টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
Advertise
বিপ্লব কর্মকার | ২৭ জুলাই, ২০২৫
২৬ জুলাই ঢাকা ট্রিবিউনসহ অনেকগুলো পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে যে, তথ্য কমিশনের শূন্য পদে কমিশনারদের নিয়োগের মাধ্যমে কমিশনকে সক্রিয় করা হচ্ছে। অবাধ তথ্যের প্রবাহ, দুর্নীতি হ্রাস, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি শুধু তথ্য কমিশনার নিয়োগের মাধ্যমেই শেষ হয় না। সাপ্লাই সাইডের সদিচ্ছাও দরকার। এই সদিচ্ছা কি সবার আছে?
আসুন দেখি প্রধান উপদেষ্টা কার্যালয়ের আছে কি না?
প্রধান উপদেষ্টা কার্যালয়ের ওয়েবসাইটে শুধু তথ্য কর্মকর্তার নাম দেয়া আছে। এমন একটা ই-মেইল দেয়া আছে, যা তিনি নিজেই নিয়মিত চেক করেন না। আপিল কর্তৃপক্ষের নাম নেই। কেন নেই? যাতে একজন নাগরিক আবেদনের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া শেষ করে অভিযোগ দিতে না পারে। মাত্র তিনটি তথ্য চেয়েছিলাম, কিন্তু অদ্যাবধি কোন তথ্য পাইনি।
ক) মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নিয়োগে অত্র কার্যালয় কী কী ব্যবস্থা নিয়েছে —তার দালিলিক তথ্য।
খ) তথ্য কমিশনের প্রধান তথ্য কমিশনার ও কমিশনারদের নিয়োগে অত্র কার্যালয় কী কী ব্যবস্থা নিয়েছে—তার দালিলিক তথ্য।
গ) সম্ভাব্য কবে (দিন, তারিখ) নাগাদ উপরোক্ত দুটি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান, সদস্য, প্রধান তথ্য কমিশনার ও কমিশনারদের নিয়োগ।
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে তথ্যের অবাধ প্রবাহ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির যদি এ হাল হয়, তাহলে নিচের দিকে কেমন হবে তা সহজেই অনুমেয়। এ পর্যন্ত তথ্য না দেয়ার অপরাধে যে সকল দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে শাস্তি দেয়া হয়েছে তাদের বেশিরভাগই পিয়ন, ইউনিয়ন পরিষদের সচিব, স্কুল মাস্টার ইত্যাদি ধরনের নিরীহ কর্মকর্তা। এমন তথ্য কমিশন ও তথ্য কমিশনার চাই যেন, তারা ছোট কর্মকর্তা নয়, বড় বড় রুইকাতলাদের আগে জরিমানা করে।
তথ্য কমিশন নিজেই তথ্য প্রবাহে বড় বাধা ছিল
কমিশনাররা শুনানিতে হয়রানি, গালমন্দ, পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে আবেদনকারীকে হয়রানি করেছেন। এজন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দৌরাত্ম্য এমনভাবে বেড়ে গিয়েছিল যে, তথ্য আবেদন করার কারণে আবেদনকারীকে ছয় মাসের জেল পর্যন্ত দিয়েছে। এ খবরে দেশের অন্যান্য আবেদনকারীরা নিস্তব্ধ হয়ে যায়। তথ্য কমিশনের কর্মকর্তা কর্মচারী উপর মহলের আদেশে অথবা অদৃশ্য কারণে নিজেরাই দুর্নীতি করত। যেমন শুনানির জন্য সমন পোস্ট অফিসে আটকে রাখত, শুনানির পর চিঠি বিলি করা হত। এ কায়দা তারা করত দুর্নীতি সংক্রান্ত কোন তথ্য আবেদনের শুনানির আগে, যদি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তাদের ম্যানেজ করতে পারত। অথচ, মেইলে বা এসএমএসে এক ক্লিকেই আবেদনকারীকে শুনানির দিন তারিখ অবহিত করতে পারে। আরও যে ভয়ংকর প্র্যাকটিস কমিশনে এতদিন চালু ছিল তা হল—দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার অনুপস্থিতিতে কমিশনের কর্মকর্তাই দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার প্রতিনিধিত্ব করা। এটা ছিল আইনের চরম লঙ্ঘন। তাই একটা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে, আগেই তথ্য কমিশনে একটা শুদ্ধিকরণ অভিযান পরিচালনা করতে হবে। স্বৈরাচারের দোসরদের বিতাড়ন করতে হবে।
একটা অচলাবস্থার চক্র
এখনো অনেক প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নেই বা নিয়োগ দেয়া হয়নি। সেই সকল প্রতিষ্ঠান প্রধান বরাবরে আবেদনের পর কমিশনে অভিযোগ দিলে—“যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়নি” মর্মে শুনানির আগেই চিঠি দিয়ে খারিজ করে দেয়। তখন তথ্য কমিশনের কাছে উক্ত প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও আপিল কর্তৃপক্ষ কে?—জানতে চাইলে আর জানায় না। ফলে কমিশন কর্তৃক একটা অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়, যার কারণে ঐ প্রতিষ্ঠানগুলোতে আর আবেদন করা যায় না। এরকম কিছু প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ হল—এটর্নি জেনারেল কার্যালয়, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ, সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশন, বেশিরভাগ বেসরকারি ব্যাংক, বিআইবিএম ইত্যাদি।
নতুন কমিশন ও কমিশনারদের কাছে দাবি থাকবে এই অচলাবস্থার চক্র ভেঙে দেয়া। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কোন প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে না থাকলে, প্রতিষ্ঠান প্রধান বরাবরে আবেদন করে, পরে অভিযোগ দিলে তা আমলে নেয়া। এই অচলাবস্থার যেন সৃষ্টি না হয় সেজন্য প্রয়োজনে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাবিহীন অফিসের তথ্য সরাসরি প্রধান তথ্য কমিশনারের কাছে চাওয়ার রেওয়াজ চালু করা উচিৎ।
মাত্র ২১ টি রিটের দ্রুত নিষ্পত্তিকরণ
হাইকোর্টে একটা রিট থাকলেই সেই রিট নাম্বার উল্লেখ করে প্রতিষ্ঠান আবেদনকারীকে সাবজুডিস বিষয় উল্লেখ করে কোন তথ্যই দেয় না যদিও যাচিত তথ্য রিটের তথ্যের সাথে কোন মিল নেই। উদাহরণস্বরূপ, ৯৩৮০/২০১৪ রিট নাম্বার উল্লেখ করে বহু সরকারি কর্মচারীর তথ্য আবেদন আগ্রাহ্য করেছে বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন । সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, তথ্য অধিকার সংক্রান্ত মাত্র ২১টি রিট হাইকোর্টে বিচারাধীন। এগুলো অতি সত্বর নিষ্পত্তি করে তথ্য অবাধ প্রবাহ বাধামুক্ত করতে হবে।
দুর্বল রায় লেখা
সর্বশেষে বলা যায়, সিদ্ধান্তপত্রগুলো লেখার সময় জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অভাব বিদ্যমান। কোন রকম ব্যাখ্যা থাকে না, কেন নাগরিক তথ্য পাবে না। সিদ্ধান্তপত্রগুলো পড়লে মনে হবে যেন, গায়ের জোরে লেখা মনগড়া আদেশ। এই উদাহরণ অগ্রহণযোগ্য। যথাযথ আইনি ব্যাখ্যা দিয়ে সিদ্ধান্তপত্রগুলো লিখতে হবে।
তাই কেমন তথ্য কমিশনার চাই?
আইনে কমিশনারদের যোগ্যতার একটা মাপকাঠি দেয়া আছে। ১৫(৫) ধারা অনুসারে, “আইন, বিচার, সাংবাদিকতা, শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, তথ্য, সমাজকর্ম, ব্যবস্থাপনা বা জনপ্রশাসনে ব্যাপক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার অধিকারী ব্যক্তিগণের মধ্য হইতে প্রধান তথ্য কমিশনার এবং তথ্য কমিশনারগণ, এই ধারার বিধানাবলী সাপেক্ষে, নিযুক্ত হইবেন৷”
মাপকাঠি এবং যোগ্যতা যাই থাকুক, বাংলাদেশে এই পর্যন্ত নিয়োগ প্রাপ্ত কমিশনারদের মধ্যে সবাই ছিল অবসরপ্রাপ্ত আমলা, তিনজন শিক্ষক, একজন টকশোতে জ্ঞানী মানুষদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে যোগ্য বিবেচিত। বেশিরভাগ আমলাদের নিয়োগের কারণে এই প্রতিষ্ঠান হয়ে যায়—অবসরপ্রাপ্ত আমলাদের পুনর্বাসন কেন্দ্র। এই তালিকার তথ্য কমিশনারদের মাত্র দুজন জনগণের তথ্য অধিকারের প্রতি সম্মান দেখিয়েছেন। বাকিরা নিয়োগকর্তা প্রভুকে সন্তুষ্ট করেছেন।
২৬ জুলাইয়ের খবরে যে তথ্য কমিশনারদের নিয়োগ দেয়া হবে বলা হয়েছে—সময়ই বলে দেবে তারা কী, জনগণের তথ্য অধিকারের প্রতি সম্মান দেখাবে না নিয়োগকর্তা প্রভুকে সন্তুষ্ট করবে—যা হবে জুলাই পুনর্জাগরণ স্পিরিটের সাথে সাংঘর্ষিক?
মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।
আপনার মন্তব্য