আজ মঙ্গলবার, ১৭ মে, ২০২২ ইং

Advertise

মুহিতের কমলালেবুর সকাল

মাসকাওয়াথ আহসান  

একজন মানুষের মৃত্যুর পর সাধারণ মানুষ তাঁকে যেভাবে মূল্যায়ন করেন; সেটাই তার জীবনের গড়-ফল। ছোটবেলায় একটা লোকজ প্রবচন চোখে পড়তো, এমনি করে গড়তে হবে জীবন; মরণে হাসবে তুমি, কাঁদবে ভুবন।

বাংলাদেশের সোনালী যুগের দিকচিহ্নগুলো ধীরে ধীরে মুছে যাবার সময় এটা। আবুল মাল আবদুল মুহিত গত শুক্রবার চলে গেলেন নিঃসীম অন্যলোকে। তাঁর চলে যাবার লক্ষণ চোখে পড়েছে; হাসপাতালের বিছানায় কমলালেবুর বিষণ্ণতার ম্রিয়মাণ দিনগুলো দেখে। সিলেটের সাংবাদিক বন্ধু মুক্তাদীর মুক্তার ফেসবুক ডায়েরিতে মুহিত স্যারের চলে যাওয়ার প্রস্তুতির মন খারাপ চোখে পড়েছিলো।

২০০৮ সালে মুক্তাদীরের বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়ে মুহিত স্যারের সঙ্গে দেখা। উনি এসে উষ্ণ আলিঙ্গনে সিলেটে স্বাগত জানান। কমলালেবুর দুপুরে নকশী পাঞ্জাবি পরা বাঙালি পিতার অবয়বে তাঁকে দেখে এতোটা পথ ঠেলে সিলেটে যাবার ক্লান্তি জুড়িয়ে যায়। উনি পাতে খাবার তুলে দিয়ে আপ্যায়ন করেন। এই উষ্ণ আপ্যায়নই তো মমতাময় বাংলাদেশ। টানা একঘণ্টা তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন অতিথি আপ্যায়নে; আমার ভীষণ সংকোচ হচ্ছিলো। ফেরার সময় জড়িয়ে ধরে কানের কাছে ফিস ফিস করে বলেন, স্যার বলছো কেন আমাকে! আমিও ফিস ফিস করে তাঁকে বললাম, ছাত্রজীবনে আপনাকে ইংলিশ ডিপার্টমেন্ট থিয়েটারের দাওয়াত দিতে গেলে, টানা দেড় ঘণ্টা লিটারেচার পড়িয়েছিলেন, সেই থেকে আপনি আমার শিক্ষক।

জার্মানির ডয়চেভেলেতে উনার ছোট ভাই ড. এ কে মোমেনকে ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণের ধারাবাহিক আয়োজনে যুক্ত করতে গিয়ে, একটি দিনও পাইনি; যেদিন উনি হেসে সাদর সম্ভাষণ জানাননি। এটি বাংলাদেশের শিষ্টতাসম্পন্ন পরিবারগুলোর একটি। সমাজ যতই কর্কশ হোক না কেন; মুহিত-মোমেনের তাতে কিচ্ছু এসে যায়নি। তারা শেষ পর্যন্ত শৈশবে পরিবার থেকে শেখা শিষ্টাচার ধরে রেখেছেন।

এই ধূসর মোহরের যুগে; মুহিতের উপার্জন কমেছে; মন্ত্রী হবার পরে। বাংলাদেশে যেখানে মানুষ এমপি-মন্ত্রী হয় জমিদার হবার জন্য; সেখানে অর্থমন্ত্রী মুহিত গরীব হয়েছেন।

ইংলিশ ডিপার্টমেন্ট থিয়েটারে একবার টর্নেডো আক্রান্ত গ্রামের মানুষের জন্য অর্থ সংগ্রহ করছিলাম। মুহিতের মতো সৎ মানুষের কাছে টাকা চাইতে মন চায়নি। আমন্ত্রণপত্র দিয়ে বিদায় নেবার সময়, নিজে থেকে টাকা বের করে আমার পকেটে গুঁজে দিয়ে বলেন, ইংলিশ ডিপার্টমেন্ট থিয়েটার তার ওপর টর্নেডোহত গ্রামের পুনর্বাসনের মতো একটা মহৎ কাজ; এটা রেখে দাও বালক।

এরকম ঔদার্যের সংস্কৃতিবান বাঙালি পুরুষদের স্নেহ সাহচর্যই এ জীবন পূর্ণ করেছে। তার সঙ্গে দেখা হওয়া যেন ছিলো হাসন রাজার সঙ্গে দেখা হওয়া। কখনো যেন সৈয়দ মুজতবা আলীর সঙ্গে দেখা হওয়া। মুহিত মানেই রম্য দুপুর, অসংখ্য রেফারেন্সের ট্যাবলেট রসগোল্লায় পুরে খাইয়ে দিতে দিতে বলা, সাহিত্য পড়ে কেউ যদি সাহিত্য রচনাটাকেই ব্রত হিসেবে নেয়; সেটাই সাহিত্য পড়ার সার্থকতা। বাকিটা আপনি হয়ে যাবে। আরে বাবা তোমরা তো স্বাধীন দেশে সচ্ছল পরিবারে জন্মেছো; আমরা তো জন্মেছিলাম পরাধীন দেশে। সুতরাং তোমাদের ক্যারিয়ার প্ল্যানিং হতে হবে স্বাধীন দেশের ছেলের মতো।