আজ বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬

Advertise

কষ্টের দিনে দুষ্টের কথা

রহিম আব্দুর রহিম  

সবেমাত্র স্কুলে যাওয়া-আসা। দিন তারিখ মনে পড়ছে না। চাউলের দাম নাগালের বাইরে। ঢাকা থেকে সাংবাদিক এসেছে, এই সংবাদ এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। শত শত মানুষ ছুটছে সাংবাদিক দেখতে; তাদের মধ্যে আমিও একজন। গ্রামের বাড়ি থেকে প্রায় ৬ কিলোমিটার রাস্তা দৌঁড়াইয়া ঢাকা-জামালপুর সড়কের দিগপাইত বাসস্ট্যান্ডে হাজির হলাম; শত সহস্র মানুষের মাঝে সাংবাদিক দেখা কঠিন হয়ে দাঁড়াল। কে সাংবাদিক, কে সাধারণ তা খুঁজে না পেয়ে বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন বকুল গাছের নিচে দাঁড়ালাম। এক বয়স্কজন জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি রে তোরা কেন আইছস?’ বললাম, সাংবাদিক দেখতে। উনি বললেন, ‘দেখছস?’ বললাম, না। উনি দেখিয়ে দিলেন এক ব্যক্তিকে। যার হাতের এক তালায় কিছু কাগজপত্র, অন্য হাতে কালো একটি বাক্সের মত প্যাকেট, সম্ভবত ক্যামেরা হবে। মন ভরে গেল, সাংবাদিক দেখেছি। বাড়ি এসে সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে এক ভয়াবহ কাহিনী বন্ধু-বান্ধবদের শোনালাম। ওদের চেহারা দেখে বুঝতে বাকি থাকলো না, সাংবাদিক না দেখাটা তাদের জন্য একটা অভিশাপ! মনে মনে স্বপ্ন দেখা শুরু করলাম, আমিও সাংবাদিক হব। স্কুল পেরিয়ে কলেজ, স্থানীয় একটি পত্রিকায় রিপোর্ট করি। এরপর কলেজ ক্যাম্পাস প্রতিনিধি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার, স্টাফ রিপোর্টারের খ্যাতি নিয়ে এখন অধ্যাপনার পাশাপাশি লেখালেখি করছি। সময় গড়িয়েছে ৩৭ বছর, নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোতে আত্মতৃপ্তি ছাড়া আর কিছুই নেই।

বর্তমান সরকারের টানা ১২ বছরের ব্যবধানে দেশের সংবাদপত্র এবং সাংবাদিকদের খনি বের হয়েছে। মাথার চুল গুনে শেষ করা যায়, সাংবাদিক গুনে শেষ করা মুস্কিল। সাধারণ মানুষ সাংবাদিকদের নাম শুনলে ‘ঘৃণার বমি’ উদগরণ করে। অসংখ্য অনলাইন পোর্টাল, টিভি চ্যানেলের হিসেব মেলানো ভার। টাকার বিনিময়ে পাওয়া যায় এ সমস্ত মিডিয়ার আইডি কার্ড। সমাজের রিকশা- ভ্যানচালক, মেকার-মিস্ত্রি, অর্ধশিক্ষিত-অশিক্ষিত বেকাররা গলায় কার্ড ঝুলিয়ে চষে বেড়াচ্ছে গ্রাম-শহর। অফিস-আদালত, কোর্ট-কাচারি, থানা থেকে আঁতুড়ঘর পর্যন্ত এদের দৌরাত্ম্য। অনেক নামি-দামি কিছু মিডিয়ায় কাজ করেছে এখন করে না, অর্জন করেছে সাংবাদিকতার খ্যাতি, এই খ্যাতিতেই রাষ্ট্রের সর্বাঙ্গে প্রভাব বিস্তার করে সুবিধা ভোগ করছে, এদের সংখ্যাও একেবারে কম নয়। হাতে মিডিয়া নেই, সাংবাদিক সংগঠনের নেতা সেজে সুবিধা গ্রহণকারীরাও তৎপর। রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলে বিবেচিত সংবাদ জগত এখন কলুষিত, কলঙ্কিত, অন্ধকারে পতিত এক ভয়াবহ জগতের নাম। এই জগতের সংস্কারে কে, কারা, কখন এগিয়ে আসবেন সেটাই ভাবনার বিষয়।

