টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
Advertise
ফরিদ আহমেদ | ২৭ জানুয়ারী, ২০২৬
ঢাকার ফুটবলে এক সময় দাপট দেখিয়ে খেলতেন শামীম আজাদ। মেধাবী ফুটবলার ছিলেন না তিনি। কিন্তু, একাগ্রতা, একনিষ্ঠতা আর প্রচণ্ড পরিশ্রম দিয়ে সেই ঘাটতি পুষিয়ে নিয়েছিলেন তিনি। তাঁর স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশের জাতীয় দলের জার্সি গায়ে দিয়ে সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ খেলা। বাংলাদেশের প্রিমিয়ার লীগে ম্যাচ ফিক্সিং এর যে নোংরামি চলে, সেটার সাথে আপোষ আর জাতীয় দলে ঢোকার জন্য প্রয়োজনীয় তোষামোদি না করতে পারার কারণে তাঁর সেই স্বপ্ন অধরা থেকে যায়। ফুটবল খেলা থেকে একদিন অবসর নেন তিনি। তবে, ফুটবলকে ছাড়েন না। ওটাই তাঁর ধ্যান, জ্ঞান আর সাধনা। কোচ হিসাবে কাজ করা শুরু করেন তিনি।
খেলোয়াড় হিসাবে তিনি যেমন আলাদা ছিলেন, কোচ হিসাবেও নিজেকে ব্যতিক্রমী একজন হিসাবে প্রমাণ করেন তিনি। প্রতিষ্ঠিত এবং প্রস্তুত খেলোয়াড় নিয়ে দল গঠনের চেয়ে স্কাউট হান্টিং করে সম্ভাবনায় খেলোয়াড় খোঁজার দিকে মনোযোগ দেন। এর জন্য চষে বেড়াতে থাকেন তিনি সারা দেশ।
এই অনুসন্ধানের ফলশ্রুতিতেই একদিন তিনি পেয়ে যান সমর কুমার চাকমাকে। সমর রাঙ্গামাটির ছেলে। দরিদ্র এক পরিবারে জন্ম তার। মা নেই, বাবা অপ্রকৃতিস্থ। পড়াশোনা করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। এই মিডফিল্ডারের মধ্যে অমিত এক সম্ভাবনাকে আবিষ্কার করে শামীম আজাদ তাকে নিয়ে আসে ঢাকায়। দূর থেকে ভালোলাগার শান্তিপ্রিয়া, যাকে ধর্ষণ করেছে এক বখাটে বাঙালি, সেই শান্তিপ্রিয়ার মুখকে স্মৃতিতে গুঁজে ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুকে গেঁথে সমর পা রাখে ঢাকায়। পদতলে একদিন মাটি কাঁপাবে, এটাই স্বপ্ন তার। শামীম নিজে থাকে তার বড় বোনের বাড়ি মগবাজারে। সেখানে সমরকে এনে রাখে সে। সুযোগ করে দেয় প্রিমিয়ার লীগের দল মহানগর ক্রীড়াচক্রে, যেটার কোচ শামীম নিজেই।
এই পর্যন্ত যেটুকু আছে এই উপন্যাসে তাতে নতুনত্ব কিছু নেই। এই ধরনের উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে মতি নন্দী লিখে রেখে গেছেন অজস্র। আমাদের এই অঞ্চলে খেলাধুলাকে আমরা বিশুদ্ধ রাখতে পারি নাই কখনোই। এখানে খেলার সাথে জড়িয়ে আছে দুর্নীতি, আছে প্রতারণা আর মিথ্যা প্রতিশ্রুতি। খেলাতে রয়েছে ম্যাচ ফিক্সিং, আছে ব্যক্তি স্বার্থ এবং স্বজনপ্রীতিও। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাজনীতিও যুক্ত হয়ে যায় খেলার সাথে। একজন খেলোয়াড়কে তাই শুধুমাত্র প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধেই খেলতে হয় না। নোংরা একটা পরিবেশও ভয়ংকর এক প্রতিপক্ষ হয়ে তার সামনে এসে দাঁড়ায় শক্ত ট্যাকল করা ডিফেন্ডারের মতো। এই সমস্ত প্রতিকূলতাকে পেরিয়ে গল্পের প্রধান চরিত্র শেষ পাতায় গিয়ে বিজয়ী হবে, এটাই হচ্ছে এই ধরনের উপন্যাসের ছকে বাঁধা পরিণতি। এই পরিণতিতে যাবার আগে রক্ত নাচানো রোমাঞ্চ থাকে, আর একেবারে শেষ মুহূর্তে থাকবে চূড়ান্ত উত্তেজনা। এতে নতুনত্ব কিছু নেই, নেই কোনো গভীরতাও।
যাঁরা সুহান রিজওয়ানের প্রথম উপন্যাস ‘সাক্ষী ছিল শিরস্ত্রাণ’ পড়েছেন, তাঁরা অবশ্য ভালো করেই জানেন এই ছক বাঁধা রাস্তায় হাঁটার মানুষ তিনি নন। সুহান তাঁর এই উপন্যাসেও সেই পথে হাঁটেন না। সমর চাকমা এখানে উপলক্ষমাত্র, উপন্যাসের মূল চরিত্র সে না। এই উপন্যাসের মূল চরিত্র আসলে কোনো ব্যক্তি নয়, বরং বিশেষ একটা অঞ্চল, একটা জনপদ। বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চল আর সেখানকার জনগোষ্ঠীই সুহানের এই উপন্যাসে মূল চরিত্র হিসাবে উঠে এসেছে।
সমর চাকমাকে রাঙামাটি থেকে ঢাকায় এনেছেন সুহান। এর বিপরীতে কোচ শামীমের ভাগ্নে আরিফ আর তাঁর ইতিহাস সচেতন এবং সংবেদনশীল পড়ুয়া বন্ধু হিমেলকে পাঠিয়েছে রাঙামাটিতে। এদের চোখ দিয়ে পুরো পার্বত্য জনপদের ইতিহাসকে সুহান উন্মোচন করেছেন পাঠকের সামনে। তিনি অবশ্য শুধু ইতিহাসেই সীমাবদ্ধ থাকেন নাই, অতীতের সাথে সাথে বর্তমানকে চিত্রায়ন করেছেন বলিষ্ঠ ভাবে।
বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চল এবং এর জনপদ বাঙালিদের জন্য বিশাল এক ব্লাইন্ড স্পট। এখানে সবাই বেড়াতে যায় আনন্দের জন্য, অবকাশের প্রয়োজনে। কিন্তু, পাহাড়ের কান্না তারা শোনে না, এই জনপদের আর্তনাদ তাদের কানে পৌঁছায় না। বাতাসের ভারি দীর্ঘশ্বাসকে উপেক্ষা করে দিব্যি তারা বিচরণ করে বিপন্ন ভূমিতে, বিধ্বস্ত জনপদে। অথচ এই ভূমিকে বিপন্ন করার, এই জনপদকে বিধ্বস্ত করার ক্ষেত্রে সমতলের বাঙালিদের ভূমিকাই মুখ্য। এ ক্ষেত্রে কারো সরাসরি ভূমিকা রয়েছে, কারো ভূমিকা অপ্রত্যক্ষ।
ষাটের দশকে সমতলকে আলোকিত করতে গিয়ে জলমগ্নতায় ডুবে গিয়েছিলো পার্বত্য ভূমি। জলবিদ্যুৎ উৎপন্ন করার প্রয়োজনে বাধ দিয়ে একটা শত শত বছরের জনপদকে জলের নীচে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিলো পাকিস্তান আমলে। সেই ধাক্কাকে তারা সামাল দিতে পারেনি। স্বাধীন বাংলাদেশে এসেও তারা নিজেদের প্রাপ্য দাবি-দাওয়ার কোনো মূল্যায়ন তারা পায়নি। বরং সবাই বাঙালি হয়ে যাও এই আহবান তারা শুনেছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো নেতার কাছ থেকে। নিজস্ব অধিকার আদায় এবং জাতিগত পরিচয় টিকিয়ে রাখতে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলো তারা। গড়ে তুলেছিল শান্তিবাহিনী নামের একটা সামরিক বাহিনী। শান্তিবাহিনীকে ঠেকাতে বাংলাদেশের আরেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান মানব ঢাল গড়ে তোলার জন্য পাহাড়ে বাঙালিদের বস্তি গড়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। এই বাঙালিদের বেশিরভাগই ছিল অশিক্ষিত, ধর্মান্ধ আর অপরাধপ্রবণ। এরা পাহাড়ে গিয়ে পাহাড়ি মানুষদের ঘৃণার চোখে দেখেছে। প্রশাসন আর সামরিক বাহিনীর সমর্থন নিয়ে অত্যাচার আর নিপীড়ন করেছে তাদের উপরে। পুড়িয়ে দিয়েছে তাদের ঘরবাড়ি, হত্যা করেছে তাদের, কখনো কখনো ধর্ষণও করেছে পাহাড়ি মেয়েদের। পাহাড়িদের দীর্ঘকালের যে আলাদা একটা জীবনযাত্রা, যেটার সাথে প্রকৃতি অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত, সেটাকেও কলুষিত করেছে এরা। ফলে, নিজভূমেই পরবাসী হয়েছে পাহাড়িরা।
শান্তিচুক্তির মাধ্যমে পাহাড়ে রক্তপাত আর হানাহানি বন্ধ হলেও, নতুন করে স্থানীয় নানা উপদলের সৃষ্টি হয়েছে। সবারই এক লক্ষ্য। পার্বত্য ভূমির অধিকার নেওয়া। এই অধিকার নেওয়াতে সেনাবাহিনীরও বড় ধরনের ভূমিকা রয়েছে। পাহাড়িদের জোরপূর্বক উচ্ছেদ করে সেখানে পর্যটনকেন্দ্র করা হয়েছে। পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ যাচ্ছে সমতল থেকে। এদের সৃষ্ট আবর্জনাতে নোংরা হচ্ছে নির্মল পাহাড়।
সুহান রিজওয়ানের উপন্যাস ‘পদতলে চমকায় মাটি’ এর সবকিছুকে ধরতে চেয়েছে। এর জন্য সুহানকে নিশ্চিতভাবেই অসংখ্য বই পড়তে হয়েছে। বইয়ের পিছনের এর একটা তালিকাও দেওয়া আছে। আমার ধারণা সুহান খুব সম্ভবত নিজেও ওই অঞ্চলে ঘোরাঘুরি করেছেন, নানা ধরনের মানুষের সাথে কথা বলেছেন তাঁর উপন্যাসের রসদ সংগ্রহের জন্য।
গবেষণার এই বাহুল্যের কারণে কিছু পাঠকের কাছে এই উপন্যাস সর্বশ্রেণির পাঠকের কাছে সেভাবে আদৃত নাও হতে পারে। যাঁরা হালকা ধরনের লেখা পড়তে অভ্যস্ত, তাঁদের কাছে এটা কষ্টকর পাঠ হবে। কিন্তু, সিরিয়াস পাঠক আবার লুফে নেবেন এই বই। সত্যি কথা বলতে আমার নিজের কাছেই মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিলো উপন্যাস পড়ছি, নাকি পার্বত্য চট্টগ্রামের উপরে লেখা গবেষণালব্ধ একটা নন-ফিকশন পড়ছি? এইটুকু সীমাবদ্ধতা বাদ দিলে, এটা একটা অসাধারণ উপন্যাস। আগেই বলেছি, পার্বত্য চট্টগ্রামের জনপদ বাঙালিদের ব্লাইন্ড স্পট। ওই জনপদ বাঙালিদের চেয়ে এতইটা আলাদা যে সেটাকে বিশেষ আগ্রহের সাথে দেখা প্রয়োজন। সেটা করতে গেলে পড়াশোনা করা লাগে, নিজের মনকে মুক্ত করা লাগে। সেই সাথে লাগে বিশেষ সংবেদনশীলতা এবং ভিন্ন সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাবোধ। বাংলাদেশে বাঙালির সংখ্যাগরিষ্ঠতা এতো বেশি যে তারা এই ক্ষুদ্র জনপদের জন্য আলাদা পরিশ্রম করতে রাজি নয়। যে কারণে এটাকে তারা চোখের আড়ালে রেখে দিয়েছে। এই জন্য বাংলাদেশের সাহিত্য এবং সংস্কৃতিতেও এদের কোনো উপস্থিতি আপনি দেখবেন না। সেই অনভিপ্রেত অনুপস্থিতির মধ্যে সুহানের উপন্যাসে তাদের উজ্জ্বল এবং কেন্দ্রিক উপস্থিতি আনন্দদায়ক যেমন, একই সাথে স্বস্তিরও।
মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।
আপনার মন্তব্য