টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
Advertise
কবির য়াহমদ | ১০ আগস্ট, ২০২৬
বাংলা একাডেমি বাংলাদেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জাতীয় মননচর্চার স্মারক প্রতিষ্ঠান। ‘বাংলা একাডেমি লেখক অভিধান’-এর পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত সংস্করণ প্রকাশের উদ্যোগ নিশ্চিতভাবেই প্রশংসনীয় এবং সময়োপযোগী। তবে ৯ আগস্ট ফেসবুক পেজে প্রকাশিত তথ্য আহ্বানসংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তিতে একাধিক নীতিগত, প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা ত্রুটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনা তৈরি হয়। পরে সমালোচনার মুখে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের পক্ষ থেকে ‘স্পষ্টীকরণ ও ব্যাখ্যা’ প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু তাদের এই প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাখ্যা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় উত্থাপিত মৌলিক প্রশ্নগুলোর প্রজ্ঞাপূর্ণ উত্তর না দিয়ে কেবল আমলাতান্ত্রিক সাফাই গাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
বাংলা একাডেমি তাদের ব্যাখ্যায় দাবি করেছে— ৩১ ডিসেম্বর ১৯৯০ পর্যন্ত জন্মসীমা নির্ধারণের বিষয়টি নাকি “কাজটাকে সম্ভবপর করে তোলার জন্য গৃহীত একটা সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত”, কোনো “লেখকের বয়স নির্ধারণজনিত” বিষয় নয়। তারা যুক্তিস্বরূপ ২০০৮ সালের আগের সংস্করণের উদাহরণ টেনে ২০ বছরের কিস্তিবন্দি হিসাব দিয়েছেন। কিন্তু সাহিত্য বা সৃজনশীলতার বিকাশ কি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ক্যালেন্ডারের কিস্তিতে বাঁধা সম্ভব? সাহিত্যকে কি সিভিল সার্ভিস বা সরকারি চাকরির ব্যাচভিত্তিক জ্যেষ্ঠতার তালিকায় রূপান্তর করা যায়? অভিধান যদি সমকালীন সাহিত্য ও লেখকদের বস্তুনিষ্ঠ প্রতিনিধিত্ব করতে চায়, তবে মূল মানদণ্ড হওয়া উচিত ‘সাহিত্যিক অবদান’, কৃত্রিম বয়সসীমা নয়। বিশ্বসাহিত্য তো বটেই, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসেও সুকান্ত ভট্টাচার্য (২০ বছর ৮ মাস), সোমেন চন্দ (২১ বছর), আবুল হাসান (২৮ বছর) কিংবা রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর (৩৪ বছর) মতো তরুণ বয়সে কালজয়ী সাহিত্য সৃষ্টির দৃষ্টান্ত ভূরি ভূরি। বাংলা একাডেমির কৃত্রিম বয়সের ফিতায় ফেলে সুকান্ত-আবুল হাসানদের কি তবে তারা এই অভিধানে জায়গা দিত না? তাছাড়া, দীর্ঘ ১৮ বছর পর যে প্রতিষ্ঠান মাত্র ২০ বছরের প্রজন্ম-ব্যবধান কাভার করতে পেরেছে, তাদের “পরবর্তী খণ্ডে যুক্ত করা হবে” আশ্বাসের বাস্তব অর্থ হলো ১৯৯০ সালের পর জন্ম নেওয়া তরুণ লেখকদের পরবর্তী সংস্করণের জন্য হয়তো আরও দুই দশক অপেক্ষা করতে হবে!
বিজ্ঞপ্তিতে লেখকদের প্রাথমিক থেকে উচ্চতর শিক্ষার সব পাবলিক পরীক্ষার সনদপত্র জমা দেওয়ার যে বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছিল, সে বিষয়ে বাংলা একাডেমি এক অদ্ভুত ব্যাখ্যা দিয়েছে। তাদের দাবি, লেখকরা নাকি পাসের সাল ও স্কুলের বানানে ভুল করেন, তাই সঠিক বানান ও তথ্যের যথার্থতা নিশ্চিত করতেই এই দাপ্তরিক দলিল চাওয়া হয়েছে! এ ব্যাখ্যা একটা জাতীয় প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে দেশের লেখক ও বুদ্ধিজীবী সমাজের প্রতি চরম অবমাননাকর ও অপমানজনক দৃষ্টিভঙ্গি। বাংলা একাডেমি প্রকারান্তরে ধরে নিচ্ছে দেশের কবি-সাহিত্যিকেরা নিজেদের স্কুলের নাম বা পাসের সাল সঠিকভাবে লিখতেও অক্ষম, তাই ‘দাপ্তরিক দলিল’ দিয়ে তাদের সত্যতা প্রমাণ করতে হবে! কবি-লেখক-সাহিত্যিকদের প্রতি এটা কোনো সম্মানজনক প্রক্রিয়া হতে পারে না।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, প্রথাগত উচ্চশিক্ষার সনদপত্রের সাথে সাহিত্য সৃষ্টির কোনো সম্পর্ক নেই। বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি ছাড়াই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বমঞ্চে নিয়ে গেছেন এবং নোবেল অর্জন করেন। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দশম শ্রেণির গণ্ডি পার হতে পারেনি। অর্থাভাবের কারণে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের এফএ পড়া বন্ধ হয়ে যায়, অথচ তিনি ‘অপরাজেয় কথাশিল্পী’। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বা তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়েরও প্রথাগত উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন হয়নি। আল মাহমুদ, কবি হেলাল হাফিজ এবং আরও অনেক লেখকের ক্ষেত্রেও প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রির তোয়াক্কা না করে নিজস্ব প্রজ্ঞায় কালজয়ী সাহিত্য রচনার প্রমাণ আমরা পাই। একজন গবেষকের জানার প্রয়োজন হতে পারে লেখকের অ্যাকাডেমিক ইতিহাস কী, যা কেবল তথ্যে উল্লেখ থাকলেই যথেষ্ট। কিন্তু সেই তথ্যের সত্যতা প্রমাণের জন্য চাকরিপ্রার্থীর মতো সনদের অনুলিপি জমা দেওয়া আবশ্যিক করা মূলত বাংলা একাডেমির নিজেদের তথ্য যাচাইয়ের গবেষণাগত দায়ভার লেখকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ারই শামিল।
‘মানসম্পন্ন প্রকাশিত গ্রন্থ’ প্রসঙ্গে বাংলা একাডেমি জানিয়েছে, কোনো গ্রন্থ মানসম্পন্ন কি না তা তাদের একটি সম্পাদনা পরিষদ মূল্যায়ন করবে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, এই ‘মানসম্পন্ন’ শব্দের প্রাতিষ্ঠানিক ও বস্তুনিষ্ঠ মাপকাঠি কী? সংজ্ঞার্থহীন ও অস্পষ্ট শর্ত সবসময়ই স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক পছন্দ-অপছন্দ ও বৈষম্যের সুযোগ তৈরি করে। অভিধানের মূল কাজ একজন লেখকের সাহিত্যিক পরিচিতি, তার গ্রন্থপঞ্জি, বিষয়বস্তু, পুরস্কার ও মূল অবদান উপস্থাপন করা। কিন্তু বাংলা একাডেমি পিতা-মাতার নাম, স্বামী/স্ত্রীর নাম, ঠিকানা, হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র ও সকল সনদপত্রের ফাইল দাবি করে সাহিত্যিক পরিচিতির আড়ালে একজন মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের কঙ্কাল উন্মোচন করতে চাইছে। কিন্তু সবচেয়ে উদ্বেগজনক ও ঝুঁকিপূর্ণ দিক হলো ‘ডেটা প্রাইভেসি’ বা তথ্য সুরক্ষা নীতির সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি।
লেখকদের কাছ থেকে এনআইডি/জন্মনিবন্ধন, শিক্ষাগত সনদ এবং যোগাযোগের সংবেদনশীল তথ্য চাওয়া হচ্ছে একটি উন্মুক্ত সাধারণ গুগল ফর্মের মাধ্যমে। একটি দায়িত্বশীল জাতীয় প্রতিষ্ঠান যখন নাগরিকদের স্পর্শকাতর ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে, তখন সেখানে একটি স্পষ্ট ‘ডেটা প্রাইভেসি নোটিস’ থাকা বাধ্যতামূলক। গুগল ফর্মে সংগৃহীত এই বিপুল ডেটা কোথায় সংরক্ষিত হবে, এই তথ্যে কাদের প্রবেশাধিকার থাকবে এবং এর নিরাপত্তা ব্যবস্থা কেমন— সে বিষয়ে প্রথম বিজ্ঞপ্তি থেকে শুরু করে সবশেষ মহাপরিচালকের ব্যাখ্যার কোথাও কোনো অঙ্গীকার নেই। এই সংগৃহীত তথ্য দিয়ে একটি ‘অনলাইন ভার্সন’ বা তথ্যভাণ্ডার বানানোর কথা বলা হচ্ছে, যা পর্যাপ্ত এনক্রিপশন ও নিরাপত্তা নীতি ছাড়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কোন ভরসায় তাদেরকে সংবেদনশীল তথ্য লেখকেরা? এখানে সবচেয়ে সংবেদনশীল তথ্যের সুরক্ষা নিয়ে বাংলা একাডেমির সুস্পষ্ট বক্তব্য থাকা উচিত ছিল, কিন্তু সেটাকে তারা গুরুত্ব দেয়নি।
জাতীয় পর্যায়ে নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের ঘটনা দেশে নতুন কিছু নয়। এ বছরের শুরুতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট থেকে ১৪ হাজার সাংবাদিকের এনআইডি নম্বর, মোবাইল নম্বর ও ব্যক্তিগত তথ্য উন্মুক্ত হয়ে পড়ার ঘটনা ঘটেছে। ওই উন্মুক্ত তালিকায় আমার নিজের সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্যও অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরবর্তীতে এই নিরাপত্তা ত্রুটির বিষয়ে এবং ভবিষ্যৎ আইনি সুরক্ষা পেতে অনলাইনে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার চেষ্টা করেও আমি ব্যর্থ হয়েছি; পুলিশ সেই আবেদন গ্রহণ করেনি। নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান যেখানে নাগরিকদের তথ্য রক্ষায় চূড়ান্ত ব্যর্থতা ও দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে, সেখানে বাংলা একাডেমি কোন এনক্রিপ্টেড ডিজিটাল নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর ভর করে থার্ড-পার্টি গুগল ফর্মের মাধ্যমে এসব স্পর্শকাতর তথ্য সংগ্রহ করছে? তথ্য ফাঁস হলে প্রাতিষ্ঠানিক দায়ভার কে নেবে?
বাংলা একাডেমি তাদের ব্যাখ্যায় স্বীকার করেছে যে, বিজ্ঞপ্তিতে ‘আবেদন’ শব্দটি ব্যবহার করে পেজ আপলোডকারী “নিশ্চয়ই ভুল করেছেন” এবং পরে তা মুছে ফেলা হয়েছে। একটি জাতীয় অভিধানের কেন্দ্রীয় বিজ্ঞপ্তিতে উচ্চপর্যায়ের তদারকির কতটা অভাব থাকলে এমন পরিভাষাগত ভুল ঘটে এবং পরে তা কর্মচারীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় তা সহজেই অনুমেয়। তথ্য দেওয়ার প্রক্রিয়া ‘জটিল’ স্বীকার করেও তা বহাল রাখা কোনো পেশাদার সমাধান হতে পারে না।
বাংলা একাডেমি কেবল কোনো সরকারি দপ্তর নয়, এটি আমাদের জাতীয় মনন ও সাহিত্যচর্চার সর্বোচ্চ প্রতীক। এর স্লোগান হচ্ছে— ‘বাংলা একাডেমি জাতির মননের প্রতীক’। একটি মানসম্পন্ন লেখক অভিধান প্রণয়নের উদ্যোগটি প্রশংসনীয় হলেও, নিছক স্পষ্টীকরণ বা দায়সারা ব্যাখ্যা দিয়ে মূল আমলাতান্ত্রিক অসংগতি ও ক্ষোভগুলো ধামাচাপা দেওয়া সম্ভব নয়। বাংলা একাডেমির উচিত কৃত্রিম বয়সসীমা বাতিল করা, অবমাননাকর সনদের বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহার করে কেবল সাহিত্যিক অবদানের ওপর ভিত্তি করে তথ্যের পরিধি সীমিত রাখা এবং আধুনিক ডেটা প্রাইভেসি আইন মেনে নিজস্ব এনক্রিপ্টেড ও নিরাপদ প্রক্রিয়ায় তথ্য আহ্বান করা। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, বস্তুনিষ্ঠ, সম্মানজনক ও তথ্য-সুরক্ষিত ‘লেখক অভিধান’ নিশ্চিত করতে এই সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই।
মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।
আপনার মন্তব্য