টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
Advertise
জুয়েল রাজ | ২৭ আগস্ট, ২০২৬
সম্প্রতি বাংলাদেশে আবারও আলোচনায় আসছে জঙ্গিবাদ। বিশেষ করে রংপুরে ধর্মীয় সংখ্যালঘু পরিবারের চার সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যার পর, হত্যার ধরণ ও অতিথের জঙ্গি হামলায় হত্যাকাণ্ডের সাথে মিল খুঁজছেন বিশেষজ্ঞরা।
আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে জঙ্গিবাদ দমনে সরকারের কঠোর ভূমিকা ছিল। তবুও থেমে ছিল না তাদের তৎপরতা। একের পর এক ব্লগার, পুরোহিত, শিক্ষককে তারা হত্যা করেছে এবং দায় স্বীকার করেছে। তখন জিরো টলারেন্স নীতিতে সরকার যখনই বিভিন্ন অভিযান চালিয়ে উগ্রবাদ প্রচার ও জঙ্গি কার্যক্রমে সংশ্লিষ্টদের গ্রেপ্তারে অভিযান পরিচালনা করত, বিরোধী রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় সংগঠনগুলো একে শেখ হাসিনার ‘জঙ্গি নাটক’ বলে অবিহিত করত। এবং শেখ হাসিনা এই জঙ্গি নির্মূলের নামে মূলত ইসলামকে ধ্বংস করতে চাইছেন বলে প্রচারণা চালাত। কিন্তু বাস্তবতা আসলে কি ছিল? ১৯৯১ সালে আফগানফেরত যোদ্ধাদের হাত ধরেই বাংলাদেশে এই উগ্রবাদের জন্ম হয় এবং বড় দুটি জঙ্গি সংগঠনের উত্থান ঘটে৷ এদের অন্যতম হচ্ছে হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশ বা হুজিবি৷ অন্যটি জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)৷
বাংলাদেশে ২০০১ সালের পর মূলত এই জঙ্গিবাদ ধারণার সাথে ব্যাপকভাবে পরিচিত হয়েছিল। বাংলা ভাই থেকে ৬৩ জেলায় বোমা হামলা, সিনেমা হল, আদালত, মন্দির, উদীচী, ছায়ানট, ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলাসহ নানা জনসভায় নানান জায়গায় বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে এর ধারাবাহিকতা দেখি আমরা হলি আর্টিজান হামলায়।
জাতিসংঘ বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান এবং কার্যক্রম নিয়ে তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। চব্বিশের সহিংস জুলাই আন্দোলনের আগে পরে চার থেকে ছয় হাজারের বেশ বন্দি জেল থেকে পালিয়েছিল, যাদের মধ্যে বিভিন্ন মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জঙ্গিরা ছিল। যাদের আর গ্রেপ্তার করেনি সরকার অথবা করতে ব্যর্থ হয়েছে। বিগত দুই বছরে তাদের এই নেটওয়ার্ক আবারো সরব হয়েছে। এবং এই জঙ্গিবাদ উত্থানের মূল চালিকাশক্তি শুধু ধর্মীয় উগ্রবাদ নয়, অর্থনীতি সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশে মৌলবাদী ও জঙ্গিবাদীদের অর্থের কোনও অভাব নেই। তাদের বৈদেশিক অর্থের প্রধান উৎস হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দাতব্য সংস্থা এবং প্রবাসীদের অনুদান। এছাড়া মৌলবাদীরা নিজেরাও বিভিন্ন আর্থিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজেদের মূলধন বৃদ্ধি করে নানাধরনের নাশকতামূলক কাজ চালানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে তারেক রহমান বলেছিলেন, 'বাংলাদেশ যাতে চরমপন্থি ও মৌলবাদের অভয়ারণ্য হয়ে উঠতে না পারে, সেই প্রত্যাশা করে বিএনপি। এজন্য সবাইকে সোচ্চার থাকতে হবে।' প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেওয়ার পরও তিনি সবধরনের মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' নীতির কথা ঘোষণা করেন। কিন্তু তারপরেও বাংলাদেশে মৌলবাদীদের মদদে জঙ্গিবাদীরা তাদের কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে 'প্রেসার কুকার' বোমা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের বিস্ফোরক উদ্ধার তারই ইঙ্গিত দেয়।
সাম্প্রতিককালে গবেষণায় উঠে এসেছে বাংলাদেশে মৌলবাদী ও তাদের মদদদাতা দলগুলোর নিজস্ব একটি বড় আর্থিক অবকাঠামো রয়েছে। সেই অবকাঠামো বেশ শক্তিশালী। দেশের সরকারি অর্থনীতির সমান্তরাল অর্থনীতি চালাচ্ছে মৌলবাদীরা। তাই অনেকে এটাকেই 'অর্থনীতির ভেতরে অর্থনীতি' বলে বর্ণনা করছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক-বীমা, রিয়েল এস্টেট, পরিবহন এবং এনজিওর রমরমা ব্যবসা চালাচ্ছে। তারা শুধু দেশের ভেতরকার আয়ের ওপর তারা মোটেই নির্ভরশীল নয়। বিদেশ থেকেও বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা এবং দাতব্য বা কল্যাণমূলক সংস্থার অনুদানের আড়ালে তহবিল মিলছে তাদের। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মৌলবাদী ও জঙ্গিবাদীদের অর্থ রোজগার অনেকটাই বেড়ে যায়। অতীতে কিছু আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় দাতা সংস্থার বিরুদ্ধে উগ্রপন্থী কার্যক্রমে অর্থায়নের অভিযোগ নিয়ে তদন্ত হয়েছে। কিন্তু জামায়াতের উত্থানের পর মৌলবাদীদের সাহস ও তৎপরতাও অনেকটা বেড়ে গিয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।
প্রবাসী কর্মী ও ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সংগঠনের তহবিলে নিয়মিত অর্থ দিয়ে থাকেন। সেই অর্থও জঙ্গিবাদী কার্যকলাপে ব্যবহৃত হচ্ছে। এক্ষেত্রে মাধ্যম হিসাবে কাজ করছে বিভিন্ন মাদ্রাসা। বাংলাদেশে ধর্মীয় মৌলবাদী ও উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোর বৈদেশিক অর্থের প্রধান উৎসই হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের দাতব্য সংস্থা ও প্রবাসী অনুদান। হুন্ডির মতো অবৈধ উপায়ে বিদেশ থেকে নিয়মিত অর্থের জোগান আসছে। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকেও প্রবাসীরা কেউ কেউ দেশের মৌলবাদীদের নিয়মিত অর্থ পাঠাচ্ছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল বারকাতের গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে মৌলবাদের অর্থনীতির বার্ষিক নিট মুনাফা ২ হাজার ৪৬৪ কোটি টাকা। আবুল বারকাত এখন বাংলাদেশের জেলে আছেন বিনা বিচারে। তার মতে বিভিন্ন বৈধ ও আংশিক বৈধ ব্যবসার মাধ্যমে তারা এই বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করেছে। এই টাকার বড় অংশই জঙ্গিবাদী কার্যকলাপে খরচ হয়। আর তাদের আয় ও ব্যয়ের পরিচ্ছন্ন হিসাবের ওপর সরকারি নজরদারি খুবই দুর্বল।
বাংলাদেশে মৌলবাদী আদর্শে পরিচালিত বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ১৯৭৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ৪০ বছরে মুনাফার পুঞ্জীভূত পরিমাণ হচ্ছে ২ লাখ কোটি টাকা। মৌলবাদী ও জঙ্গিবাদী অর্থায়ন প্রতিরোধে বাংলাদেশ ব্যাংক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের (বিএফআইইউ) নিয়মিত নজরদারি চালানোর কথা। কিন্তু অর্থপাচার প্রতিরোধ আইনে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ক্ষেত্রে তারা তদারকি করলেও অর্থপাচার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে তারা ব্যর্থ। কারণ জটিল নেটওয়ার্ক পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করার মতো অবকাঠামো তাদের নেই। ফলে বৈধ ও অবৈধ উভয় পথেই চলছে মৌলবাদীদের অর্থায়ন। আর সেই অর্থে ভর করে জঙ্গিবাদীরা বাংলাদেশে অস্থিরতা সৃষ্টির নতুন নতুন ষড়যন্ত্রের জাল বুনে চলেছে। বিপজ্জনক চেহারা নিচ্ছে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি।
প্রবাস থেকে মানবিক কারণে পাঠানো অর্থে চলছে জঙ্গিবাদীদের প্রশিক্ষণ। সৌদিআরব, কুয়েত, কাতার ও লিবিয়া থেকে পাওয়া টাকায় রমরমা কারবার চলছে সন্ত্রাসীদের। অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলের বদলে 'হুন্ডি' বা অনানুষ্ঠানিক আর্থিক স্থানান্তরের মাধ্যমে বাংলাদেশে পৌঁছায়। ফলে তেমন সরকারি নজরদারি থাকে না। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে মৌলবাদীরা বিদেশি অর্থে দেশে অনর্থ সৃষ্টির মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে।
বিএনপি কি বুঝতে পারছে বাংলাদেশকে ফের অস্থির করে তোলাই হচ্ছে তাদের মূল লক্ষ্য। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই বাংলাদেশে বিভিন্ন মৌলবাদী ও জঙ্গিবাদীদের সঙ্গে নিয়ে চলছে গভীর ষড়যন্ত্র। এই জঙ্গিবাদের খেসারত বিএনপি দিয়েছে ১৭ বছর। এখনো পশ্চিমা বিশ্ব কিংবা ভারত বিএনপিকে নিয়ে এক ধরনের অস্বস্তিতে থাকে। তারেক রহমানের ভারত সফরও এই উগ্রবাদের প্রশ্রয় দেওয়া বিশেষ গোষ্ঠীর চাপে বাতিল করতে বাধ্য হয়েছেন বলে অনেকে মনে করছেন।
সর্বশেষ একটি তথ্য যোগ করি লন্ডনের আল খায়ের ফাউন্ডেশন নামক একটি সংগঠনের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত চলছে ফিলিস্তিন সংগঠন হামাসকে ৭৪ মিলিয়ন পাউন্ড আর্থিক সহায়তা দেওয়ার। আল খায়ের ফাউন্ডেশন দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে কাজ করছে আসছে। এবং আওয়ামী লীগের আমলেই তারা মানবিক সহায়তার নামে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিল। দেশে বিদেশে বাংলা গণমাধ্যমে এই নিয়ে কোন সংবাদ প্রচার হয়নি। এই জাতীয় শত শত বিদেশি সহায়তা সংস্থা বাংলাদেশে কাজ করছে।
মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।
আপনার মন্তব্য