টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
Advertise
এনামুল হক এনাম | ১৪ জুলাই, ২০২০
বয়ঃসন্ধিকালে নজর দিন নিজ সন্তান, ভাই-বোনদের প্রতি। ১৩ বৎসর থেকে ১৯ বৎসর, একটি ছেলে এবং একটি মেয়ের জীবনে সবচেয়ে কঠিন সময়। এই সময়েই বয়ঃসন্ধি কাল, শারীরিক মানসিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের সময়, হরমোনের পরিবর্তনের সময়। সময়টা এতই কঠিন যে সামান্য বেখেয়ালে সদ্য কৈশোরে পদার্পণ করা সন্তান বা ছোট ভাই বোনটি পথ হারিয়ে ফেলতে পারে। চোখের সামনে নিজের সন্তানকে ভুল পথে যেতে দেখেও সঠিক দিক নির্দেশনার অভাবে শোধরানো যায় না। সেও আপনাকে বুঝতে পারে না, আপনি তাকে বুঝতে পারেন না। পরিশেষে আমরা অনেকেই হাল ছেড়ে দেই। যার ফলে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে যাত্রা করে আপন ভাই, বোন বা সন্তান।
বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন আগে থেকে লিখবো ভাবছি, কিন্তু লিখতে পারছি না আপনজনদের জন্য। অতি ঘনিষ্ঠ ছোট ভাই, বোনকে চোখের সামনে ভুল পথে যেতে দেখেছি, নিজের বিবেকের তাড়নায় বার বার বাধা দিয়েছি, সফল হতে পারিনি। কারণ দিনশেষে আমি তার পরিবার না। কঠিন কোন সিদ্ধান্ত নিতে গেলে পারিবারিক সমর্থন পাওয়া যায় না, সেই পরিবার বলে বসে, “বিগড়ে গেলে বিগড়ে যাক… সে তার ভবিষ্যৎ নষ্ট করবে”। কলাম লিখতে গিয়ে মনে হয়েছে, এই কলাম পড়ে আত্মীয়রা মনে করবেন, তাদের উদ্দেশ্যে লিখা। হ্যাঁ, তাদের তো অবশ্যই, সাথে অন্যান্য যারা এই কলামটি পড়বেন, নিজ সন্তান, ভাই-বোনকে বেশি করে সময় দেবেন, তাদের বন্ধু হবেন, এই আশায় লিখতে বসা।
আমার অতি ঘনিষ্ঠ বন্ধু যে এখন এই বয়সেও ইউরোপে কিংবা দেশে নিজের ক্যারিয়ার গড়ার জন্য তীব্র লড়াই করছে, তারা পদে পদে ঠ্যাকেছে কৈশোরের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে। চল্লিশ বছর বয়সেও ফ্র্যাস্টেশনে ভোগা এক বন্ধু দুঃখ করে বলেছিল, কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে উঠার পরই যেন আকাশটা ছুঁয়ে ফেলেছিলাম। পড়ার টেবিলে কালেভদ্রে বসতাম, প্রচুর আড্ডা মারতাম। আড্ডা মারতে হলে টাকার প্রয়োজন, স্যারের বাসার কথা বলে টাকা নিতাম বাসা থেকে। বন্ধুরা মিলে গাঁজা খেতো, আমিও সামিল হলাম। গাঁজা খাওয়ায় আমার সুনাম ছড়িয়ে পড়লো, প্রচুর টানতে পারি। বন্ধুদের মাঝে যারই গাঁজা খাওয়ার ইচ্ছা হয়, সেই আমায় ডাক দেয়। আমি হাজিরা দেই। এভাবে দেখা গেল, সব অনেক বন্ধুই গাঁজা খেয়ে বাসায় গিয়ে ঠিকই পড়তে বসতো, আর আমি একে সঙ্গ দেই, ওকে সঙ্গ দেই। সব সঙ্গের সঙ্গী হয়ে ইন্টার ফেল করলাম। অথচ যে আমায় গাঁজা খাওয়ানো শিখিয়েছিলো, সে প্রথম বিভাগ পেয়েছিল। নিজের ভাল মন্দ বুঝার ক্ষমতা লোপ পেয়েছিল। বাসায় কেউ উপদেশ দিলে তাকে সবচেয়ে বড় শত্রু মনে হতো! অনেকবার বিদেশ কিংবা ব্যবসার জন্য টাকা নিলাম পরিবার থেকে, কিন্তু কিছুই হল না। অনেককিছু বুঝতে পারতাম না, জানতাম না… কারণ লেখাপড়া অতটা করিনি, বা যতটুকু করেছি তা মনোযোগ দিয়েও করিনি।
এটা আমার বন্ধুর অভিজ্ঞতা। আপনার আশপাশে আপনারই পরিচিতজন, বন্ধুবান্ধব অনেকেই আছেন যারা টিনএজ লাইফে জীবনের সবচেয়ে জরুরি সময়টা নষ্ট করেছেন। অনেকক্ষেত্রে তাদের টাকা পয়সা হয়েছে, কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ঐ নিম্নস্তরেই রয়ে গেছে, দশজনের সাথে আড্ডায় বসলেই তা প্রকট হয়ে পড়ে। অতি আপনজন চোখের সামনে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু আমরা প্রায়শই তা বুঝতে পারি না। কলামের এই পর্যায়ে আমি কয়েকটি পয়েন্ট আপনাদের নজরে আনতে যা দেশে বা পর্যবেক্ষণ করে আপনারা বুঝতে পারবেন আপনার সন্তান বা ছোট ভাই বা বোনটির প্রতি আরও বেশি নজর দেয়া দরকার, সময় দেয়া দরকার।
১. পারিবারিক আড্ডায় আপনার সন্তান অনুপস্থিত থাকবে। সকালের নাস্তা, দুপুরের খাবার, বিকালের নাস্তা বা রাতের খাবার, একসাথে টিভি দেখা এইসব সময় পারিবারিক সময়। প্রাথমিক ভাবে আপনার সন্তান পারিবারিক আড্ডা মিস করবে, বোরিং ফিল করবে।
২. প্রচুর মিথ্যে কথা বলবে। একটু খেয়াল করলেই ধরতে পারবেন, এসময়ে তারা অনায়াসে মিথ্যা কথা বলে, হেসে এমন সব মিথ্যা বানিয়ে বলবে, আপনারাই কনফিউজড হয়ে যাবেন।
৩. না, নিষেধ শুনতে চাইবে না। অনুমতি নিতে কাজ করাকে অপমান মনে করবে।
৪. আপনার দেয়া উপহার তার প্রায়শই পছন্দ হবে না এবং এজন্য মুখের উপর তা বলে দিতে দ্বিধা করবে না।
৫. কোন আইন আদেশ, নিষেধ বা নিয়মের ভেতর থাকতে চাইবে না।
৬. পরামর্শ দিলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করবে। কোন ক্ষেত্রে পরামর্শ উপদেশ খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছে ভান করবে, কিন্তু পরে বিন্দুমাত্র গ্রাহ্য করবে না কিছু।
৭. সামান্য ব্যাপারে রেগে যাবে। মেজাজ দেখাবে।
৮. কোন সাহায্য নিতে চাইবে না। নিজেকে খোলসের ভেতর লুকিয়ে ফেলবে।
৯. অন্যান্য ভাইবোনদের সাথে মিশতে চাইবে না। কথা কমিয়ে দেবে। সম্পর্ক অবনতি হবে। ভাইবোনদের মধ্যে কিছু শেয়ার করতে চাইবে না।
১০. পড়ার টেবিলে কোন নির্দিষ্ট সময়ে বসবে না। বসলেও অমনোযোগী থাকবে।
১১. লক্ষ্য করলে দেখবেন কিছুটা বেপরোয়া ভাব আছে, প্লিজ বা থ্যাংক ইউ শব্দগুলো বলছে না। মাথা নিচু করে কাউকে কিছু না বলে বাসা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে, ফিরছে।
১২. নিজের প্রয়োজনে, “আমার দরকার, দিতে হবে। দেয়াই লাগবে” এইসব শব্দ ব্যবহার করছে।
১৩. সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি কমে যাবে। প্রায়শই বেয়াদবি করবে। ইমোশনাল ব্ল্যাক-মেইল করতে চাইবে।
১৪. কম্প্রোমাইজ করতে চাইবে না। জেদি ভাব দেখাবে।
১৫. অসময়ে বাসা থেকে বের হবে, অসময়ে বাসায় ফিরবে।
১৬. খেলাধুলা থেকে বন্ধুদের সাথে আড্ডায় বেশি আগ্রহী হবে।
১৭. অনেক বেশি কিছু তার গোপনীয় থাকবে। প্রয়োজনে, তার অবর্তমানে তার রুমে ঢুকলে বা তার মোবাইল হাতে নিতে ক্ষেপে যাবে।
১৮. নিজের ভুলে জবাবদিহিতা করবে না। প্রশ্ন করলে উলটো রেগে যাবে।
১৯. নিজের প্রব্লেম নিয়ে কথা বলতে চাইবে না।
২০. অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হবে যা বয়সের সাথে একেবারেই বেমানান হবে।
২১. পড়ালেখা ঠিক মত হচ্ছে না, রেজাল্ট খারাপ বা বন্ধুদের নিয়ে অভিযোগ করলে, পালটা তর্ক জুড়ে দেবে, কোন ক্ষেত্রে আপনাকেই অভিযুক্ত করবে বা নিরুত্তর থাকবে।
২২. অত্যধিক সময় মোবাইলে কাটাবে।
২৩. রাত জাগবে, দেরিতে ঘুম থেকে উঠবে। ক্লাস বা প্রাইভেট টিউশন মিস করবে।
এইসব বিষয় নজরে এনে আপনাকে আরও বেশি সময় দিতে হবে নিজের সন্তান, ভাই, বোনকে। সবচেয়ে জরুরি ফ্যামিলি টাইম বা পারিবারিক আড্ডা। পারিবারিক আড্ডায় নিজের টিনএজ সন্তান বা ভাই বোনকে পেতে চেষ্টা করুন বেশি বেশি। তাদের সাথে বেশি বেশি কথা বলুন, বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করুন। ক্লাস কেমন চলছে খোজ নিন। বন্ধুদের কি খবর, কোন বন্ধুর কি পছন্দ, কি করে তা কৌশলে আড্ডায় গল্পচ্ছলে জেনে নিন। লক্ষ্য রাখুন পড়তে বসে মোবাইল ইউজ করছে কি না বা মোবাইলে কেমন সময় দিচ্ছে। রাত জাগার ব্যাপারে কড়া নিষেধাজ্ঞা দিন, এমন কি পড়ালেখার অজুহাতেও না। নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাবে এবং নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে উঠবে। এ ব্যাপারে কোন ছাড় দিবেন না। সন্তান বা ভাই সিগারেট খায় কি না তা জানার সহজ উপায় মাঝে মধ্যে হাসিমুখে তার সাথে হ্যান্ডশেক করা কৌতুকচ্ছলে। একটু সরে গিয়ে নিজের হাত শুকলেই তামাকের গন্ধ পাবেন যদি সে সিগারেট খায়। আর সন্তান যদি অত্যধিক চালাক হয় তবে বাইরে থেকে সাবান দিয়ে হাত মুখ ধুয়েই বাসায় আসবে। সেক্ষেত্রে তার রুমে মাঝে মধ্যে গোয়েন্দাগিরি করা উচিত। আর হ্যাঁ আপনাকে এক্ষেত্রে সিগারেট না খাওয়ারই অনুরোধ করব। অন্তত নিজের সন্তানের সামনে সিগারেট খাবেন না, তাহলে সে ধূমপানকে নর্ম হিসেবে ধরে নেবে। নিয়মিত খোজ নিন স্কুল, কলেজে। ক্লাস নিয়মিত করছে কি না, রেজাল্ট কেমন। কোন বন্ধুদের সাথে মিশছে, কতটা সময় মিশছে, কোথায় দেখা করছে বা মিশছে।
যৌনতা সম্পর্কে এই বয়সে অধিক আগ্রহ থাকে। প্রয়োজনে নিজের সন্তানের সাথে খোলামেলা আলোচনা করুন। কোনটা স্বাভাবিক কোনটা অস্বাভাবিক সেই ধারনা দিন। সেক্সুয়াল এব্যিউজ যাতে না হয় বা কাউকে নিজে সেক্সুয়াল এব্যিউজ না করে সেদিকে নজর রাখুন এবং সহজ সরল ভাষায় বিষয়গুলি বুঝিয়ে বলুন। মনে রাখবেন, এসব বিষয়ে লজ্জা পাবেন না। লজ্জা ভেঙ্গে সেক্স এডুকেশন দেয়ার বিষয়টি আপনার সন্তানকে অনেক বড় বিপদ থেকে বাঁচিয়ে দিতে পারে। এই বয়সে আপনার সন্তান বা ভাই, বোন ভুল করলে শাসনের বদলে বুঝিয়ে বলুন, কাউন্সিলিং করুন।
মনে রাখবেন ১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সটা আসলেই কঠিন। অন্তত ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত নিজের সন্তান, ভাই-বোনকে একটু বেশি নজরে রাখুন, তাকে নৈতিক এবং আদর্শিক শিক্ষা দিন। উচ্চমাধ্যমিকে একটা ভাল রেজাল্ট তার জীবনের গতিপথ বদলে দেবে। একটা ভাল ট্র্যাকে পড়ে গেলে, সে নিজের বুদ্ধিমত্তায় বাকী পথ একাই চলতে পারবে। সে পর্যন্ত তার পাশে থাকুন।
মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।
আপনার মন্তব্য