আজ শুক্রবার, ০৮ মে, ২০২৬

Advertise

পাঠ বনাম পাঠ-সংখ্যা

রাজু আহমেদ  

বই পড়া বিষয়ে ভয়ংকর ভুলের সাথে চলা মধ্য তিরিশে ধরতে পেরে মনে হয় উপকারই হলো। এতদিন পঠিত বই সংখ্যায় বাড়িয়ে গর্ববোধ হতো। অমুকের লেখা পড়েছি, তমুক বই নিয়েছি, সংগ্রহ করেছি বিস্তর কিংবা আমার পড়া বইয়ের সংখ্যা তিনশো তেতাল্লিশ- আদতে কোনোই বাহাদুরির কথা নয়। বছর দেড়েক আগে পাঠ করা একখানা বই আজ সকালেই নেড়েচেড়ে দেখলাম। বইখানা যে নিশ্চয়ই পড়েছি সেটার চিহ্ন বইয়ের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় রেখে দিয়েছি। কোথাও আন্ডার লাইন করা, কোথাও ছোট্ট নোট লেখা। অথচ আবার পৃষ্ঠা দুই পড়ে কোনোভাবেই মনে করতে পারলাম না যে- বইখানা ইতোপূর্বে আমি পড়েছি। এমনকি আন্ডারলাইন করা লাইন কিংবা নোট রাখা সাইনের কথাও আমার মনে পড়ছে না।

পাঠক হিসেবে আমার মতো যারা গড়পড়তার মেধাবী, মনে রাখতে পারে কম তাদের আসলে পড়া বইয়ের সংখ্যা বাড়িয়ে ফায়দা হবে না। বরং কায়দা করে পাঠাভ্যাস সাজাতে হবে। নির্দিষ্ট বিরতির পর পঠিত বই রিভিশন দিতে হবে। মনে করে দেখুন, যে বই বেশি ভালো লাগে সে বই দুই-তিনবার পড়ে ফেলেছি । সিনেমা নাটকের ক্ষেত্রেও তো তাই হয়? ধর্মীয় গ্রন্থের একই পৃষ্ঠা, একই লাইন কিংবা একটি শব্দ একজীবনে যে কত শতবার পাঠ করেছি তার ইয়ত্তা আছে? প্রত্যেকবার আলাদা আবেগ, ভিন্ন অর্থ এবং নতুন ব্যাখ্যা। গল্প-উপন্যাস একবার পড়লেও হতে পারে কিন্তু কবিতা-ইতিহাস বারবার না পরলে রস আস্বাদন করা যায় না। লেখকের উদ্দেশ্য এবং সত্যের অনেকটাই অনাবিষ্কৃত থেকে যায়। যে পাঠ জীবন পাল্টানোর গল্প বলে তা হাজারবার পড়া যায়। পরীক্ষায় ভালো করতে যেমন একই বিষয়কে বারবার পড়ে-লিখে বোধগম্য করতে হয় তেমনি পাঠের মাধ্যমে পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় লুকিয়ে থাকা আলো অবলোকন করতে হলেও পুনঃপাঠের বিকল্প আছে বলে মনে হয় না।

জীবন বদলে দেওয়ার মতো শক্তি এক-দু'খানা বইয়ের মধ্যেও থাকতে পারে। একজীবনে যদি হাজারখানা বইও পঠিত হয় তবে তা যেন দ্বিতীয়বার পাঠের সময় মেলে। প্রথমবারের চাষের মাধ্যমে জমিন যেমন পুরোপুরি সোনা ফলানোর জন্য প্রস্তুত হয় না তেমনি বইয়ের ক্ষেত্রেও একবারের পাঠে সঠিক উপলব্ধি অজ্ঞাতে থেকে যেতে পারে। দক্ষ কৃষক মানেই একই জমি বারবার কর্ষণ করে বীজ বপন উপযোগী চাষের জন্য পূর্ণ প্রস্তুত করে। যেকোনো বইও পড়তে হবে না বোঝার পূর্ব পর্যন্ত। ছোট্ট চটি বই শিক্ষার্থীদের দিয়ে পড়ানো হয় বছরজুড়ে- নিশ্চয়ই এখানে ইশারা আছে। খুঁজতে এবং বুঝতে সময়টা লম্বা নিলে সেটা পোক্তভাবেই মস্তিস্কে গাঁথে। পড়ার উদ্দেশ্য যদি রস হয় তবে তা একবারে মিলতে পারে কিন্তু যদি শিক্ষা হয় তবে শব্দের গাঁথুনি খতিয়ে দেখতে হবে। সরাসরি কথা বলতে হবে লেখকের সাথে। যদি সে লেখক হাজার বছর আগে পৃথিবী ছেড়ে যায় তবুও তার পিছু নিতে হবে।

আমরা খুব কম পড়ি কিংবা পড়ার জন্য প্রাত্যহিক জীবন থেকে অল্প সময়ই বের করতে পারি। আমাদের গল্প করার অঢেল সময় মেলে। মোবাইলে ডুবে থাকার অপার অবকাশ-অবসর থাকে! গৃহের জন্য সব গহনা কিনি। অঙ্গের জন্যে সংগ্রহ করি নানা অলংকার। অথচ মস্তিষ্কের আবরণ যে চিন্তায় গঠিত হয়ে সে চিন্তা সংগ্রহের জন্য কিতাব কিনি না। বইয়ের পেছনে অর্থের খরচ অপচয় মানতেও দ্বিধা করি না! কারো কারো ঘরে খানকয়েক বই থাকলেও সেগুলোর অঙ্গ জুড়ে ঢাকা ধুলোময়লার দুনিয়া। কোনো কোনো রুচিশীলের ঘরের দেয়ালে দেয়ালে অবশ্য আজকাল বইয়ের তাক থরে থরে থাকে। এসব দেখিয়ে আগন্তুকদের মনে তাক লাগিয়ে দেওয়া যায়/হয় আর-কি! পাঠের রূপরেখার আলোচনায় আজ এসব ভিন্ন আলাপ থাক না-হয়!

ব্যক্তিভেদে পড়ার ধরণ ভিন্ন রকম। রুচি-পছন্দও অন্যরকম। আমি কেবল আমার পড়ার পদ্ধতির ত্রুটিগুলো বলেছি। পঠিত বইয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি দিকে জোর দিয়ে আমি বোধহয় পাঠের উদ্দেশ্য থেকেই বিচ্যুত হয়েছি। তবে সঠিক-বেঠিকের চূড়ান্ত রায় এখনই দিচ্ছি না। তড়িৎ বইয়ের পাতায় চোখ ফেলে উল্টিয়ে যাওয়ায় মাথা খালি রয়ে গেছে- এইটুকু বুঝতে পেরেছি বেশ ভালোভাবে। লাইনের মাঝে যে লাইন সেটাকে খুঁজে বের করতে হলে ধীরে চলতে হবে। পুরনো প্রেমিকার মতো বারবার ফিরে ফিরে আসতে হয় চেনা পথে। মন টানে। নতুন গন্ধের মলাটবদ্ধ বই সাময়িক নেশা ধরাতে পারে বটে কিন্তু জীবনের পাঠে শেখায় কম। আগেও বলেছি, সব রকমের বইয়ের ক্ষেত্রে এই তত্ত্ব খাটবে না। ফিকশন একবার পড়লেও হয়, উপন্যাসের পৃষ্ঠায় ঘোড়সওয়ার হওয়া যায় কিন্তু কবিতার লাইন পুনরাবৃত্তি চায়। সেখানে বিচরণ করতে হয় সাবধানে, অতি সন্তর্পণে।

গড় মেধাবীদের পাঠাভ্যাসের ধরণ পরিবর্তন করলে আশা করি ভালো ফল মিলবে। যে বইটা এই বৈশাখে শেষ হয়েছে সে বইটা আসছে বছরের শরতে আরেকবার হাতে নিলে পূর্বেকার চেয়ে পাঠের সময় কম লাগবে কিন্তু প্রাপ্তির পাঠ লম্বা হবে। সংখ্যা তো মান নির্ধারণ করতে পারে না। পড়ার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা হতে হয় নিজের সাথে। জগতের কোনো কোনো মনীষীর জীবন বদলেছে মাত্র একখানা কিংবা কয়েকখানা বই পড়ে। কেউ কিংবা কোনো জাতি কি বই ছাড়া, কালো অক্ষরের আলো ছাড়া নিজেকে চিনতে, ভাগ্য বদলাতে পেরেছে? মুশকিল হলো, সেই যুতসই বইখানা পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য একটা দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে হয়। পড়তে হয়। ভাবতে হয় বিস্তর। পড়লে জীবনবোধ পাল্টায়। যে পড়া প্রশ্ন করা শেখায় সেই বোধই বোধহয় উত্তর খুঁজতে চিত্তকে তাড়িত করে। না পড়ে নিজে বদলে যাব এবং দুনিয়া বদলে দেবো- তা নাস্তি! পড়ুন, সঠিক পদ্ধতিতে পড়ুন এবং গড়ুন।

রাজু আহমেদ, কলাম লেখক। ইমেইল: raju69alive@gmail.com

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অধ্যাপক ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী ৪৮ অধ্যাপক ডা. শেখ মো. নাজমুল হাসান ২৮ অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১১ আজমিনা আফরিন তোড়া ১০ আনোয়ারুল হক হেলাল আফসানা বেগম আবদুল গাফফার চৌধুরী আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ৩২ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল ১০ আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১৮ আরিফ রহমান ১৬ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৫৪ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইনাম আহমদ চৌধুরী ইমতিয়াজ মাহমুদ ৭২ ইয়ামেন এম হক এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন একুশ তাপাদার এখলাসুর রহমান ৩৭ এনামুল হক এনাম ৫৪ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৬৪ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান কেশব কুমার অধিকারী খুরশীদ শাম্মী ১৮ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ৪৪ জহিরুল হক মজুমদার জাকিয়া সুলতানা মুক্তা জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুনাইদ আহমেদ পলক জুয়েল রাজ ১১৫ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ১২ ড. কাবেরী গায়েন ২৩ ড. নাদিম মাহমুদ ৩৭ ড. মাহরুফ চৌধুরী ১২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ড. শামীম আহমেদ ৪৫ ডা. আতিকুজ্জামান ফিলিপ ২০ ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার তোফায়েল আহমেদ ৩২ দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৭ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক প্রফেসর ড. মো. আতী উল্লাহ ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬২ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৪৪ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার জাকির হোসেন ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৮ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১৯৪ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১৫৩ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক ১৪ রণেশ মৈত্র ১৮৩ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ৫৫ রাজু আহমেদ ৪১ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩৮ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর