টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
Advertise
শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ | ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
"স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক"– বাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় রাজনৈতিক স্লোগান, যা ১৯৮০ ও ৯০-এর দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। এই স্লোগানটি মূলত ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে শহীদ যুবক নূর হোসেন-এর বুকে ও পিঠে লেখা ছিল।
উইকিপিডিয়ায় উল্লেখ রয়েছে, নূর হোসেন ঢাকা শহরের একটি স্বৈরাচারবিরোধী মিছিলে অংশগ্রহণ করেন এবং ওই দিন পুলিশের গুলিতে তিনি শহীদ হন। তাঁর বুকে লেখা ছিল "স্বৈরাচার নিপাত যাক" এবং পিঠে লেখা ছিল "গণতন্ত্র মুক্তি পাক"। সেই স্লোগানটি মুহূর্তেই গোটা আন্দোলনের প্রতীক ও প্রতিবাদের ভাষা হয়ে ওঠে। এই স্লোগানটি এরশাদবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাসে একটি অমর চিহ্ন হয়ে আছে এবং ১০ নভেম্বর দিনটি আজও বাংলাদেশে শহীদ নূর হোসেন দিবস হিসেবে পালিত হয়।
খুব সাধারণ একটি প্রশ্ন হতে পারে গণতন্ত্র কী?
অধিকাংশ রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, গণতন্ত্র হল এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা বা কোনও প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা বা একটি দেশের মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণের এমন ব্যবস্থা, যেখানে সমস্ত সদস্যই ক্ষমতার সমান অংশীদার। গণতন্ত্র প্রথাটি প্রাচীন গ্রীক এবং রোমানদের সাথে জড়িত।
ইতিহাস পাঠে জানা যায়, ১৯৮৮ সালে ফিলিপাইনের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট কোরাজন একুইনো প্রথমবারের মতো স্বৈরশাসন থেকে মুক্ত হওয়া রাষ্ট্রসমূহ নিয়ে একটা সম্মেলনের আয়োজন করেন। সেই সম্মেলনের নাম দেয়া হয় 'ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অন নিউ অ্যান্ড রেস্টোর্ড ডেমোক্রেসি বা আইসিএনআরডি।' সেই সম্মেলনে নতুন গণতন্ত্র পাওয়া দেশগুলোর গণতন্ত্র সংহতকরণের লক্ষ্যে কিছু প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। যার ধারাবাহিকতায় ১৯৯৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের আন্তসংসদীয় ইউনিয়ন বা আইপিইউ 'ইউনিভার্সাল ডিক্লারেশন অন ডেমোক্রেসি' শিরোনামে এক প্রস্তাব গ্রহণ করে। এর ১০ বছর পর ২০০৭ সালে জাতিসংঘ ১৫ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। তখন থেকে জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত দেশগুলো দিবসটি পালন করে আসছে।
আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস বিশ্বের নানান দেশে ভিন্ন ভিন্ন আকার ও আয়োজনে পালিত হয় এবং প্রতিটি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও নাগরিক সমাজের ঐতিহ্য অনুযায়ী এর রূপ আলাদা। ইউরোপের দেশগুলোতে যেমন যুক্তরাজ্য, নরওয়ে ও জার্মানিতে সংসদ ভবন বা সিটি হলে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত সেশন ও সেমিনার আয়োজন করা হয়, যেখানে সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ, মানবাধিকার ও আইনের শাসন নিয়ে আলোচনা করেন। এসব দেশে বিশ্ববিদ্যালয় ও নাগরিক সংগঠনগুলো মুক্ত মতপ্রকাশের গুরুত্ব ও নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে জনসচেতনতা ক্যাম্পেইন চালায় এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়।
আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করে জাতিসংঘ। চলতি বছরে দিবসটির মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে, "অ্যাচিভিং জেন্ডার ইক্যুইলিটি অ্যাকশন বাই অ্যাকশন" অর্থাৎ পদক্ষেপের পর পদক্ষেপ গ্রহণ করে লিঙ্গসমতা অর্জন করতে হবে। গণতন্ত্রে নারী-পুরুষ বা অন্য যে কোনো লিঙ্গের মানুষ, লিঙ্গ নির্বিশেষে সবাই সমান সুযোগ ও মর্যাদা লাভ করে।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি ইউএনডিপি'র তথ্য অনুযায়ী, গণতান্ত্রিক দেশগুলির মানব উন্নয়ন সূচক (এইচডিআই) কর্তৃত্ববাদী দেশগুলোর তুলনায় গড়ে প্রায় ২০ শতাংশ বেশি। বিশ্বব্যাংকের গভর্নেন্স ইন্ডিকেটর অনুযায়ী, গণতান্ত্রিক দেশগুলো দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও সরকারি কার্যকারিতা সূচকে সর্বোচ্চ স্থানে থাকে। ২০২২ সালের করাপশন পারসেপশন ইনডেক্সে শীর্ষ দশ দেশের মধ্যে নয়টি পূর্ণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রেও গণতন্ত্রের ইতিবাচক প্রভাব সুস্পষ্ট: ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বিশ্লেষণ অনুসারে, দৃঢ় গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসম্পন্ন দেশগুলোর মাথাপিছু জিডিপি বৃদ্ধি কর্তৃত্ববাদী দেশগুলির তুলনায় গড়ে ১৫ শতাংশ বেশি।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক গেটেল গণতন্ত্র ও আধুনিক রাষ্ট্রের প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। তাঁর মতে, যে শাসনব্যবস্থায় জনগণ সার্বভৌম ক্ষমতার প্রয়োগে অংশ নিতে পারে, সেটিই গণতন্ত্র। এছাড়াও, তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কাজকে রাষ্ট্রকে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন।
গণতন্ত্র নিয়ে যে শুধু রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা চর্চা করেছেন, তা নয়। এটি নিয়ে সাহিত্যেও চর্চা রয়েছে। বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গণতন্ত্রের ধারণার একজন শক্তিশালী প্রবক্তা ছিলেন। তিনি মনে করতেন, গণতন্ত্র কেবল রাজনৈতিক ব্যবস্থা নয়, বরং মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক মুক্তি এবং আত্মবিকাশের একটি পথ। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, সর্বজনীন শিক্ষা, এবং সামাজিক ন্যায়বিচার ছাড়া প্রকৃত গণতন্ত্র সম্ভব নয়। রবীন্দ্রনাথের লেখনী, যেমন 'ঘরে বাইরে' উপন্যাসে গণতন্ত্রের বিভিন্ন দিক, জাতীয়তাবাদ, স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক আন্দোলনকে তুলে ধরা হয়েছে, যা তার গণতান্ত্রিক চিন্তাধারাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
অপরদিকে, বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম 'ধূমকেতু' পত্রিকার মাধ্যমে স্বাধীনতার দাবি তুলে ধরেন এবং ভারতবাসীকে তাদের অধিকারের জন্য সোচ্চার হতে অনুপ্রাণিত করেন। তাঁর শক্তিশালী লেখাগুলো মানুষকে নিজেদের অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে সাহস যোগাতো, যা মত প্রকাশের স্বাধীনতারই এক প্রকার রূপ। তাঁর বেশ কিছু লেখা এবং কাজ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল, যা ব্রিটিশ শাসনামলে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং মত প্রকাশের সীমাবদ্ধতার প্রমাণ দেয়। নজরুল নিজে এই সীমাবদ্ধতা ভাঙতে চেয়েছিলেন। তাঁর বিখ্যাত কবিতাগুলোতে, যেমন 'বিদ্রোহী'-তে, তিনি সব প্রকার শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙতে মানুষকে অনুপ্রাণিত করেন। তাঁর লেখায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, কোনো মানুষ বা সমাজ যেন মত প্রকাশের স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত না হয়।
সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবিরত ধারায় গণতন্ত্র নিয়ে চর্চা বিদ্যমান। গণতন্ত্রের এই চর্চায় বিভিন্ন আলাপ আলোচনায় এটিই প্রমাণ হয়েছে যে, রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। বাংলাদেশের সংবিধানের ৭(১) ধারা অনুযায়ী, "প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ" এবং এই ক্ষমতা জনগণের পক্ষে সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হবে। এর অর্থ হলো, রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতার চূড়ান্ত উৎস জনগণ এবং জনগণই নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে এই ক্ষমতা প্রয়োগ করে।
সাংবাদিক ও গবেষক আরশাদ সিদ্দিকী 'জনতা থেকে দূরে সরছে ক্ষমতা' শিরোনামে একটি কলাম লিখেছেন, যেটি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশ হয়েছে। তিনি লিখেছেন, "গণতন্ত্র বেপথু হলে জনতার সঙ্গে ক্ষমতার ব্যবধান বাড়ে। এ ব্যবধান যত বেশি হয়, ক্ষমতার মসনদ তত নড়বড়ে হয়ে পড়ে। রাষ্ট্র পরিচালনাও জটিল থেকে জটিলতর হতে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ের বাংলাদেশের রাজনীতিতে আমরা এর নমুনা ঢের উপলব্ধি করছি। ক্ষমতাসীন এবং ক্ষমতার বাইরে যারা রয়েছে, উভয় পক্ষই এখন ঘুড়ির মতো পাক খাচ্ছে।"
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রতিদিন কিছু না কিছুর যোগ-বিয়োগ চলছে। কিছু না কিছু ঘটছে। এসব ঘটনার সাথে অধিকাংশ ক্ষেত্রে যাদের যোগ বা বিয়োগ নেই তারা হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। রাষ্ট্রের দোদুল্যমান অবস্থায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ জনগণ। ইতিহাস আমাদের সামনে। এতে দেখা যাচ্ছে, যখনই ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে, তখন দেশকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে। ভোগান্তির শিকার হয়েছে এবং হচ্ছে সাধারণ বাসিন্দারা। রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে যে পরিস্থিতি চলমান সেটা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে শহীদ যুবক নূর হোসেন-এর বুকে ও পিঠে লেখা ছিল। "স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক।" ২০২৫ সালে 'আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস'-এ একটি প্রশ্ন দণ্ডায়মান। প্রশ্নটি হচ্ছে, গণতন্ত্র কি মুক্ত?
মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।
আপনার মন্তব্য