টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
Advertise
মাসকাওয়াথ আহসান | ২৪ জানুয়ারী, ২০২৫
বিএনপি একটি প্রতিষ্ঠিত দল। বৈষম্যবিরোধী ছাত্ররা নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উপস্থিত। গণতন্ত্রে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষতা ও নানারকম রেটোরিক খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু পতিত আওয়ামী লীগের রেখে যাওয়া অপসংস্কৃতি এখনো আচ্ছন্ন করে রেখেছে অনেকের মনোজগৎ। এটা খুব স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু যে কোন রাজনৈতিক বিতর্কে আওয়ামী লীগের গান্ধা কইরা দেয়ার কুসংস্কৃতিমুক্ত হতে না পারলে বাংলাদেশের রাজনীতি দূষণমুক্ত হবে না।
বিএনপি নেতা মির্জা ফখরুল রাজনৈতিক সুরুচির দৃষ্টান্ত। তিনি যেসব বক্তব্য রাখছেন; তাতে দ্বিমত পোষণ করতে যদি পতিত আওয়ামী লীগের অশালীন পদ্ধতি কেউ গ্রহণ করে; তা হবে আত্মবিনাশী। বাংলাদেশে সবচেয়ে রুচিশীল মানুষ হচ্ছেন স্বশিক্ষিত গ্রামীণ জনগোষ্ঠী। তারা রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের অশ্লীল কথামালায় বিরক্ত। নতুন রাজনীতি উপহার দিতে তাই আওয়ামী-ভাইরাসমুক্ত রেটোরিক প্রয়োজন।
আবার নতুন রাজনৈতিক শক্তির তরুণ নেতাদের রেটোরিকের প্রেক্ষিতে, বিএনপির নেতা-কর্মীরা পেশি প্রদর্শন করতে চাইলে তা হবে বিরাট ভুল। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ মাস্তানি একেবারেই পছন্দ করে না। মাস্তানির পরিণতি তাড়া খেয়ে পালিয়ে যাওয়া।
বিএনপি সাড়ে পনেরো বছর ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে। কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানের সংজ্ঞায় তা সরণ, কাজ নয়। ফুটবল নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করা; কিন্তু গোলপোস্টে একটিও শট নিতে না পারা। এর বিপরীতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের ৩৬ দিনের আন্দোলন পদার্থবিজ্ঞানের সংজ্ঞা অনুযায়ী কাজ, ফুটবল নিয়ে দৌড়ে গিয়ে গোল করে দেয়া। আজকের বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের যে ফ্যাসিজমমুক্ত জীবন, এর পেছনে রয়েছে তারুণ্যের রক্ত-ত্যাগ-ঘাম।
বিএনপি নেতা মির্জা ফখরুল যেটা করছেন, একে বলা হয়; প্রেশার ট্যাকটিক; জবাবদিহির দাবিতে সচল থাকা। এটা রাজনীতির খুব জরুরি অনুষঙ্গ। বিএনপিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের সঙ্গে ইঞ্চি-ইঞ্চি মিলিয়ে কথা বলতে হবে; এই আশা তো আওয়ামী ভাইরাস। বিএনপিতে সম্মুখ সমরে অংশ নেয়া সর্বোচ্চ সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন। তা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের সংস্কৃতি মামারা মুক্তিযুদ্ধকালে "কলকাতায় প্রমোদে ঢালিয়া দিনু মন"-কে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে প্রাণপণ চেষ্টা করে; ব্যর্থ হয়েছে। সুতরাং বিএনপির বর্ষীয়ান নেতারা মুক্তিযুদ্ধের গর্ব ধারণ করবেন, সেটাই স্বাভাবিক। বিএনপি বাকশালের একদলীয় শাসন থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের সংস্কৃতি ফিরিয়ে এনেছিল; সুতরাং তারা কোন রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের দাবির পক্ষে থাকার কথা নয়।
অন্যদিকে বিএনপি যদি জুলাই-এর ছাত্র-গণহত্যার বিচার চাইতে কৃপণতা দেখায়; তাহলে তাদের নতুন প্রজন্মের জীবনে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবার আশংকা রয়েছে। এ পর্যন্ত ৫ অগাস্ট পরবর্তী বক্তব্যে বিএনপি নেতা তারেক রহমান মোটামুটি নির্ভুল জায়গায় রয়েছেন; কারণ তার সঙ্গে তরুণ প্রজন্মের প্রজন্ম ব্যবধান কম। বিএনপির বয়েসী নেতারা ওল্ড প্যারাডাইম পলিটিকসে আটকে আছেন; এমনটা প্রতীয়মান হয়।
আওয়ামী লীগ নিঃশেষিত হয়ে যাবার পর নতুন তরুণ শক্তিই আজ ও আগামীর বাস্তবতা। বিএনপি এই শক্তিকে আন্ডারএস্টিমেট করলে ভুল করবে।
স্বাধীন বাংলাদেশে ৫৪ বছর ধরে প্রতিবেশী ভারত কী রকম শত্রুতা করেছে; ৫ অগাস্টের পর ফ্যাসিস্ট হাসিনার সেখানে পালিয়ে যাওয়া; সেখানকার রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী ও মিডিয়ার বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণা থেকে তা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে গেছে। ভারতের সবগুলো রাজনৈতিক দল মনে করে, আওয়ামী লীগ প্রগতিশীল, বাকি সবাই মৌলবাদী। এগারো বছর ধরে মৌলবাদী বিজেপির শাসন সাম্রাজ্যে বসে; বাংলাদেশকে মৌলবাদী বলা; শতছিদ্রের ঝাঁঝরের সূচের একটি ছিদ্র নিয়ে বেচায়েন হবার মতো। এ তো হুবহু শতছিদ্রের আওয়ামী লীগের অন্যদের একটি ছিদ্র খুঁজে পাড়া মাথায় করার মতো।
বিএনপি যেহেতু ভারতের রুদ্ররোষে পড়ে ২০০৭-২০২৪ মানবেতর জীবন যাপন করেছে; তাই তাদের মধ্যে ভারতভীতি থাকা স্বাভাবিক। বিএনপির ভারতভীতি যৌক্তিক, তাই তারা ভারতের সমালোচনায় কৌশলী। সেইখানে নতুন তরুণ শক্তির অভ্যুত্থানের সাফল্যের অন্যতম কারণ ভারতভীতিকে প্রশ্রয় না দেয়া। খুব সম্ভব ভারতকে ভয় না পেলে বিএনপি তাদের আন্দোলনের মাধ্যমে হাসিনার ফ্যাসিজম উপড়ে ফেলতে পারতো।
বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনে নতুন তরুণ শক্তির সম্ভাবনার জায়গা ঠিক এইখানে। তারুণ্যের অকুতোভয় মনোজগতই যুগে যুগে দেশে দেশে পরিবর্তন সূচিত করেছে। কিন্তু নতুন এই তরুণ শক্তিকে মনে রাখতে হবে; ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ও পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলন সাধারণ মানুষের জীবনে অনুদিত হতে পারেনি; সেই সময়ের তরুণ বিপ্লবীদের দ্রুত বুর্জোয়া হবার আত্মকেন্দ্রিকতার কারণে। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের যে তারুণ্য নব্বুই-এর গণঅভ্যুত্থানে বীরোচিত ভূমিকা রেখেছিলেন; তাদেরও দ্রুত বুর্জোয়া হবার আকাঙ্ক্ষা; এই দুই দলের রাজনীতিকে ব্যর্থ করেছে। মনের দারিদ্র্য কাটিয়ে দামি গাড়ি-দামি বাড়ি-ব্যাংক ব্যালেন্সের ভাটিয়ালী স্বপ্নের ক্ষুদ্রত্বকে জয় করে; সততার রাজনীতি প্রচলন না করলে; বৈষম্য মুক্ত সমাজ লিপ সার্ভিস হয়ে রয়ে যাবে।
মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।
আপনার মন্তব্য