টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
Advertise
জাকিয়া সুলতানা মুক্তা | ২৩ জুলাই, ২০২৬
২০২৬ সালে নৃত্যে একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থি আহমেদের বয়স সম্ভবত ৩০-৩৫ বছর। এত অল্প বয়সেই নৃত্যে অবদান রাখার জন্য রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পদকপ্রাপ্তির বিষয়টি কারোরই ভালো লাগেনি। হতে পারে পুরষ্কার পাওয়ার মতো যোগ্যতা তার রয়েছে। শান্তিতে নোবেলের মতন বৈশ্বিক পুরষ্কার যখন একটা বক্তৃতা দিয়েই বারাক ওবামা পেয়ে যেতে পারেন কিংবা মেয়েদের স্কুলে যাওয়াকে কেন্দ্র করে লেখালেখির কারণে মালালা ইউসুফজাই যদি নোবেল শান্তি পুরষ্কারে ভূষিত হতে পারে, সেখানে এই নারী তো বহু কাজ করেছেন। সুতরাং পেতেই পারেন পুরষ্কার। তাই এ নিয়ে ভাবিনি।
গত কয়েকদিন থেকেই তার এই ঘনঘটা আয়োজন নিয়ে একটা ছোট্ট ভিডিও ফেসবুক স্ক্রল করলেই চোখে পড়ছিল। প্রথমে আমি ভেবেছি এটা বুঝি চারুকলার আয়োজনে করা কোনো কিছু। যেহেতু পেছনে ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে দেখাচ্ছিল চারুকলার বকুলতলা। পরে জেনেছি ওটা মূলত নৃত্যশিল্পী অর্থি আহমেদের নৃত্য একাডেমি "অর্থি আহমেদ ডান্স একাডেমি" ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের যৌথ প্রয়াসে করা। প্রায় ৩০০ ওপরে অপেশাদার নৃত্যশিল্পীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং অর্থি আহমেদের পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় অনুষ্ঠানটি আয়োজিত হয়। এই অনুষ্ঠানটির কোনো স্পন্সর ছিল না, স্বতঃস্ফূর্ত কেউ করলে করেছেন। বাকিটা অর্থি আহমেদের একাডেমি বহন করেছে। উলটো বন্যার্তদের সহযোগিতার জন্য এই আয়োজনের থেকে সংগৃহীত অর্থ পাহাড়ের বন্যা-দুর্গতদের বিতরণের উদ্দেশ্যে "জাগো ফাউন্ডেশন" নামক একটি এনজিও এই আয়োজনের সাথে মানবিকভাবে যুক্ত ছিল।
এই ইতিহাস শোনার পর আমার মনে যতসব দুষ্টু প্রশ্ন আসতে শুরু করল। জানি না কেন? এজন্য আমি লজ্জিত ও দুঃখিত হবো কিনা ভাবছি। কিন্তু প্রশ্নগুলো তো মাথায় ঘুরছে, এটাও তো মিথ্যা নয়। তো বলেই ফেলি!
ক. ২০২০ সাল থেকে ডান্স একাডেমি চালানো একটা একাডেমি এত বড় আয়োজন এত মহাসমারোহে করার মতন যোগ্য হয়ে গেল, এমনকি স্পন্সরবিহীন কাজ করার মতন এত ব্যাপক আয়োজন করা সম্ভব? আমি ঠিক জানি না আদতেই এতটা সম্ভব কীভাবে? এরকম অসাধ্য সাধনের গল্প জুলাইয়ের পর জুলাইয়ের বহু পোস্টার গার্ল/পোস্টারবয়দের কাছ থেকে শুনছি। সম্ভব না হওয়ার কারণ নেই। হয়েছে তাতো দেখাই যাচ্ছে। এখন ভাবছি ঠিক উপায়খানা কী? সবাই দেখি শাবানা ম্যাডামের মতন সেলাই মেশিন চালিয়ে কিংবা জসিম সাহেবের মতন চানাচুর বিক্রি করেই বড়লোক বনে যায় আজকাল। যেন এদেশে আর যে-কোনো কিছু করার চেয়ে অর্থ ও সম্পদশালী হওয়া বেশি সহজ ব্যাপার! শুধু আমাদেরই অর্থ-কড়ির দেখা নাই। আমরা গরিব, ঈর্ষাকাতর!
খ. ছায়ানট থেকে নৃত্যশিক্ষা নেওয়া অর্থি আহমেদ যেদিন ছায়ানট, উদীচী পুড়িয়ে দিলো; সেদিন নৃত্যশিল্পী হিসেবে ঠিক কী প্রতিবাদী ভূমিকা রেখেছিলেন? সবকিছুর পরেও শিক্ষাগুরুর একটা মর্যাদা তো থাকেই, না? তো কী পরিকল্পনা ওনার এসব বিষয়ে? নাকি নৃত্যে তার পাওয়া পদক নিয়ে নৃত্যশিল্পীদের সমালোচনার কারণে তিনি এসব প্রসঙ্গ এড়াতে চেয়েছেন? কোনটা?
গ. যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের বকুলতলায় তিনি এত বড় আয়োজন করেছেন, সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৬ সালের ২২ জুন অনুষ্ঠিত ডিনস কমিটির একটি সভায় ‘বিবিধ’ অংশে প্রাথমিক প্রস্তাবে; পূর্বে একই মূল কাঠামো থেকে সৃষ্ট বা সমজাতীয় ৮টি বিভাগকে পুনর্বিন্যাস করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। সেখানে কলা অনুষদের পরিবেশন শিল্পকলা অংশ, যথাক্রমে 'থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ' বিভাগ, সংগীত বিভাগ এবং নৃত্যকলা বিভাগ— এই তিনটি বিভাগকে একীভূত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। শিল্প-সাহিত্য চর্চার মূলধারার কেন্দ্রগুলোতেই শিল্প-সাহিত্যচর্চার ওপর এই যে অভাবনীয় আঘাত আসার রাস্তা সৃষ্টি হয়েছে, এ ব্যাপারে নৃত্যশিল্পী অর্থি আহমেদের কী মনোভাব? নাকি এসব ভারি ভারি বিষয়ে যাওয়ার ইচ্ছা বা আগ্রহ কোনটাই তার নেই? সময়ও হয়তো, নাকি?
ঘ. বিভিন্ন মানবাধিকার ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরবর্তী মাসগুলোতে গ্রামীণ লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত বহু লোকশিল্পী ও নৃত্যশিল্পী কর্মহীন হয়ে পড়েন এবং সামাজিক নিরাপত্তার অভাবে তীব্র ভয়ের মধ্যে এখন তারা দিন কাটাচ্ছেন। এসব ক্ষেত্রে নৃত্যশিল্পী অর্থি আহমেদের কোনো নিজস্ব বয়ান কি কারোর সামনে পরিলক্ষিত হয়েছে? হলে জানাবেন! আমি জানতে আগ্রহী। তিনি একুশে পদক পেয়েছেন, নৃত্য ও নৃত্যশিল্পীদের প্রতি তার নিশ্চয়ই একটা দায়বদ্ধতা রয়েছে। তিনি অবশ্যই কিছু না কিছু করেছেন বা করার পরিকল্পনা তার থেকে থাকবে। কী সেগুলো?
ঙ. নৃত্যশিল্পী হিসেবে শুধু "Art's for art sake" অর্থাৎ "শিল্পের জন্য শিল্প" সৃষ্টি তিনি করতে চাননি। এটা স্পষ্ট। কেননা নাচ শেখার সংজ্ঞাটাই তিনি পালটে দিয়েছেন। এটা সত্যিই অসাধারণ। আমি ভূয়সী প্রশংসা করছি এই বিষয়টির। নাচ যে ভালো থাকার মাধ্যম রূপে তিনি হাজির করেছেন তার এই কয়েক বছরের কর্মের মাধ্যমে, তা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু কথা হলো, "Art's for life sake" মানে "জীবনের জন্য শিল্প" ঘরানার অভিযাত্রী হিসেবে নিজের যাবতীয় কাজকে মূল্যায়িত হওয়ার চেষ্টা করে, অপরের এতগুলো ভয়ানক দৃষ্টান্তে তিনি নিশ্চুপ কেন? কিংবা যথেষ্ট সক্রিয় নন কেন?
সর্বশেষে বলি শোনেন! অবশ্যই নাচ যে-কোনো সময়ে যে-কোনো বয়সে শেখানোর বার্তা নিয়ে নৃত্যশিল্পী অর্থি আহমেদ তার নৃত্য প্রশিক্ষণের যাত্রা শুরু করেছেন, এটার একটা মনস্তাত্ত্বিক উদ্দীপনা রয়েছে। কিন্তু এই উদ্দীপনায় উদ্দীপিত হওয়ার উদ্দিষ্ট গ্রাহক কারা? মানে দর্শক-শ্রোতা-অংশগ্রহণকারী হবেন কারা? কাদের মনের ভার নির্ভার করার উদ্দেশ্যে কাজে লাগবে এই একাডেমির মূল লক্ষ্য? একেবারেই কর্পোরেট এলিট দুনিয়া! যাদের কাছে কর্পোরেট কালচারের দমবন্ধ ভুবন থেকে খানিক সময়ের জন্য নাচ-গানের নামে, হাত-পা ছোঁড়াছুড়ি মন ভালো থাকার উদ্দীপক হিসেবে ঠিক বিষয়, ভালো বিষয়। এরা কেউ নিজেদের কর্পোরেট দুনিয়ার ঝাঁ-চকচকে আলিশান বাসা থেকে নেমে নৃত্যের জন্য অর্থাৎ শিল্পের জন্য প্রাণান্তকর দর্শন ধারণ করবে না। এরা সাময়িক আনন্দ-উন্মাদনার ভিড়ে খুশি। আবার দুইদিনের মজা শেষে যে যার কাজে চলে যাবে। এটা কর্পোরেট কালচারের মনস্তাত্ত্বিক মুক্তির জন্য খারাপ না। আমি একে উৎসাহ দিতে চাই।
কিন্তু এখানে আমি যে বিষয়টা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে চাই, তা হলো— একটা দেশ ও সমাজের বহুস্তরিক জনগোষ্ঠীর জন্য শুধু কর্পোরেট-কেন্দ্রিক শিল্পচর্চা, তাও একেবারেই উদ্দেশ্যভিত্তিক (Art's for life sake) শিল্পচর্চার দর্শনকে এত উৎসাহের সাথে প্রণোদিত করার রাষ্ট্রীয় সমর্থনের পেছনের দর্শনটা ঠিক কী? কেন দেশের অপরাপর শিল্পচর্চার (যেমন বাউল গান ও দর্শন চর্চা) মাধ্যমগুলোকে সংকুচিত করানোতে রাষ্ট্রের এত উৎসাহ? আর এখানে প্রণোদনার ব্যবস্থা রাখা?
আমি ধারণা করি, রাষ্ট্র একটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ দর্শনের দিকে ঝুঁকছে, যা আবহমান বাংলার শিল্প-সাহিত্যচর্চার, আমাদের বাঙালি জীবনব্যবস্থার বিপরীতশক্তিকে শক্তি যোগাচ্ছে। তা হলো অন্তর্ভুক্তিমূলক সাংস্কৃতিক পরিবেশের নামে রাজধানীকেন্দ্রিক কর্পোরেট কালচারকে সামনে রেখে, গোটা দেশের শিল্প-সাহিত্যচর্চার পরিবেশের টুঁটি চেপে ধরা। নিয়ন্ত্রিত এই পরিবেশে পুরো দেশ শিল্পের জন্য শিল্প সৃষ্টি প্রয়াসে থাকবে না আর, ইস্যুভিত্তিক জীবনের জন্য শিল্পের এই সংকীর্ণ শিল্পদর্শনেই আবর্তিত হবে। এটা কখনোই কাম্য নয়।
আমরা আমাদের দেশকে পাকিস্তানের কিংবা পশ্চিমা ডিপস্টেটের প্রেসক্রিপ্টেড আদলে দেখতে চাই না। পাকিস্তানে যেমন উগ্রবাদী জঙ্গি গোষ্ঠীও আছে, আবার শিল্পচর্চার নিমগ্ন এলিট শ্রেণিও আছে। ওটাকে অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ বলে না। কেননা ওখানকার সর্বসাধারণের ক্ষেত্রে উগ্রগোষ্ঠীর রক্তচক্ষু সার্বক্ষণিক বিদ্যমান। এলিট শ্রেণির জন্য নয়। আমাদের দেশেও এরকম পরিবেশ দেখিয়ে দেশটাকে অন্তর্ভুক্তিমূলক দেখানোর এই প্রচেষ্টা রয়েছে এই ঘটঘটা আয়োজনের মধ্যে। একে অত্যন্ত নিরীহদর্শন সাংস্কৃতিক উৎসবের আড়ালে ভয়ানক এক মেটিকুলাস ডিজাইনের আগ্রাসী সাংস্কৃতিক দর্শনতাড়িত ডিপস্টেটের ষড়যন্ত্র না ভাবার কারণ দেখি না। সত্য দাবি করছি না, তবে আশঙ্কা করছি। আশঙ্কা করছি রাষ্ট্রের এই উৎসব ও উৎসবের পেছনের ব্যক্তিবর্গের প্রতি অত্যধিক প্রণোদনা দেওয়ার বিষয় লক্ষ্য করে। আমরা চাই সারাদেশের শিল্পীসমাজকেই সমান গুরুত্বের সাথে রাষ্ট্র দেখুক। প্রণোদনায় আনতে হলে দীর্ঘদিন সাধনায় নিমগ্ন শিল্পীসত্তার প্রতি করা হোক। তা না করে কেবল সুনির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীকে প্রণোদিত করলে এদেশের শিল্পচর্চা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। শিল্পীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর শিল্প-সাহিত্যবর্জিত সমাজ হবে এক সভ্যতাবিবর্জিত সংকীর্ণচিত্তের সমাজ। এটা কাম্য নয়।
মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।
আপনার মন্তব্য