টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
Advertise
শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ | ১৮ জুলাই, ২০২৫
একটি স্বাধীন দেশের প্রতিটি মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়া তার নাগরিক অধিকার। বিশ্বের নানান স্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধগুলোকে যেন বিচার প্রক্রিয়ায় সম্মুখীন করা যায়, সেজন্য প্রতিষ্ঠা করা হয় আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত। ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠা পাওয়া এই বিশেষ আদালতটির সদর দপ্তর নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে। তবে যে কোনো দেশেই এই আদালতের বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে পারে। অপরাধের বিচার করে বিশ্বজুড়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য পালিত হয় আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার দিবস। অপরাধ সেটা যেখানেই হোক আর যে দেশেই হোক, মানুষ যেন বিচার প্রক্রিয়ার আশ্রয় নিতে পারে সেই ধারনাকে প্রতিষ্ঠিত করতে পালন করা হয় আন্তর্জাতিক ন্যায় বিচার দিবস।
বিশ্বব্যাপী সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধগুলোর বিচার প্রক্রিয়া সুনিশ্চিত করতে বিশ্বের অনেক দেশেই বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন সময় ভিন্ন প্রক্রিয়ায় আন্দোলন হয়েছে এবং হচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক বিচার কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা মোটেই সহজ ছিল না। আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার দিবস সম্পর্কে জানা যায়, ১৯৯৮ সালে রোম সংবিধির ঐতিহাসিক গ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক ফৌজদারি বিচারের নতুন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার স্মরণে বিশ্ব আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার দিবস পালিত হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত আইসিসি প্রতিষ্ঠা শান্তি এবং আইনের শাসনের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে দেখা হয়। এটি প্রথম স্থায়ী এবং স্বাধীন আন্তর্জাতিক বিচারিক প্রতিষ্ঠান যা আন্তর্জাতিক মানবিক ও মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচার করতে সক্ষম। আইসিসি জাতীয় আদালতের বিকল্প নয়, তবে এটি তখনই উপলব্ধ থাকে যখন কোনও দেশ তদন্ত পরিচালনা করতে বা অপরাধীদের বিচার করতে পারে না বা করতে চায় না। ১৩৯ টিরও বেশি দেশ আদালতের চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চলের প্রতিনিধিত্বকারী প্রায় ৮০টি রাষ্ট্র এটি অনুমোদন করেছে। এই দিনটি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গুরুত্ব এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় এর কাজের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এটি সকল দেশকে দায়মুক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যোগদানের আহ্বান জানায়, যাতে অপরাধীদের শাস্তি দেওয়া হয় এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রোধ করা যায়। এই দিনটি বিশ্বজুড়ে মানুষকে গুরুতর বিষয়গুলিতে মনোযোগ দেওয়ার এবং ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলির শান্তি, নিরাপত্তা এবং কল্যাণকে প্রভাবিত করে এমন ব্যক্তিদের সতর্ক করার জন্যও আকৃষ্ট করে। প্রতি বছর ১৭ জুলাই, আইসিসির প্রচার ও সমর্থনের জন্য বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-এর বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর টুমো পৌটিয়াইনেনি এক নিবন্ধে লিখেছেন, "সামাজিক ন্যায়বিচারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার উপর গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে। এটিকে একটি নৈতিক বাধ্যবাধকতা এবং স্থায়ী শান্তি এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য আর্থ-সামাজিক অগ্রগতি অর্জন করেছে, যার পেছনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে ছিল দেশের শ্রমশক্তি। ২০২২ সালের বাংলাদেশ শ্রমশক্তি জরিপ অনুসারে, জনসংখ্যা অনুযায়ী বাংলাদেশে শ্রমশক্তির অংশ গ্রহণের হার মোট ৬১.২ শতাংশ (পুরুষদের জন্য ৪০ শতাংশ এবং মহিলাদের জন্য ৪২.৮ শতাংশ), যা ২০১০ সাল থেকে শ্রমক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণে (৩৬ শতাংশ) উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি নির্দেশ করে। বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং বহুমাত্রিক হবার সাথে সাথে দেশের শ্রমশক্তি উচ্চ স্তরের দক্ষতা, উৎপাদনশীলতার উন্নয়ন এবং উচ্চ পারিশ্রমিকসহ শোভন কাজের সুফলগুলো ভোগ করতে পারবে। বাংলাদেশ তার শ্রম খাতকে পুনর্গঠনের জন্য শোভন কাজের মাধ্যমে সামাজিক ন্যায় এবং অন্তর্ভুক্তিকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ৩৬টি আইএলও কনভেনশন এবং ১টি প্রটোকল অনুমোদন করেছে; শুধুমাত্র পেশাগত নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্য সম্পর্কিত কনভেনশনগুলো ব্যতিরেকে দশটি মৌলিক কনভেনশনের মধ্যে আটটি অনুমোদন করেছে। এগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হল, ২০২২ সালের মার্চে মিনিমাম ওয়েজ কনভেনশন ১৯৭৩। এই কনভেনশনটি কর্মসংস্থানের জন্য ন্যূনতম বয়স নির্ধারণ করে। এই কনভেনশনটি ১৯৬৪ সালে গৃহীত হয়েছিল এবং ১৯৬৬ সালে কার্যকর হয়েছিল। এটি রাষ্ট্রগুলিকে একটি জাতীয় নীতি অনুসরণ করতে উৎসাহিত করে যেখানে শিশুশ্রমের কার্যকর বিলুপ্তি নিশ্চিত করা যায়।"
আইএলও জাতিসংঘের একটি বিশেষায়িত সংস্থা, যা আন্তর্জাতিক শ্রম মান নির্ধারণ করে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য কাজ করে। আইএলও'র চেষ্টায় বাংলাদেশে সি ১৮২ অনুমোদন পেয়েছে। সি ১৮২ হলো আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ১৯৯৯ সালের শিশু শ্রমের সবচেয়ে খারাপ রূপ সম্পর্কিত একটি কনভেনশন। এর মূল লক্ষ্য হলো শিশু শ্রমের সবচেয়ে খারাপ রূপগুলো নিষিদ্ধ করা এবং এই ধরনের শিশু শ্রম বন্ধ করার জন্য জরুরি পদক্ষেপ নেয়া।
বলা বাহুল্য, সামাজিক ন্যায়বিচারের অগ্রগতি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের জন্য, শ্রমখাতে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি এবং শ্রমিকদের অধিকারের প্রচারের পাশাপাশি তাদের দক্ষতা এবং নতুন প্রযুক্তিতে পুনঃদক্ষতা প্রয়োজন। এই প্রচেষ্টাগুলো আরও অবহিত, দক্ষ এবং ক্ষমতায়িত কর্মশক্তিতে অবদান রাখবে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, আদিবাসী, অভিবাসী এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীসহ দুর্বল বা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার জন্য বিশেষভাবে গৃহীত নীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সেইজন্যেই সি ১৮২ কনভেনশনটি 'শিশু শ্রমের নিকৃষ্টতম রূপ নির্মূলের জন্য নিষেধাজ্ঞা এবং তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ সম্পর্কিত কনভেনশন' নামেও পরিচিত। এটি ১৯৯৯ সালে আইএলও দ্বারা গৃহীত হয় এবং এর মাধ্যমে ৪টি বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এগুলো হল, ১. শিশু শ্রমের সবচেয়ে খারাপ রূপগুলো চিহ্নিত করা এবং সেগুলো নিষিদ্ধ করা। ২. এই ধরনের শিশু শ্রম বন্ধ করার জন্য জরুরি পদক্ষেপ নেয়া। ৩. এই কনভেনশনটি বিশেষভাবে জোর দেয় যে, কোনো শিশুকে কোনো অবৈধ কাজে ব্যবহার করা, যেমন- মাদক দ্রব্য তৈরি বা পাচার, সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা উচিত। ৪. এই কনভেনশনটি সকল সদস্য রাষ্ট্রের জন্য প্রযোজ্য।
জাতিসংঘ মনে করে, যুব বেকারত্ব মোকাবেলা করা এবং অংশীদারদের মধ্যে মতের আদান-প্রদান উত্সাহিত করার মাধ্যমে একটি অধিকতর ন্যায়সঙ্গত শ্রম খাতের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে। সর্বোত্তম অনুশীলনসমূহের বিনিময় এবং ন্যায্য শ্রম অনুশীলনের জন্য বিশ্বমান প্রতিষ্ঠার জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্য একটি 'দ্য গ্লোবাল কোয়ালিশন ফর সোশ্যাল জাস্টিস' আওতায় 'গ্লোবাল কোয়ালিশন গঠন'-এর অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এই কোয়ালিশনকে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার প্রধান এবং জাতিসংঘসহ অন্যান্য বিশ্ব নেতারা স্বাগত জানিয়েছেন। এই কোয়ালিশন ব্যবস্থায় বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ৫টি পাঁচটি পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এগুলো হল; ১. বৈষম্য মোকাবেলা। ২. সহযোগিতা। ৩. ন্যায্যতা। ৪. অন্তর্ভুক্তি। ৫. ত্রিপক্ষীয়তা।
'দ্য গ্লোবাল কোয়ালিশন ফর সোশ্যাল জাস্টিস'-এর লক্ষ্য হল সামাজিক ন্যায়বিচারের অভাবকে জরুরীভাবে মোকাবেলা করতে এবং শোভন কাজের এজেন্ডাকে ত্বরান্বিত করার জন্য সম্মিলিত প্রচেষ্টা জোরদার করা। বিশ্বব্যাপী সংহতি, নীতির সমন্বয় এবং ভিন্নধর্মী অংশীজনদের মধ্যে সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে শক্তিশালী, টেকসই, এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করা এর মূল লক্ষ্য। ২০২৪ পর্যন্ত এই কোয়ালিশনের সদস্য সংখ্যা ১৪১। গ্লোবাল কোয়ালিশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ টেকসই কাজের অনুশীলন এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নীতিসমূহ গ্রহণ ও প্রচারের ক্ষেত্রে জাতীয় এবং বৈশ্বিক উভয় পর্যায়ে বাংলাদেশকে শীর্ষস্থানে রাখে। এই অংশীদারিত্ব একটি ন্যায়সঙ্গত এবং সম-অধিকারসম্পন্ন সমাজ গঠনে বাংলাদেশ সরকারের অঙ্গীকারের বহিঃপ্রকাশ।
ন্যায়বিচার ভাবনাটা কেবল মাত্র খাতায় কলমে সীমাবদ্ধ হলে চলবে না। একটি মানুষ প্রকৃত ন্যায়বিচার পাচ্ছে কিনা সেটাও পর্যবেক্ষণ করতে হবে। অনেক সময় দেখা যায় প্রকৃত ন্যায় বিচারপ্রার্থীরা বঞ্চিত থেকে যায়। সামাজিক প্রভাব প্রতিপত্তি, অর্থবল এর প্রভাব খাটিয়ে অনেকেই নিজেদের দোষ ঢেকে দিতে সক্ষম হয়, যা কখনই কাম্য নয়। বাস্তবিক অর্থে ন্যায়বিচার একটি আপেক্ষিক বিষয়। দেশ, কাল হিসেবে ন্যায়বিচার ভিন্ন। এমনকি অনেক সময় বিচার করলেও তা কার্যকর করা যায় না। সেক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হয়েছে বলা যায় না। ন্যায়বিচার হতে পারে পানির জন্য, শিক্ষার জন্য, সমঅধিকারের জন্য কিংবা অন্য যে কোনো বিষয়ে। এক্ষেত্রে গ্রিক দার্শনিক প্লেটো রচিত গ্রন্থ 'রিপাবলিক'-এর কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। প্লেটো সেখানে বলেছেন, "সমাজ তৈরি হয় ন্যায়ের মধ্য দিয়ে। ঘরের মধ্যে, সমাজের মধ্যে ন্যায়বিচার হচ্ছে কিনা, ধনী দেশের সঙ্গে সম্পর্কে গরিবের ন্যায়বিচার হচ্ছে কিনা তা দেখতে হবে। সেই বিচারের মধ্য দিয়েই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা পায়।"
মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।
আপনার মন্তব্য