আজ শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী, ২০২৬

Advertise

অসহযোগিতার দায়ে ইতিহাসে আমাদের নামও থাকবে

রাজু আহমেদ  

ইতিহাস কোনোদিন যদি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের শাসনকাল মূল্যায়ন করে, তবে সেখানে আমাদের অসহযোগিতার চিত্রও উঠে আসবে। যৌক্তিক–অযৌক্তিক কত-শত কারণে সরকারের প্রত্যেকটি দিন বিষিয়ে তোলা হলো। ক্যালেন্ডারের পাতায় সরকারের জন্য নির্বিঘ্ন কয়টি দিনের সন্ধান পাবেন? রাজনৈতিক দলগুলোর মতানৈক্য, নাগরিকদের অনৈক্য এবং কতিপয় কর্মকর্তা–কর্মচারীদের স্বার্থ—সবকিছু মিলিয়ে গত ১৫ মাসকে শান্তির সময় বলার সুযোগ নাই। চারদিকেই ছন্দপতন। খুঁজে দেখুন—এই অপ্রাপ্তির খুঁটিতে খুঁটিতে আপনার ও আমার নাম লেখা। একটুও ছাড় না দিয়ে কেবল পেতে চেয়েছি। গড়তে দেইনি বরং নিজেরাই ভেঙেছি।

ন্যায়–অন্যায় বিবেচনা করিনি বরং স্বার্থকে সবার আগে রেখেছি। রাস্তা অবরোধ করে, হুমকি–ধমকি দিয়ে, আন্দোলন–অনশন করে কিংবা অবরোধ–বিশৃঙ্খলার পাল তুলে যতভাবে সরকারের পথচলা আটকে রাখা যায়, সেটা ছিল। কোথাও কোথাও ষড়যন্ত্রও ছিল। ইউনূস সরকার সফল হোক—এটা অনেকেই চায়নি, চায় না এবং চাইবেও না। বরং পূর্বেকার যে-ই সেই স্বপ্নে বিভোর মানুষগুলোর কাছে জুলাইয়ের সহস্র লাশ, ত্যাগ ও বেদনার করুণ ইতিহাসের কোনোই মূল্য নাই। বরং স্বেচ্ছাচারিতায় অতীতকে ছাপিয়ে যাওয়ার আয়োজন ও আশঙ্কা দেখি।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে প্রায় প্রত্যেকটি দিন চ্যালেঞ্জের ছিল। সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জ ছিল দেশের শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায়। শতভাগ সন্তোষজনক হয়নি, কেননা জুলাইয়ের নাম দিয়ে, ধর্মের ইস্যু এনে, মাজার-পূজার নাম করে, সংখ্যালঘুর তকমা টেনে, বিদেশি চক্রান্তের চক্করে পড়ে এবং নাগরিকদের মধ্যে স্বাধীনতার অপব্যাখ্যা ও অপব্যবহার করে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর দূরত্ব ধরে দিনগুলো মোটেও স্বাভাবিক ছিল না। গুজব ও হুজুগে, চাঁদা ও চামচামিতে এবং ক্ষমতা ও প্রতিশোধে সরকারকে যতভাবে বিব্রত করা যায়—সে চেষ্টা অংশীজনদের মাঝে ছিল। কেউ কেউ জুলাইয়ের সওদাগর সেজেছিল। কেউ কেউ দেখিয়েছে দলের প্রতি জনমত ও বিরোধীদলের প্রতি বিরুদ্ধাচারণ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও এমন কিছু বিতর্কিত ইস্যু উঠিয়েছে, যেগুলো এই স্বল্প সময় সামনে না আনলেও হতো। রাষ্ট্রসংস্কারের প্রশ্নে কুমিল্লা নাকি নোয়াখালী বিভাগ হবে—এসব নিয়েও এখনই কথা না বললেও হতো। অথচ এই ধরণের ইস্যুগুলোতেই ভস্ম হয়েছে বেশি।

নানান প্রতিকূলতার মাঝেও দেশি–বিদেশি চাপ ও ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে ডক্টরের নেতৃত্বাধীন সরকার এমন কিছু যুগান্তকারী পরিবর্তন সূচিত করে গেছে, যা ধারাবাহিক হলে বাংলাদেশ বদলে যাবে। বিদ্যমান কাঠামোতে যেকোনো সরকারের স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠার যে সুযোগ ছিল, তা আমূল বদলে দিয়েছেন। ষড়যন্ত্র ও সমালোচনা সহ্য করেও এমন কিছু অসাধ্য সাধন করেছেন, সামনের দিনগুলোতে যার ফলভোগ অত্যন্ত সুফলদায়ক হবে। আশা করা যায়, পরবর্তী সরকারগুলো এই পরিবর্তনগুলোকে স্বাভাবিক বিবেচনা করে এগুলো বাস্তবায়নে সুবিবেচকের ভূমিকা নেবে। নয়তো যে-কোনো সামনের যে-কোনো সরকারের নড়বড়ে হতে সময় লাগবে না। এই অল্পদিনে যত দাবি উঠেছে তা আশ্চর্যজনক। তার চেয়েও বড় বিস্ময়—যতগুলো যৌক্তিক দাবি, সেগুলোর প্রায়টাই পূরণ হয়েছে। তবে রাষ্ট্রকে জিম্মি করে দাবি আদায়ের এই অপদ্ধতিগত সংস্কৃতি ভালো নয়। আবার ন্যায্য অধিকার থেকে রাষ্ট্রও নাগরিককে বঞ্চিত রাখবে—এই চর্চাও কাঙ্ক্ষিত ও সুখকর নয়।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শুরু থেকেই অন্তর্ভুক্তিমূলক পদ্ধতি অনুসরণ করেছে। কোনো ব্যাপারে অযৌক্তিক ও অহেতুক রিঅ্যাক্ট না করায় কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্বাভাবিকতার ব্যত্যয় ঘটেছে বটে তবে প্রশংসিত ক্ষেত্রগুলোই বেশি। রাষ্ট্রের অহেতুক বলপ্রয়োগের প্রবণতা রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে দূরত্ব বৃদ্ধি করে। বর্তমান সরকারের অর্জন কোনোভাবেই খাটো করে দেখার সুযোগ নাই। যে পরিবেশ ও পরিস্থিতি মোকাবিলা করে তাদেরকে কাজ করতে হয়েছে, তাতে তারা গণপ্রশংসার দাবিদার। অথচ স্বার্থ হাসিলের জন্য নাগরিকদের নানান শ্রেণি যে ভূমিকা পালন করেছে, তা অনেকটাই হতাশার। জাতি হিসেবে নিজেদেরকে তথা চিত্র ও চরিত্র নিয়ে খুব বেশি আশাবাদী হওয়ার ক্ষেত্র এখনো তৈরি হয়নি । রাষ্ট্রের উপকার হবে জেনেও শুধু বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা করতে গিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কতিপয় সিদ্ধান্তের এমন নগ্ন সমালোচনা ও আন্দোলন সাধন হয়েছে, যা শিক্ষা ও প্রগতি, ন্যায় ও উন্নতির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক। আমরা জেনেশুনেই নিজেদেরকে পিছিয়ে রাখতে চাইছি।

সরকারকে অসহযোগিতার ক্ষেত্রে, এমনকি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির প্রশ্নে রাষ্ট্রের শিক্ষিত ও পদধারী ক্ষমতার কেন্দ্রীভূতরাই বেশি ভূমিকা পালন করেছে। অথচ কৃষক তার চাষবাস বন্ধ রাখেনি, শ্রমিক তার পরিশ্রম বন্ধ করেনি। শাটডাউন, লকডাউন তথা কর্মবিরতির মতো জিম্মি করার আয়োজন রাষ্ট্রের বিবেকখ্যাতদের থেকেই বারবার দেখা গেছে। সরকারকে আরেকটু সহযোগিতা করলে এই রাষ্ট্রের ভিন্ন চিত্র হাজির করা অসম্ভব হতো না। ভাগ্য বদলাতে সবার আগে নিজেকে পরিবর্তন করতে হয়। রাষ্ট্রের কাছে যাদের স্বার্থ নাই সেই গোটা টিমটাই কার্যত অবরুদ্ধ ছিল মাসের পর মাস। টার্গেট পয়েন্টে ফোকাস করা তাদের জন্য দুরূহ ছিল। সেজন্যই সংস্কার ও পরিবর্তনগুলো খুবই ধীরগতির। বন্দর ব্যবস্থাপনায় বিদেশিদের দ্বারস্থ হওয়াতেও যারা তটস্থ অনুভব করেন, তারা দেশপ্রেমের বদলে স্বার্থপ্রেমের পূজারী। ভাগ্যের উন্নতি ঘটুক, রাষ্ট্রের দুর্নীতিহীন সিস্টেম দাঁড়াক—তা যারা চায় না, তাদেরকে গণশত্রু হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে।

সকল রাজনৈতিক দলের লক্ষ্য জনগণের পক্ষ নেওয়া, জীবনমানের উন্নয়ন ঘটানো। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সহায়তা করে তাদের ঘাড়ে বন্দুক রেখে রাষ্ট্রের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যমুখী ট্রেনে যাত্রা করা যেত না? যারা ক্ষমতার নিকটবর্তী, তারা ক্ষমতায় থাকা সময়ের চেয়ে কম ক্ষমতা নিয়ে ছিল? সুযোগ-সুবিধা এর চেয়ে বেশি দখল করলে কৈফিয়ত দিতে হবে না? অথচ এই ক্ষমতাও অনেকের ক্ষমতায় থাকার কালেও থাকবে না। দলাদলি ও টেন্ডারবাজিতে অনেকের জাত যাবে। তখন সমালোচনার তুফান উঠবে।

ফেব্রুয়ারিতেই নির্বাচন হয়ে যাক—তবে যারা সরকারকে সবচেয়ে বেশি অসহযোগিতা করেছে তারাই জনগণের কাছ থেকে বেশি ঘৃণা কুড়াবে। ইতিহাসে লেখা থাকবে—ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার খুব বেশি ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করতে পারেনি; অথচ সুযোগ ছিল। সেই সুযোগকে সরকার কেন কাজে লাগাতে পারেনি? কারণ আমরা সরকারকে মোটেও সহযোগিতা করিনি, বরং কী করে আরও কঠিন পরিস্থিতি হাজির করা যায় সেজন্য আন্দোলন করেছি। যেটুকু পক্ষে বলেছি তা স্বার্থপূরণের গুটি হিসেব! স্বার্থপূরণই আমাদের মুখ্য বিবেচ্য ছিল! দেশের সামষ্টিক স্বার্থ কখনোই আমাদের কাছে গুরুত্ব পায়নি। ইস্যুভিত্তিক চলমান অনেক আন্দোলনের আলামত দেশপ্রেমের সাক্ষ্য দেয় না। অথচ জন-ভোগান্তিতে অতিষ্ঠ মানুষ।

রাজু আহমেদ, কলাম লেখক। ইমেইল: raju69alive@gmail.com

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অধ্যাপক ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী ৪৮ অধ্যাপক ডা. শেখ মো. নাজমুল হাসান ২৭ অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১১ আজমিনা আফরিন তোড়া ১০ আনোয়ারুল হক হেলাল আফসানা বেগম আবদুল গাফফার চৌধুরী আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ৩২ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল ১০ আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১৮ আরিফ রহমান ১৬ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৫৪ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইনাম আহমদ চৌধুরী ইমতিয়াজ মাহমুদ ৭২ ইয়ামেন এম হক এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন একুশ তাপাদার এখলাসুর রহমান ৩৭ এনামুল হক এনাম ৫৩ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৬৪ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান কেশব কুমার অধিকারী খুরশীদ শাম্মী ১৮ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ৪৪ জহিরুল হক মজুমদার জাকিয়া সুলতানা মুক্তা জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুনাইদ আহমেদ পলক জুয়েল রাজ ১১২ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ১২ ড. কাবেরী গায়েন ২৩ ড. নাদিম মাহমুদ ৩৭ ড. মাহরুফ চৌধুরী ১০ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ড. শামীম আহমেদ ৪৫ ডা. আতিকুজ্জামান ফিলিপ ২০ ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার তোফায়েল আহমেদ ৩২ দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৭ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক প্রফেসর ড. মো. আতী উল্লাহ ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬২ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৪৩ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার জাকির হোসেন ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৮ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১৯৪ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১৫৩ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক ১৪ রণেশ মৈত্র ১৮৩ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ৫৫ রাজু আহমেদ ৩৮ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩৮ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর