আজ শনিবার, ০৬ জুন, ২০২০ ইং

Advertise

পূজায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি অন্যায়

ইমতিয়াজ মাহমুদ  

দেখি তো শুক্কুরবারে ইলেকশন দেন দেখি! দেখি আপনাদের কতো বড় ক্ষমতা! বলেন দেখি মুখ ফুটে যে, জুম্মাও পবিত্র ভোটও পবিত্র। মানুষ মসজিদে জুম্মা পড়বে আর ইশকুল ঘরে এসে ভোট দিবে। পারবেন বলতে? যদি পারেন ৩১ তারিখে শুক্কুরবার আছে, ঐদিন ইলেকশন দিয়ে দেন। ছেলেমেয়েরা তিরিশ তারিখ ইচ্ছা মতো সরস্বতী পূজা খেলুক আর শুক্কুরবারে ভোট হোক। সব ল্যাঠা চুকে যায়।

আর সেটা যদি না পারেন, বছরে অর্ধ শতাধিক জুম্মাবার আছে সেগুলির মধ্য একটা দিনে যদি ভোট করতে না পারেন তাইলে ছাত্রছাত্রীদের একটা মাত্র পূজার দিন বছরে সেটাতে বাগড়া দেবেন কেন? আর জুম্মাবারে ইলেকশন হলে তো জুম্মার কোন অসুবিধা হবে না। পূজার দিনে ইলেকশনের সমস্যা হচ্ছে পূজার ভেন্যুটা সেদিন বেদখল হয়ে থাকবে।

সেটা তো পারবেন না। আপনাদের নিজেদের ধর্মবিশ্বাস আপনাদের কাছে মনে হয় স্বতঃসিদ্ধ, অবশ্য পালনীয় ইত্যাদি। হিন্দুদের ধর্মবিশ্বাস ও পূজা পার্বণ এইগুলি তো তুচ্ছ। তাইলে এই কথাটাই স্পষ্ট করে বলেন। যে ঐসব পূজা-ফুজার কোন গুরুত্ব আমাদের দেশে নাই। মওকা পাইলে পূজা করবেন, না পাইলে নাই। ব্যস, সব স্পষ্ট হয়ে যায়। ভণ্ডামির দরকার থাকলো না।


দেখেন, আমার কাছে পূজা বলেন ঈদ বলেন বা ক্রিসমাস বলেন এইগুলির কোনটারই কোন আধ্যাত্মিক বা ঐশ্বরিক বা ওইরকম কোন গুরুত্ব নাই। কেননা ঐসবে আমার ঠিক বিশ্বাস নাই। এই দিবসগুলি আমার কাছে কেবলই একেকটা সামাজিক উৎসব- ছুটি থাকে, খানাপিনা থাকে, সুন্দর বস্ত্র থাকে, সামাজিকতা হয় ইত্যাদি। এর বাইরে বা এর বেশি কিছু না।

ছোটবেলায় অবশ্যই সরস্বতী পূজায় গেছি। সর্বশেষ সরস্বতী পূজায় গেছি সম্ভবত উনিশ শ বিরাশি কি তিরাশি সনে রাঙামাটি কলেজে। সেবারের কথা ভাসাভাসা মনে আছে। সাদা পাঞ্জাবি, সরু পাড় দেওয়া সাদা ধুতি আর সাদা খাদির চাদর পরেছিলাম। আরও দুইএকজন বন্ধু ধুতি পরেছিলেন সেদিন, ওদের নাম বলছি না, সময় ভাল না। আমরা গান করেছি, নৃত্যনাট্য করেছি, আবৃত্তি ইত্যাদি করেছি।

ইলেকশনেও অংশগ্রহণ করেছি। প্রার্থী হয়েছি বা ক্যাম্পেইন করেছি বা পোলিং এজেন্ট হয়েছি বা আর কিছু না হোক ভোটটা দিতে গেছি। ইলেকশন কর্মকাণ্ড, এর নিরাপত্তার দিক এইগুলি সবই প্রত্যক্ষ করেছি। এজন্যে এসব কথা বলছি যে, আমার মতো আপানদের অনেকেরই পূজার অভিজ্ঞতা ও ইলেকশনের অভিজ্ঞতা দুইই আছে।


আমরা সকলে ভালমতোই জানি যে যেখানে ভোট গ্রহণ হবে সেখানে আর যাই হোক পূজা হবে না। পূজাগুলিও স্কুল কলেজে হয় আর ভোটগুলিও স্কুলঘরে বা কলেজ বিল্ডিংয়ে হয়। যে স্কুলে বা যে কলেজে ভোট হবে সেইসব বিল্ডিং তো আগের দিন থেকেই পুলিশ বিজিবি আনসার এরা গিয়ে দখল করবে। প্রিজাইডিং অফিসার বিল্ডিংয়ের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করবেন।

নিরাপত্তার কারণেই ভোটের বিল্ডিংয়ে অর্থাৎ ইশকুল ঘরে ভোটের দিন আর ইচ্ছামতো লোকজন যাওয়া আসা করতে পারবে না। আপনি চিন্তা করেন তো, যত বড় বিল্ডিংই হোক, একপাশে সরস্বতী পূজা হচ্ছে আরেকদিকে ভোট হচ্ছে এটা সম্ভব? আপনার ভোট কেন্দ্রটি যে স্কুলে বা কলেজে সেখানে গিয়ে তার মাঠে দাঁড়িয়ে কল্পনা করেন। সম্ভব?

কল্পনা করেন- একদিকে ভোট হচ্ছে আরেকদিকে মাইক বাজিয়ে ছেলেমেয়েরা আবৃত্তি করছে, সন্ন্যাসী উপ-গুপ্ত মথুরা পুড়ির প্রাচীরের তোলে একদা ছিলেন সুপ্ত, হবে এটা? একদল হয়তো গান গাইছে, তুমি মঙ্গল কর তারপর কী জানি পরে মলিন মর্ম ঘুচায়ে... ইত্যাদি। এটা হয়? পুলিশ বিজিবি আনসার দিয়ে ঘিরে রাখা একটা প্রাঙ্গণ সেখানে ছোট ছেলেমেয়েরা গিয়ে প্রতিমার পায়ে বইখাতা রাখবে? হয় এরকম?


এইসব হবে না।

পূজা-ফুজায় আমি বিশ্বাস করি না। অনেকেই করে না। বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষই মনে করে পূজা একটি অর্থহীন কাজ। একটা বড় অংশের লোক মনে করে যে পূজা করা একটি মন্দ কাজ গুনাহর কাজ। ঠিক আছে। আপনার যা ইচ্ছা তাই আপনি ভাবতে পারেন। কিন্তু যে ব্যক্তিটি এইসব বিশ্বাস করে তার তো অধিকার আছে তার নিজের বিশ্বাসটি প্র্যাকটিস করার। সে যদি একজনও হয় তবুও তার অধিকার আছে।

এটা আমাদের দেশের মৌলিক ভিত্তির অংশ। আদর্শিক ভিত্তি এবং আইনগত ভিত্তি। সকল মানুষ তার বিশ্বাস অনুযায়ী প্র্যাকটিস করতে পারবে এবং সকলের এরকম বিশ্বাস অথবা অবিশ্বাসের অধিকার আছে। তাহলে রাষ্ট্রের ভূমিকা কী হবে? রাষ্ট্র সকলের এই অধিকার নিশ্চিত করবে। এসব বিশ্বাসের মধ্যে একটাকে ভুল বা একটাকে শুদ্ধ বা একটাকে ঠিক বা আরেকটাকে মন্দ বলতে পারবে না রাষ্ট্র।

এখানেই পূজার দিনে পূজার বিঘ্ন ঘটিয়ে ভোট করার ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রকে কেউ বলছে না যে সরকারিভাবে পূজা করতে হবে ইত্যাদি। কিন্তু যেটা রাষ্ট্রকে করতে হবে সেটা হচ্ছে যে কারো নিজস্ব বিশ্বাস বা আচার বা প্রতিপালনে যেন বিঘ্ন না ঘটে সেটা দেখা। সকলেই যেন তার নিজের নিজের বিশ্বাস বা অবিশ্বাস অনুযায়ী অনুস্থানাদি পালন করতে পারে।

কিন্তু রাষ্ট্র এখানে উল্টোটা করছে- রাষ্ট্র নিজেই প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। এটা অন্যায়।

ইমতিয়াজ মাহমুদ, অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট। ইমেইল: mahmood.imtiaz@gmail.com

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অধ্যাপক ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১০ আজমিনা আফরিন তোড়া ১০ আফসানা বেগম আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ২৮ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১৫ আরিফ রহমান ১৬ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৪৭ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইনাম আহমদ চৌধুরী ইমতিয়াজ মাহমুদ ৬০ ইয়ামেন এম হক এখলাসুর রহমান ২৩ এনামুল হক এনাম ২৯ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ এস এম নাদিম মাহমুদ ২৭ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৩৫ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান খুরশীদ শাম্মী ১৪ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ২৮ জহিরুল হক মজুমদার জাকিয়া সুলতানা মুক্তা জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুয়েল রাজ ৭৭ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ১২ ড. কাবেরী গায়েন ২২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৭ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬২ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৩৪ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৮ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১৪০ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১৩২ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক ১৩ রণেশ মৈত্র ১৬৭ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ২৯ রাজেশ পাল ২৪ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩৪ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর শাখাওয়াত লিটন শামান সাত্ত্বিক শামীম আহমেদ শামীম সাঈদ শারমিন শামস্ ১৪ শাশ্বতী বিপ্লব শিতাংশু গুহ শিবলী নোমান শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ ২৪ শেখ মো. নাজমুল হাসান ২১ শেখ হাসিনা শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী সঙ্গীতা ইমাম সঙ্গীতা ইয়াসমিন ১৬

ফেসবুক পেইজ