আজ রবিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬

Advertise

সন্তান প্রতিপালনে স্বার্থপরতা

রাজু আহমেদ  

অভিভাবকদের অনেকেই সন্তানকে স্বার্থপরতা শেখান। পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের থেকে আলাদা করে দেখার প্রবণতা সন্তানকে জেদি ও মাত্রাতিরিক্ত উচ্চাভিলাষী করে গড়ে তোলে। শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। বাবা-মা ও পারিপার্শ্বিকতা থেকে যা দেখে, সে তাই শেখে। চাচাতো-ফুফাতো ভাইবোন থেকে আলাদা করার প্রবণতা, পরিবেশের সঙ্গে মিল না থাকা এবং শৈশবের দীর্ঘ সময় তাকে নির্ভরশীল করে রাখা—এসব শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। শিশু চাইলেই যা চায়, সেভাবে পাওয়ার অভ্যাস ধীরে ধীরে তার চরিত্র বিকৃত করে।

বয়ঃসন্ধিকাল থেকে অভিভাবকগণ সন্তানের জেদ, রাগ ও অহংকার স্পষ্টভাবে অনুভব করেন। তবুও অনেকেই অতিরিক্ত স্নেহের বশবর্তী হয়ে সন্তানকে উচিত-অনুচিত শেখায় না। ফলে, একটি সময়ে সন্তান সংশোধনের বাইরে চলে যায়। ছোট পরিবার ও শহরকেন্দ্রিক বাসস্থানের কারণে দুই-তিন রুমে অভিভাবক-সন্তানের আবেগ-ভালোবাসা সীমার বাইরে চলে যায়।

সন্তানের আবদার ও নৈতিক সীমা অতিক্রম হলেও অনেক অভিভাবক তা পূরণ করেন। বিশেষ করে মা শ্রেণি সন্তানদের আপত্তিকর দোষ বাবার সঙ্গে আলোচনা না করে আড়াল করেন। কেউ বিশ্বাস করতে চান না যে তাদের সন্তান অপরাধ, রীতিনীতি ভঙ্গ এবং মূল্যবোধের অবক্ষয়ের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। আবার কেউ সন্তানের দোষের পক্ষে সাফাই গান। “নিজের সন্তান তুলসী পাতা, অন্যদেরটা তামাক পাতা”—এমন মনোভাবও দেখা যায়।

ভালো অভিভাবকত্বের অভাব সমাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সংসারে সন্তানকে বড় করতে গিয়ে পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা প্রাধিকার হারাচ্ছে। আদরের সন্তানদের আচরণের অনেককিছুই সামাজিক মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। স্কুল ও কলেজের সামনে মাবর্গ সন্তানদের জন্য অপেক্ষা করে, বাসা থেকে কোচিং ক্লাসে হাত ধরে নিয়ে যায়। মাধ্যমিক শেষ করা সন্তানও এখনও নিজের দায়িত্ব নিতে অক্ষম—এই ধারণা শিশুদের স্বনির্ভরতা ব্যাহত করছে।

খেতে বসলে তারা নিজেদের পছন্দের বাইরে কিছুই খাবে না। পড়াশোনায় ইচ্ছামতো বা বই নিয়ে বসবে না। সারাদিন মোবাইল বা ল্যাপটপে গেম খেলবে। কোনো আত্মীয়স্বজন এলে উপস্থিত হবে না। সন্তানের এই বদ অভ্যাসের পেছনে মা- বাবার দায় কম নয়। পরিবার থেকে সামাজিকীকরণের প্রাথমিক পাঠ, আদর ও শাসনের ভারসাম্য এবং সত্য শেখানোর দায়িত্ব অনেক অভিভাবক পালন করেন না।

মোটরসাইকেল রেসে প্রাণ হারানো প্রজন্মের বাবা-মায়ের হুঁশ অনেক পরে আসে। তখন প্রায়শ্চিত্তের সুযোগ থাকে না। কেউ ঘুষ-দুর্নীতির আশ্রয় নেন, কেউ সর্বস্ব বিনিয়োগ করে সন্তানের শখ পূরণ করেন। কিন্তু সন্তানদের জন্য সম্পদ রেখে যাওয়া বাধ্যতামূলক নয়; বরং মানুষ করে গড়ে তোলা সবচেয়ে উত্তম বিনিয়োগ।

যে মা সন্তানের সামনে শিক্ষকের সঙ্গে খাতার নম্বর নিয়ে ঝগড়া করে, যে বাবা ক্লাস ফ্যান নিয়ে প্রধানকে হুমকি দেয়, তাদের সন্তান কী শিখবে? নেতার আচরণ যদি সন্তানের সামনে প্রদর্শিত হয়, মানুষ হওয়ার সম্ভাবনা কমে। নব্বই দশকের মতো শিশুরা নালিশ করলে সবাই মিলে প্রতিরোধ করে। সন্তান সংসারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, কিন্তু অতিরিক্ত মাতামাতি কখনো ফলপ্রসূ নয়। অভিভাবকদের প্রতিচ্ছবিই সন্তানের মধ্যে প্রকাশিত হয়।

যে অভিভাবক মিথ্যা বলে, ছলনা করে, প্রতারণার স্বভাব রাখে, তাদের সন্তানের চরিত্রেও এসব স্পষ্ট হয়। কাজেই সন্তানকে ভালো শেখাতে অভিভাবককে নিজে ভালো চর্চা করতে হবে। আত্মীয়তা বজায় রাখা, প্রতিবেশী-স্বজনের বিপদে পাশে থাকা এবং সামর্থ্য অনুযায়ী দান—এসব সন্তানকে গঠনে সহায়তা করে। শৈশব ও কৈশোরে দেওয়া সেই শিক্ষা বার্ধক্যেও প্রতিফলিত হয়।

সন্তানকে স্বার্থপরতা শেখানোর শেষ পরিণতি কী? সে বড় হয়ে অভিভাবক হবে। নতুন একজন মানুষের সঙ্গে জীবন জুড়ে যাবে। শৈশবে শেখা আচরণ পুনরায় প্রয়োগ করবে। সংসারকে ছোট করতে হবে। যত বেশি মানুষ, তত বেশি ঝামেলা—সে মনে রাখবে। তাই প্রথমে বাবা-মা কাটা পড়বে। একসাথে থাকার, কথা বলার ও সেবা পাওয়ার সুযোগ থাকবে না। সে শিখেছে আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার প্রয়োজন নেই। এখন সংসার চলবে, পারিবারিক সুখ সংকীর্ণ হবে।

এই চক্রে অন্যের সুখের সময় সে পাশে থাকবে, দুঃখের সময় থাকবে না। প্রয়োজনের সময়ে সহায়তা দেবে না। সন্তানকে অভাব শেখানো উচিত নাকি দারিদ্র্য, তা ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও সামর্থ্যের ওপর নির্ভর করে। তবে আদবকায়দা না শেখালে, সে জীবন ও ইজ্জতের জন্য হুমকি হবে। তখন গর্ব নয়, লজ্জা জন্মাবে। তাই সময় থাকতে সাবধান হওয়া ও সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। বাবা-মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক নির্মাণে আবেগের সঙ্গে বিবেকও রাখতে হবে। রক্তের সম্পর্ক অস্বীকার করা যায় না, কিন্তু কোনো সম্পর্ক কখনো কখনো কলিজা পর্যন্ত পুড়াতে পারে।

রাজু আহমেদ, কলাম লেখক। ইমেইল: raju69alive@gmail.com

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অধ্যাপক ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী ৪৮ অধ্যাপক ডা. শেখ মো. নাজমুল হাসান ২৮ অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১১ আজমিনা আফরিন তোড়া ১০ আনোয়ারুল হক হেলাল আফসানা বেগম আবদুল গাফফার চৌধুরী আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ৩২ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল ১০ আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১৮ আরিফ রহমান ১৬ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৫৪ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইনাম আহমদ চৌধুরী ইমতিয়াজ মাহমুদ ৭২ ইয়ামেন এম হক এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন একুশ তাপাদার এখলাসুর রহমান ৩৭ এনামুল হক এনাম ৫৪ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৬৪ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান কেশব কুমার অধিকারী খুরশীদ শাম্মী ১৮ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ৪৪ জহিরুল হক মজুমদার জাকিয়া সুলতানা মুক্তা জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুনাইদ আহমেদ পলক জুয়েল রাজ ১১৪ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ১২ ড. কাবেরী গায়েন ২৩ ড. নাদিম মাহমুদ ৩৭ ড. মাহরুফ চৌধুরী ১২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ড. শামীম আহমেদ ৪৫ ডা. আতিকুজ্জামান ফিলিপ ২০ ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার তোফায়েল আহমেদ ৩২ দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৭ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক প্রফেসর ড. মো. আতী উল্লাহ ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬২ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৪৪ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার জাকির হোসেন ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৮ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১৯৪ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১৫৩ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক ১৪ রণেশ মৈত্র ১৮৩ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ৫৫ রাজু আহমেদ ৪০ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩৮ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর