টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
Advertise
কবির য়াহমদ | ৩১ জুলাই, ২০২৬
জুলাইজুড়ে এনসিপির ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচি মাঠের রাজনীতিতে অনেকটাই অনালোচিত ও গুরুত্বহীন ছিল। নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর কিছু বক্তব্য ছাড়া এ দলের নেতারা কোথায় কী বললেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা দেখা যায়নি। তবে হবিগঞ্জে প্রবেশ করতেই দৃশ্যপট হঠাৎ বদলে গেছে; প্রহৃত হওয়ার ঘটনায় তারা পুরো রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ ছড়িয়ে দিতে পেরেছে। এনসিপির দাবি, এই হামলা চালিয়েছে ছাত্রদল ও যুবদল, আর এর নেপথ্যে তারা দায়ী করছে সরকারি দলের হুইপ জি কে গউসকে। তবে স্থানীয় বিএনপি বলছে, হামলার সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
হবিগঞ্জে স্থানীয়দের হাতে এনসিপি নেতারা প্রহৃত হওয়ার পরদিন যে পাল্টা কর্মসূচি দেয়, তা তাদের রাজনৈতিক বিচক্ষণতারই প্রকাশ। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করলেও এনসিপির নেতারা দমে না গিয়ে হবিগঞ্জে ঢোকার যে চেষ্টা চালিয়েছেন, তা সবার দৃষ্টি কাড়ে। রাস্তায় একের পর এক পুলিশি ব্যারিকেড ভাঙা, পুলিশের সঙ্গে তর্ক-বিতর্ক ও ধস্তাধস্তির পর শহরে ঢুকতে না পেরে যখন তারা রশিদপুর গ্যাসফিল্ড সংলগ্ন সড়কে অবস্থান নিয়ে বসে পড়েন, তখন রাজনৈতিক কৌশলে তারা বেশ কিছুটা এগিয়ে গিয়েছিলেন।
তবে রাজনৈতিক অর্জনের সেই সুযোগটি তারা শেষ পর্যন্ত কাজে লাগাতে পারেননি। কারণ, সে রকম রাজনৈতিক স্থৈর্য ও সাহসের ঘাটতি ছিল তাদের মাঝে। রশিদপুরের রাস্তায় তারা যদি অনড় অবস্থান নিয়ে একটি রাত কাটিয়ে দিতে পারতেন, তবে স্থানীয় প্রশাসনের ওপর তৈরি হওয়া চাপ সরাসরি কেন্দ্রে গিয়ে পৌঁছাত, অচল হয়ে পড়ত ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক। রাজপথের এই অচলাবস্থা খোদ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বাধ্য করত হস্তক্ষেপে; হয়তো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজে কিংবা স্থানীয় প্রতিনিধি ও হুইপকে তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে হতো। কিন্তু এনসিপি মাঠের সেই মোমেন্টাম ধরে রাখতে পারেনি। এর কারণ হতে পারে ঢাকার বাইরে অবস্থান নেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় লোকবল না থাকা অথবা মাঠের রাজনীতির অনভিজ্ঞতা। রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশের শুরু থেকেই প্রথাগত লড়াইয়ের স্বাভাবিক নিয়ম এড়িয়ে দ্রুত অনেক কিছু পেয়ে যাওয়ার কারণে রাজপথের দীর্ঘ সংগ্রামের যে শিক্ষা, তা তাদের অভিজ্ঞতার ঝুলিতে ছিল না। তবে ধারণা করা যায়, এই অবস্থান যদি ঢাকা শহরে হতো, তবে তা দীর্ঘ একটা অবস্থানে রূপ নিত।
হবিগঞ্জে কর্মসূচি পালন করতে না পেরে পরে তারা মামলা করতে শহরে ঢুকতে চাইলেও ব্যর্থ হন। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় একটি পুলিশ ক্যাম্পে গিয়ে তাদের মামলার আবেদন জমা দিয়ে আসতে হয়। এই মামলা করার প্রক্রিয়ায় এনসিপির প্রাপ্তি কিছু নেই, বরং কৌশলগত জয় হয়েছে এখানে সরকার ও প্রশাসনের। কারণ, তারা সহজে প্রমাণ করার সুযোগ পেল যে, ‘দেশে মামলা করা যাচ্ছে না’— এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। ফলে ‘প্রশাসন বিএনপির পক্ষে কাজ করছে’ এনসিপির এই দাবিও স্রেফ রাজনৈতিক অভিযোগে পরিণত হলো।
হবিগঞ্জের আলোচনা শেষ হওয়ার আগেই সিলেটের গোলাপগঞ্জে আবারও হামলার মুখে পড়ে এনসিপি। সেখানে ‘ভুয়া-ভুয়া’ ধ্বনি, গাড়ির কাচ ভাঙচুর কিংবা পাঁচমাইলে ঢিল ছোঁড়ার ঘটনাগুলো মূলত ঘটিয়েছে বিএনপির প্রান্তিক পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। অথচ সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলেছিলেন, এনসিপির নেতারা কটু কথা বললেও যেন কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখানো হয়। সভাপতির এই নির্দেশ উপেক্ষা করে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের নির্বাচনী এলাকায় হামলা প্রমাণ করে, তৃণমূলের ওপর শীর্ষ নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ নেই অথবা এনসিপির ওপর তাদের প্রান্তিক পর্যায়ের নেতাকর্মীরা কতটা সংক্ষুব্ধ।
তবে হামলা ও নানা বাধা পার করে সিলেটের সীমান্তবর্তী উপজেলা কানাইঘাটে এনসিপির জনসভা রূপ নেয় এক বিশাল গণজমায়েতে। ধারণা করা যায়, পুরো ‘জুলাই পদযাত্রার’ মধ্যে এটিই ছিল এনসিপির সবচেয়ে বড় জনসভা। এর পেছনে মূল অনুঘটক ছিল দুই দিনের উত্তপ্ত ঘটনাপ্রবাহ, গণমাধ্যম কাভারেজ এবং বিএনপি-বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির উপস্থিতি। কানাইঘাট ধর্মভিত্তিক দলগুলোর শক্ত ঘাঁটি; একদিকে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক দলগুলোর শক্ত অবস্থান, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীও এখানে বেশ সুসংগঠিত। জনসভায় অংশগ্রহণকারীদের পোশাক ও টুপি-পাঞ্জাবির আধিক্য প্রমাণ করে, বিএনপির বিরুদ্ধে এনসিপির সাম্প্রতিক বক্তব্য ও হামলা এই অংশটিকে মাঠে নামতে উদ্বুদ্ধ করেছে। এছাড়া কানাইঘাটে এনসিপির কর্মসূচির আগে শহরে একটি শোডাউনও করেছে জামায়াতে ইসলামী। জামায়াত নেতারা মঞ্চে না গেলেও কিংবা প্রকাশ্যে কিছু না বললেও, এনসিপির জনসভার স্থান আগে পরিদর্শনের মাধ্যমে কার্যত নিজেদের উপস্থিতির ইঙ্গিত দিয়ে গিয়েছিলেন।
এনসিপি এখন তাদের বক্তব্য-বিবৃতিতে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার। অথচ সরকার তাদের প্রতি যথেষ্ট নমনীয়, সদয় ও সহযোগিতামূলক মনোভাব দেখাচ্ছে। কিন্তু রাজপথে তৃণমূল পর্যায়ের বিএনপির নেতাকর্মীরা এনসিপির প্রতি চরম সংক্ষুব্ধ। সংসদে এনসিপি জামায়াতের সঙ্গে মিলে ‘আধা-সরকারি বিরোধী দল’ হিসেবে ভূমিকা রাখলেও, মাঠের রাজনীতিতে তাদের মূল লড়াই জমছে বিএনপির সঙ্গেই। জামায়াত নেতারা দীর্ঘদিন ধরে সরকারি দলের নানামুখী সমালোচনা করলেও তা রাজনীতিতে আলোচনার জন্ম দিতে পারেনি; অথচ ছোট্ট একটি দল হয়েও এনসিপি তা পেরেছে। হবিগঞ্জ ও গোলাপগঞ্জে বিএনপির প্রান্তিক কর্মীদের এই সংক্ষুব্ধ ও আগ্রাসী প্রতিক্রিয়াই তার বড় প্রমাণ।
৩১ জুলাই ২০২৬
মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।
আপনার মন্তব্য