টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
Advertise
ইমতিয়াজ মাহমুদ | ১৪ মে, ২০২৬
আজ আমি একজন নায়কের কথা বলতে এসেছি। নাটক সিনেমার নায়ক নয়, একজন দেশপ্রেমিক নায়ক যিনি ১৯৭১ সনে আমাদের জন্যে প্রাণ নিয়েছিলেন হাতের মুঠোয়, লড়েছেন রাজনৈতিক ও সামরিক দুই ফ্রন্টেই। দুই ফ্রন্টেই যিনি লড়েছেন প্রকৃত রয়েল বেঙ্গল টাইগারের মত। একজন রিয়্যাল লাইফ হিরো। চলেন তাঁর গল্প বলি — আমাদের পূর্ব পুরুষের গৌরবের কথা বলি। প্রথমে একটা গেরিলা অপারেশনের কথা বলে নিই।
১৯৭১ সনের মার্চে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। সেই যুদ্ধে আমাদের এই নায়ক- মোশাররফ হোসেন ছাব্বিশ-সাতাশ বছরের একজন তরতাজা যুবক — ছিলেন এক নম্বর সেক্টরের একজন সাব-সেক্টর কমান্ডার। তিনি সহযোদ্ধাদের সাথে আলাপ করে সিদ্ধান্ত নিলেন, শুভপুর ব্রিজ উড়িয়ে দিতে হবে। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে ফেনী পার হলে মাঝারি আকৃতির এই ব্রিজটা আপনারা দেখেছেন। সামরিকভাবে এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা স্থাপনা, কেননা এই ব্রিজটাই সড়কপথে চট্টগ্রামকে যুক্ত করেছে দেশের বাকি অংশের সাথে। এটা উড়িয়ে দিলে একদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের সাথে দেশের বাকি অংশের যোগাযোগ বন্ধ হবে, অপরদিকে ঢাকা বা কুমিল্লার সাথে চট্টগ্রামে পাকিস্তানি মিলিটারির যোগাযোগ বিঘ্নিত হবে।
২
এপ্রিলের এক ও দুই তারিখের মাঝখানে গভীর রাতে অপারেশন হবে। অপারেশনে নেতৃত্ব দেবেন মোশাররফ হোসেন। তিনি আবার একজন মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারও বটে, সেই সূত্রে বিস্ফোরক সম্পর্কে, বিশেষ করে ডিনামাইটের নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ বিষয়ে তাঁর পেশাগত জ্ঞান আছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী বিস্ফোরক জোগাড় করলেন; ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ব্রিজটা এবং এর গঠন সম্পর্কে ভালোভাবেই জানতেন — কেননা তিনি এর সপ্তাহখানেক আগেও আরেকবার ব্রিজটি ধ্বংস করার চেষ্টা করেছিলেন, ডিনামাইট না পেয়ে বিটুমিন ও কেরোসিনের মিশ্রণ দিয়ে একরকম বিস্ফোরক তৈরি করে সেটি দিয়ে আংশিক ধ্বংসও করেছিলেন।
অপারেশন দিন গভীর রাতে, এগারো-বারোটার দিকে আমাদের নায়কের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের দলটি অবস্থান নেয় ব্রিজ থেকে খানিকটা দূরে। সকলেই ছদ্মবেশে ছিল, দেখলে এমনিতে কেউ বুঝবে না যে এরা মুক্তিযোদ্ধা। ঠিকঠাকমত ব্রিজের একটা পিলারে ডিনামাইট বাঁধা হয়, তার টেনে নিয়ে যাওয়া হয় নিরাপদ দূরত্বে। সেখান থেকে আগুন দেওয়া হয় তারে, বিকট বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে চারপাশ, শুভপুর ব্রিজের একটি স্প্যান ধ্বংস হয়ে হেলে পড়ে, চলাচলের অযোগ্য হয়ে যায় ব্রিজটি।
ব্রিজটি কি-না খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা স্থাপনা — আগেই বলেছি এর গুরুত্ব। সেইজন্যে পাকিস্তানি মিলিটারির একটা দুই ব্রিজটার দুই পাড়ে ক্যাম্প করে পাহারা দিতো সর্বক্ষণ। বিস্ফোরণের পরপরই শুরু হয়ে যায় সম্মুখযুদ্ধ। ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে পাকিস্তানি বাহিনীর। পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে ভারি অস্ত্রশস্ত্র ছিল, গোলাবারুদও ছিল পর্যাপ্ত। মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র-গোলাবারুদ মিলিয়ে ক্ষমতা ছিল সীমিত। কিন্তু ওদের কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধাদের স্থাপন করেছিল পাহাড়ের দিকে একটু উঁচুতে, সুবিধাজনক অবস্থানে থাকার ফলে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানিদের নাস্তানাবুদ করতে সক্ষম হয়।
৩
শুভপুর ব্রিজ এবং এর আশেপাশে এর পরেও গোটা মুক্তিযুদ্ধের সময়টাতে কয়েকবার পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে যুদ্ধ হয় মুক্তিযোদ্ধাদের। এইসব যুদ্ধের নেতৃত্ব দেন আমাদের তরুণ ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। এইসব যুদ্ধে তিনজন মুক্তিযোদ্ধা শহিদ হন — শহিদ তাজুল ইসলাম, শহিদ নুরুল গণি ও শহিদ জাকের হোসেন। এইসব যুদ্ধ ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফের নেতৃত্বে অংশ নেন বেশ কয়েকজন সামরিক বাহিনীর সদস্য ও আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।
কে ছিলেন এই নায়ক? তিনিই মোশাররফ হোসেন; অতি সচ্ছল বিত্তবান পরিবারের সন্তান, মীরসরাই উপজেলার ধুম গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। লাহোরে একটা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে তিনি মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে উনসত্তর সনে দেশে ফেরেন। ছাত্রজীবনে লাহোরেই ছয় দফার পক্ষে আন্দোলন করেছেন, দেশে ফিরে এসে আওয়ামী লীগের রাজনীতি শুরু করেন। উনসত্তরের গণআন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। সত্তরের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু তাকে প্রাদেশিক পরিষদের জন্যে মনোনয়ন দেন। নির্বাচিত এমএলএদের মধ্যে তিনিই ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। এরপর বহুবার বহু নির্বাচনে তিনি নৌকার প্রার্থী হয়ে জিতেছেন, মন্ত্রী হয়েছেন কয়েকবার।
আপনি তাকে চেনেন আওয়ামী লীগের মন্ত্রী হিসেবে, এমপি হিসেবে বা বড় ব্যবসায়ী হিসাবে। তরুণ বন্ধুরা, আপনি কি জানতেন আমাদের জন্যে তাঁর এই গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার কথা? এই মহান বীরের বীরত্বের কথা কি জানতেন? অনেকেই নিশ্চয়ই জানতেন, কিন্তু আমাদের জন্যে যিনি হাতের মুঠোয় প্রাণ নিয়ে যুদ্ধ করতে গেছেন, মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন বারবার তাঁকে আপনারা প্রাপ্য মর্যাদাটা দিয়েছেন? দেননি। এইতো কদিন আগেও তিনি কারাগারে আটক ছিলেন মিথ্যা মামলায়। আশির উপর বয়স হয়ে গিয়েছিল, শারীরিকভাবে দুর্বল ছিলেন, তথাপি তাঁকে জামিন দিতে অস্বীকার করেছে এই দেশের কোর্ট।
৪
স্বাধীনতাবিরোধীরা কিন্তু তাঁকে ভুলে যায়নি একটিবারের জন্যেও। স্বাধীনতার পরও তাঁর উপর কয়েকবার হামলা হয়েছে, তাঁকে হত্যার চেষ্টা করেছে ওরা। ১৯৮০ সনে চট্টগ্রাম নিউ মার্কেটে কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতার উপর হামলা হয়, সেই হামলায় ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের পায়ের রগ কেটে দেয়। ১৯৯২ সনের ৮ই মে তারিখে জামায়াতে ইসলামীর লোকজন ফটিকছড়িতে সশস্ত্র হামলা করে তাঁর উপর। গুরুতর আহত হয়েছিলেন সেবার। ১৯৮৮ সনে চট্টগ্রামে শেখ হাসিনার মিছিলে নির্বিচারে গুলি করে পুলিশ, মৃত্যু হয় অনেকের, সেবার তিনিও আহত হন। ইতিহাসের এই নোংরা ভিলেনরা, ওরা কিন্তু চেষ্টা করেই গেছে প্রতিশোধ নিতে।
বুধবার (১৩ মে) দুপুরে ঢাকার একটা হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। চব্বিশ সন থেকে দীর্ঘদিন কারাগারে থেকে অশীতিপর এই যুবকের স্বাস্থ্যের অবনতি হয়েছিল, না হলে হয়তো এত তাড়াতাড়ি তিনি চলে যেতেন না। স্বাধীনতার জন্যে, মানুষের জন্যে যে যুবক মৃত্যুর মুখোমুখি হতে দ্বিধা করেননি, তাঁকে আমরা এই প্রতিদান দিয়েছি। মনে রাখবেন কথাটা, আপনাদের কাছে অনুরোধ করি, ভুলবেন না, মনে রাখবেন। আমরা একটা স্বাধীন রাষ্ট্রে বড় হবো বলে তিনি আত্মোৎসর্গ করেছিলেন, আর আমরা তাঁকে এই প্রতিদান দিয়েছি। মিথ্যা মামলায় দিনের পর দিন তাঁকে কারাগারে আটকে রেখেছি অন্যায়ভাবে।
৫
শোনেন, নিজের দেশের হিরোদের চিনতে হয়, জানতে হয়, না হলে আপনি নিজের দেশকে চিনবেন না। বাঙাল মা যেসব বীরদের জন্ম দিয়েছেন ওদেরকে যদি না জানেন তাইলে কি করে হবে? রাজনৈতিক বক্তৃতা-বিবৃতি সকলেই দিতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত মুহূর্তে প্রায় নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও মেরুদণ্ড সোজা করে সকলে দাঁড়াতে পারে না। কার যেন একটা উদ্ধৃতি আছে, দেশপ্রেম হচ্ছে এমন একটা পরীক্ষা যেখানে পাস মার্ক হচ্ছে একশতে একশ, নিরানব্বই পেলেও ফেইল। এই পরীক্ষায় অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগও সবার জীবনে আসে না। মোশাররফ হোসেনরা হচ্ছেন মায়ের সেইসব সন্তান যারা এই পরীক্ষায় পাস করেছেন।
না, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের মৃত্যুতে আপনার কান্নার প্রয়োজন নেই। আপনি আপনার নিজের প্রয়োজনেই মনে রাখবেন, সন্তানদের বলবেন ওদের গল্প। এইরকম জীবনের উদাহরণ থেকে শিশুদের শেখাবেন দেশপ্রেম কাকে বলে। আমি আজ (বুধবার, ১৩ মে) দুপুরে খাওয়ার সময় চেষ্টা করেছিলাম আমার কন্যাদের বলতে কে এই ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। গলা ধরে এলো। পুরোটা বলতে পারলাম না। মেয়েকে বললাম, এরপর যেদিন আমরা ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাবো, শুভপুর ব্রিজটা এলে মনে করিয়ে দেবে আমাদের এই হিরোর কথা, সেদিন বলবো পুরো গল্পটা।
মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।
আপনার মন্তব্য