টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
Advertise
ইমতিয়াজ মাহমুদ | ০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
ছোটবেলার কথা। এখলাসউদ্দিন আহমেদের একটা ছোট উপন্যাস পড়ছিলাম, হঠাৎ একটা লাইনে এসে চমকে উঠেছি— একটি দুরন্ত কিশোর ওর মা সম্পর্কে বলছিল, আমার মা সবার জন্যে ভাতের দাবিতে মিছিল করতে গিয়ে আর ফিরে আসেনি'। আমি নিজেও তখন ঐরকমই, ১২-১৩ বছর বয়স। বাক্যটা আমার মাথায় এমনভাবে গেঁথে গিয়েছিল! আপনি বুঝতেই পারছেন আজ এতো বছর পরেও লাইনটা মনে আছে। সবার জন্যে ভাতের দাবিতে মিছিল করতে গিয়ে আর ফিরে আসেনি। হৃদয়ে আটকে আছে কথাটা।
আজ সেই কথাটা আবার মনে পড়ছে, কেননা নীলফামারীতে গতকাল বিশ বছর বয়সী যুবক মো. হাবিবুর রহমান ওর সকল শ্রমিক সহকর্মীদের জন্যে ভাতের দাবিতে গিয়ে আর ফেরেনি। যে ফ্যাক্টরিটা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, হাবিবুর সেই ফ্যাক্টরির শ্রমিক ছিল না, হাবিবুর ইকু ইন্টারন্যাশনাল নামে একটা নিটিং কারখানার শ্রমিক, আর বন্ধ হয়েছে এলিগ্যান্ট নামের একটা কারখানা। হাবিবুর এলিগ্যান্টের শ্রমিকদের সাথে মিছিলে গেছে। পুলিশ আর মিলিটারি মিলে গুলি চালিয়েছে শ্রমিকদের মিছিলে, প্রাণ গেছে হাবিবুরের।
নীলফামারীতে উত্তরা ইপিজেডে ঘটেছে এই ঘটনা- গতকাল। হাবিবুর প্রাণ হারিয়েছে আরও অনেকে আহত হয়ে হাসপাতালে। কালের কণ্ঠ কয়েকজন আহত শ্রমিকের নাম দিয়েছে— মো. মোমিনুর রহমান (২৫), মো. শাহিন (২৬), নূর আলম (৩০), মোস্তাক আহমেদ (২৫), লিপি আক্তার (২৬) জমিলা খাতুন (৩৫)। ব্র্যাকেটে দেয়া বয়সগুলি লক্ষ্য করেছেন? এই শ্রমিকেরা সবাই তরতাজা যুবক। ওরা কীজন্যে মিছিল করতে গিয়েছিল? কাজের জন্যে জনাব। নিতান্ত কায়িক শ্রমের কাজ। ওদের দাবি ছিল, ফ্যাক্টরি বন্ধ করিস না, ফ্যাক্টরি বন্ধ হলে আমরা খাবো কী!
না, ওরা ঐরকম মিছিল করতে যায়নি, যে না, আমাদেরকে দিতে হবে উপরের গ্রেড, ডিপ্লোমাদের উপরের গ্রেড দেওয়া যাবে না। সেগুলি মিছিল করেন আপনারা ভদ্রলোকের ছেলেমেয়েরা। হাবিবুর তো আপনাদের বয়সীই। আপনাদেরকে দুইটা লাঠির বাড়ি দিয়েছে বলে আপনারা কেঁদে কেটে শেষ। আর সরকারও পুলিশের কর্তাদের পাঠিয়েছে, অলে বাবু সোনারা ব্যথা পেয়েছ, এই পুলিশ, যাও মাফ চেয়ে আসো। কিন্তু হাবিবুরকে তো গুলি করে মেরেই ফেলেছে। আপনাদের সরকার পাঠাবে পুলিশের বাবুসাহেব বা মিলিটারির জেনারেল সাহেবদের, যাও মাফ চেয়ে আসো? বলবে যে হাবিবুর হত্যার বিচার চাই? না।
কিসসু হবে না। বিশ বছরের তরতাজা মজুর, ওকে গুলি করে মেরে ফেললো, আয়নারা কিসসু করবেন না। আপনারা আওয়ামী লীগ-বিএনপি করবেন, হিন্দু- মুসলমান করবেন, জামায়াতিদের পাশে দাঁড়িয়ে ফুক্কা কুল্লে করবেন, তুমি কে আমি কে করবেন। করেন। হাবিবুরর প্রাণ দিয়েছে, সকলের জন্যে ভাতের জন্য, কাজের জন্য। হাবিবুর সেই অনন্ত কাল ধরে চলমান সংগ্রামের একজন শহিদ। এইখানে জন হেনরি আর আমাদের হাবিবুর সকলে এক, অভিন্ন।
হাবিবুরদের এই মহান সংগ্রামে কোন জাত ধর্ম নেই, বাংলাদেশ ইন্ডিয়া পাকিস্তান নেই, হিন্দু মুসলিম ইহুদী খৃস্টান নেই। এটার নাম শ্রেণিসংগ্রাম। এইটাই লড়াই, এইটাই মুল লড়াই এইটাই আসল লড়াই এইটাই শেষ লড়াই। আপনারা ফুক্কা কুল্লে করেন, আয়নারা আমি কে তুমি কে করেন। শ্রেণিসংগ্রামটা হাবিবুররা আয়নাদের ছাড়াই অগ্রসর করে নিবে। শালা মধ্যবিত্তের দল।
মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।
আপনার মন্তব্য