আজ রবিবার, ০২ অক্টোবর, ২০২২ ইং

Advertise

চা-শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি পূরণ হোক

রাজেশ পাল  

সকালের নাস্তা ঘরেই করি। তেমন কিছু না। ঘরে বানানো দুটো আটার রুটি, আগের রাতের লেফটওভার তরকারি আর চা। সামান্য ব্যতিক্রম বাদে এই মেন্যুই সাধারণত। তাতেই এই বাজারে মিনিমাম খরচ ৩০/৪০ টাকা। কোর্টে আসা যাওয়ার খরচ যায় ১৮০ টাকার মতো। যাওয়ার সময় সিএনজি দ্রুত যাওয়ার জন্য। আসার সময়ে লোকাল বাস বা টেম্পো। চেম্বার খরচ গড়ে ১০০ টাকা পত্রিকা, চায়ের বিল সবমিলে। দুপুরে হোটেলে খাই। একেবারে কম করে হলেও ১০০/১২০ টাকা। তাও এক তরকারি আর এক প্লেট ভাত। বিকেলে তেমন কিছু খাওয়া হয়না। শুধু চা বিস্কিট। তাতেও ধরুন ২০ টাকা। ধূমপানের বদভ্যাস। তাতেও ১০ টাতে চলে যায় ১২০ টাকা। রাতে বাসায় খাই। হোটেলের হিসেবে সেটাও ১৫০ টাকার কম না।

উপরের হিসেব একেবারে মিনিমাম খরচ আমার মতো একজন সাধারণ মধ্যবিত্তের বর্তমান বাজারে। যা দৈনিক প্রায় ৯০০ টাকার কাছাকাছি। আর একজন চা শ্রমিক?

দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজ করে ২৩ কেজি চায়ের পাতা সংগ্রহ করলে পান ১২০ টাকা। এর মধ্যে যদি দুইটি পাতা আর একটি কুড়ি ছাড়া অন্য চা পাতা থাকে তাহলে সেটা কাউন্ট হবে না। তাতে মাসিক ইনকাম দাঁড়ায় ১২০x২৬= ৩১২০ টাকা। তাও যদি প্রতিদিন ২৩ কেজি পাতা সংগ্রহ করতে পারেন তাহলে।

তাদের সকাল শুরু হয় লবণ চা আর দুটো বনরুটি দিয়ে। দুপুরের চা-পাতা ভর্তা আর ভাত। সন্ধ্যায় সেই লবণ চা আর বনরুটি। রাতে আবার সেই চা-পাতা ভর্তা আর ভাত। এই ৩১২০ টাকাতেই চলে একজন চা শ্রমিকের পুরো পরিবারের এক মাসের খাওয়া দাওয়া , চিকিৎসা খরচ সবকিছু। বিনোদন সেখানে বিলাসিতা মাত্র। বাংলাদেশে এখন ১৬৮টি বাণিজ্যিক চা উৎপাদনের বাগান কাজ করছে। যেখানে ১ দশমিক ৫ লাখেরও বেশি লোকের কর্মসংস্থান রয়েছে। অথচ শত শত কোটি টাকার সম্পদের অধীশ্বর এদেশের চা বাগানের মালিকেরা। এদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি দ্রব্যও এটি। যার রপ্তানি থেকে অর্জিত অর্থে চলে দেশের টিকে থাকার চাকা।

বিশ্বে চা রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান নবম। যা থেকে আসে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রায় প্রতি অর্থবছরে। বাংলাদেশে এখন ১৬৮টি বাণিজ্যিক চা উৎপাদনের বাগান কাজ করছে। যেখানে ১ দশমিক ৫ লাখেরও বেশি লোকের কর্মসংস্থান রয়েছে। উপরন্তু, বাংলাদেশ বিশ্বের ৩ শতাংশ চা উৎপাদন করে। ২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশি চায়ের বাজারের মূল্য প্রায় ৩ হাজার ৫শ কোটি টাকা জিডিপিতে এই শিল্পের অবদান প্রায় ১ শতাংশ।

যে চায়ের সুবাস ছাড়া আমাদের মতো ছাপোষা মধ্যবিত্তের পর্যন্ত দিন শুরু হয় না, হয় না ঘরোয়া আড্ডা আর মেহমানদারী, সেই চা শ্রমিকরা আজ আন্দোলনে নেমেছেন স্রেফ ১৮০ টাকা বৃদ্ধি করে ৩০০ টাকা বেতন নির্ধারণ করে বেঁচে থাকার অধিকারের দাবিতে।

হীরক রাজার দেশের ছবির সেই গানটি মনে পড়ে?
"সোনার ফসল ফলায় যে তার , দুই বেলা জুটে না আহার।
হীরার খনির মজুর হয়ে কানাকড়ি নাই।
ভাইরে ভাইরে।
আমি কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়"

চা শ্রমিকদের বেতন না বাড়ার পেছনে মজুরি বোর্ড এর ভূমিকাও কম নয়। সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোর অনলাইনের প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, "২০১০ সালে মজুরি বোর্ড চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৪৮ টাকা নির্ধারণ করে। প্রতি পাঁচ বছর পর শ্রমিকদের মজুরি নতুন করে নির্ধারণ করার কথা থাকলেও ন্যূনতম মজুরি বোর্ড তা করেনি। তাই মালিকপক্ষের সাথে প্রতি দুইবছর পর পর চুক্তির মাধ্যমে ৪৮ টাকা থেকে ১২০ টাকায় মজুরি উন্নীত করে চা শ্রমিকরা। সবশেষ ২০২১ সালের ১৩ জুন দীর্ঘ ১১ বছর পর চা শিল্প খাতে ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গেজেট আকারে খসড়া মজুরির ১২০ টাকা সুপারিশ প্রকাশ করে। কিন্তু এর আগেই মালিক ও শ্রমিক পক্ষের দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১২০ টাকা মজুরি কার্যকর হয়েছে। তাই ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের এই সিদ্ধান্ত মেনে নেননি চা শ্রমিকরা। চা শ্রমিকরা এবং তাদের সংগঠনগুলো এই খসড়ার প্রতিবাদ করে আসছেন ওই সময় থেকেই। কিন্তু তাতেও টনক নড়েনি মজুরি বোর্ড কর্তৃপক্ষের। চলতি বছর জুন মাসের শেষ দিকে মজুরি বোর্ডর সর্বশেষ মিটিংয়েও ১২০ টাকা মজুরির সুপারিশ করে মজুরি বোর্ড। মজুরি বোর্ডের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে আগামী ৫ বছর ১২০ টাকা দৈনিক মজুরিতে কাজ করতে হবে চা শ্রমিকদের"

৩০০ নয়। ন্যূনতম ৫০০ টাকা করা হোক এই চা শ্রমিকদের মজুরি। মানুষের মতো করে বেঁচে থাকার এইটুকু অধিকার দেশের নাগরিক হিসেবে তাদের অবশ্যই প্রাপ্য। এই প্রাপ্য অধিকার থেকে তাদের বঞ্চিত করার মতো মহাপাপের লাইসেন্স নেই কারোরই। কীইবা হবে হে মহান শিল্পপতি? আপনার লভ্যাংশ থেকে একটু পরিমাণ যদি কমই হয়? আপনার গুলশানের বাড়ি, গ্যারেজের মার্সিডিজ এবং অথবা ক্লাবের খরচের কিছুতেই তো টান পড়ে যাবে না এই সামান্য সহানুভূতিটুকু দেখালে। বরং ভাতের পাতে চা পাতা সিদ্ধ ছাড়াও অন্য একটু সবজি বা ডাল যুক্ত হবে হাজারো হাজারো মানুষের পাতে।

অবিলম্বে চা শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির ন্যায্য দাবি পূরণ করা হোক।

রাজেশ পাল, আইনজীবী, ছাত্র আন্দোলনের সাবেক কর্মী

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অধ্যাপক ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী ৪৫ অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১০ আজমিনা আফরিন তোড়া ১০ আফসানা বেগম আবদুল গাফফার চৌধুরী আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ৩০ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল ১০ আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১৭ আরিফ রহমান ১৬ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৫৩ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইনাম আহমদ চৌধুরী ইমতিয়াজ মাহমুদ ৬৮ ইয়ামেন এম হক একুশ তাপাদার এখলাসুর রহমান ৩০ এনামুল হক এনাম ৩৫ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ এস এম নাদিম মাহমুদ ৩৩ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৫৮ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান কেশব কুমার অধিকারী খুরশীদ শাম্মী ১৬ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ৪৪ জহিরুল হক মজুমদার জাকিয়া সুলতানা মুক্তা জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুয়েল রাজ ৮৫ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ১২ ড. কাবেরী গায়েন ২৩ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ডা. আতিকুজ্জামান ফিলিপ ১৫ ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার তোফায়েল আহমেদ ২০ দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৭ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক প্রফেসর ড. মো. আতী উল্লাহ ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬২ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৩৯ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৮ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১৮৫ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১৫৩ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক ১৪ রণেশ মৈত্র ১৮৩ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ৪৭ রাজেশ পাল ২৬ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩৮ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর শাওন মাহমুদ শাখাওয়াত লিটন শামান সাত্ত্বিক শামীম আহমেদ ৩৬ শামীম সাঈদ শারমিন শামস্ ১৪ শাশ্বতী বিপ্লব শিতাংশু গুহ

ফেসবুক পেইজ