আজ সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬

Advertise

বন্ধুত্ব হোক তাৎপর্যময়

শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ  

মানুষ একা বাস করতে পারে না। সভ্যতার আদিলগ্ন থেকে এই রীতি চলমান। চলমান এই রীতির ধারাবাহিকতায় আধুনিক যুগে মানুষকে সমাজে বাস করতে হয়। কারও না কারও সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হয়। সামাজিক জীবনে যে সম্পর্ক সবচেয়ে নিরাপদ এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্বার্থহীন, সেই সম্পর্কটির নাম বন্ধুত্ব। এটি এমন একটি বন্ধন, যেখানে থাকে ভালোবাসা, আবেগ এবং বিশ্বাস। জীবন যাপনের জন্য বন্ধুত্বের বন্ধন একাধারে তাৎপর্যময়, বিশ্বাসী, দায়িত্ববান—যার উপর ভরসা করা যায় নিশ্চিন্তে।

সময়ের সাথে সাথে আমাদের জীবনে প্রতি নিয়ত বিভিন্ন ধরণের পরিবর্তন আসছে। আমরা আধুনিকতার ধাপ পেরিয়ে অত্যাধুনিক হচ্ছি। আসাদের যাপিত জীবন ক্রমশ যন্ত্র নির্ভর হচ্ছে। আমাদের মাঝে এমন অনেকেই আছেন যারা, মানুষের সান্নিধ্য থেকে যন্ত্রের সাহচর্য বেশি পছন্দ করছেন। জীবনে যতো বেশি যন্ত্রের প্রভাব বাড়বে, মানুষ ততো বেশি অমানবিক হয়ে উঠবে এবং সেটাই স্বাভাবিক। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের জীবনে মানবিকতা টিকিয়ে রাখতে বন্ধুর ভূমিকা অপরিহার্য। আর সেই কারণেই বছরের বিভিন্ন সময়ে এমন কিছু দিবস পালন করা হয়, যেটির মূল উদ্দেশ্য থাকে বন্ধুত্বকে টিকিয়ে রাখা।

ইতিহাস পাঠে জানা যায়, ঊনবিংশ শতাব্দীর ত্রিশ থেকে চল্লিশের দশকের মধ্যবর্তী সময়েই বন্ধু দিবস পালনের রীতি শুরু হয়। ১৯৫৮ সালের ২০ জুলাই ওয়ার্ল্ড ফ্রেন্ডশিপ ক্রুসেডের প্রতিষ্ঠাতা ড. আর্তেমিও ব্রেঞ্চো বন্ধুদের সঙ্গে প্যারাগুয়ের পুয়ের্তো পিনাসকোতে এক নৈশভোজে প্রস্তাব উত্থাপন করেন। সেই রাতেই ওয়ার্ল্ড ফ্রেন্ডশিপ ক্রুসেড প্রতিষ্ঠা পায়। এই প্রতিষ্ঠানটি ৩০ জুলাই বিশ্বব্যাপী বন্ধু দিবস পালনের জন্য জাতিসংঘে প্রস্তাব পাঠায়। প্রায় পাঁচ যুগ পর ২০১১ সালের ২৭ জুলাই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ৩০ জুলাইকে বিশ্ব বন্ধু দিবস হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির সঙ্গে এই দিন উদযাপন বিশাল আকার ধারণ করে। ধারণা করা হয় ১৯৩৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এই দিন উদযাপন শুরু হয়। পরে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে যায়। ১৯৩৫ সালে আমেরিকার সরকার এক ব্যক্তিকে হত্যা করে। দিনটি ছিল আগস্টের প্রথম শনিবার। হত্যার প্রতিবাদে পরের দিন ওই ব্যক্তির এক বন্ধু আত্মহত্যা করেন। সে সময় বিষয়টি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। এরপর থেকে জীবনের নানান ক্ষেত্রে বন্ধুত্বের অবদান আর তাঁদের প্রতি সম্মান জানানোর লক্ষ্যেই আমেরিকান কংগ্রেস ১৯৩৫ সালে আইন করে আগস্ট মাসের প্রথম রবিবারকে বিশ্ব বন্ধু দিবস ঘোষণা করে।

বছরের শেষ সপ্তাহে যখন নতুন বছরের আগমনকে স্বাগত জানানোর আয়োজন করা হয়, তখন বন্ধুদের সাথে যোগাযোগের জন্য ২৮ ডিসেম্বর তারিখটি নির্ধারণ করা হয়। পশ্চিমারা এই দিনটির নাম দিয়েছেন 'কল অ্যা ফ্রেন্ড ডে'। এদিনটি বন্ধুকে কাছে ডাকার দিন। নাগরিক বিষাদ আর ব্যস্ততার জাঁতাকলে প্রিয় বন্ধুর খোঁজ নিতে, তাঁকে আপন মহিমায় মহিমান্বিত করার দিন। একটা সময় যোগাযোগের মাধ্যম ছিল চিঠি। বিভিন্ন দিবসে বা অনুষ্ঠানে একে অপরকে চিঠি লিখতেন, ভিউ কার্ড পাঠাতেন। প্রযুক্তির যুগে সেই প্রথা এখন আর নেই। বাংলাদেশে মোবাইল ফোন সেবা চালু হয় ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে। তখন এটি সহজলভ্য ছিল না। মূলত ১৯৯৭ সালে গ্রামীণফোন-এর মাধ্যমে এটি ব্যাপকতা লাভ করে। এরপর ২০০৪ সালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে 'ফেসবুক' সামনে আসে।

'ফেসবুক'-এর প্রচলনের পর দেখা যায়, মানুষ ল্যান্ডফোন কিংবা মোবাইল ফোনে কথা বলার চেয়ে ফেসবুককে প্রাধান্য দিতে শুরু করছে। ২০১৪ সাল নাগাদ দৃশ্যপটে আসে ব্যাপক পরিবর্তন। দেখা গেছে, ৫০ বছরের নিচে যারা আছেন, তারা পারস্পরিক যোগাযোগে কথা বলার চেয়ে টেক্সট করতে বেশি পছন্দ করছেন। ফলে যোগাযোগটি থাকলেও জোরালো হচ্ছে মানুষের বিচ্ছিন্নতা। আর এমন প্রেক্ষাপটে ২০১৮ সালে প্রথম পালিত হয় 'কল অ্যা ফ্রেন্ড ডে'। যে বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছে তাকে ফোন করে, তাঁর খোঁজ নিতেই দিনটির প্রচলন। বিভিন্ন গবেষণা বলছে, ইন্টারনেট যোগাযোগে এনেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। তরুণরা ফোনে কথা বলার চেয়ে টেক্সট করতে বেশি আগ্রহী হচ্ছেন। ফলে কমছে মুখোমুখি কথা বলার প্রবণতা। এই অবস্থা ঘুচিয়ে কাজের ফাঁকে বন্ধুকে ফোন করে কথা বলতে আগ্রহী করে তুলতে 'কল অ্যা ফ্রেন্ড ডে'—ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, ভালো বন্ধু মানসিক চাপ কমাতে, সুখ ও নিরাপত্তা বোধ বাড়াতে এবং আবেগিক স্থিতিশীলতা আনতে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের শক্তিশালী বন্ধুত্ব আছে তাদের উচ্চ রক্তচাপ, বিষণ্ণতা ও হৃদরোগের ঝুঁকি কম থাকে এবং তারা তুলনামূলকভাবে দীর্ঘজীবী হয়। বন্ধুত্ব সামাজিক দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস ও আত্ম-মর্যাদা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে; শৈশবে ভালো বন্ধু থাকলে তা ভবিষ্যতের মানসিক ব্যাধি প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে। বহুদিন পর প্রিয় বন্ধুর চিরচেনা গলার স্বর মনকে জাগিয়ে তুলে, মনে করিয়ে দিতে পারে অতীত দিনের সুখস্মৃতি। শুধু তাই নয়। বন্ধুত্ব একাকীত্ব দূর করে। বন্ধুত্বের মাধ্যমে সামাজিক সম্পর্ক তৈরি হয়, যা সামাজিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আমাদের প্রত্যেকের জীবনে এমন কিছু অধ্যায় থাকে, যা শুধু বন্ধুকেই বলা যায়। বন্ধুর সঙ্গে কথা বলে নিজেকে হালকা করে নেয়া যায়। পৃথিবীর নিষ্পাপ সম্পর্কের নাম 'বন্ধুত্ব'। সৃষ্টির শুরুতে বন্ধুত্ব ছিল, এখনও আছে, থাকবে অনন্তকাল। আত্মার আত্মীয় বন্ধুর সাথে এই সম্পর্ক প্রতিদিন সমান গুরুত্বের হলেও বন্ধুকে কিছুটা আলাদা করে মূল্যায়ন করার জন্য পালিত হয়ে আসছে 'কল অ্যা ফ্রেন্ড ডে'। বন্ধুত্বের অবদানকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়া বাঞ্ছনীয়। আমরা যেন ভুলেও ভুলে না যাই, বন্ধুত্বের তাৎপর্য।

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অধ্যাপক ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী ৪৮ অধ্যাপক ডা. শেখ মো. নাজমুল হাসান ২৮ অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১১ আজমিনা আফরিন তোড়া ১০ আনোয়ারুল হক হেলাল আফসানা বেগম আবদুল গাফফার চৌধুরী আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ৩২ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল ১০ আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১৮ আরিফ রহমান ১৬ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৫৪ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইনাম আহমদ চৌধুরী ইমতিয়াজ মাহমুদ ৭৩ ইয়ামেন এম হক এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন একুশ তাপাদার এখলাসুর রহমান ৩৭ এনামুল হক এনাম ৫৪ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৭৮ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান কেশব কুমার অধিকারী খুরশীদ শাম্মী ১৮ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ৪৪ জহিরুল হক মজুমদার জাকিয়া সুলতানা মুক্তা জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুনাইদ আহমেদ পলক জুয়েল রাজ ১২১ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ১২ ড. কাবেরী গায়েন ২৩ ড. নাদিম মাহমুদ ৩৮ ড. মাহরুফ চৌধুরী ১২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ড. শামীম আহমেদ ৪৫ ডা. আতিকুজ্জামান ফিলিপ ২০ ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন ১০ তানবীরা তালুকদার তোফায়েল আহমেদ ৩২ দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৭ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক প্রফেসর ড. মো. আতী উল্লাহ ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬২ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৪৪ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার জাকির হোসেন ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৮ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১৯৪ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১৫৩ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক ১৪ রণেশ মৈত্র ১৮৩ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ৫৫ রাজু আহমেদ ৪৩ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩৮ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর