আজ বুধবার, ০৩ জুন, ২০২৬

Advertise

সাকিব আল হাসান, বাংলাদেশ ও প্রতিহিংসার রাজনীতি

ড. শামীম আহমেদ  

আমি খুব একটা সংখ্যাতত্ত্বের ভক্ত নই। আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির ছাত্র, তখন আমার প্রিয় বিষয় ছিল “উন্নয়ন অর্থনীতি” ও “পলিটিকাল ইকোনোমি”। “কৃষি অর্থনীতি” এবং “সামষ্টিক অর্থনীতি”ও ভাল লাগত। একদমই পছন্দ করতাম না পরিসংখ্যান। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে জনস্বাস্থ্য পড়ার সময় আমার প্রিয় বিষয় ছিল “মেডিক্যাল এনথ্রোপোলোজি”, “হেলথ সিস্টেমস ম্যানেজমেন্ট”, “রিপ্রোডাক্টিভ হেলথ”, “ইনফেকসাস ডিজিজ”, “হেলথ কমিউনিকেসন্স” ইত্যাদি। সেখানেও “বায়োস্ট্যাটিসটিক্স” ভাল লাগত না। ইউনিভার্সিটি অফ টরোন্টোতে আরাম পেয়েছি “হেলথ প্রোমোশন”, “সোশাল ডিটারমিনেন্টস অফ হেলথ” পড়ে। গবেষণা পদ্ধতিতে সবসময় ভাল লেগেছে “কোয়ালিটেটিভ রিসার্চ”। “কোয়ান্টিটেটিভ রিসার্চে” বরাবরই আগ্রহ ছিল কম। যদিও প্রথম চাকরিস্থল ব্র্যাকে ৪৬ হাজার sample size এর একটা গবেষণা দিয়ে কাজ শুরু করেছিলাম। SPSS, STATA ইত্যাদি দিয়ে হাতেখড়ি, কিন্তু আগ্রহের অভাবে ওসব থেকে এখন সরে এসেছি।

এই জিনিসগুলো উল্লেখ করার প্রাসঙ্গিকতা হচ্ছে সাকিব আল হাসানকে নিয়ে কিছু কথা বলব। সাকিবের রেকর্ডের সংখ্যা এত বেশি যে সেটা কিছু সময় ক্লান্তিকর মনে হয়। ক্রিকেট মানেই সাকিব আর সাকিব মানেই রেকর্ড ভাঙাগড়ার খেলা। তো রেকর্ডের বেশিরভাগই যেহেতু সংখ্যা নিয়ে নাড়াচাড়া তাই আমার এ বিষয়ে আগ্রহ কম এবং আমি এগুলো তেমন মনেও রাখি না। তবুও আজকের আলোচনার স্বার্থে সাকিবের অসংখ্য রেকর্ড এবং অর্জনের পরিসংখ্যান থেকে কিছু তুলে ধরলাম। এই তথ্যগুলো মূলত ESPN থেকে নেয়া, ভুল থাকতে পারে, তবে সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়। মূলত খুব সংক্ষেপে তুলে ধরতে চেয়েছি সাকিবের অর্জন।

সাকিব আল হাসানের ক্রিকেট ক্যারিয়ার তার অসাধারণ বহুমুখিতা এবং ধারাবাহিক উৎকর্ষতার একটি উদাহরণ, যা তাকে খেলাটির ইতিহাসে অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। টেস্ট, ওয়ানডে ইন্টারন্যাশনাল (ওডিআই) এবং টি-টোয়েন্টি ইন্টারন্যাশনাল (টি-টোয়েন্টি) ফরম্যাটে তিনি প্রায়শই আইসিসি অলরাউন্ডার র‍্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষস্থান দখল করেছেন, যা ব্যাট এবং বল উভয় ক্ষেত্রেই তার অনন্য দক্ষতা প্রতিফলিত করে। টেস্ট ক্রিকেটে সাকিব ছিলেন ষষ্ঠ কনিষ্ঠ অধিনায়ক, যিনি ২২ বছর ১১৫ দিন বয়সে বাংলাদেশ দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার টেস্ট ক্যারিয়ার অসাধারণ সব কীর্তিতে সমৃদ্ধ, যার মধ্যে একটি ম্যাচে শতক ও ছয় উইকেট নেওয়ার বিরল কৃতিত্ব এবং পঞ্চম উইকেটে ৩৫৯ রানের জুটি গড়ে চতুর্থ সর্বোচ্চ পার্টনারশিপ গড়ার কৃতিত্ব রয়েছে। এছাড়া, টেস্টে সিরিজ সেরার পুরস্কার জয়ের দিক থেকে তিনি ষষ্ঠ স্থানে রয়েছেন, তিনি সাতবার এই পুরস্কার জিতেছেন।

ওডিআইতে, সাকিবের প্রভাব সুস্পষ্ট। তিনি একটি নির্দিষ্ট মাঠে সবচেয়ে বেশি উইকেট নেওয়ার (১৩১ উইকেট) এবং সবচেয়ে বেশি রান (২৬৫৬) করার রেকর্ড করেছেন। এছাড়া পঞ্চম উইকেটে সবচেয়ে বেশি রান করা জুটির (২২৪) ক্ষেত্রে তৃতীয় স্থানে রয়েছেন। তিনি নবম দ্রুততম খেলোয়াড় হিসেবে ওডিআইতে ৩০০ উইকেট পূর্ণ করেছেন। ওডিআইতে সাকিবের সাড়ে ৭ হাজার রান করেছেন, নিয়েছেন ৩১৭ উইকেট এছাড়াও, ওডিআইতে এলবিডব্লিউতে সবচেয়ে বেশি উইকেট নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি সপ্তম স্থানে রয়েছেন। টি-টোয়েন্টি ইন্টারন্যাশনালে, সাকিব তার প্রভাব বজায় রেখেছেন। তিনি একটি নির্দিষ্ট মাঠে সবচেয়ে বেশি উইকেট (৪৫) এবং স্টাম্পিংয়ে সবচেয়ে বেশি উইকেট (১৯) নেওয়ার রেকর্ডের অধিকারী। টি-টোয়েন্টিতে, তিনি সবচেয়ে বেশি চার উইকেট নেওয়ার (৮) এবং সবচেয়ে বেশি বল করার (২৭৪৫) ক্ষেত্রে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন। এছাড়াও, তিনি সবচেয়ে বেশি সিরিজ সেরার পুরস্কার (১৭) অর্জনের ক্ষেত্রে তৃতীয় স্থানে রয়েছেন।

টেস্ট, ওডিআই এবং টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে মিলিত রেকর্ডের ক্ষেত্রে, সাকিব একটি নির্দিষ্ট মাঠে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান (৪৭৮৬) এবং সবচেয়ে বেশি উইকেট (২৫২) নেওয়ার রেকর্ডধারী। এছাড়া, তিনি সব ফরম্যাটে স্টাম্পিংয়ে সবচেয়ে বেশি উইকেট (৫৩) নেওয়ার ক্ষেত্রে চতুর্থ স্থানে রয়েছেন। তার ক্যারিয়ার, যা ১৭ বছর ২০৯ দিন দীর্ঘ, টি-টোয়েন্টিতে সবচেয়ে দীর্ঘতম হিসেবে দাঁড়িয়েছে, যা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার দীর্ঘমেয়াদী উৎকর্ষতার একটি প্রমাণ। এই অর্জনগুলো এবং অলরাউন্ডার র‍্যাঙ্কিংয়ে তার শীর্ষ অবস্থান মিলিয়ে, সাকিব আল হাসানকে তার প্রজন্মের অন্যতম সম্পূর্ণ এবং সফল ক্রিকেটার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

আমি এই লেখাটি যখন লিখছি তখনও সাকিব আল হাসানের টেস্ট এবং টি২০ র‍্যাঙ্কিং ৩ আর ওডিআই’তে র‍্যাঙ্কিং ২। এই মুহূর্তে সাকিব আল হাসান পাকিস্তানে একটি টেস্ট খেলছেন এবং বিস্ময়কর হলেও সত্য সাকিব আল হাসান বাংলাদেশে বর্তমানে একজন খুনের মামলার আসামি! গত ৫৩ বছরের হিংসা-বিদ্বেষ ও প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে এটা সবাই জানেন যে সাকিবের বিরুদ্ধে এই মামলা মিথ্যা, সাজানো ও উদ্দেশ্যমূলক। সাকিব আল হাসান ও মাশরাফি বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে সফল দুইজন ক্রিকেট ব্যক্তিত্ব কিন্তু দুজনই যেহেতু আওয়ামী লীগের পক্ষে নির্বাচন করে জয়ী হয়ে সংসদ সদস্য হয়েছেন, তাই তাদের ফাঁসানোর জন্য এখন নানা ফন্দি ফিকির চলছে।

সাকিব হাসান যতটা জনপ্রিয়, ঠিক ততটা অজনপ্রিয়ও বটে। ক্রিকেট বেটিং, বিজ্ঞাপনের শুটিং এবং উন্নাসিকতার কারণে তিনি অজনপ্রিয়তাও অর্জন করেছেন জনপ্রিয়তার সাথে তাল মিলিয়ে। ক্রিকেট মাঠে রাগ ধরে রাখতে না পারা, আম্পায়ার ও ভক্তদের সাথে দুর্ব্যবহার, মিডিয়াতে সরাসরি কথা বলা, সাংবাদিকদের নাস্তানাবুদ করা এবং সংক্ষেপে কাউকে পাত্তা না দেয়ার আচরণের কারণে অনেক মানুষ তাকে অপছন্দ করেন। এছাড়াও সাকিব গত বেশ কয়েক বছর ভাল ক্রিকেট খেলছেন না। শেষ বিশ্বকাপেও তার পারফরম্যান্স তেমন ভাল ছিল না, তবে বাংলাদেশ দলের যেহেতু প্রায় সবাই খারাপ খেলেছেন, তাই সাকিব এখনও দলের জন্য একজন অপরিহার্য ক্রিকেটার হিসেবেই বিবেচিত হন।

আমার ধারণা সাকিবের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও উদ্দেশ্যমূলক সাজানো মামলা না দিয়ে যদি তার দুর্বল পারফরমেন্সের জন্য দল থেকে বাদ দেয়া হতো, তাহলে মানুষের প্রতিক্রিয়া সীমিত হতো। তাছাড়া নতুন বোর্ডের অধীনে আগামীর বাংলাদেশ ক্রিকেট দল সাজানো হবে এই বিবেচনায় তরুণ খেলোয়াড়দের বেশি সুযোগ দেয়া হবে, এই যুক্তিতেও সাকিবকে বাদ দিলে সেটা খুব বেশি অন্যায় হতো না বলে আমি মনে করি। কিন্তু সাকিব আল হাসান, যিনি গত দুই যুগে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে বিশ্ব অঙ্গনে সবচেয়ে বেশি পরিচিতি এনে দিয়েছেন, তাকে একজন পোশাক কর্মী খুনের মামলায় আসামি দেখিয়ে খেলা থেকে বাদ দেবার সিদ্ধান্ত অভাবনীয়, অগ্রহণযোগ্য এবং নিন্দনীয়। এখন বিষয় হচ্ছে সাকিব তো দেশে ফিরে আদালতে জামিন নিয়ে খেলতে পারতেন। কিন্তু সত্য বলতে কী ৫ অগাস্ট ২০২৪ আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের “নীরব সমর্থনের” মধ্য দিয়ে যে খুন-হত্যা-জখম এবং অরাজকতা হয়েছে – সেটি বাংলাদেশের ইতিহাসে আগে কখনও হয়নি। এর আগে ১৯৯৬ সালে বিএনপির পরাজয়ের পর আওয়ামী লীগ, কিংবা এমনকি ২০০১ এ আওয়ামী লীগের পরাজয়ের পর বিএনপি-জামায়াতও এই পরিমাণ ধ্বংসযজ্ঞ চালায়নি। যদিও ২০০১ এ কিছু সুনির্দিষ্ট সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছিল কিন্তু সেটি ২০২৪ সালের তুলনায় কিছুই নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের “নীরব সমর্থনে” দেশব্যাপী আওয়ামী লীগের দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসীদের সাথে সাথে সাধারণ সমর্থকদের উপর যে লুটতরাজ, অত্যাচার, সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন হয়েছে তা বাংলাদেশের ইতিহাসে আগে কখনও হয়নি। এমতাবস্থায় সাকিব আল হাসান দেশে ফিরে আদালত থেকে এই মিথ্যা মামলায় জামিন নিয়ে খেলার চেষ্টা করবেন এটি অসম্ভব জেনেই এই কাজটি করা হয়েছে।

যারা সাকিবকে একদমই পছন্দ করেন না, আমি নিশ্চিত তারা ফেইসবুকে যাই বলুক না কেন, রাতে খাবার টেবিলে পরিবারের সাথে আলাপে স্বীকার করে নিচ্ছে যে এই মামলা সাজানো। যারা বলছেন এগুলো আগের সরকারের ১৫ বছর ধরে করা অপকর্মের প্রতিশোধ, তারা নিশ্চয় বুঝতে পারছেন যে এই ঘটনাগুলো বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অসামান্য অর্জনকে ধুলোয় মিশিয়ে দিচ্ছে। সত্য ও স্পষ্ট কথা বলার জন্য এক সপ্তাহের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাকে যখন তার দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়, তখন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আস্থা রাখা কঠিন হয়ে যায়। অন্তর্বর্তী সরকারের সকল সিদ্ধান্ত ও কাজ যদি কোন রাজনৈতিক দলের সরকার করত, তাহলে আমি মোটেও অবাক হতাম না। বাংলাদেশে সরকার বদলের পর প্রতিহিংসার রাজনীতি খুবই স্বাভাবিক ও ধারাবাহিক। কিন্তু এবার যেভাবে ছাত্র আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল, তাতে করে মনে হচ্ছিল, হয়ত দেশে একটি পরিবর্তন আসবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে পরিবর্তন তো দূরে থাকুক, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারে আগের আওয়ামী লীগ বা বিএনপি-জামায়াত সরকারের স্বজনপ্রীতি কিংবা প্রতিহিংসার মাত্রাকে বহুগুণে ছাড়িয়ে গেছে মাত্র ৩ সপ্তাহেই।

দেশব্যাপী ঘটা ভয়াবহ অন্যায় অত্যাচারের সব খবর দেশের প্রায় অর্ধশতাধিক সদ্য “বিটিভি” বনে যাওয়া চ্যানেলগুলোতে উঠে না আসলেও, মানুষ “ভূত থেকে ভূতে” পদ্ধতিতে জানতে পারছে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাকে সরিয়ে দেয়া, সাকিব আল হাসান ও মাশরাফির বিরুদ্ধে খুনের মামলা দেয়ার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রতিহিংসার রাজনীতি ছড়িয়ে পড়ছে। অনেকে বলেছেন শেখ হাসিনা ড. ইউনূসের সাথে যা করেছেন, এটি তারই ফলস্বরূপ। চলমান অন্যায়-অত্যাচার-অরাজকতার জবাব যদি হয় ড. ইউনূস এখন শেখ হাসিনার আচরণের প্রতিশোধ নিচ্ছেন – তাহলে আমার আর তেমন কিছু বলার নেই। আমার কাছে মনে হচ্ছে শেখ হাসিনার সাথে ড. ইউনূসের অনেক মিল। শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রে আকাশ-পাতাল ফারাক ছাড়া তাদের মধ্যে স্বৈরাচারী ও প্রতিহিংসামূলক আচরণের ক্ষেত্রে অসম্ভব মিল। শেখ হাসিনা যদি ড. ইউনূসকে কাজে লাগাতেন আমার ধারণা তারা একটি অসম্ভব সফল রাজনৈতিক জুটি হতে পারতেন।

বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা ক্রিকেট খেলোয়াড় এবং বিশ্বের সর্বকালের অন্যতম সেরা ক্রিকেট খেলোয়াড় সাকিব আল হাসানের প্রতি যে অচিন্তনীয় অন্যায় করা হচ্ছে তার প্রতিবাদ জানাচ্ছি। “গুণীর মর্যাদা যে দেশে হয় না, সে দেশে গুণীর জন্ম হয় না” – এই কথাটি আমরা আওয়ামী লীগের শাসনামলে শুনেছি ড. ইউনূসের প্রতি শেখ হাসিনার বিদ্বেষমূলক আচরণের কারণে। এখন ড. ইউনূসের সময়ে সাকিব আল হাসানসহ অনেক গুণী ব্যক্তির প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের কারণে এই কথাটি আবার শুনতে হচ্ছে। সরকার বদলের ২ দিনের মধ্যে খুনি এবং হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত বিএনপির অনেক নেতা যেভাবে জেল থেকে কোন প্রকার বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়া বেরিয়ে এসেছেন, তাতে এই সরকারের কাছ থেকে তিন সপ্তাহের মাথায় মানুষের প্রত্যাশা অনেকটাই কমে গিয়েছে। এখন আগামী কিছুদিন তারা আগের সব সামরিক ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতোই বুড়িগঙ্গার পাড় পরিষ্কার, খাল খনন, পলিথিন নিষিদ্ধকরণ, অবৈধ দোকান উচ্ছেদ, ভারত বিদ্বেষী ক্যাম্পেইন ও কিছু আওয়ামীপন্থী আমলা, বুদ্ধিজীবীদের দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ ও মামলা-হামলা দিয়ে মাঝে মাঝে চমক দেখানোর চেষ্টা করবেন এতটুকু বুঝতে পারছি। কিন্তু এসব স্টান্টবাজি দিয়ে আগের কোন “অনির্বাচিত-অন্তর্বর্তী” সরকার টিকতে পারেনি, এ সরকারও পারবে না।

২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার আকবর আলী খান, ধীরাজ কুমার নাথ, সুলতানা কামালের মতো গ্রহণযোগ্য উপদেষ্টা নিয়েও বেশিদিন টিকতে পারেনি। দুই বছরে তিন দফায় উপদেষ্টা পরিষদ গঠন ও পুনর্গঠন করেও তাদের বিদায় নিতে হয়েছিল। সেখানে বর্তমান পরিষদে ড. ইউনূস ছাড়া আগের মতো গ্রহণযোগ্য উপদেষ্টা একজনও নেই। সালেহউদ্দিন আহমেদ, এম সাখাওয়াত হোসেন, ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের কিছুটা খ্যাতি থাকলেও তারা আগের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাদের মতো সার্বজনীন নন। এছাড়া আগের তত্ত্বাবধায়ক সরকারগুলোর উপদেষ্টাদের দলীয় সংশ্লিষ্টতা ছিল না বললেই চলে যেখানে এই অন্তর্বর্তী সরকারের সব উপদেষ্টাই যে কেবল বিএনপি-জামায়াত ঘেঁষা তাই নয়, তাদের অনেকের সাথে আগের সরকারের সরাসরি বিরোধ ছিল।

এসব কিছুই অগ্রাহ্য করা যেত যদি ৩ সপ্তাহে তারা দেশে ন্যূনতম কোন আশার আলো দেখাতে পারতেন। ছাত্র আন্দোলনের ফসল যে সরকার বদল তাতে এখন পর্যন্ত তাদের নেতৃত্বের কোন আলোকচ্ছটা অনুপস্থিত। তারা যেন পূর্ববর্তী সরকার ও তাদের সমর্থকদের দমন পীড়নের নীল নকশাতেই ব্যস্ত আছেন। এমনকি সাম্প্রতিক বন্যায় সরকারের ভূমিকা নেই বললেই চলে; যতটুকু আয়োজন প্রায় পুরোটুকু সাধারণ মানুষ এবং সেনাবাহিনীর। এসব কিছুর বাইরে মাশরাফি-সাকিব-জাফর ইকবাল স্যারের মতো হাজার হাজার মানুষের পরিবার ও সম্পত্তিতে আন্দোলনে যোগ না দেবার অভিযোগে যে ভয়াবহ আক্রোশের দাবানল ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে তা এককথায় unprecedented and unacceptable. দেশের ১৮ কোটি মানুষের ১৭ কোটি ৯০ লাখ মানুষই আন্দোলনে রাস্তায় নামেনি, তার মানে কি তারা আন্দোলনের বিরুদ্ধে ছিল? মাশরাফির মেয়ে এই পুরো সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আন্দোলনের পক্ষে ছবি দিয়েছে, লিখেছে, নিজে রাস্তায় ছিল এবং মাশরাফি তাতে সমর্থনই দিয়েছেন। এখন দেশের ১৭ কোটি ৯০ লাখ মানুষের বাড়িতে আগুন দেয়া হবে? তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেয়া হবে? কোন সভ্য দেশে এমন হয়?

আন্দোলনে অংশ নেয়া কিংবা না নেয়া একটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। কেউ যদি আন্দোলনে ছাত্রদের উপর গুলি-হত্যায় সমর্থন দেয় তাদের বিচার আমিও চাই কিন্তু রাস্তায় না নামা বা ফেইসবুকে স্ট্যাটাস না দেয়ার অপরাধে বা অজুহাতে যা হচ্ছে তা অরাজকতার চূড়ান্ত। বিশেষত যদি সে দেশের শাসনভার কোন নোবেল শান্তি পুরস্কার জয়ী অর্থনীতিবিদের হাতে থাকে। আমরা পাশের দেশ মায়ানমারে দেখেছি শান্তি পুরস্কারজয়ী অং সান সুকিকে মানুষ মাথায় তুলেছে, দেশ শাসনের দায়িত্ব দিয়েছে আবার ছুঁড়েও ফেলেছে। আমরা ড. মুহম্মদ ইউনূসের ক্ষেত্রে এমনটি হোক তা চাই না। আমরা একসময় বলেছি শেখ হাসিনার আশেপাশের মানুষরা তার তোষামোদিতা করে তাকে ধ্বংস করেছে; এখন মনে হচ্ছে ড. ইউনূসের আশেপাশের উপদেষ্টারা তাকে সুপরামর্শ দিচ্ছে না। শেখ হাসিনার পতনের বেশ আগ থেকেই আমরা বলেছি আশেপাশের মানুষ নয়, শেখ হাসিনা নিজেই নিজের ইগোর কারণে অজনপ্রিয় হচ্ছেন। তিন সপ্তাহের মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতার মাত্রা যে জায়গায় আছে তাতে ড. ইউনূসকে মানুষ আগামীতে শেখ হাসিনার যোগ্য উত্তরসূরি বলা শুরু করলে অবাক হবো না!

সাকিব আল হাসান একজনমাত্র ব্যক্তি হলেও সারা বিশ্বে তাকে নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। আওয়ামী লীগের সাবেক এই এমপির প্রশংসায় গ্যালারিতে তাকে নিয়ে স্লোগান দিচ্ছে এমনকি পাকিস্তানের হাজার হাজার দর্শক। একটি কোটা আন্দোলনের কয়েকটি আসন নিয়ে গোঁয়ার্তুমি করতে গিয়ে আজকে ইতিহাসের পাতায় অতীত হয়ে গেছেন শেখ হাসিনা। ড. ইউনূসকে অনুরোধ তিনি যেন মাথায় রাখেন যে এভাবে একটি একটি ঘটনা তাকেও গড্ডলিকা প্রবাহে ভাসিয়ে দিতে পারে। একজন সাকিব শুধু একজন সাকিব না; বহির্বিশ্বে সাকিব আল হাসান সম্ভবত একমাত্র বাংলাদেশী যিনি ড. মুহম্মদ ইউনূসের সমান বা কাছাকাছি সম্মান ও অনেক বেশি জনপ্রিয়তা এককভাবে বাংলাদেশকে এনে দিয়েছেন।

আইনকে কেবলমাত্র ভোগান্তি ও প্রতিশোধের স্বার্থে নিজের গতিতে চলতে দেবেন না। আপনি যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত অপরাধী গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের মতো শত শত অপরাধীকে যেভাবে রাতের আধারে সমস্ত আইন-আদালতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ছেড়ে দিয়েছেন সেভাবে নয়; বরঞ্চ যেভাবে শেখ হাসিনার শেষ সময়ে নিরীহ ছাত্রদের বিরুদ্ধে দেয়া মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করেছেন, সাকিব আল হাসানের বিরুদ্ধে দেয়া মিথ্যা মামলাও একইভাবে প্রত্যাহার করবেন – এই অনুরোধ থাকল।

সাকিব আল হাসানের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের মাধ্যমে আপনার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি মানুষের মাত্র তিন সপ্তাহে হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনার হয়ত এটিই আপনার জন্য শেষ সুযোগের প্রথম সতর্কবার্তা।

ড. শামীম আহমেদ, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সামাজিক-বিজ্ঞান গবেষক।

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অধ্যাপক ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী ৪৮ অধ্যাপক ডা. শেখ মো. নাজমুল হাসান ২৮ অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১১ আজমিনা আফরিন তোড়া ১০ আনোয়ারুল হক হেলাল আফসানা বেগম আবদুল গাফফার চৌধুরী আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ৩২ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল ১০ আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১৮ আরিফ রহমান ১৬ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৫৪ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইনাম আহমদ চৌধুরী ইমতিয়াজ মাহমুদ ৭৩ ইয়ামেন এম হক এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন একুশ তাপাদার এখলাসুর রহমান ৩৭ এনামুল হক এনাম ৫৪ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৬৪ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান কেশব কুমার অধিকারী খুরশীদ শাম্মী ১৮ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ৪৪ জহিরুল হক মজুমদার জাকিয়া সুলতানা মুক্তা জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুনাইদ আহমেদ পলক জুয়েল রাজ ১১৭ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ১২ ড. কাবেরী গায়েন ২৩ ড. নাদিম মাহমুদ ৩৭ ড. মাহরুফ চৌধুরী ১২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ড. শামীম আহমেদ ৪৫ ডা. আতিকুজ্জামান ফিলিপ ২০ ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার তোফায়েল আহমেদ ৩২ দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৭ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক প্রফেসর ড. মো. আতী উল্লাহ ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬২ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৪৪ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার জাকির হোসেন ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৮ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১৯৪ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১৫৩ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক ১৪ রণেশ মৈত্র ১৮৩ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ৫৫ রাজু আহমেদ ৪১ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩৮ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর