টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
Advertise
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম | ২৮ ডিসেম্বর, ২০২৫
কমিউনিস্ট পার্টির আদৌ কোন ভবিষ্যৎ আছে কি? এমন প্রশ্নের জবাবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রয়াত সাবেক অর্থমন্ত্রী প্রখ্যাত মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক অধ্যাপক অশোক মিত্র বলেছিলেন “মার্ক্সবাদের যদি কোন ভবিষ্যৎ না থাকে তাহলে ‘ভবিষ্যতেরও’ কোন ভবিষ্যৎ নেই।” জবাবটি শুধু চমকপ্রদভাবে সুন্দরই নয়, তা নানা দিক থেকে এ যুগের এক নিষ্ঠুর সত্যের নির্যাস। আমি এবং আমার মতো যারা কমিউনিস্ট আন্দোলনের অংশীদার—আমরা সবাই সাম্যবাদী সভ্যতা নির্মাণের লক্ষ্যে সেই বিশ্বাস নিয়ে দৃঢ় প্রত্যয়ে কাজ করে যাচ্ছি। এ ‘বিশ্বাস’ শুধু ‘অন্ধবিশ্বাস’ নয়, তা চলমান গতিময় ঘটনাপ্রবাহ আমাদের সামনে যে বাস্তব সত্য উন্মোচন করছে, তার দ্বারা প্রতিনিয়ত প্রমাণিত হচ্ছে। এ যুগকে ‘পুঁজিবাদের মুমূর্ষুকাল’ বলে যে কথা বলা হয়, বিভিন্ন উত্থানপতনের মধ্য দিয়ে, সেই যুগের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য এখন আরও স্পষ্ট হচ্ছে। আমাদের দেশেও তার বেদনাদায়ক ও উলঙ্গ প্রকাশ আমরা দেখছি।
মার্ক্সবাদী দর্শন ও রাজনীতির প্রতি এই প্রত্যয় ও বিশ্বাসের পেছনে থাকা নানা কারণের মধ্যে শুধু একটি কারণের কথা আজ আলোচনা করব। এই বিশ্বাস ও আস্থার জায়গাটি হাজারো কমরেডের মধ্যে আজো সক্রিয় সাবজেক্টিভ উপাদান হিসেবে ছড়িয়ে দিচ্ছে আমাদের পার্টি- কমিউনিস্ট পার্টি।
আমাদের দেশে কমিউনিস্ট পার্টি, কমিউনিস্ট আন্দোলন কোন ভুঁইফোঁড় রাজনৈতিক দল বা আন্দোলন নয়। এদেশে আমরা ‘কিংস পার্টি’, ‘এজেন্সি দ্বারা সৃষ্ট পার্টি’ , ‘টাকা দিয়ে তৈরি করা পার্টি’, ‘জোটে দল ভারী করার জন্য পার্টি’, ‘সাইনবোর্ড পার্টি’, ‘ভোক্স ওয়াগন পার্টি’—ইত্যাদির বহু ধরণের বহু খেলা দেখেছি ও দেখছি। কিন্তু ‘কমিউনিস্ট পার্টি’ হলো ভিন্ন ধরনের পার্টি। এটি হ’লো ‘মাটি-মানুষ-ইতিহাসের প্রকৃতিজাত সন্তান’ স্বরূপ বাস্তবতাকে ভিত্তি করে সৃষ্টি হওয়া একটি দল। এ কথা যে শুধু কথার কথা নয় তার প্রমাণ আমরা পাই এই পার্টির বিকাশের বিভিন্ন সময়কালের বৈচিত্র্যপূর্ণ ভাবনা-চিন্তা ও প্রবণতা-ধারার অস্তিত্ব থাকার মাধ্যমে। পার্টি যদি উপর থেকে চাপানো কোন ‘মাস্টারমাইন্ড’ ও ‘মেটিকুলাস প্ল্যানিং’-এর সৃষ্টি হতো তাহলে এরকমটি হতো না। হ’তো জন্ম থেকেই একই ছাঁচে গড়া যান্ত্রিকভাবে চালিত পরিপূর্ণ বিশুদ্ধ একটি দল। কিন্তু ‘মাটি, মানুষ ও ইতিহাসের প্রকৃতিজাত সন্তান’ বলেই কমিউনিস্ট পার্টি তার উৎসমূলের জন্মদাগ বহন করেই সৃষ্ট ও অন্তহীন আত্মসংগ্রামের মাধ্যমে বিকশিত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতের বার্তাবহ হয়ে তার লড়াই জারি রাখতে পারছে।
আমাদের দেশে কমিউনিস্ট পার্টি হুট করে তৈরি হয়নি। এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে আমাদের দেশসহ দক্ষিণ- এশিয় ভূখণ্ডে কমিউনিস্ট আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটেছিল। প্রায় সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া তখন ছিল ব্রিটিশ শাসিত একটি অখণ্ড ও একক রাষ্ট্র ভারতের অন্তর্ভুক্ত। সে সময় আমরা ছিলাম একদিকে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসন-শোষণে পিষ্ট এবং অপরদিকে প্রাচীন সময় থেকে সমাজ কাঠামোর ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে সনাতনী অচলায়তনে বন্দি ও নিষ্ঠুর সামন্তবাদী শোষণে নিষ্পেষিত। এই অবস্থার বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত ভাবে চলছিল গণমানুষের বিদ্রোহ। এর আগে আগেই ইউরোপ-আমেরিকায় সূচিত হয়েছিল শিল্প-বিপ্লব, দৃঢ়মূল হয়েছিল পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক-সামাজিক ব্যবস্থা। ‘সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতার’ আওয়াজ নিয়ে সে বিপ্লবী রূপান্তর ঘটে থাকলেও এবং মেহনতি মানুষ সহ ব্যাপক জনগণের অংশগ্রহণে সেই বিপ্লব পরিচালিত হয়ে থাকলেও, রাষ্ট্রক্ষমতা চলে গিয়েছিল জনগণের বদলে বুর্জোয়া শ্রেণির হাতে। ফলে তীব্র হয়ে উঠেছিল শ্রেণি দ্বন্দ্ব ও শ্রেণি-সংগ্রাম। ১৯১৭ সালের ৭ নভেম্বর শ্রমিক শ্রেণি রুশ দেশে রাষ্ট্রক্ষমতা ছিনিয়ে নিয়ে মার্কসবাদী মতবাদকে অবলম্বন করে বলশেভিক বিপ্লব ও মজুর-কিষানের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা নির্মাণের এক ঐতিহাসিক অভিনব প্রয়াসে হাত দিয়েছিল। দুনিয়ার দেশে-দেশে মজুর শ্রেণির এই সাফল্যের খবর বিরাট আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল এবং নিজ-নিজ দেশের গণসংগ্রামে নতুন পথে অগ্রসর হওয়ার কাজে আশা ও অনুপ্রেরণার জন্ম দিয়েছিল।
এরকম পটভূমিতে, গণমানুষের অর্থনৈতিক-সামাজিক অধিকারের দাবীতে বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্তভাবে চলতে থাকা সংগ্রাম-বিদ্রোহ এবং ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সারা ভারতবর্ষ জুড়ে তীব্র হয়ে ওঠা সংগ্রামের পটভূমিতে পূর্ব বাংলাসহ ভারতের বিভিন্ন এলাকায় পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন নানা উদ্যোগে মার্কসবাদী ধারায় কমিউনিস্ট আন্দোলন-সংগঠন গড়ে তোলার উদ্যোগ সূচিত হয়েছিল।
গ্রাম-শহরের মেহনতি মানুষ হলো কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রধান বাহক। বিপ্লবী বুদ্ধিজীবী শ্রেণির মানুষ তাদেরকে বিপ্লবী তত্ত্বে সমৃদ্ধ করে কমিউনিস্ট পার্টিতে নিয়ে আসতে সহায়তা করে এবং সমাজতন্ত্রের বিপ্লবী লক্ষাভিমুখী সংগ্রামে অগ্রদূতের ভূমিকা পালনের জন্য তাকে প্রস্তুত করে। তারা সবাই ‘রেডি-মেইড’ কমিউনিস্ট হয়ে পার্টিতে আসে না। বিভিন্ন স্তরের এবং চেতনাগত বিবর্তনের প্রক্রিয়া-ধারার পথে তারা সাম্যবাদের আদর্শিক মোহনায় মিলিত হয়। কে কোথা থেকে ও কোন পথ পরিক্রমণ করে এই মোহনায় আসেন। তাদের প্রত্যেকে তাদের জন্মদাগ বহন করেই পার্টিতে আসেন। জন্মদাগ হিসাবে থেকে যাওয়া যাবতীয় পিছুটান কঠোর ও অন্তহীন আত্ম-সংগ্রামের মাধ্যমে অতিক্রম করতে হয়।
বিভক্তিপূর্ব ‘ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি’, যার উত্তরাধিকার আমাদের দেশের কমিউনিস্ট পার্টিও বহন করে, কোন ভুঁইফোঁড় রাজনৈতিক দল নয়। ইতিহাসের একটি সুনির্দিষ্ট সময়কালে উদ্ভূত বাস্তব সংগ্রাম ও চেতনার বিকাশের ফলাফলে তা জন্ম নিয়েছিল। ১৯২৫ সালে কানপুরে সম্মেলনের সম্মেলন করে পার্টির কর্মসূচি গ্রহণ ও কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনকে যদি পার্টি প্রতিষ্ঠার ক্ষণ বলে গণ্য করা হয় তাহলে একথাও হিসাবে রাখতে হবে যে তার আগে থেকেই পার্টি গঠনের বিচ্ছিন্ন নানা খণ্ডিত প্রয়াস অগ্রসর হয়েছিল। সেসব প্রতিটি উদ্যোগের বিবরণে না গেলেও তার বিশ্লেষণ থেকে এ কথাই বেরিয়ে আসে যে—গঠনের প্রক্রিয়াকাল থেকেই নিম্নোক্ত বিশেষ ৪টি উৎস থেকে পার্টিতে প্রাণরস সঞ্চারিত হয়েছে। সেগুলো হলো—
১) রাশিয়ায় মহান সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সাফল্যের প্রভাব।
২) ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের সন্ত্রাসবাদী ধারার অনুসারীদের এই অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি অর্জন যে ‘জনশক্তি’ বাদ দিয়ে শুধু ‘সন্ত্রাস’ দিয়ে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তিলাভ করা যাবে না।
৩) ভারতের কংগ্রেস-গান্ধীজীর নেতৃত্বে পরিচালিত স্বাধীনতা সংগ্রামে আপোসকামিতা, অহিংস মতবাদের অসারতা ইত্যাদির কারণে মোহভঙ্গ।
৪) ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন ও কৃষক সহ মেহনতি মানুষের আন্দোলনের অভিজ্ঞতা থেকে লব্ধ রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে রাজনৈতিক জ্ঞান।
এইসব ঘটনাপ্রবাহ ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে উঠেছিল। এই অঞ্চলে শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে সমাজবিপ্লবের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত এই পার্টি এ অঞ্চলের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসের নানা বাঁকে, আত্মোৎসর্গ ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছে। নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হলেও, পরিবর্তনশীল বিশ্বের বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করেই কমিউনিস্ট পার্টি নিজেকে টিকিয়ে রেখেছে এবং পুনর্গঠিত করেছে। ইতিহাস কখনোই সরলরৈখিক নয়। সমাজবিপ্লবের পথও মসৃণ নয়। এই পার্টির ইতিহাসে সাময়িক পশ্চাদপসরণ, বিভ্রান্তি ও বিচ্যুতির অধ্যায় যেমন আছে, তেমনি আছে ঘুরে দাঁড়ানোর, নতুন করে শিখে নেওয়ার এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতাও।
বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিপর্যয়, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন, পূর্ব ইউরোপে সমাজতন্ত্রের অবসান—এই ঘটনাগুলোকে পুঁজিবাদী প্রচারণা যন্ত্র ব্যবহার করেছে ‘ইতিহাসের সমাপ্তি’ হিসাবে ঘোষণার জন্য। বলা হয়েছে—মার্ক্সবাদ ব্যর্থ, সমাজতন্ত্র অচল, কমিউনিস্ট পার্টির আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই। কিন্তু তাতে করে ইতিহাসকে সেখানেই থামিয়ে রাখা যায়নি। বরং এই সময়েই পুঁজিবাদের গভীর সংকট আরও উন্মোচিত হয়েছে। বিশ্বব্যাপী সম্পদের কেন্দ্রীভবন, বৈষম্যের চরম বিস্তার, যুদ্ধ ও সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন, পরিবেশ ধ্বংস, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা—সবকিছু মিলিয়ে মানবসভ্যতাই আজ প্রশ্নের মুখে। এই বাস্তবতাই আবার নতুন করে মার্ক্সবাদী বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে নিয়ে এসেছে। শ্রেণি বিভাজন আজ বিলুপ্ত হয়নি, বরং আরও তীব্র হয়েছে। শ্রমের শোষণ নতুন নতুন রূপ নিয়েছে। পুঁজির চরিত্র বদলেছে, কিন্তু পুঁজির মৌলিক প্রবণতা বদলায়নি। ফলে শ্রেণি সংগ্রামও শেষ হয়ে যায়নি। এই সংগ্রামকে রাজনৈতিক রূপ, সংগঠিত রূপ এবং দিশা দেওয়ার দায়িত্ব আজও কমিউনিস্ট পার্টির কাঁধেই এসে পড়ে। বর্তমান বাস্তবতা থেকে মুক্তির কোনো পথ যদি থাকে, তা সমাজ ব্যবস্থার মৌলিক রূপান্তরের মধ্য দিয়েই সম্ভব। আর সেই রূপান্তরের তাত্ত্বিক ভিত্তি ও রাজনৈতিক বাহন হিসেবে কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা আজও প্রাসঙ্গিক।
কমিউনিস্ট পার্টির ভবিষ্যৎ তাই কোনো বিমূর্ত কল্পনার বিষয় নয়। এই ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শ্রেণিভিত্তিক অবস্থান, জনগণের সঙ্গে তার সম্পর্ক, আত্মসমালোচনার ক্ষমতা, তত্ত্ব ও বাস্তবতার সৃজনশীল প্রয়োগ এবং সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সামর্থ্যের ওপর। কমিউনিস্ট পার্টি যদি নিজেকে জনগণের জীবনের বাস্তব সমস্যার সঙ্গে যুক্ত রাখতে পারে, যদি সে তার বিপ্লবী চরিত্র অটুট রেখে নতুন বাস্তবতার আলোকে নিজের কৌশল ও কর্মপদ্ধতি বিকশিত করতে পারে, তাহলে কমিউনিস্টরাই এদেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করবে। এই অর্থেই অশোক মিত্রের কথাটি আজও সত্য—মার্ক্সবাদের যদি কোনো ভবিষ্যৎ না থাকে, তবে ভবিষ্যতেরই কোনো ভবিষ্যৎ নেই।
এ অঞ্চলে কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠার একশ বছরে তাই পার্টির স্বকীয় চরিত্র, দর্শন ও লক্ষ্যকে ধারণ করেই ভবিষ্যতকে নির্মাণ করতে হবে। আমাদের জন্মের ইতিহাস, লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা সেই নির্মাণের ভিত্তিভূমি হিসেবেই থেকে যাবে।
মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।
আপনার মন্তব্য