টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
Advertise
শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ | ২৮ ডিসেম্বর, ২০২৫
২০১৯ সালে করোনা ভাইরাসের আক্রমণ আমাদের জীবন যাত্রায় ভয়াবহ মাত্রায় পরিবর্তন এনেছে। অনাকাঙ্ক্ষিত এই ভাইরাসের প্রকোপ এবং প্রসার একেবারেই অতর্কিত নয়। কারণ, করোনা ভাইরাস সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেছে প্রায় ৫৫ বছর আগে। ১৯৬৪ সালে লন্ডনের সেন্ট থমাস হাসপাতালের গবেষণাগারে প্রথম করোনাভাইরাস শনাক্ত করেছিলেন ড. আলমেইডা। তিনি মানব শরীরে করোনা ভাইরাসের অস্তিত্বের প্রমাণ করেছিলেন।
ইন্টারন্যাশনাল সায়েন্স কাউন্সিল (আইএসসি)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালে করোনা ভাইরাসে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে ৩৮ ব্যক্তি আক্রান্ত হয়েছিলেন। এদের মাঝে ২২ জনের মৃত্যু হয়, যাদের ১১ জনই সৌদি নাগরিক। ঐ সময়ে সৌদি আরব, জর্ডান, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সকে 'করোনাভাইরাস' সম্পর্কে রেড এলার্ট জারি করা হয়েছিল। বিজ্ঞানীরা বলেছিলেন, এই ভাইরাসে নারী-পুরুষ উভয়েই আক্রান্ত হতে পারেন।
২০১৯ থেকে বিশ্বব্যাপী সৃষ্টি হয় মহামারী পরিস্থিতি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাদের অফিসিয়াল ওয়েব সাইটে উল্লেখ করেছে, "কোভিড-১৯ মহামারী দ্বারা প্রমাণ হয়েছে, বড় বড় সংক্রামক রোগ এবং মহামারী মানবজীবনের উপর বিধ্বংসী প্রভাব ফেলতে পারে। দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের উপর বিপর্যয় ডেকে আনছে। বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য সংকট ইতিমধ্যেই অতিরিক্ত প্রসারিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আচ্ছন্ন করেছে। বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খলকে ব্যাহত এবং মানুষের জীবিকা ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অর্থনীতির অসামঞ্জস্যপূর্ণ ধ্বংসের হুমকি দিচ্ছে।"
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, করোনা ভাইরাসের আধিপত্য চলমান রয়েছে। বলা বাহুল্য, মহামারী হলো যখন একটি নতুন রোগ বা বিদ্যমান রোগের নতুন স্ট্রেন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। নতুন ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস বা কোভিড-১৯ এর মতো ভাইরাল শ্বাসযন্ত্রের রোগগুলো মহামারী সৃষ্টির সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা রাখে। অতীতে, অনেক ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারী দেখা দিয়েছে। মহামারীগুলো প্রায়শই প্রাণীদের ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস থেকে শুরু হয়। মহামারী ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসগুলো মৌসুমি ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস থেকে আলাদা। ২০২০ সাল থেকে ডিসেম্বর মাসের ২৭ তারিখে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সরাসরি তত্ত্বাবধানে আন্তর্জাতিক মহামারী দিবস পালন করা হয়।
মহামারী ব্যবস্থাপনা এবং মৌলিক পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা দিবসটি পালনের মূল উদ্দেশ্যে। জাতিসংঘের মহাসচিব এক বার্তায় বলেছেন, "কোভিড-১৯ একটি মানবিক ট্র্যাজেডি। কিন্তু এটি একটি প্রজন্মগত সুযোগও তৈরি করেছে। আরও সমান ও টেকসই বিশ্ব গড়ে তোলার একটি সুযোগ। মহামারীর প্রতিক্রিয়া এবং এর আগে যে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দিয়েছিল, তার প্রতিকার অবশ্যই একটি নতুন সামাজিক চুক্তি। আগামীতে নতুন বৈশ্বিক চুক্তির উপর ভিত্তি করে পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে যা সকলের জন্য সমান সুযোগ তৈরি করবে এবং সকলের অধিকার ও স্বাধীনতাকে সম্মান করবে।"
প্রশ্ন হতে পারে, কীভাবে আমরা সামাজিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মহামারি প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে পারি? এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন আলোক হেলথকেয়ার অ্যান্ড হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. লোকমান হোসেন। তিনি বলেছেন," বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, বিশ্বজুড়ে নতুন ভাইরাস অত্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। যার ফলে করোনা ভাইরাস ও ডেঙ্গুর মতো মহামারি মানুষের জীবন ও অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলছে। শুধুমাত্র করোনায় পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেছে প্রায় ৬৯ লাখ মানুষ। বাংলাদেশেও প্রতি বছর ডেঙ্গু আমাদের বহু প্রিয় মানুষকে কেড়ে নিচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, যদি প্রস্তুতি, প্রতিরোধ, সচেতনতা এবং সামাজিক উদ্যোগ শক্তিশালী হয়, তাহলে মহামারি-জনিত ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।"
মহামারি বিষয়ক বিভিন্ন জার্নাল থেকে জানা গেছে, মহামারি রুখতে হলে এটি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞান থাকা জরুরি। যেকোনো মহামারীর দ্রুততম পর্যাপ্ত প্রতিক্রিয়া জানাতে প্রস্তুতির স্তর বৃদ্ধি করে মহামারী প্রতিরোধকে শক্তিশালী করা গুরুত্বপূর্ণ। একইসাথে মানব স্বাস্থ্য, প্রাণী স্বাস্থ্য এবং উদ্ভিদ স্বাস্থ্য এবং পরিবেশগত অন্যান্য প্রাসঙ্গিক খাতের একীকরণকে উৎসাহিত করে এমন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা বাঞ্ছনীয়। মহামারী মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং বহুপাক্ষিকতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মহামারী ব্যবস্থাপনার সকল পর্যায়ে প্রতিটি ব্যক্তি, সম্প্রদায় এবং রাষ্ট্রের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। এক্ষেত্রে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে অংশীদারিত্ব এবং সংহতির গুরুত্বের উপর জোর দিতে হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মহামারী নিয়ন্ত্রণ ও পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি পূর্ববর্তী মহামারীর শিক্ষা থেকে পরবর্তীতে সম্ভাব্য মহামারী সম্পর্কে ভাবনা ও প্রস্তুতির সুযোগ রয়েছে। আগে থেকে যথাযথভাবে প্রস্তুতি না থাকলে মহামারী বা জরুরী পরিস্থিতিতে তা মোকাবেলা করা ভীষণ কঠিন, যার প্রমাণ ইতোমধ্যে বিশ্ববাসী করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে উপলব্ধি করেছে। এই উপলব্ধি থেকেই ভবিষ্যৎ মহামারী প্রতিরোধ ও প্রস্তুতির তাগিদ। সামাজিক চুক্তি বা সম্পর্ককে মানুষ কতটা কাজে লাগাতে সক্ষম হবে, তার ওপর নির্ভর করছে ভবিষ্যৎ মহামারীর আশঙ্কা, পরিস্থিতি ও সেটা মোকাবেলা। যদি বিশ্ববাসী এই শিক্ষা ও সুযোগকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারে, তাহলে একদিকে ভবিষ্যতের মহামারী প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে বিদ্যমান সামাজিক অসমতা থেকে মানুষ মুক্তি পাবে। এক্ষেত্রে শিক্ষা, গবেষণা, সংহতি ও স্বাস্থ্যসেবা অনিবার্য অনুষঙ্গ হিসেবে বিবেচিত।
মহামারী প্রস্তুতির মূলে রয়েছে বিশ্বব্যাপী সংহতি। এই দিবসটি স্বাস্থ্য সংকট মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের গুরুত্ব তুলে ধরে এবং মহামারী মোকাবেলায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতো সংস্থাগুলোর ভূমিকার উপর জোর দেয়। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, মহামারীর হুমকি ক্রমশ বাড়ছে। এটি যেকোনো সময় মানবিক সংকট বৃদ্ধি করতে পারে। অতএব, ভবিষ্যতের প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধ এবং প্রশমনে টেকসই ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন।
মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।
আপনার মন্তব্য