বেশিদিনের কথা নয়, দেশ স্বাধীন হওয়ার পরের ঘটনা। গ্রামের জনমানুষ দিনমান হাড়ভাঙা খাটুনির পর সন্ধ্যা বেলায় হলে সিনেমা দেখতে যেতেন, বিদ্যুৎ না থাকায় জেনারেটরের সাহায্যে সিনেমা হল চলতো। সে কি আনন্দ! ওই সময়কার নায়ক-নায়িকাদের মনোমুগ্ধ অভিনয়ে বিমোহিত শ্রোতা-দর্শক তাদের নবজাতকের নাম রাখতেন নায়ক-নায়িকাদের নামানুসারে। তখনকার দিনে প্রতি মাসে একবার টেলিভিশনে প্রদর্শিত হতো সিনেমা। এই সিনেমা দেখার জন্য গ্রামের মানুষের সে কি ভিড়! বিদ্যুৎ ছিল না, ব্যাটারির মাধ্যমে চলতো টিভি। এই ব্যাটারি চার্জ করে আনতে হতো শহর থেকে। এভাবেই দেখা হতো টিভি প্রদর্শিত সিনেমা। এখন আর সিনেমা কেউ দেখে না। যাও দেখতো তাও কলুষিত। সম্প্রতি এই কলুষিত অঙ্গনের অনেকেই ধরা পড়েছে। কেউ কেউ পুলিশের নজরদারিতে রয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে। কয়দিন পরে হয়ত শোনাও যাবে না।

রাজনীতির কথা কে না জানে! পাকিস্তানি শাসক-শোষকদের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে জাতির পিতা গ্রাম থেকে গ্রামে চষে বেরিয়েছেন। জানিয়েছেন মুক্তির আহ্বান। যাঁর রাজনৈতিক আদর্শের কথা শুনেছি বাবা-মা প্রতিবেশীর মুখে। দেখেছি আওয়ামী লীগের মত বৃহৎ সংগঠনের কর্মী সংগ্রহের পদ্ধতি। গ্রামে গ্রামে কর্মীদের কাছ থেকে সামান্য চাঁদার বিনিময়ে চলেছে এই দলটি। যে দল স্বাধীন দেশের একমাত্র অবলম্বন, সেই দলে পরগাছার শেষ নাই। বৃহৎ বা পুরোনো গাছে পরগাছা গজাবে এটাই সত্য। তবে তা ছেঁটে-ছুটে পরিস্কার করার মত একটি সময় সম্ভবত হেলেনা জাহাঙ্গীর ইস্যুতে সামনে এসেছে। এই ইস্যুকে কাজে লাগাতে পারলে রাজনীতির কুলাঙ্গারদের পতন ঘটতে পারে। আমাদের মধুর সংস্কৃতির অঙ্গনে জিন-পরীদের যে আছর পড়েছে, এটাও দূর হওয়া উচিত।

চতুর্থ স্তম্ভের মিডিয়া জগতে সিলেটের তথাকথিত সাংবাদিক ফয়সাল কাদির কোন বড় ফ্যাক্টর নয়। দেশের পরতে পরতে এর চেয়েও বড় ফ্যাক্টররা উজ্জীবিত। এদের হাত থেকে ‘সংস্কৃতি’, ‘সংবাদ জগত’ এবং ‘রাজনৈতিক অঙ্গন’ রক্ষা এখন সুস্থ বিবেকের সময়ের দাবি।

রহিম আব্দুর রহিম, শিক্ষক, কলামিস্ট, নাট্যকার ও শিশু সাহিত্যিক। ইমেইল: bskt1967@gmail.com

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অধ্যাপক ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী ৪৮ অধ্যাপক ডা. শেখ মো. নাজমুল হাসান ২৮ অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১১ আজমিনা আফরিন তোড়া ১০ আনোয়ারুল হক হেলাল আফসানা বেগম আবদুল গাফফার চৌধুরী আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ৩২ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল ১০ আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১৮ আরিফ রহমান ১৬ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৫৪ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইনাম আহমদ চৌধুরী ইমতিয়াজ মাহমুদ ৭২ ইয়ামেন এম হক এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন একুশ তাপাদার এখলাসুর রহমান ৩৭ এনামুল হক এনাম ৫৪ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৬৪ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান কেশব কুমার অধিকারী খুরশীদ শাম্মী ১৮ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ৪৪ জহিরুল হক মজুমদার জাকিয়া সুলতানা মুক্তা জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুনাইদ আহমেদ পলক জুয়েল রাজ ১১৫ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ১২ ড. কাবেরী গায়েন ২৩ ড. নাদিম মাহমুদ ৩৭ ড. মাহরুফ চৌধুরী ১২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ড. শামীম আহমেদ ৪৫ ডা. আতিকুজ্জামান ফিলিপ ২০ ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার তোফায়েল আহমেদ ৩২ দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৭ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক প্রফেসর ড. মো. আতী উল্লাহ ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬২ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৪৪ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার জাকির হোসেন ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৮ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১৯৪ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১৫৩ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক ১৪ রণেশ মৈত্র ১৮৩ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ৫৫ রাজু আহমেদ ৪০ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩৮ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর