টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
Advertise
রাজু আহমেদ | ২২ জুলাই, ২০২৬
অতিরিক্ত সঞ্চয় প্রবণতা জীবনকে কঠিন করে তুলছে। আয়ু ও আয় বাড়ছে, আর বাড়ছে সঞ্চয়ের অঙ্ক। কেবল ভবিষ্যতের সুদিনের স্বপ্নে আমরা বর্তমানকে বঞ্চিত করে চলছি। দশ বছর পরে আমার কত সম্পদ হবে সে হিসেব করতে গিয়ে আমাদের অনেকেরই আজকের দিনের হিসেব মিলছে না। কর্মের শুরুতে আয় কম থাকে, ব্যয় বেশি। প্রতিবেশ ও প্রতিবেশীর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে, বন্ধু ও সহকর্মীর হাবভাব দেখে আয়ের বড় অঙ্ক সঞ্চয় করতে গিয়ে ফকিরের জীবনযাপন আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সব শখ হত্যা করছি। উপভোগকে উপেক্ষা করছি। সব রেখে দিচ্ছি যে ভবিষ্যতের জন্য সেই ভবিষ্যৎ আমাদের কাছে আদৌ ধরা দেবে কি-না সেটাও চরমভাবে অনিশ্চিত। ধরা দিলেও আমার শখ পূরণ, জীবন উদযাপন ও উপভোগের পক্ষে থাকবে কি-না সেটাও জানি না।
সঞ্চয়ের নেশায় জীবনের স্বাদ হারানোর যে প্রবণতা তা অন্যের দ্বারা প্রভাবিত করে। সহকর্মীদের সঞ্চয় দেখে সংক্রমিত হই। বন্ধুর সম্পদ দেখে ঈর্ষান্বিত হই। কেউ কেউ বোঝায়, এখন না তখনকার জীবন গুরুত্বপূর্ণ হবে। কাজেই যত পার তত সঞ্চয় করে যাও। এখন শ্রম দাও, দু'হাতে অর্থ কামাও। সব শখ-স্বপ্ন জমা রাখো। উপভোগ করবে জীবনের পড়ন্ত বেলায়। অথচ সম্পদ সঞ্চয়ের নেশায় কখন জীবনে ও যৌবনের সকাল গড়িয়ে যায়, দুপুর নিস্তেজ হয়, বিকেল উপভোগ করা হয় না— তা উপলব্ধি করতে পারি না। ঠিক সন্ধ্যায় অনুশোচনা হয়— গোটা দিনটাই তো ফুরিয়ে ফেললাম। সঞ্চয়ের পাহাড় যখন সামনে অনাবৃত হয় তখন দম্ভ করা ছাড়া ভিন্ন কোনো পথ খোলা থাকে না! কেবল জাহির করতে পারি— গাড়ি, বাড়ি আমারও আছে! তাতে প্রাণ আছে কি-না তা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না।
তারুণ্য, যৌবনের কাল উপভোগের। ক্ষণগুলো উদযাপনের। অথচ সম্পদ অর্জনের ব্যস্ততায় ভোরের বাতাস উপভোগ করা হয় না, রাতের জোছনা ধরা দেয় না। সম্পদ ও সঞ্চয়ের নেশায় ডুবে তখন ধ্যানে-জ্ঞানে আয়ের প্রবণতা। যাকে একবার সঞ্চয়ের নেশায় ধরে সে ডান-বাম ভুলে যায়। বৈধ-অবৈধ তার কাছে গৌণ হয়ে দাঁড়ায়। তার জীবনের গল্পে হন্যে হয়ে ওঠে ব্যবসায়িক বিনিয়োগে। সঞ্চয়পত্রে সে সুখ খোঁজে। ডিপিএসের সংখ্যায় সে প্রশান্তি মাপে। প্রতিবেশীদের থেকে তার বেশি লাগবে, বন্ধুর থেকে তাকে এগিয়ে থাকতে হবে কিংবা সহকর্মীদেরকে টেক্কা দিয়ে তার নিজেকে জাহির করতে হবে— জীবনের কাছে তার এগুলোই চাওয়া। আমার এই আছ, সেই আছে— এটা বলার মধ্যে সে দম্ভ অনুভব করে। অথচ অতিরিক্ত সঞ্চয়ের নেশায় সে যে জীবনের পথ হারিয়েছে তা কৈশোরে, তারুণ্যে কিংবা যৌবনে একবারও মনে আসে না। প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছে যে হয়তো বোঝে, অতীতে বিলকুল ভুল করে এসেছে।
তখন বার্ধক্যে ওষুধ ছাড়া আর কিছু সঙ্গী থাকে না। একাকীত্ব ছাড়া আর কিছু সঙ্গ দেয় না। শক্তি তাকে আর পথ দেখায় না। সম্পদের পাহাড়ের মধ্যে থেকেও পূরণযোগ্য কোনো শখের সাক্ষাৎ মেলে না। অহংকার ছাড়া আর কিছু বেঁচে থাকে না। পরিবেশের ধোঁকায় পড়ে সঞ্চয়ের যে নেশায় উন্মাদ হয়ে সম্পদ জমিয়েছিল সে সম্পদের দুশ্চিন্তায় ঘুম ছেড়ে যায়, স্বস্তি চলে যায়। অসময়ের সম্পদ শান্তি দিতেও জানে না। কাজেই যৌবনে কোনো ধোঁকায় পড়ে, প্রলোভনে ভুলে সীমাহীন সঞ্চয় প্রবৃত্তির মতো আত্মঘাতী ডুবোচরে আটকে যাওয়া যাবে না। শখগুলোকে প্রাধান্য দিতে হবে। স্বপ্নগুলোকে স্পর্শ করতে হবে। সঞ্চয়ের যে রূপ বর্তমানে মানুষকে কৃপণ বানায়, জীবনকে নীরস করে এবং সততাকে জলাঞ্জলি দেয় তা থেকে দূরে থাকা জরুরি। কখনও কখনও সম্পদ থাকার চেয়ে না থাকা কল্যাণের।
সঞ্চয় হবে সামর্থ্যের মধ্যে সীমিত। কাউকে দেখে সঞ্চয়ের নেশায় বুঁদ হওয়া যাবে না এখানে আয়ের ধরণ বিচিত্র বৈচিত্র্যের। কাজেই অমুক তমুক করছে, আমাকেও তাই করতে হবে? না। স্ব-সামর্থ্যের ওপর ভর করতে হবে। আয়ের সীমিত অংশই হবে সঞ্চয়। কেননা জীবনটা দুঃখের বাণিজ্য নয়। যারা সবটা সঞ্চয় করার প্রবণতা দেখায় তারা বর্তমানকে ঝুঁকিপূর্ণ করে। জীবনের এই সময়কে বঞ্চিত করে কেবল ভবিষ্যৎ? অথচ ভবিষ্যৎ চিন্তা সুখগুলোকে মুকুলেই হত্যা করে। রাষ্ট্র চায় তার সঞ্চয় বাড়ুক। সে সম্পদে ধনী হতে চায় কিন্তু তাতে নাগরিকদের মানসিক দীনতা তৈরি হয়। আমাদের মধ্যে সূক্ষ্ম আনন্দ কেনার কোনও লক্ষণীয়ভাব নাই। আমরা সম্পদের মতো স্থূল আনন্দ কিনতে মরিয়া। এই লোভের তো সীমা-পরিসীমা নাই। কাজেই কেবল সম্পদের নেশায় দিল দেউলিয়া করি। অথচ ভালোবাসা, সুখ কিংবা প্রশান্তির জন্যও দিওয়ানা হতে পারতাম।
আহারে জীবন, আহা জীবন! জীবনটাকে কেবল ভবিষ্যতের জন্যই রেখে দিতে চাই। ভাবনায় কেবল আগামী। অথচ আমার কাছে যে একটা জীবন্ত জীবন আজ আছে সেটা সম্পর্কে উদাসীনতা দেখাই। সবকিছুই আগামীকালের জন্য জমা রাখতে গিয়ে আজকের ভালোবাসাটুকু পাই না, দেইও না। কাল শখ পূরণ করবো বলে রেখে দেই, অথচ কাল তো আমার থাকে না। এভাবেই সুখের পথে ঝুঁকি বাড়াই। দিন দিন বঞ্চনার তালিকা স্থূল করি। আমাদের সুখ জমা থাকে ব্যাংকের ভল্টে, ইট-পাথরের খুপরিতে কিংবা যান্ত্রিকতার জীবনে। যা কখনো আমার আপন হয়ে ওঠেই না। দু'দিনের জীবন তৃতীয় দিনে উপভোগ করার জন্য মোড়ক আবদ্ধ করে রেখে যাই। একজীবনে হয়তো তা স্পর্শ করা হয়েই ওঠে না।
সমাজ শেখাচ্ছে, সম্পদশালী হতে হবে, রাষ্ট্র শেখাচ্ছে, পাশেই তোমার প্রতিযোগী। তার সাথে পাল্লা দাও। কেউ বলছে না, সময়টাকে উপভোগ করে যাও! তোমার মনও কী কিছু বলছে না? সঞ্চয় প্রয়োজন, কিন্তু সঞ্চয়ের জন্য জীবন নয়। ভবিষ্যতের নিরাপত্তা যেমন জরুরি, তেমনি বর্তমানের হাসি, ভালোবাসা, স্বপ্ন আর উপভোগও সমান মূল্যবান। যে সম্পদ আজকের জীবনকে নিঃস্ব করে, সে সম্পদ কখনো প্রকৃত প্রাচুর্য এনে দিতে পারে না। জীবনের সবচেয়ে বড় সঞ্চয় ব্যাংকের হিসাবে নয়, স্মৃতি, সম্পর্ক ও প্রশান্তির ভাণ্ডারে।
মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।
আপনার মন্তব্য