টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
Advertise
জুয়েল রাজ | ১১ মার্চ, ২০২৬
যুক্তরাজ্যে স্থায়ী নাগরিক বা ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী ছাড়া যারা ওয়ার্ক পারমিট বা অন্যান্য ভিসায় দেশটিতে বসবাস করেন, তাদের আগে একটি বায়োমেট্রিক রেসিডেন্স কার্ড (BRP) দেওয়া হতো। এই কার্ডটি ছিল দেশটিতে বসবাসের বৈধতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণপত্র। ২০২৫ সালের শেষ দিক থেকে এবং ২০২৬ সাল থেকে ধীরে ধীরে সেই কার্ডের পরিবর্তে যুক্তরাজ্য সরকার চালু করেছে ডিজিটাল ইমিগ্রেশন স্ট্যাটাস, যেখানে ব্যবহার করা হচ্ছে একটি শেয়ার কোড। এখন আর কোথাও কার্ড প্রদর্শনের প্রয়োজন হয় না। নির্দিষ্ট একটি শেয়ার কোড দেখালেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ইমিগ্রেশন তথ্য সরকারি ওয়েবসাইটে ছবিসহ দেখা যায়।
কিন্তু এই নতুন ব্যবস্থাই বাংলাদেশের বিমানবন্দরে অনেক প্রবাসী যাত্রীর জন্য নতুন ধরনের বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ যখনই যুক্তরাজ্যের কোন যাত্রী লাগেজ-ব্যাগেজসহ পরিবার পরিজনকে বিদায় জানিয়ে বোডিং পাসের জন্য লাইনে দাঁড়ান তখনই শেয়ার কোডটি দেখতে চাওয়া হয় এবং এটাই নিয়ম। প্রবাসী যাত্রীরা সেই শেয়ার কোডের ছবিটা দেখান অথবা মুখে বলেন। কিন্তু কর্মকর্তা যখন সেই কোডটি লাইভ দেখাতে বলেন, মানে সেই যাত্রীকে সেই মুহূর্তে তার অ্যাকাউন্টে লগইন করে দেখাতে বলা হয়।
প্রথমত অনেক যাত্রী থাকেন যাদের আইটি দক্ষতা নেই। অনেকের আছে বাংলাদেশি সিম কার্ড নেই মোবাইলে, সেই ক্ষেত্রে তার পক্ষে লগইন করার সুযোগ নেই, অথবা বাংলাদেশি সিম, মোবাইল সবই আছে কিন্তু নেটওয়ার্কের কারণে লগইন করতে পারে না।
গত ৫ মার্চ ঢাকা লন্ডন ফ্লাইটে সেই বিড়ম্বনার সাক্ষী ছিলাম আমি নিজে। আমার সামনেই ছিলেন এক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, পাশের লাইনে ছিলেন এক তরুণ আইনজীবী এবং পিছনে এক বয়স্ক ভদ্রলোক, যিনি বাসা থেকে লিংকসহ কাগজটি প্রিন্ট করে নিয়ে এসেছেন। কিন্তু সামনে দাঁড়ানো কর্মকর্তাটি বারবার লাইভ কোড চাইছিলেন। এবং এই যাত্রীদের কেউ নেটওয়ার্কের অভাবে, কেউ আইটি দক্ষতার অভাবে সেটি পারছিলেন না। এবং অতীতে কখনো এই কোডটি লাইভ দেখতে চাওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন। কিন্তু টেবিলের অন্যপাশের কর্মকর্তারা ছিলেন অনড়। যাত্রীরা বলছিলেন, এটি আপনাদের দায়িত্ব, আপনারা চেক করে দেখুন আমার দেয়া তথ্য বা কোড ভুল না সঠিক। যদিও দীর্ঘ বাগবিতণ্ডার পর উনারা করুণা করে, যাত্রীদের সাহায্য করছেন বলে সেই যাত্রা উদ্ধার করে দিলেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এই শেয়ার কোড যাচাইয়ের নিয়ম হচ্ছে যাচাইকারী কর্মকর্তার।
এখানেই শেষ নয়, দ্বিতীয়বার বিমানে উঠার মুখে ও সেই কোড যাচাই করা হয়। লাইনে দাঁড়ানো চার জনের সাথে কথা বলে জানলাম সবাই এর ভুক্তভোগী। আমি ও আমার এক বন্ধু এক সাথে ফিরব বলে লাগেজ নিয়ে দাঁড়ালাম একজনের লাগেজ ওজন কয়েক কেজি বেশি, অন্যজনের লাগেজের ওজন আবার কম। দুইটা লাগেজ একসাথে ওজন করার অনুরোধ করলেও কর্মকর্তা সেটি নাকচ করে দেন। তার সামনেই আমরা এক লাগেজ থেকে অন্য লাগেজে কিছু কাপড়চোপড় অদলবদল করলাম, তারপর তিনি লাগেজ ছাড়েন। এতে করে দীর্ঘ লাইনে ১০ থেকে ১৫ মিনিট সময় নষ্ট হয়। আমরা যেহেতু লাইনে ছিলাম তখন তিনি অন্যযাত্রীকেও সেবা দিতে পারছিলেন না।
আবার একই জিনিস গত মাসে ভারতে আবার ভিন্ন অভিজ্ঞতা ছিল। বড় একটি গ্রুপের একজনের লাগেজের ওজন বেশি হওয়াতে, দায়িত্বরত কর্মকর্তা বললেন আপনাদের সবার লাগেজ এক সাথে দিয়ে দেন তাতে করে ব্যালেন্স হয়ে যেতে পারে, এবং নিজ উদ্যোগেই তিনি সেটি করলেন। প্রবাসী হেল্প ডেস্কের কর্মচারীরা দেখলাম বেশ সচল আছেন, কী কাজ জানি না তবে তাদের সক্রিয়তা চোখে পড়েছে।
২
একই অবস্থা বিমানের টিকেটের; গত মাসের ২২ তারিখ আমি বাংলাদেশ বিমানে লন্ডন থেকে সিলেট যাই। সেই টিকেট আমি বাংলাদেশ থেকে ভোররাতে কনফার্ম করি, মানে বাংলাদেশে তখন ২২ তারিখ সকাল ১০টা প্রায়, লন্ডন সময় তখন ভোর। কিন্তু এর আগে অনলাইনে বা থার্ডপার্টি ওয়েবসাইটগুলোতে বিমানের কোন টিকেট ছিল না। কিন্তু ম্যাজিকের মত বাংলাদেশের এক ট্রাভেল ব্যবসায়ী আমাকে টিকেটটি সংগ্রহ করে দিলেন। যদিও মধ্যপ্রাচ্যের এয়ারলাইন্সের চেয়ে দাম ছিল বেশি। কিন্তু অবাক করার বিষয় হলো, বিমানে উঠে দেখি অর্ধেক বিমানই খালি। পিছনের পুরো ব্লক শূন্য ছিল একজন যাত্রীও ছিল না। বাকি সিটেও অনেকেই শুয়ে-ঘুমিয়ে গেছেন। অথচ বিমানের টিকেটের ক্রাইসিস সব সময় লেগেই থাকে। আর দাম থাকে আকাশচুম্বী, চাইলেও অনেকে এই উচ্চমূল্যের কারণে বিমানে ভ্রমণের লোভ সংবরণ করতে বাধ্য হন। নিজের সাধ্যের মধ্যে অন্য এয়ারলাইন্সের সেবা গ্রহণ করেন। বিমানের এই স্বেচ্ছাচারিতায় নিয়ে দশকের পর দশক ধরে আলোচনা হচ্ছে কিন্তু, বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধা যায়নি।
বিমানের সেবার মান নিয়েও একই কথা প্রযোজ্য। বিমানের ক্রুদের ব্যবহার এখনো আন্তর্জাতিক মানের হতে পারেনি। একেকজন ক্রু একেক ধরনের পোশাক পরেন, বিরিয়ানি-ভাতই একমাত্র খাবার। আসার সময় আমার পাশে বসা বিদেশি নাগরিক একবার খাবার নিয়েছিল, নিয়ে না খেতে পেরে পরে আর দুইবার মানা করে দিয়েছেন। খাবার ঢাকার জন্য ব্যবহার করা হয় ক্লিন ফিল্ম, সোজা বাংলায় বললে স্বচ্ছ পলিথিন। যেখানে অন্যান্য এয়ারলাইন্সগুলো, যারা প্রায় অর্ধেক পয়সায় টিকেট বিক্রি করে, তারা প্লাস্টিক কাভার ব্যবহার করে। খাবার মান ও পেশাদারত্বের জায়গায় শতগুণ এগিয়ে। ফ্লাইট অবতরণের এক ঘণ্টা আগেই, হেডফোন, কম্বল নেয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগে যায়। একেকজন যাত্রী দুইবার তিনবার করে হেডফোন বদল করতে হয়, কারণ হেডফোনগুলো ঠিকমত কাজ করে না। সবচেয়ে বড় কথা নির্ধারিত ফ্লাইট ২ ঘণ্টা পরে উড্ডয়ন করেছে। কারণ ত্রুটির জন্য বিমানের দরজা লাগানো সম্ভব হচ্ছিল না। ইঞ্জিনিয়ার এসে ঠিক করে দেয়ার পর বিমান ফ্লাইট করে। কিন্তু যাত্রীদের মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ বা ভীতি ছিল সার্বক্ষণিক।
৩
গত দুই দিন আগে বর্তমান বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা জনাব হুমায়ুন কবির লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরে নেমে যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত হাইকমিশনার আবিদা ইসলামের প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। ঘোষণাকালে পররাষ্ট্র উপদেষ্টার (প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা) পাশেই ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। পররাষ্ট্র উপদেষ্টার ঘোষণার পরদিন ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, হাইকমিশনার আবিদা ইসলামসহ কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রদূতদের প্রত্যাহার করে ঢাকায় বদলি করা হয়েছে।
সরকার যে-কোনো সময় যে-কোনো মিশন থেকে যে কাউকে প্রত্যাহার করতে পারে। কিন্তু লন্ডনের হাই কমিশনার প্রত্যাহারের ঘোষণা যেভাবে গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। তা খুবই আপত্তিজনক।
সরকার পরিবর্তন হলে সরকারের পছন্দসই লোকজন দেশে বিদেশে বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে নিয়োগ পাবেন এটা দোষের কিছু নয়। কিন্তু কাকে কোন প্রক্রিয়ায় সরানো হচ্ছে তার সঙ্গে দেশের ভাবমূর্তি জড়িত থাকে।
বাস্তবতা হলো, একজন হাই কমিশনার দেশের হয়ে কী কাজ করেন, সাধারণ প্রবাসীদের ৮০ ভাগ মানুষই জানেন না। বাকি ২০ ভাগ, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক সুশীল সমাজ হাই কমিশনের নানা বিষয়ে সম্পৃক্ত থাকেন। তাও সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে সেই তালিকা বদলে যায়।
সাধারণ মানুষ বুঝেন তাদের পাসপোর্ট, পাওয়ার অব এটর্নি অনুমতি এই কাজই করে হাই কমিশন। তারা বরং বাংলাদেশ বিমান নিয়ে বেশি ধারণা রাখেন। তারা চান বিমানে চড়ে বাংলাদেশে যেতে। অন্যান্য এয়ারলাইন্সের সমমূল্যে বা একটু বেশি হলেও বিমানের সেবা নিতে। টিকেট নেই, টিকেট নেই হাহাকার শুনতে চান না। এয়ারপোর্টে হয়রানি মুক্ত থাকতে চান। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে কর্তাসুলভ নয়, চান একটু সুন্দর আন্তরিক ব্যবহার।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা যেহেতু নিজেও প্রবাসী, বেসামরিক বিমান পর্যটন মন্ত্রী নিজে প্রবাসী না হলেও প্রবাসীদের সাথে সংশ্লিষ্ট, তাই এই সব অভিযোগ সমস্যা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। বাংলাদেশ বিমানের ইঁদুর ধরতে সমস্যা হওয়ার কথা না। পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যয়বহুল এয়ারলাইন্স সম্ভবত বিমান বাংলাদেশ। কিন্তু কখনো লাভের মুখ দেখে না। যুগে যুগে আমরা ক্ষতির গল্পই শুনে আসছি। তাই বিমানের ইঁদুর নিধন' জরুরি; হাই কমিশনার নয়।
জাতীয় এয়ারলাইন্স ও বিমানবন্দরের সেবার মান উন্নত হলে প্রবাসীরা সেটিকে সবচেয়ে বেশি স্বাগত জানাবেন। কারণ তাদের কাছে এটি শুধু একটি পরিবহন সেবা নয়, বরং দেশের সঙ্গে সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন।
মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।
আপনার মন্তব্য