আজ শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬

Advertise

শাহজালালের মাজার: হাতে মারতে না পেরে ভাতে মারতে চাইছে

জুয়েল রাজ  

আমি বাংলাদেশের অন্যান্য এলাকার কথা জানি না, কিন্তু সিলেট অঞ্চলের হিন্দু মুসলিম সর্বস্তরের, সব ধর্মের মানুষের আবেগের সাথে জড়িত হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজার। যদিও বিগত দশক সমূহে ধর্মীয় উগ্রবাদের আস্ফালনের ফলে দিনে দিনে সব ধর্মের মানুষের মাঝেই নানা রকম উগ্রমতবাদের প্রসার ঘটেছে। মাজার নিয়ে নানা রকম ফতোয়ার কারণে সেই প্রবাহ কিছুটা হয়তো কমেছে। তবুও সিলেটের মানুষের মনে, শাহজালালের মাজারের আবেগ অন্যদের চেয়ে ভিন্ন; বিশ্বাস করুক বা না করুক, এই মাজারকে শ্রদ্ধা করে এবং ভালোবাসে।

বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে শাহজালালের মাজার জিয়ারতের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারণার রেওয়াজ এখন পর্যন্ত চলমান। সিলেট-১ আসনে যে দল বিজয়ী হয় সেই দল সরকার গঠন করে, এইটা তো মিথে পরিণত হয়ে গেছে। তো হঠাৎ করে এই মাজারের ডেগ (দানবাক্স)-এর প্রতি প্রশাসনের বা একটি গোষ্ঠীর নজর পড়ল কেন?

হযরত শাহজালাল সিলেটে আসেন ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে প্রায় ৭২৩ বছর আগে। ১০০/২০০ বছরের ইতিহাসেই নান বিবর্তন ঘটে, শাহজালাল (রহ.) ৭২৩ বছরের ইতিহাসে ও নানা বিষয় নানা ভাবে রঞ্জিত বা অতিরঞ্জিত হওয়া ও অমূলক নয়। সিলেটের মানুষ ধূসর রঙের কবুতরের মাংস খায় না। এই কবুতরকে বলা হয় জালালী কৈতর (কবুতরকে সিলেটে কৈতর বলা হয়)। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের বিখ্যাত একটা গান আছে , "হবিগঞ্জের জালালী কৈতর সুনামগঞ্জের কোরা' সুরমা নদীর গাঙচিল আমি শূন্যে দিলাম উড়া" সিলেটের বহু মানুষ গজার মাছ খায় না। আমাদের পরিবারেও দেখেছি এই দুই জিনিস। কারণ গজার মাছ আর জালালী কৈতর শাহজালালের মাজারের প্রতিনিধিত্ব করে বলে মানুষ বিশ্বাস করে। এটা কতটা সত্য মিথ্যা জানি না, কিন্তু মানুষ শত শত বছর ধরে এই আবেগগুলো ধারণ করে আসছে।

সিলেটের ধর্মীয় সম্প্রীতি বাংলাদেশের অন্য যে কোন জায়গার চেয়ে ভিন্ন। এবং ১৯৪৭ থেকে শুরু করে সর্বশেষ ২০০১ সালে সারা বাংলাদেশের তাণ্ডব কিংবা ২০২৪-এর ৫ আগস্টের পরে সারা বাংলাদেশে যে ধরণের তাণ্ডব ঘটেছে, তুলনা করলে সিলেটের ঘটনাগুলো সেই সবের কাছে কিছুই না। সিলেটের মানুষ এখনো সেই সম্প্রীতিকে ধারণ করার চেষ্টা করছেন প্রতিনিয়ত। শাহজালালের মাজার ও সিলেটে ধর্মীয় সম্প্রীতির এক আইকনিক নাম। হিন্দু মুসলিম বা সিলেটের আদিবাসী সমাজের কাছে সমান শ্রদ্ধার একটি স্থান হিসাবে বিবেচিত হয়।

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ১৭ মাসে ৯৭টি মাজার ভাঙার সংবাদ এসেছে জাতীয় দৈনিকে। কবর থেকে লাশ তুলে আগুনে পুড়িয়ে মারার ঘটনা বাংলাদেশ দেখেছে। বাংলাদেশে মাজার বিরোধিতাও নতুন কিছু নয়। এর রাজনৈতিক আলোচনা খুবই দীর্ঘ। মাজার সংস্কৃতি বা মাজারকেন্দ্রিক যে চর্চা সে সবের দর্শন নিয়ে আলোচনা হতে পারে। তবে দিনশেষে অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতিকেই ধারক হয় মাজারগুলো। এবং এই সত্য তো নতুন নয় এই সুফি দরবেশরা ইসলামের বাণী প্রচার করেছেন মানুষকে অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির দর্শন প্রচার করেই কাছে টেনেছেন। কট্টর মতবাদ এখন যেভাবে প্রচার হয়, সেই বাণী প্রচার করলে কোনভাবেই ইসলাম ধর্ম এই দেশে প্রচার করতে পারতেন না। এইসব নিয়ে গবেষকদের বহু আলোচনা গবেষণা আছে। আর যদি জোর করে প্রচার করতেন, ভিন্ন ধর্মের মানুষের এই ভালবাসা থাকত না। বরং এই মাজারের প্রতি ঘৃণা পোষণ করত ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা ।

উপমহাদেশে মাজার বিরোধিতার ইতিহাস মূলত ১৮শ শতক থেকে ওয়াহাবি ও দেওবন্দি আন্দোলনের মতো কট্টরপন্থী ধারাগুলো মাজার সংস্কৃতির তীব্র বিরোধিতা শুরু করে। তাদের মতে, মাজারে গিয়ে কিছু চাওয়া বা কবরের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা ‘শিরক’ বা স্রষ্টার সঙ্গে অন্য কাউকে অংশীদার করার শামিল। তাদের দৃষ্টিতে এটি ‘কবরপূজা’ এবং ইসলামের বিশুদ্ধ একেশ্বরবাদী ধারণার পরিপন্থী। এই ‘বিশুদ্ধ বনাম মিশ্র’ ইসলামের বিতর্কই মাজারকে একটি স্থায়ী বিবাদের জায়গায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এই আলোচনা হচ্ছে বেসিক আলোচনা। দ্বিতীয় যে বিষয়টি আসে অসামাজিক কার্যকলাপ, গাঁজা সেবন এবং অশ্লীল নাচ গান। এইখানে কারা আসে, কারা মাজারে রাত্রি যাপন করে একবার নিজের চোখে দেখে আসুন। একেবারে প্রান্তিক, ছিন্নমূল মানুষ যারা তারাই এখানে রাত্রি যাপন করে, একমুঠো খাবারের আশায় বসে থাকে। মাজার কিন্তু এদের নিরাশ করে না। ধর্ম জাত পাত এসব যাচাই বাছাই করে না। এদের মুখে খাবার তুলে দেয়।

সরকার যদি মাজারের দানবাক্সে মালিকানা নিয়ে নেয়, তবে সাথে করে এই ভবঘুরে ছিন্নমূল মানুষদের দায়িত্বও নেয়া উচিত। শাহজালালের মাজার এখন শুধু আর মাজারে সীমাবদ্ধ নেই। মাজার ঘিরে পুরো একটা শিল্প গড়ে উঠেছে আবাসিক হোটেল, খাবার হোটেল, স্যুভেনিরের দোকান আগর বাতি, মোমবাতি, তোসা সিন্নি ইত্যাদি বিক্রির সাথে হাজার হাজার মানুষের রুটি রুজি জড়িত হয়ে গেছে। মাজারে মানুষের আনাগোনা কমলে প্রভাব পড়বে এর সাথে সংশ্লিষ্ট সবার।

যে আলোচনায় ছিলাম, বাংলাদেশে মাজার বিরোধিতার মূল লক্ষ্য রাজনৈতিক। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের বিপরীতে একটি কট্টর ধর্মীয় মতবাদ প্রতিস্থাপন করাই লক্ষ্য। আর এর অন্তরায় মাজার সংস্কৃতি, বাউল গান, যাত্রা, মেলা, নাটক, পালাগান। সাধারণ মানুষ নয়, বরং রাজনৈতিক গোষ্ঠী নানাভাবে এর বিরোধিতা করে। এরা বড় বড় শহরের ক্লাব, বার কিংবা হোটেলে আক্রমণ চালায় না। রাতের আঁধারের নিয়ন আলোয় যেখানে কোটি কোটি টাকার লেনদেন চলে, আমরা সবাই জানি সেই সত্য, সেসব জায়গায় এরা হাত দেয় না। কারণ এদের সাথে ক্ষমতার জোরে টিকতে পারবে না।

২০২৪-এর পর এই গোষ্ঠীই মাজার ভাঙার মহোৎসব শুরু করেছে। শাহপরানের মাজারে একজনকে পিটিয়ে মারার ঘটনা ঘটেছে। সেই ঘটনার অভিজ্ঞতা থেকে এবং শাহজালালের মাজারের ঐতিহ্যের কারণে, সাধারণ মানুষ যাতে প্রতিক্রিয়া না দেখায়, সেই জন্য প্রাচীন প্রবাদ, "যাকে মারা যায় না হাতে, তারে মারব ভাতে" এই পদ্ধতি প্রয়োগ করতে চাইছে। এই প্রবাদের সারমর্ম হচ্ছে, "কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা পক্ষকে যখন সরাসরি আইনি বা শারীরিক উপায়ে দমন করা যায় না, তখন তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি বা অর্থনৈতিক পথ বন্ধ করে অবরুদ্ধ করার কৌশল"। মাজারের ডেগ বা দানবাক্স সিলগালা করে দেয়ার মাধ্যমে মূলত মাজারের মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়ার চেষ্টা করা। যাতে করে ধীরে ধীরে মাজারটি অকার্যকর হয়ে যায়। এইগুলো খুবই সূক্ষ্ম দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনার অংশ।

জুয়েল রাজ, সম্পাদক, ব্রিকলেন; যুক্তরাজ্য প্রতিনিধি, দৈনিক কালেরকন্ঠ

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য ২ অধ্যাপক ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী ৪৮ অধ্যাপক ডা. শেখ মো. নাজমুল হাসান ২৯ অসীম চক্রবর্তী ৯ আজম খান ১১ আজমিনা আফরিন তোড়া ১০ আনোয়ারুল হক হেলাল ১ আফসানা বেগম ১ আবদুল গাফফার চৌধুরী ৯ আবু এম ইউসুফ ৩ আবু সাঈদ আহমেদ ৮ আব্দুল করিম কিম ৩২ আব্দুল্লাহ আল নোমান ২ আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল ১০ আমিনা আইরিন ৩ আরশাদ খান ৩ আরিফ জেবতিক ১৮ আরিফ রহমান ১৬ আরিফুর রহমান ২ আলমগীর নিষাদ ১ আলমগীর শাহরিয়ার ৫৪ আশরাফ মাহমুদ ৯ আশিক শাওন ৫ ইনাম আহমদ চৌধুরী ৯ ইমতিয়াজ মাহমুদ ৭৩ ইয়ামেন এম হক ১ এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন ১ একুশ তাপাদার ১ এখলাসুর রহমান ৩৭ এনামুল হক এনাম ৫৪ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ ওমর ফারুক লুক্স ৩ কবির য়াহমদ ৮৯ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান ১ কেশব কুমার অধিকারী ১ খুরশীদ শাম্মী ১৮ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু ৭ জহিরুল হক বাপি ৪৪ জহিরুল হক মজুমদার ৩ জাকিয়া সুলতানা মুক্তা ৯ জান্নাতুল মাওয়া ২ জাহিদ নেওয়াজ খান ৫ জুনাইদ আহমেদ পলক ২ জুয়েল রাজ ১২৩ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ১২ ড. কাবেরী গায়েন ২৩ ড. নাদিম মাহমুদ ৩৮ ড. মাহরুফ চৌধুরী ১৫ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ৮ ড. শামীম আহমেদ ৪৫ ডা. আতিকুজ্জামান ফিলিপ ২০ ডা. সাঈদ এনাম ৪ ডোরা প্রেন্টিস ২ তপু সৌমেন ৩ তসলিমা নাসরিন ১০ তানবীরা তালুকদার ৩ তোফায়েল আহমেদ ৩২ দিব্যেন্দু দ্বীপ ৭ দেব দুলাল গুহ ৮ দেব প্রসাদ দেবু ১ দেবজ্যোতি দেবু ২৭ নিখিল নীল ৫ পাপলু বাঙ্গালী ৪ পুলক ঘটক ৫ প্রফেসর ড. মো. আতী উল্লাহ ৫ ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬২ ফড়িং ক্যামেলিয়া ২ ফরিদ আহমেদ ৪৪ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা ১ বদরুল আলম ৯ বন্যা আহমেদ ৪ বিজন সরকার ৪ বিপ্লব কর্মকার ৭ ব্যারিস্টার জাকির হোসেন ২ ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৮ ভায়লেট হালদার ৩ মারজিয়া প্রভা ৭ মাসকাওয়াথ আহসান ১৯৬ মাসুদ পারভেজ ২ মাহমুদুল হক মুন্সী ৩ মিলন ফারাবী ১ মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ৩ মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১৫৩ মো. মাহমুদুর রহমান ৬ মো. সাখাওয়াত হোসেন ৩ মোছাদ্দিক উজ্জ্বল ৩ মোনাজ হক ১৪ রণেশ মৈত্র ১৮৩ রতন কুমার সমাদ্দার ১ রহিম আব্দুর রহিম ৫৫ রাজু আহমেদ ৪৪ রুমী আহমেদ ১ রেজা ঘটক ৩৮ লীনা পারভীন ৬ শওগাত আলী সাগর ৫