আজ সোমবার, ২২ জুলাই, ২০২৪

Advertise

কেমন ছিল আমাদের বিজয়ী বাংলাদেশের প্রথম সকাল!

অধ্যাপক ডা. শেখ মো. নাজমুল হাসান  

১৯৭১ সাল, যুদ্ধ চলছে। গোলাগুলির শব্দ পেলেই বাঙ্কারে গিয়ে আশ্রয় নেওয়া ততদিনে গ্রামের মানুষের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। চারিদিকে বিল পরিবেষ্টিত ফাঁকা মাঠের মধ্যে আমাদের বাড়ি। বর্ষাকালে চারিদিকে থৈ থৈ পানি, দ্বীপের মতো ভাসতে থাকে বাড়িটি। বাড়ীর আশেপাশে আর কোনো বাড়িঘর নাই। বর্ষাকাল ছাড়া বাকি সময়গুলিতে দিগন্ত বিস্তৃত ধু ধু ফসলের মাঠ। বাড়ির পিছনে উত্তর দিকে ছিল একটা ন্যাড়া বাহা ভিটে। এই ভিটের মাটি খুঁড়ে বাঙ্কার বানানো হয়েছিল। অনেকগুলি বাঙ্কার, বাড়িতে বসবাসকারী সবগুলি পরিবারের লোকজন একসাথে বাঙ্কারে গিয়ে লুকনোর মতো ব্যবস্থা ছিল।

আমাদের বাড়ির চারপাশে কয়েক কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে ফাঁকা ফাঁকা দু/চারটি বাড়ি ছাড়া আর তেমন কোনো বাড়িঘর ছিল না। ফলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আসার সময়ে অনেক দূরে থাকা অবস্থায়ই তাদেরকে দেখা যেতো। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী দেখার সাথে সাথে তাৎক্ষণিকভাবে দোয়া-কালাম পড়তে পড়তে সবাই বাঙ্কারে গিয়ে আশ্রয় নিতো।

এতো গণ্ডগ্রামে সাধারণত পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যেতো না। আমাদের বাড়িতে ঘন ঘন হামলা দেবার কারণ, আমরা ছিলাম মুক্তিযোদ্ধা পরিবার। আমার বাবা, বড়ভাই, মেঝো ভাই সবাই মুক্তিযোদ্ধা। আমার দাদাভাই জাহাঙ্গীর আলম আলফাডাঙ্গা থানার প্রথম মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার। মাত্র ৭ জন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে মুক্তিযোদ্ধার প্রথম যে দলটি আলফাডাঙ্গা প্রবেশ করে তিনি ছিলেন সেই বাহিনীর কমান্ডার। আমার মেজো ভাই ছিলেন নৌ কমান্ডো বাহিনীর কমান্ডার। অপারেশন জ্যাকপটে অসামান্য অবদান রাখা মুক্তিযোদ্ধা।

আমাদের পরিবার ও আত্মীয়স্বজন মিলে মোট বত্রিশজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলো। সবাইকে মুক্তিযুদ্ধে পাঠানোর মূল দায়িত্বে ছিলেন আমার বাবা। আমার দু'ভাই-সহ ছোট ফুফুর ছেলে বটু ভাই, তিনজন ছিলেন মুক্তিযোদ্ধার কমান্ডার। ফলে আমাদের বাড়ি ছিল অনেকটা মুক্তিযোদ্ধা কেন্দ্রের মতো। কেউ মুক্তিযুদ্ধে যেতে চাইলে আমাদের বাড়িতে এসে খোঁজ-খবর নিতো এবং সে অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধে চলে যেতো।

আশেপাশের কোনো এলাকায় মুক্তিযোদ্ধারা কোনো অপারেশন করার পরিকল্পনা করলে তার বেজ হিসেবে বেঁছে নিতো আমাদের বাড়ি। মুক্তিযোদ্ধা-বাড়ি হিসেবে আমাদের বাড়ির পরিচিতি এবং বিশ্বস্ততার পাশাপাশি এর বিচ্ছিন্ন অবস্থান অপারেশনের বেজ হবার জন্য ছিল উপযুক্ত। ফলে পুরো যুদ্ধকালীন আমাদের বাড়িটি ছিল একটা মিনি ক্যান্টনমেন্ট।

গরুরগাড়ি ভরে ভরে অস্ত্রপাতি, গোলাবারুদ এনে পলিথিনে মুড়ে মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে তা লুকিয়ে রাখা হতো। বড় বড় ড্রাম ও খালি তেলের টিনে গুলি ভরে মাটির তলে লুকিয়ে রাখা হতো। এলএমজি, এসএমজি, বন্দুক, রাইফেল আরও কত যে অস্ত্রপাতি থাকতো তার ইয়ত্তা নাই। শুধু মাটির তলে কেন; ঘড়ের গাঁদা, কলাগাছের ঝোপ, রান্নাঘরের মাচা, ঘরের ভীত, ধানের কোলা, ছাইয়ের গাদা, খোলা পায়খানার চাল সর্বত্রই লুকানো থাকতো অস্ত্র ও গোলা-বারুদ। খালি তেলের টিনের মধ্যে গুলি ও গ্রেনেড বোঝাই করে মুখ এঁটে পুকুরের পানিতে ডুবিয়ে রাখা হতো।

আমাদের গ্রামের বোধ হয় এমন কেউ ছিল না যে অস্ত্র চালাতে জানতো না। আমার বাবা এবং ভাইয়েরা প্রায় সবাইকেই অস্ত্র চালনা শিখিয়েছিল। আমার বাবার ছিল ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ। ফলে যারা সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে যেতে পারেনি তারাও অস্ত্র চালাতে জানতো। বাঙ্কারে এবং তার আশেপাশেও গর্ত খুঁড়ে রাখা হতো অস্ত্র ও গোলা-বারুদ। যদি পাকসেনারা আক্রমণ করে বসে তবে যেন লড়াই করা যায় সে জন্য এ সতর্কতার ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। আমার ভাইয়েরা গ্রামের সবাইকে ক্রলিং করা শিখিয়েছিল। বিপদ এলে যেন ক্রলিং করে গোলাগুলি করা যায় এবং আত্মরক্ষা করা যায়।

ষোলই ডিসেম্বর সকাল। চারিদিকে গোলাগুলি হচ্ছে। ভয়াবহ গোলাগুলি। দূরের গ্রামগুলিতে গোলাগুলি হলেও ফাঁকা মাঠের ভিতর দিয়ে তার বিকট শব্দ ভেসে আসছে। একটানা গোলাগুলি ও গ্রেনেড ফাটার শব্দ, এক মুহূর্তের জন্যও থামছে না। ক্রমাগত গোলাগুলির শব্দ। মাঝে মাঝে গ্রেনেড ফাটার শব্দ এবং তা থেকে সৃষ্ট ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যাচ্ছে। আকাশ ছেয়ে যাচ্ছে গ্রেনেডের ধোঁয়ায়।

আমি ছোট হলেও বুঝে গেছি এখন বাঙ্কারে গিয়ে পালাতে হবে। কিন্তু কেউ পালাচ্ছে না। রাঙ্গাভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, “কেউ পলাচ্ছে না ক্যা? রাঙ্গাভাই বলল, “আর পলাতি অবি না, বাংলাদেশ স্বাদীন অয়ে গ্যাছে।” আমি তো স্বাধীনতা বুঝি না। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “স্বাদীন ওলি কি গুলাগুলি করতি অয়?” রাঙ্গাভাই বলল, “আরে ওতো আনন্দ করতিছে। নিজিরা নিজিরা ফাঁকা যাগা গুলাগুলি করতিছে মানুষ মারতিছে না।” চল আমরাও মজা করি।

যেখানে যতো অস্ত্র, গোলা-বারুদ লুকানো ছিল একের পর এক বের করে স্তূপ করা হলো। আসলেই এক মিনি ক্যান্টনমেন্ট। গ্রামের সব মানুষ জড় হয়েছে আমাদের বাড়িতে। সবাই অস্ত্র, গুলি, গ্রেনেড হাতে নিয়ে ফাঁকা মাঠে চলে গেলো। শুরু হলো ক্রমাগত গুলি ও গ্রেনেড ফাটিয়ে আনন্দ করার এক মহা-আনন্দমেলা। সন্ধ্যা পর্যন্ত চলল সে আনন্দ-বন্যা।

সকালে যখন চারিদিকে গুলাগুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিল, মানুষের মধ্যে বয়ে যাচ্ছিল আনন্দের ফোয়ারা, তখন আমাদের বাড়িতে চলছিল শোকের মাতম। মা চিৎকার করে কাঁদছিল, মা’র সাথে কাঁদছিল আরও অনেকে। বুকফাটা সে কান্না।

বাবা ফেরেননি, সেই ১৪ই আগস্ট খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলস কলোনি থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাবাকে ধরে নিয়ে গেছে সেই থেকে তিনি নিখোঁজ। ফিরে আসেননি মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আমার দাদাভাই এবং মেঝো ভাই। তারা বেঁচে আছেন, না মরে গেছেন তাও আমরা জানি না। আশেপাশের গ্রামের কেউ কেউ তখন মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরে এসেছে। তাদের কাছে খবর পাওয়া গেছে কমান্ডার জাহাঙ্গীর আলম ভাটিয়াপাড়া অপারেশনের সময়ে মারা গেছেন। কমান্ডার জাহাঙ্গীর আলম আমার বড়ভাই। অনেক পরে এসে জানা যায়, যে জাহাঙ্গীর আলম মারা গেছেন তিনি আমার সহোদর বড় ভাই নন।

মেঝো ভাই সেই যে যুদ্ধে গেছেন তারপর থেকে দেশ স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত তাঁর আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। বাবা যে নিখোঁজ হয়েছেন তাও দু'ভাইয়ের কেউই জানেন না, অথবা তাঁরা জানেন কি না তা আমরা জানি না। দু ভাইয়ের একজনের খোঁজও আরেকজন জানেন না। দুজনই কমান্ডার, দুজনের যুদ্ধক্ষেত্র ভিন্ন ভিন্ন। তারা কে কোথায় আছেন কেউ জানে না। বাড়ি থেকে আমরা কেউই জানি না বাবা, বড়ভাই এবং মেঝো ভাই এরা কেউ বেঁচে আছেন নাকি মরে গেছেন। আমরা বাড়িতে বেঁচে আছি না মরে গেছি তাও জানেন না আমার বড় দু ভাই।

সবার ছেলেরা মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরে আসছে, আমার ভাইয়েরা ফিরে আসছে না। নানাজনের কাছে নানান খবর শোনা যাচ্ছে। একেকটা খবর আসে আর বাড়িতে শুরু হয় কান্নার মাতম। সে কি কান্না। চারিদিকের গোলাগুলির শব্দকে ছাড়িয়ে যায় শোকের সে মাতম।

আমাদের জন্য বিজয়ী-স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রক্তলাল সূর্যোদয় সুখের ছিল না, বিজয়ের সুখ অনুভব করার মতো কোন অবস্থাই আমাদের ছিল না। আমাদের জন্য বিজয়ের সকালটা ছিল খুবই শোকার্ত এবং কান্নাভেজা। ভাইদের সংগ্রাম এবং পিতার রক্তের উপর দিয়ে ভেসে আসা বিজয়ের রক্তিম সকালের রক্তেরসাথে মিশে গিয়েছিল আমাদের শোকার্ত চোখের জল। পিতার লাল রক্তের সাথে আমাদের নীলকষ্টগুলো একাকার হয়ে সবুজ হয়ে ঘিরে আছে বাংলাদেশের পতাকার রক্তলাল বৃত্ত। এইই আমার বাংলাদেশ।

উৎসর্গ: মুক্তিযুদ্ধে নিখোঁজ, আমার পিতা শেখ আব্দুল মজিদকে।

অধ্যাপক ডা. শেখ মো. নাজমুল হাসান, লেখক, গবেষক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অধ্যাপক ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী ৪৮ অধ্যাপক ডা. শেখ মো. নাজমুল হাসান ২৬ অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১১ আজমিনা আফরিন তোড়া ১০ আনোয়ারুল হক হেলাল আফসানা বেগম আবদুল গাফফার চৌধুরী আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ৩২ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল ১০ আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১৮ আরিফ রহমান ১৬ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৫৪ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইনাম আহমদ চৌধুরী ইমতিয়াজ মাহমুদ ৭১ ইয়ামেন এম হক এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন একুশ তাপাদার এখলাসুর রহমান ৩৭ এনামুল হক এনাম ৪৪ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ এস এম নাদিম মাহমুদ ৩৩ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৬৪ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান কেশব কুমার অধিকারী খুরশীদ শাম্মী ১৭ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ৪৪ জহিরুল হক মজুমদার জাকিয়া সুলতানা মুক্তা জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুনাইদ আহমেদ পলক জুয়েল রাজ ১০৯ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ১২ ড. কাবেরী গায়েন ২৩ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ড. শামীম আহমেদ ৪১ ডা. আতিকুজ্জামান ফিলিপ ২০ ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার তোফায়েল আহমেদ ৩২ দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৭ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক প্রফেসর ড. মো. আতী উল্লাহ ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬২ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৪২ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার জাকির হোসেন ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৮ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১৯১ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১৫৩ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক ১৪ রণেশ মৈত্র ১৮৩ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ৫৫ রাজু আহমেদ ১৯ রাজেশ পাল ২৮ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩৮ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর শাওন মাহমুদ