আজ বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬

Advertise

শিক্ষক

ড. শামীম আহমেদ  

ঘুম থেকে উঠলে শ্রদ্ধায় মাথা অবনত হয়ে আসে, রাতে ঘুমাবার সময়ে চরণে ফুল ছড়িয়ে দিতে ইচ্ছে করে এমন কোন শিক্ষক আমার জীবনে আসেনি। হতে পারে এ একান্তই আমার ব্যর্থতা। ছাত্র হিসেবে দুর্বিনীত, একরোখা, বাংলাদেশি সংস্কৃতির চিরচেনা 'জি হুজুর' স্বভাবের ছিলাম না বিধায় কোন শিক্ষক কখনও আমাকে পোষ মানাতে পারেননি। আবার জীবনের শিল্প-সাহিত্য-বিজ্ঞান-দর্শন সবই প্রকৃতি ও পরিবেশ থেকে আহরণ করার খুব অল্প বয়সের অভ্যাসের কারণে মনে হয়নি কোন শিক্ষক আমার জীবনের আদর্শ-চেতনা আমূল পাল্টে দিয়েছেন! আবার হতে পারে এমন কোন শিক্ষক জীবনে পাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি!

বেত দিয়ে ইচ্ছেমতো পিটিয়েছেন, কানের সাথে কলমের ঢাকনা চেপে ধরেছেন, উচ্চস্বরে অশ্রাব্য ভাষায় চিৎকার করে পড়িয়েছেন, নিজেকে পুরোপুরি সমর্পণ করিনি বিধায় নাম্বার দেবার সময় বৈষম্য করেছেন- এমন শিক্ষকদেরও আমাদের সমাজে মাথায় তুলে রাখবার যে শতাব্দীব্যাপী চেষ্টা, তা আমাকে কখনই স্পর্শ করতে পারেনি। এমন কোন শিক্ষকের কথা ভাবতে পারি না, যিনি না থাকলে আজকে গঙ্গার জলে ভেসে যেতাম।

তার মানে এই নয় কিছু শিক্ষক মনে দাগ কাটেননি। ওই যে ক্লাস সেভেনে থাকতে ঢাকা কলেজের এক সংগ্রামীছাত্রকে আর্থিক সহায়তা করার জন্য আমার বাবা নিজ সন্তানদের পড়া দেখিয়ে দিতে বলেছিলেন, সেই রেজা স্যারের কাছ থেকে বাংলা ভাষার গভীরতা শিখেছিলাম। তা স্কুলজীবনে কোন কাজে না আসলেও, এখনও যে দিস্তার পর দিস্তা মনের কথা অসংকোচে লিখে যেতে পারি, তাতে তার অবদান আছে বৈকি! অথবা নটর ডেম কলেজে প্রাণিবিজ্ঞানের শিক্ষক গাজী আজমলের মনোমুগ্ধকর ক্লাসের কথা তো ভুলতে পারি না। সেই নটরডেমেরই বাংলার শিক্ষক মুখতার স্যার যে অদ্ভুত দক্ষতায় রসিকতার রস মিশিয়ে পদ্মা নদীর মাঝি পড়াতেন, তা ভুলবার জো নেই! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মনের আনন্দে ক্লাস করেছি শুধুমাত্র অর্থনীতির শিক্ষক আবুল বারকাতের। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে হার্ভার্ডের অধ্যাপক রিচার্ড ক্যাশের সংক্রামক ব্যাধির ক্লাসে শিহরিত হয়েছি বার বার। মুগ্ধ হয়েছি।

জীবিকার জন্য শিক্ষক যারা, তাদের চাইতে অনেক বেশি শিখেছি অন্য পেশার মানুষদের কাছ থেকে। রাস্তায় হঠাৎ হোঁচট খেয়ে পড়বার পর যে মানুষটি টেনে দাঁড় করিয়েছেন, রেস্তোরায় ঢুকবার সময় যে মানুষটি দরজা খুলে দাঁড়িয়ে থেকেছেন, চরম বিপদের সময় একদম অপ্রত্যাশিতভাবে যে মানুষটি আস্থা রেখেছেন, মিথ্যা অপবাদে ভাসিয়ে দেবার সময় সবচেয়ে কম কথা হওয়া যে মানুষটি বুক চিতিয়ে পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন, নিজের বিপদকে লুকিয়ে রেখে যে মানুষটি হাসি মুখে নিয়মিত খবর নিয়েছেন, তাদেরকেই শিক্ষক হিসেবে চিনেছি, জেনেছি এই জীবনে।

নিকেতনের বাসার কেয়ারটেকার দুলাল, ফার্মগেটের অচেনা অজানা কোন রিকশাওয়ালা, হাতিরঝিলে ঝোল মাখানো ঝালমুড়ি বিক্রেতা, টরোন্টোর ল্যাবে প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা ঘর ঝাড়ু দিতে আসা সুইপার, বাসার নিচের ডলারামার কাউন্টারে বছরের পর বছর কাজ করতে থাকা শ্রী লংকার ক্যাশিয়ার আমার আদর্শ শিক্ষক। নানা আলাপে, আয়োজনে, কথায়, কাজে তারা আমাকে জীবনকে চিনতে শিখিয়েছেন, জানতে শিখিয়েছেন।

তবে জীবনে সবচেয়ে বেশি যে দুজন মানুষের কাছ থেকে এগিয়ে যাবার শিক্ষা পেয়েছি, এখনও পাচ্ছি; তারা হচ্ছেন আমার ৭৬ বছর বয়সী বাবা ও ১৪ বছর বয়সী মেয়ে।

সবার জীবনে শ্রদ্ধা করার মতো, মাথা শ্রদ্ধায় নুয়ে আসবার মতো শিক্ষকের আবির্ভাব ঘটুক। দাবি করে না এমন আগ্রাসী, অসহিষ্ণু কাউকে যেন আমরা গুরু মেনে তার চরণে সেজদা না দিই। আমাদের সমাজের এই অতি ভয়ংকর কপট শ্রদ্ধা প্রদর্শন থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আমরা এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি করে রেখেছি যে আমাদের সন্তানেরা তাদের নিজেদের অর্জনকেও অর্জন মানতে শেখে না, ভাবে এটি তাদের কেউ পাইয়ে দিয়েছে, আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভোগে।

নিজের যৎসামান্য শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি শিক্ষক কেবল তিনিই নন যিনি শেখান, বরঞ্চ তিনিও যিনি প্রতিনিয়ত শেখেন।

ড. শামীম আহমেদ, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সামাজিক-বিজ্ঞান গবেষক।

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য ২ অধ্যাপক ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী ৪৮ অধ্যাপক ডা. শেখ মো. নাজমুল হাসান ২৯ অসীম চক্রবর্তী ৯ আজম খান ১১ আজমিনা আফরিন তোড়া ১০ আনোয়ারুল হক হেলাল ১ আফসানা বেগম ১ আবদুল গাফফার চৌধুরী ৯ আবু এম ইউসুফ ৩ আবু সাঈদ আহমেদ ৮ আব্দুল করিম কিম ৩২ আব্দুল্লাহ আল নোমান ২ আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল ১০ আমিনা আইরিন ৩ আরশাদ খান ৩ আরিফ জেবতিক ১৮ আরিফ রহমান ১৬ আরিফুর রহমান ২ আলমগীর নিষাদ ১ আলমগীর শাহরিয়ার ৫৪ আশরাফ মাহমুদ ৯ আশিক শাওন ৫ ইনাম আহমদ চৌধুরী ৯ ইমতিয়াজ মাহমুদ ৭৩ ইয়ামেন এম হক ১ এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন ১ একুশ তাপাদার ১ এখলাসুর রহমান ৩৭ এনামুল হক এনাম ৫৪ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ ওমর ফারুক লুক্স ৩ কবির য়াহমদ ৮৯ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান ১ কেশব কুমার অধিকারী ১ খুরশীদ শাম্মী ১৮ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু ৭ জহিরুল হক বাপি ৪৪ জহিরুল হক মজুমদার ৩ জাকিয়া সুলতানা মুক্তা ৯ জান্নাতুল মাওয়া ২ জাহিদ নেওয়াজ খান ৫ জুনাইদ আহমেদ পলক ২ জুয়েল রাজ ১২৩ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ১২ ড. কাবেরী গায়েন ২৩ ড. নাদিম মাহমুদ ৩৮ ড. মাহরুফ চৌধুরী ১৫ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ৮ ড. শামীম আহমেদ ৪৫ ডা. আতিকুজ্জামান ফিলিপ ২০ ডা. সাঈদ এনাম ৪ ডোরা প্রেন্টিস ২ তপু সৌমেন ৩ তসলিমা নাসরিন ১০ তানবীরা তালুকদার ৩ তোফায়েল আহমেদ ৩২ দিব্যেন্দু দ্বীপ ৭ দেব দুলাল গুহ ৮ দেব প্রসাদ দেবু ১ দেবজ্যোতি দেবু ২৭ নিখিল নীল ৫ পাপলু বাঙ্গালী ৪ পুলক ঘটক ৫ প্রফেসর ড. মো. আতী উল্লাহ ৫ ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬২ ফড়িং ক্যামেলিয়া ২ ফরিদ আহমেদ ৪৪ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা ১ বদরুল আলম ৯ বন্যা আহমেদ ৪ বিজন সরকার ৪ বিপ্লব কর্মকার ৭ ব্যারিস্টার জাকির হোসেন ২ ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৮ ভায়লেট হালদার ৩ মারজিয়া প্রভা ৭ মাসকাওয়াথ আহসান ১৯৬ মাসুদ পারভেজ ২ মাহমুদুল হক মুন্সী ৩ মিলন ফারাবী ১ মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ৩ মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১৫৩ মো. মাহমুদুর রহমান ৬ মো. সাখাওয়াত হোসেন ৩ মোছাদ্দিক উজ্জ্বল ৩ মোনাজ হক ১৪ রণেশ মৈত্র ১৮৩ রতন কুমার সমাদ্দার ১ রহিম আব্দুর রহিম ৫৫ রাজু আহমেদ ৪৪ রুমী আহমেদ ১ রেজা ঘটক ৩৮ লীনা পারভীন ৬ শওগাত আলী সাগর ৫