টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
Advertise
রাজু আহমেদ | ০৮ জুলাই, ২০২৬
মানুষের শেখা প্রথম জীবন-দক্ষতাগুলোর একটি হওয়া উচিত রান্না। অথচ আমাদের সমাজে এখনও অনেক মা সন্তানের হাতে কলম ধরাতে চান, কিন্তু খুন্তি ধরাতে চান না। বিশেষ করে ছেলে সন্তান হলে যেন রান্নাঘরের দরজাটাই তার জন্য অলিখিতভাবে নিষিদ্ধ। অথচ চা বানানো, ভাত রাঁধা, ডাল ফোটানো, কাপড় কাচা কিংবা ঘর গুছিয়ে রাখার মতো কাজগুলো কোনো লিঙ্গের পরিচয় বহন করে না; এগুলো জীবনকে ধারণ করার মৌলিক দক্ষতা। যে কাজ মানুষকে ধৈর্য শেখায়, দায়িত্ববোধ শেখায়, অন্যের শ্রমের মূল্য বুঝতে শেখায়—সেই কাজ ভাগাভাগি হলে পরিবারে কেবল শ্রম নয়, ভালোবাসাও ভাগ হয়ে যায়।
একসময় সমাজের কাঠামো ছিল ভিন্ন। নারীর জীবন আবর্তিত হতো সংসারের চার দেয়ালের ভেতর, আর পুরুষের জীবন বাইরের পৃথিবীতে। সেই বাস্তবতায় রান্নাঘর নারীর কর্মক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সময় তো কখনও একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না। আজ নারী-পুরুষ একই কর্মযুদ্ধে, একই ক্লান্তি নিয়ে দিনের শেষে ঘরে ফেরে। কর্মঘণ্টা যখন সমান, তখন দায়িত্ব অসমান হওয়ার কোনো নৈতিক ভিত্তি থাকে না। রান্নাঘরের ধোঁয়া যদি কেবল একজনের কাঁধেই জমা হয়, তবে সেই সংসারে সমতা নয়, নীরব অবিচারই বাসা বাঁধে।
রান্না কোনো তুচ্ছ কাজ নয়। একটি পরিবারের সুস্থতা, নিরাপত্তা আর ভালোবাসার সবচেয়ে উষ্ণ প্রকাশগুলোর একটি লুকিয়ে থাকে রান্নাঘরের চুলার আগুনে। অথচ কত পুরুষ এখনও সেখানে প্রবেশ করাকে আত্মমর্যাদার অবমাননা মনে করেন! আসলে এটি দক্ষতার সংকট নয়, মানসিকতার সংকট। শিক্ষা যদি এই সংকীর্ণতা ভাঙতে না পারে, বাস্তবতা একদিন তা ভেঙে দেবে। কারণ অর্থ থাকলেই সারাজীবন হোটেলের খাবারে জীবন চলে না। ভাড়াটে হাতের রান্নায় ক্ষুধা মিটলেও আপনজনের স্পর্শের যে স্বাদ, তার কোনো বিকল্প নেই।
প্রযুক্তি রান্নাঘরকে সহজ করেছে, সময় কমিয়েছে, পরিশ্রমও অনেক হালকা করেছে। তবু একমুঠো সাধারণ ভাত, এক বাটি ডাল কিংবা একটি ভর্তাও কেবল খাবার নয়; সেখানে যত্নেরও স্বাদ মিশে থাকে। মায়ের হাতের রান্নার কথা আমরা বারবার বলি, কিন্তু বাবার হাতের রান্নাও সন্তানের স্মৃতিতে সমান মমতা হয়ে থেকে যেতে পারে। কারণ রান্না শেষ পর্যন্ত পেট ভরানোর কাজ নয়, সম্পর্ক বাঁচিয়ে রাখারও একটি ভাষা।
আজকের পৃথিবীতে স্মার্ট হওয়ার অর্থ শুধু প্রযুক্তি জানা নয়; নিজের জীবন নিজে সামলাতে পারাও এক ধরনের প্রজ্ঞা। পড়াশোনা, চাকরি কিংবা জীবিকার প্রয়োজনে অসংখ্য মানুষ পরিবার থেকে দূরে একা থাকে। তখন বোঝা যায়, রান্না জানা মানে শুধু খাবার তৈরি করা নয়; নিজের জীবনকে নিজের হাতে ধরে রাখার ক্ষমতা অর্জন করা। যারা বলেন, "আমার দ্বারা রান্না হবে না", তাঁদের অক্ষমতার চেয়ে অনীহাই বড়।
দীর্ঘদিনের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা আমাদের শিখিয়েছে রান্নাঘর নারীর রাজ্য। তাই অনেক পুরুষের কাজ যেন কেবল খাবারের প্রশংসা করা, কিংবা লবণ-ঝালের হিসাব কষে সমালোচনা করা। কিন্তু সময় নীরবে সেই পাঠ্যবই বদলে দিয়েছে। এখন সংসারও অংশীদারত্ব চায়, একতরফা দায়িত্ব নয়।
সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই রান্নাঘরের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। ছেলে হোক কিংবা মেয়ে—চাল ধোয়া, ডাল ধোয়া, ডিম ভাজা কিংবা ভাত বসানোর মতো ছোট ছোট কাজ শেখানো মানে কেবল রান্না শেখানো নয়; তাকে আত্মনির্ভরতার বর্ণমালা শেখানো। যে মা আজ বলেন, "ছেলে হয়ে রান্না করবে কেন?", সময়ই একদিন সেই প্রশ্নের উত্তর লিখে দেবে। তখন হয়তো মা পাশে থাকবেন না, কিন্তু তাঁর শেখানো কিংবা না-শেখানোর ফল সন্তানের জীবনেই প্রতিফলিত হবে।
সভ্যতা যত এগোবে, মানুষের ব্যক্তিগত জীবন তত জটিল হবে। তাই স্বনির্ভরতার মূল্যও তত বাড়বে। প্রয়োজনীয় দক্ষতাগুলো ছোটবেলায় শেখা সহজ; প্রয়োজনের তাড়নায় শেখা কঠিন। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলাতে না পারলে মানুষ হোঁচট খায়, সমাজও পিছিয়ে পড়ে।
কোনো কাজের লিঙ্গ নেই, আছে প্রয়োজন। আগুন যেমন নারী-পুরুষ আলাদা করে উষ্ণতা দেয় না, তেমনি রান্নাঘরের চুলাও কাউকে আলাদা করে আহ্বান জানায় না। যে হাত ভালোবাসতে জানে, সেই হাতই রান্না করতে পারে। আর যে সংসারে রান্নাঘরের আগুন দুইজনের দায়িত্বে জ্বলে, সেখানে কেবল খাবার নয়—সম্মান, সমতা আর ভালোবাসাও একসঙ্গে সিদ্ধ হয়।
মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।
আপনার মন্তব্য