আজ বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬

Advertise

স্বর্ণময়ী থেকে মিমো ও আমাদের ডিজিটাল মবিং

জুয়েল রাজ  

২৫ এপ্রিল দিবাগত রাতে আত্মহত্যা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী মুনিরা মাহজাবিন মিমো। এবং একটি নোট লিখে রেখে যান, যেখানে তিনি তারই বিভাগের শিক্ষক এবং তার ঘনিষ্ঠ এক বান্ধবীর নাম লিখে যান। তবে তা আত্মহত্যার জন্য দায়ী করে নয়, তিনে লিখে যান "সুদীপ স্যারকে ৫০ হাজার টাকা দিতে হবে, হানি এবং স্যার ভাল থেক, স্যারের গিফটগুলো ফেরত দিতে হবে। এই নোটের কারণে শিক্ষক সুদীপ চক্রবর্তী ও মিমোর বান্ধবী হানিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যায় পুলিশ, হানিকে মুচলেকা রেখে ছেড়ে দিলেও সুদীপ চক্রবর্তীকে জেলে পাঠায়।

এই নোটের জের ধরে যে দিন সুদীপ চক্রবর্তীকে ৩ দিনের রিমান্ড দেয় আদালত, ঠিক একই দিনে অনলাইন সংবাদমাধ্যম 'ঢাকা স্ট্রিম'-এর গ্রাফিক ডিজাইনার ও সংবাদকর্মী স্বর্ণময়ী বিশ্বাস-এর আত্মহত্যার ঘটনায় পুলিশ দীর্ঘ তদন্ত শেষে দাখিল করা চূড়ান্ত প্রতিবেদনে (ফাইনাল রিপোর্ট) তার মৃত্যুকে 'আত্মহত্যা' হিসেবে উল্লেখ করেছে। কিন্তু এই ঘটনার পর ঢাকা স্ট্রিমের বাংলা কনটেন্ট এডিটর আলতাফ শাহনেওয়াজের বিরুদ্ধে প্ররোচনা ও যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু পুলিশি প্রতিবেদনে হ্যারাসমেন্টের বদলে পারিবারিক কারণই তার মৃত্যুর মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। সুদীপ চক্রবর্তীর রিমান্ড, জামিন না পাওয়া এবং স্বর্ণময়ীর আত্মহত্যা মামলার রায় প্রকাশ কাকতালীয়ভাবেই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠে।

স্বর্ণময়ীর আত্মহত্যার পর তার কর্মক্ষেত্রের একটি পুরনো অভিযোগকে সামনে এনে ধীরে ধীরে এমন এক সংঘবদ্ধ অনলাইন ক্যাম্পেইন তৈরি হয়, যা শুধু আলতাফ শাহনেওয়াজ নন, তার স্ত্রী এবং তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এন’স কিচেন-সহ তাদের সামাজিক জীবন, ব্যক্তিজীবন, অর্থনৈতিক জীবন সব তছনছ করে দেয় প্রায়। পুলিশের তদন্ত, আদালতের রায় কিংবা ন্যায়বিচার নয়, শুরু হয় আলতাফ শাহনেওয়াজ তার স্ত্রীর প্রতি এক ধরনের প্রতিশোধ পরায়ণতার প্রকাশ।

এখন আদালত যখন স্বর্ণময়ীর হত্যার দীর্ঘ তদন্ত শেষে স্বর্ণময়ীর আত্মহত্যায়, আলতাফ শাহনেওয়াজের কোন সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়নি। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার আগেই শুধু আলতাফ শাহনেওয়াজ নয়, তার স্ত্রী-সহ তাদের বিরুদ্ধে রায় দিয়ে দেয়। তখনকার সময়ের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যদি এখন দেখেন, তাহলে বুঝতে পারবেন আলতাফ শাহনেওয়াজ যে এখনো বেঁচে রয়েছেন সেটিই বরং আশ্চর্যজনক! বিগত ডিজিটাল মবিং-এর জন্য কেউ কি আলতাফ শাহনেওয়াজ এর কাছে ক্ষমা চেয়েছেন? চাননি।

মিমো আত্মহত্যার পরও আমরা একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে। আমরা কেউই জানি না মিমোর এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর রহস্য কী? কিন্তু মিমোর চিরকুটের সূত্র ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সরব হয়ে উঠে সুদীপ চক্রবর্তীর বিচারের। যা বরং ন্যায়বিচারকে ব্যাহত করে। সুদীপ চক্রবর্তী আদতেই এই আত্মহত্যায় কোনোভাবে মিমোকে প্ররোচিত করেছেন কি-না, সেটি একমাত্র পুলিশি তদন্তেই বের হওয়া সম্ভব। কিন্তু তার আগেই সুদীপ চক্রবর্তী যে বিভাগের শিক্ষক, সেই বিভাগেরই শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে শিক্ষকরা-সহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নৈতিকশিক্ষার বিচার শুরু করেছেন। ব্যক্তিগত ক্ষোভ ও অভিযোগের খাতা খুলে বসেছেন। যেখানে মিমোর জন্য ন্যায়বিচার পাওয়ার চেয়ে ব্যক্তি সুদীপের চরিত্রহনন ও সুদীপকে অপরাধী প্রমাণ করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। মিমোর আত্মহত্যার নেপথ্য কারণ প্রমাণিত হওয়ার আগেই, তার শিক্ষা অনুষদের আভ্যন্তরীণ দুর্নীতি স্বজনপ্রীতি, শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির সংস্কার এর দাবী নিয়ে সরব হয়েছেন, এবং সেই ক্যাম্পেইনে বলির পাঁঠা বানিয়ে ফেলছেন সুদীপ চক্রবর্তীকে। ঠিক যেভাবে হয়েছিল স্বর্ণময়ীর আত্মহত্যার পর, আলতাফ শাহনেওয়াজের বিরুদ্ধে। ব্যক্তি আলতাফ শাহনেওয়াজ কিংবা সুদীপ চক্রবর্তীর চারিত্রিক সনদপত্রের চেয়েও জরুরি ছিল আত্মহত্যা রোধে আমাদের কী করণীয় ছিল এই ধরনের মেধাবীরা কেন আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়, বিশ্ববিদ্যালয় বা কর্মস্থলে রাষ্ট্রীয় ভাবে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ তৈরি করা, আর যেন কোন স্বর্ণময়ী বা মিমো এই পথ বেছে না নেয় তার পরিবেশ তৈরি করা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমরা বেছে নিয়েছি অনলাইন ট্রায়াল। অপরপক্ষে থাকা মানুষটি যদি মানসিক ভাবে অধিক পরিমাণে শক্ত না হন, এই বিচার তাকেও এক ভিন্ন মৃত্যুর পথে ঠেলে দেয়। একটি ন্যায়বিচারের দাবিতে অন্য আরেকটি জীবনের প্রতি অন্যায় করছি কি-না, সেই চিন্তা করছি না।

ভুক্তভোগীর পরিবারের করা মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, অভিযুক্ত শিক্ষক সুদীপ চক্রবর্তীর সঙ্গে মিমোর ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল। ঘটনার রাতে তাদের মধ্যে ভিডিওকলে কথোপকথনের পর মিমো মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং ওই আলাপের পরিপ্রেক্ষিতেই তিনি আত্মহত্যা করেন। পরিবারের পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়, মিমোর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে থাকা হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ ও কলরেকর্ডে দুজনের সম্পর্ক এবং যোগাযোগের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

মামলায় দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। এ বিষয়ে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধারায় (আত্মহত্যায় প্ররোচনা) দোষী সাব্যস্ত করতে হলে কেবল সম্পর্ক বা কথোপকথন নয়, প্ররোচনার সরাসরি বা পরোক্ষ প্রমাণ দেখাতে হয়।

মিমোর আত্মহত্যার পরপরই তার মায়ের একটি দীর্ঘ মোবাইল ফোন কথোপকথন ভাইরাল হয়েছে, যেখানে মা-বাবা পরিবার-সহ তার কাছের মানুষের সাথে সম্পর্ক, গত মাসের ৫ তারিখে মিমোর প্রেমিকের অন্য মেয়ের সাথে বিয়ে হয়ে যাওয়া নিয়ে তার মানসিক বিপর্যয়, ছেলে বন্ধুদের সাথে তার উচ্ছৃঙ্খল জীবন যাপন। প্রথম বিয়ে ভেঙে যাওয়া, বারবার আত্মহত্যা বা নিজেকে আঘাত করার প্রবণতা এইসব বিষয় তিনি মিমোর এক বান্ধবীকে বয়ান করছেন। একজন মা কতটা নিরুপায় ছিলেন, সেই অসহায়ত্ব বারবার উল্লেখ করেছেন সেখানে। মিমোর সেই জীবনও যেমন একান্তই তার, এই বিষয়গুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে তার চারিত্রিক সনদপত্র দেওয়াও কোনভাবে সমীচীন নয়।

২৫ তারিখ মৃত্যুর পূর্ব সন্ধ্যায় সুদীপ চক্রবর্তীর অফিসের মিটিং থেকে বের হওয়ার সিসিটিভি ফুটেজে দৃশ্যমান তিনি ফোনে কথা বলে পায়চারী করছেন। সেই ফোনের অন্যপ্রান্তে কে ছিলেন? কেউ প্রশ্ন তুলেনি। সুদীপ চক্রবর্তীর সাথে কথা হয়েছে রাত ১টায়। আর মিমো আত্মহত্যা করেছেন ভোর ৫টায়; প্রায় ৪ ঘণ্টা পর। এই দীর্ঘ ৪ ঘণ্টা সময় কী ঘটেছিল তার জীবনে?

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই সব ফুটেজ আদালত চাইলে দিতে বাধ্য। কিন্তু সেটি না করে এইসব পাবলিক করে দেয়ার ঘটনায় এক ধরনের পক্ষপাতিত্ব পরিলক্ষিত হচ্ছে।

মিমো আত্মহত্যা করেছে এই বিষয়টি প্রমাণিত, সেই আত্মহত্যায় যদি সুদীপ চক্রবর্তী কোনোভাবে দায়ী থাকেন, আইনত নিশ্চয় তিনি সাজা ভোগ করবেন। আদালতকে সেই সুযোগটা দেওয়া উচিত। কিন্তু তার আগেই মিমো, মিমোর পরিবার, তার ব্যক্তিজীবন নিয়ে টানাটানি, সুদীপের দীর্ঘ ক্যারিয়ার তার ব্যক্তিজীবন সবকিছুকে আমরা বিচারের নামে দুর্বিষহ করে তুলেছি।

অনলাইন ট্রায়াল কোনো সমাধান নয়, বরং এটি আরেকটি মৃত্যুর পথ তৈরি করে। আমরা যদি সত্যিকারের মানবিক সমাজ হতে চাই, তবে আমাদের ঘৃণা ছড়ানো বন্ধ করে সুস্থ তদন্তের সুযোগ দিতে হবে। মিমোর বিষাদসিন্ধু যেন আমাদের ভেতরের মানুষটাকে ডুবিয়ে না দেয়, বরং আমাদের প্রশ্ন করতে শেখাক—কেন আমাদের চারপাশটা এতটা বিষাক্ত হয়ে উঠছে?

জুয়েল রাজ, সম্পাদক, ব্রিকলেন; যুক্তরাজ্য প্রতিনিধি, দৈনিক কালেরকন্ঠ

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অধ্যাপক ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী ৪৮ অধ্যাপক ডা. শেখ মো. নাজমুল হাসান ২৮ অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১১ আজমিনা আফরিন তোড়া ১০ আনোয়ারুল হক হেলাল আফসানা বেগম আবদুল গাফফার চৌধুরী আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ৩২ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল ১০ আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১৮ আরিফ রহমান ১৬ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৫৪ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইনাম আহমদ চৌধুরী ইমতিয়াজ মাহমুদ ৭৩ ইয়ামেন এম হক এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন একুশ তাপাদার এখলাসুর রহমান ৩৭ এনামুল হক এনাম ৫৪ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৬৪ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান কেশব কুমার অধিকারী খুরশীদ শাম্মী ১৮ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ৪৪ জহিরুল হক মজুমদার জাকিয়া সুলতানা মুক্তা জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুনাইদ আহমেদ পলক জুয়েল রাজ ১১৬ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ১২ ড. কাবেরী গায়েন ২৩ ড. নাদিম মাহমুদ ৩৭ ড. মাহরুফ চৌধুরী ১২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ড. শামীম আহমেদ ৪৫ ডা. আতিকুজ্জামান ফিলিপ ২০ ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার তোফায়েল আহমেদ ৩২ দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৭ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক প্রফেসর ড. মো. আতী উল্লাহ ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬২ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৪৪ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার জাকির হোসেন ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৮ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১৯৪ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১৫৩ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক ১৪ রণেশ মৈত্র ১৮৩ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ৫৫ রাজু আহমেদ ৪১ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩৮ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর