আজ বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

Advertise

আদর্শিক দ্বন্দ্ব ও রাজপথের ঐক্য: আমার চোখে ‘তোফায়েল ভাই’

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম  

বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদ আর আমাদের মাঝে নেই। তার প্রয়াণ বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে এক উজ্জ্বল ‘নক্ষত্রে’র বিদায়। আমি তাকে সব সময় ‘তোফায়েল ভাই’ বলেই সম্বোধন করতাম। আমার সঙ্গে তার সম্পর্কটি দীর্ঘদিনের। বয়সে এবং অ্যাকাডেমিক দিক থেকে আমি তার চেয়ে কিছুটা অনুজ। দীর্ঘ লড়াই সংগ্রামের মাধ্যমে তিনি সাধারণ মানুষের হৃদয়ে নিজের একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পেরেছিলেন।

ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোর মধ্য দিয়ে তোফায়েল আহমেদ একজন অপ্রতিদ্বন্দ্বী জননেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। এর পেছনে সবচেয়ে বড় নিয়ামক ছিল ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের কালজয়ী পটভূমি।

গণঅভ্যুত্থানের আগে তিনি খুব একটা পরিচিত বা দাপুটে ছাত্রনেতা ছিলেন না; ছিলেন তৎকালীন ইকবাল হলের (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ছাত্রলীগের একজন সাধারণ কর্মী। সে যুগে ডাকসু নির্বাচন হতো পরোক্ষ ভোটে। হল সংসদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা ডাকসুর ভিপি ও জিএস নির্বাচন করতেন এবং রোটেশন বা পর্যায়ক্রমিক পদ্ধতিতে আগে থেকেই নির্ধারণ করা থাকতো কোন হল থেকে ভিপি বা জিএস নির্বাচিত হবেন। সেবার ভিপি পদটি ইকবাল হলের ভাগে পড়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য হলে ছাত্র ইউনিয়ন জয়লাভ করলেও, বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রবল জোয়ারে ইকবাল হলে ছাত্রলীগ বিজয়ী হয়। ফলে ইকবাল হলের প্রতিনিধি হিসেবে তোফায়েল আহমেদ ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হন। অন্যদিকে, সূর্যসেন হল থেকে জিএস নির্বাচিত হয়েছিলেন এনএসএফ-এর নাজিম কামরান চৌধুরী।

ডাকসুর ভিপি হওয়ার আগে জাদুকরী নেতা হিসেবে তোফায়েল আহমেদের পরিচিতি না থাকলেও, '৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান তাকে দেশজুড়ে এক সুপরিচিত জননেতায় পরিণত করে। এ সময় ‘ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন ও ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণার পাশাপাশি এই মর্মেও সিদ্ধান্ত হয় যে, ডাকসুর ভিপিই হবেন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের মুখপাত্র। ফলশ্রুতিতে তোফায়েল আহমেদ এই ঐতিহাসিক আন্দোলনের প্রধান কণ্ঠস্বর হিসেবে সামনে আসেন। সারা দেশের মানুষের কাছে আন্দোলনের দিকনির্দেশনা ও ঘোষণাসমূহ তিনি অত্যন্ত সফলভাবে তুলে ধরতেন। এভাবেই তিনি একজন ছাত্রনেতা থেকে পরিণত হন সত্যিকারের জননেতায়।

তোফায়েল ভাইয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্কের ভিত রচিত হয়েছিল সংগ্রামের রক্ত-পিচ্ছিল পথে। সেই আইয়ুববিরোধী আন্দোলনের যুগ থেকে। তার সঙ্গে আমার চমৎকার ব্যক্তিগত সখ্য থাকলেও, আমাদের রাজনৈতিক আদর্শের ভিন্নতা সব সময়ই ছিল। আমি দেশপ্রেমিক, বামপন্থী, সমাজতান্ত্রিক ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার আদর্শের অনুসারী। বিপরীতে, তোফায়েল আহমেদ ছিলেন বুর্জোয়া উদারতাবাদ এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের একনিষ্ঠ ধারক। তবে এই আদর্শিক ব্যবধান কখনোই আমাদের নির্দিষ্ট জাতীয় ইস্যু বা অভিন্ন দাবিতে একসাথে কাজ করার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। আমাদের এই সম্পর্কটিকে বলা যায় ‘ডায়ালেকটিক্যাল কন্ট্রাডিকশন অ্যান্ড ইউনিটি’ বা দ্বন্দ্ব ও ঐক্যের বিষয়। রাজপথে পিকেটিং, পুলিশের মোকাবিলা থেকে শুরু করে কারাবাসের বন্দিজীবন—সবখানেই আমরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছি। কিন্তু কেউই নিজেদের শ্রেণিগত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এক চুলও সরে আসিনি।

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তোফায়েল আহমেদকে নিজের রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেন। সে সময় সরকার পরিচালনায় তার ব্যাপক প্রভাব ছিল। তবে ১৯৭৩ সালের ১ জানুয়ারি পুলিশের গুলিতে ছাত্রনেতা মতিউল-কাদের নিহত হওয়া এবং পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালের ৫ এপ্রিল মহসীন হলে সংঘটিত সেভেন মার্ডারের মতো মর্মান্তিক ঘটনাগুলোর কারণে বামপন্থীদের সাথে তোফায়েল আহমেদসহ তৎকালীন সরকারের চরম দূরত্ব ও মতবিরোধের সৃষ্টি হয়। এ ধরনের বেশ কিছু ঘটনায় আমাদের মাঝে যেমন বিরোধ হয়েছে, তেমনি বহু ক্ষেত্রে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ারও চেষ্টা করেছি।

১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তোফায়েল আহমেদ কারাবরণ করেন। জেলে থাকা অবস্থায় এবং পরবর্তীতে মুক্ত হয়ে তিনি আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠিত করতে, দলের ভেতরের কোন্দল নিরসন করতে এবং শেখ হাসিনাকে দলের নেতৃত্বে নিয়ে আসতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এরশাদের সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আমরা আবারও একসাথে রাজপথে লড়াই করেছি। ১৯৮৬ সালে আন্দোলনরত আওয়ামী লীগসহ ১৫ দলীয় জোটের একটি অংশ নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে তিনি তা মেনে নিতে পারেননি। এ কারণে দলের ভেতরে তিনি কিছুটা কোণঠাসা হয়ে পড়েন। যদিও সেই সংসদ বেশিদিন টেকেনি। সংসদ ভেঙে যাওয়ার পর স্বৈরশাসক এরশাদের বিরুদ্ধে নতুন উদ্যমে আন্দোলন শুরু হয়।

সে সময় ‘তিন জোটের রূপরেখা’ প্রণয়নের দায়িত্ব আমার ওপর অর্পিত হয়েছিল, আর এই ঐতিহাসিক কাজে আমি তোফায়েল ভাইয়ের কাছ থেকে অত্যন্ত মূল্যবান পরামর্শ পেয়েছিলাম।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তোফায়েল আহমেদ মন্ত্রী হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ের পর ২০০৯ সালে যখন আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে, তখন থেকেই দলের মূল নীতিনির্ধারণী জায়গা থেকে তাকে ধীরে ধীরে সাইডলাইন করা হয়। পরের নির্বাচনগুলোতে জনগণের সমর্থন না থাকা সত্ত্বেও কারচুপির নির্বাচনকে সঠিক মনে করেননি তোফায়েল আহমেদ। এমন একটি নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর আমি যখন তার সাথে হাত মিলিয়ে বলেছিলাম, ‘তোফায়েল ভাই, অভিনন্দন’, তখন তিনি উত্তরে বলেছিলেন, ‘সেলিম, আর লজ্জা দিও না’। ‘চিরদিন দরকার আওয়ামী লীগের সরকার’—এই ধারণাটি হয়তোবা তিনি মন থেকে গ্রহণ করতে পারেননি। আমি তাকে মাঝেমধ্যেই বলতাম, ‘আপনি যা বিশ্বাস করেন, তা প্রকাশ্যে খোলাখুলি বলেন না কেন? আপনি তো আর ভুঁইফোড় কোনো নেতা নন!’

ব্যক্তিজীবনে তোফায়েল ভাই ছিলেন অত্যন্ত অমায়িক একজন মানুষ। তার স্মরণশক্তি ছিল বিস্ময়কর। যেকোনো বিষয়, এমনকি কার টেলিফোন নম্বর কী, তা তিনি মুহূর্তের মধ্যে বলে দিতে পারতেন। অবস্থা এমন ছিল যে, আমরা নিজেদের নম্বর ভুলে গেলেও তোফায়েল ভাইকে ফোন করে সেটি জেনে নিতাম। তিনি অত্যন্ত পরিপাটি থাকতে ভালোবাসতেন। স্যুট-টাই, বেল্ট, মোজা ও জুতো মিলিয়ে ফিটফাট পোশাক পরিধান করা তার একটি বিশেষ শখ ছিল, যা তিনি আজীবন ধরে রেখেছিলেন।

তিনি ছিলেন আদ্যোপান্ত একজন ‘ফ্যামিলি ম্যান’। স্ত্রী, একমাত্র কন্যা এবং জামাতার প্রতি তার অগাধ ভালোবাসা ও অনুরাগ ছিল। ভাবীর (তার স্ত্রী) প্রতি দায়িত্ব পালনে তার একনিষ্ঠতা আমি খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছি। স্ত্রীর প্রয়াণে তিনি মানসিকভাবে তো বটেই, শারীরিকভাবেও ভীষণ ভেঙে পড়েছিলেন। এরপর দীর্ঘকাল তিনি শয্যাশায়ী ছিলেন।

রাজনৈতিক মতাদর্শে ভিন্নতা থাকলেও, বৃহত্তর গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও জাতীয় লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে তোফায়েল আহমেদ ছিলেন একজন অত্যন্ত বিশ্বস্ত, নির্ভরযোগ্য ও আন্তরিক সহযোদ্ধা। আমরা ভিন্ন রাজনৈতিক ঘরানার মানুষ হওয়া সত্ত্বেও, যখনই কোনো ইস্যুতে আমাদের মতের মিল হয়েছে, আমরা একে অপরকে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য সাথী হিসেবে পেয়েছি। তার সাথে কাজ করার স্মৃতিগুলো আমার জীবনে ভালো মন্দ মিলিয়ে এক অমূল্য অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা। একজন লিবারেল বুর্জোয়া রাজনৈতিক নেতা হিসেবে যতটুকু সম্মান ও শ্রদ্ধা একজনের প্রাপ্য হতে পারে, তার সবটুকুই আজ তাকে আমি নিবেদন করছি।

হয়তো আর কিছুদিন বেঁচে থাকলে তিনি এই সত্যটি উপলব্ধি করতে পারতেন যে, বাংলাদেশের চলমান সংকট নিরসনের ক্ষমতা বুর্জোয়া লিবারেল শক্তির হাতে নেই। এটি অর্জন করতে হলে চূড়ান্তভাবে ভিন্ন শক্তির ওপর, অর্থাৎ বামপন্থীদের ওপরই নির্ভর করতে হবে।

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, সাবেক সভাপতি ও সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অধ্যাপক ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী ৪৮ অধ্যাপক ডা. শেখ মো. নাজমুল হাসান ২৮ অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১১ আজমিনা আফরিন তোড়া ১০ আনোয়ারুল হক হেলাল আফসানা বেগম আবদুল গাফফার চৌধুরী আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ৩২ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল ১০ আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১৮ আরিফ রহমান ১৬ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৫৪ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইনাম আহমদ চৌধুরী ইমতিয়াজ মাহমুদ ৭৩ ইয়ামেন এম হক এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন একুশ তাপাদার এখলাসুর রহমান ৩৭ এনামুল হক এনাম ৫৪ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৬৪ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান কেশব কুমার অধিকারী খুরশীদ শাম্মী ১৮ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ৪৪ জহিরুল হক মজুমদার জাকিয়া সুলতানা মুক্তা জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুনাইদ আহমেদ পলক জুয়েল রাজ ১১৭ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ১২ ড. কাবেরী গায়েন ২৩ ড. নাদিম মাহমুদ ৩৭ ড. মাহরুফ চৌধুরী ১২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ড. শামীম আহমেদ ৪৫ ডা. আতিকুজ্জামান ফিলিপ ২০ ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার তোফায়েল আহমেদ ৩২ দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৭ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক প্রফেসর ড. মো. আতী উল্লাহ ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬২ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৪৪ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার জাকির হোসেন ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৮ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১৯৪ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১৫৩ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক ১৪ রণেশ মৈত্র ১৮৩ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ৫৫ রাজু আহমেদ ৪১ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩৮ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর