টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
Advertise
কবির য়াহমদ | ১৪ জুলাই, ২০২৬
সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে সাম্প্রতিক টানাপড়েনের সমাধান কোথায়— এটি আজ এক জরুরি প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। দানবাক্স, ডেগ ও মানতের টাকা কি আগের মতো মাজার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা পরিবারগুলোই পরিচালনা করবেন, নাকি এটি চলে যাবে জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে— এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যেমন সহজ নয়, তেমনি সহজ নয় হঠাৎ জেগে ওঠা একটি জনমতের চাপে সিদ্ধান্ত নেওয়া। বিষয়টির নিষ্পত্তির জন্য বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের একটি কমিটি গঠিত হয়েছে, যারা এই মাসের ২৫ তারিখের মধ্যে একটি ‘যৌক্তিক পদ্ধতি’ নির্ধারণ করবে বলে জানা গেছে।
দেশে যখন মাজার ভাঙার হিড়িক চলেছিল, তখন জনমনে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। সেই ধাক্কা সামলে মাজার-সংস্কৃতি আবার ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করার সময়েই সিলেটের তৎকালীন জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলমের মাধ্যমে একটি ভিন্ন বার্তা দেওয়ার চেষ্টা লক্ষ করা যায়— মাজার কেবল ‘অনৈসলামিক’ কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র নয়, এটি মূলত অর্থ লুটপাটেরও আখড়া। এই ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠিত করতেই শাহজালালের মাজারের ৭০০ বছরের প্রাচীন রীতি এক লহমায় ভেঙে দেওয়া হয়। ঐতিহাসিক ডেগ সিলগালা করা হয়, বসানো হয় সিসি ক্যামেরা, মোতায়েন করা হয় আনসারসহ বিভিন্ন বাহিনীর সদস্য, বাইরে থেকে আনা হয় তালাবদ্ধ বিশাল দানবাক্স।
নাটকের চূড়ান্ত পর্ব মঞ্চস্থ হয় ডিসির বিদায়ের ঠিক আগমুহূর্তে। তার নির্দেশে তালাবদ্ধ বাক্সগুলো খুলে গণনা শেষে জানানো হয়— মাত্র ৪ দিনে জমা হয়েছে ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা, যার বেশিরভাগই ১০০০ ও ৫০০ টাকার বড় নোট। হিসাব করলে দাঁড়ায়, দৈনিক গড়ে সাড়ে ৪ লাখ টাকা— অর্থাৎ মাসে সোয়া কোটি, বছরে প্রায় ১৬ কোটি টাকা! এই সংখ্যা প্রকাশ্যে আসার পরপরই মাজার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা পরিবারগুলো শত শত বছর ধরে লুটপাট করছে, এমন প্রচারণা জোরালো হয়ে ওঠে। সারওয়ার আলম বদলি হওয়ার পর তার অনুসারীরা প্রচার শুরু করেন যে, মাজারে হাত দেওয়ার কারণেই সুবিধাভোগী শ্রেণি তাকে সরিয়ে দিয়েছে।
কিন্তু এই ‘জাদুমন্ত্রের’ রহস্য ফাঁস হতে বেশি সময় লাগেনি। প্রথম দফার ১৯ দিন পর, গত ১১ জুলাই দ্বিতীয়বার মাজারের ডেগ ও দানবাক্স খোলা হলে দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। এবার ৪ বস্তায় মোট সংগৃহীত অর্থের পরিমাণ ৪৭ লাখ ১০ হাজার ১৫৩ টাকা, যা আগেরবারের চেয়ে বেশি ঠিকই, কিন্তু নোটের চরিত্র আমূল বদলে গেছে। সংখ্যার দিক থেকে বেশিরভাগই এবার ১০ ও ৫০ টাকার ছোট নোট। আর মাজার-সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী সাধারণ মানুষের অকৃত্রিম ভক্তি-ভালোবাসার প্রকৃত প্রতিচ্ছবি তো আসলে মেলে এই ছোট্ট নোটগুলোতেই। সিলেটের একজন বাসিন্দা, সুফিবাদ ও মাজার-সংস্কৃতির খোঁজখবর মানুষমাত্রই জানেন ওখানে যারা যান আর্থিক দিক থেকে তারা অবস্থায়।
এখানেই দাঁড়ায় আসল প্রশ্নটি। প্রথম দফায় মাত্র ৪ দিনে হাজার-পাঁচশর নোটের স্তূপ দেখে মানুষের মনে প্রশ্ন জেগেছিল— হঠাৎ এত ধনী মানুষ একসঙ্গে মাজারে টাকা বিলিয়ে গেলেন কীভাবে? আর ১৯ দিন পর যখন স্বাভাবিক ছোট নোটের আধিক্য দেখা গেল, তখন উল্টো প্রশ্ন ওঠে— প্রথম দফার সেই ‘হাজারি নোটের’ পেছনে কোন চাল লুকিয়ে ছিল? দুই দফার এই বিপরীতমুখী চিত্র থেকে একটা কথাই স্পষ্ট হয়ে যায় ৭০০ বছরের ঐতিহ্য ভাঙার পেছনে উদ্দেশ্য যতটা না ছিল ‘স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা’, তার চেয়ে ঢের বেশি ছিল মাজারের গায়ে একটি নির্দিষ্ট তকমা এঁটে দেওয়ার প্রশাসনিক-রাজনৈতিক কৌশল।
এই প্রচারণায় স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক মহলও যুক্ত হয়েছিল। জাতীয় পর্যায়ের একজন নেতা এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, সিলেটের মাজারে বছরে ১০০ কোটি টাকা দান হিসেবে ওঠে, যার ৯০ কোটিই দলীয়ভাবে লুটপাট হয়ে যায়, আর সারওয়ার আলম তা আটকাতে গিয়েই বদলি হয়েছেন। দুই দফার প্রকৃত হিসাব পাশাপাশি রাখলে এই দাবির অসারতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, সিলেটে মাজারের ‘স্বচ্ছতা’ নিশ্চিত করতে এবং সাবেক ডিসিকে ফিরিয়ে আনতে মাঠে যে অংশটি সক্রিয়, তাদের অনেকেরই দীর্ঘদিনের পরিচয় মাজারবিদ্বেষী ধারার রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে। মাজারে ‘অনৈসলামিক কর্মকাণ্ড’ হয়— এই অভিযোগ তুলে তারা বহু বছর ধরেই সিলেটে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে। ফলে স্বচ্ছতার প্রশ্নটি এখানে কতটা নিরপেক্ষ জায়গা থেকে উঠছে, তা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়।
এই উত্তুঙ্গু পরিস্থিতিতে অনেকে কিশোরগঞ্জের পাগলা মসজিদের সাথে শাহজালালের মাজারের তুলনা টানছেন। তাদের প্রশ্ন— পাগলা মসজিদের টাকা জেলা প্রশাসন প্রকাশ্যে গুনতে পারলে শাহজালালের মাজারের টাকা কেন পারবে না? প্রশ্নটি শুনতে যুক্তিসঙ্গত মনে হলেও, দুটি প্রতিষ্ঠানের আইনি কাঠামো সম্পূর্ণ ভিন্ন বলে এই তুলনা আসলে ধোপে টেকে না। পাগলা মসজিদ ‘ওয়াকফ এস্টেট’-এর অধীন একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, যা সরাসরি সরকারি কাঠামোর মধ্যে পড়ে বলেই এর টাকা জেলা প্রশাসন গণনা ও পরিচালনা করে। শাহজালালের মাজার কিন্তু ওয়াকফ এস্টেটের অধীন নয়, বরং এটি বংশপরম্পরায় নির্দিষ্ট পরিবারের রক্ষণাবেক্ষণে থাকা একটি আধ্যাত্মিক কেন্দ্র। শাহজালাল নিজে চির-অনূঢ় থাকায় তার সরাসরি রক্তসম্পর্কীয় উত্তরাধিকার নেই; বর্তমান পরিবারগুলো উচ্চ আদালতে তাদের উত্তরাধিকার সূত্র ও আইনগত অধিকার প্রমাণ করেই এই দায়িত্বে এসেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা মাজার কীভাবে পরিচালিত হবে এবং দানের অর্থ কীভাবে ব্যবহৃত হবে, এই প্রশ্নের উত্তর আজ কোনো অমীমাংসিত বিষয় নয়; বরং ২০১৪ সালে মহামান্য হাইকোর্ট কর্তৃক আইনিভাবে চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তিকৃত একটি বিষয়। ফলে এই রায় অগ্রাহ্য করে নিজের খেয়ালখুশিমত কিছু করার সুযোগ প্রজাতন্ত্রের কোনো কর্মচারীর থাকে না।
সিলেটের সাবেক জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম চাইলে আদালতের রায়ের আলোকে একটি সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দাঁড় করাতে পারতেন। সেই সুযোগ তার ছিল। কারণ আদালতের উল্লিখিত ছিল অর্থের ব্যবস্থাপনা। সেগুলো নিয়ে আপত্তি থাকলে বিধিবদ্ধ ও আইনি পথে আদালতের মাধ্যমে পরিবর্তন আনাও সম্ভব ছিল। কিন্তু তা না করে তিনি হুট করে শত শত বছরের রীতি ভেঙেছেন, যা সাময়িকভাবে জনসমর্থন আদায়ের কার্যকর কৌশল হলেও সরাসরি আদালতের রায়ের ব্যত্যয়। রাষ্ট্র ও সংবিধান অনুযায়ী আদালতের রায় বহাল থাকবে, আর একজন সরকারি কর্মচারী তা উপেক্ষা করবেন— এটি সুশাসন ও শুদ্ধাচারের লক্ষণ নয়। এমন প্রকাশ্য লঙ্ঘনের জন্য বরং তার বিভাগীয় শাস্তি হওয়া উচিত ছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে তাকে বদলি করার পরও নতুন ডিসি পদায়নেই সময় লেগেছে দুই সপ্তাহ— শাস্তির কথা তো তাই ভাবাই যাচ্ছে না।
শাহজালালের মাজারের অর্থ নিয়ে আলোচনায় প্রায় অনুপস্থিত একটি দিক হলো ব্যবস্থাপনা ব্যয়। রক্ষণাবেক্ষণকারী পরিবারগুলো আদালতের দেওয়া আইনি অধিকার অনুযায়ী প্রাপ্ত অর্থের একাংশ ব্যবহার করেন ঠিকই, কিন্তু প্রতিদিন শত শত মানুষের খাবার, লঙ্গরখানা পরিচালনা, বিপুল স্টাফের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য বড় খরচও এই অর্থ থেকেই নির্বাহ হয়। মাজার কর্তৃপক্ষ কখনো একে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে উপস্থাপন করেননি। এর একটা উদাহরণ হতে পারে, ওরস উপলক্ষে অন্য অনেক মাজারের মতো ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রচারণা এখানে চালানো হয় না; বরং অনুষ্ঠানের খবর জানা যায় গণমাধ্যমে, তা-ও প্রায়ই ওরস শুরুর ঠিক আগের দিন।
শাহজালালের মাজার নিয়ে আমাদের কারও পক্ষে-বিপক্ষে বিভক্ত হওয়া অনুচিত। যে স্বচ্ছতার আলোচনা শুরু হয়েছে, মাজারের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা লোকজনেরাও সে একই কথা বলছেন এখন। এখানে তারা সামনে আনতে চাইছেন হাইকোর্টের রায়। রায়ে যখন দিকনির্দেশনা আছে, তখন এর প্রতিপালনে সবাই বাধ্য। তবু কারও যদি বর্তমান কাঠামো নিয়ে আপত্তি থাকে, তার প্রতিকারের পথ খোলা আছে— উচ্চ আদালতে আপিল করে নতুন দিকনির্দেশনা আনা যায়। আইনসম্মত পথে যে পরিবর্তন আসবে, তা সবার কাছেই গ্রহণযোগ্য হবে। কিন্তু আদালতকে পাশ কাটিয়ে প্রশাসনিক জবরদস্তিকে সমর্থন করা সুশাসনের লক্ষণ নয়। মাজার-সংস্কৃতি, শত বছরের ঐতিহ্য এবং দেশের আইন ও আদালতের রায়ের পক্ষে দাঁড়ানোটাই এখানে মুখ্য বিবেচ্য— সস্তা পপুলিজম বা সাময়িক জনতুষ্টি কখনো দীর্ঘমেয়াদী ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে না।
শাহজালালের মাজারের রক্ষণাবেক্ষণ পরিবার ও ঐতিহ্যকেন্দ্রিক, আর পাগলা মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণ জেলা প্রশাসন ও ওয়াকফ এস্টেটের দায়িত্বে— দুটি ভিন্ন কাঠামোর প্রতিষ্ঠানকে একই মানদণ্ডে বিচার করা যায় না। এর বাইরে বাণিজ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত কমিটি যেহেতু মাজার ব্যবস্থাপনাসহ সার্বিক বিষয়ে কাজ করছে, তাদের সিদ্ধান্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করাই সংগত। শেষ কথা হলো শাহজালালের মাজার কোনো অর্থ উপার্জন বা পর্যটনকেন্দ্র নয়। একে সেই দৃষ্টিতে না দেখে সুফি ঘরানার মাজার-সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিক পরিমণ্ডল থেকে দেখাই সংগত। যেই মুহূর্তে এটাকে আমরা শুধু অর্থের নিক্তিতে মাপতে শুরু করি, সমস্যার শুরু ঠিক সেখান থেকেই; এটা এমন এক সমস্যা, যার আসলে কোনো সহজ সমাধান হয় না।
সিলেট, ১২ জুলাই ২০২৬
মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।
আপনার মন্তব্য