আজ বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

Advertise

যেওনাকো মক্কা প্যাক্টে তুমি, সুরঞ্জনা!

মাসকাওয়াথ আহসান  

মক্কা প্যাক্ট শব্দবন্ধ বাজারে আসতেই শ্যামবাজারের রয়টার্সের রমরমা পাল জুজু প্রতিবেদন রচনা করে। তেল আভিভের ইজরায়েল পোস্টে পরিপূর্ণ লাল রচনা করে, যে পাঁচটি কারণে মক্কা প্যাক্টে কিছুতেই যোগ দেওয়া উচিত নয়। সাউথ ব্লকের পরাজয় সওয়াল প্রেস কনফারেন্সে বলে, মক্কা প্যাক্টে ঢাকা যোগ দিচ্ছে কিনা; দিল্লি সেদিকে চোখ রাখছে।

সিগন্যাল পেয়েই দৈনিক হিরোশিমা ডক্টোরাল ফেলোদের খবর দেয়; মক্কা প্যাক্টের দশটি ক্ষতিকর দিক নিয়ে উপসম্পাদকীয় রচনা করতে। ছাপাখানা থেকে খবর আসে, যে দশটি কারণে তারেক রহমানের দিল্লি সফরে যাওয়া উচিত; সে বিষয়ে দিস্তা দিস্তা উপসম্পাদকীয় ছেপে ছেপে ছাপার কাগজে টান পড়েছে।

দৈনিক হিরোশিমার সম্পাদক নির্দেশ দেয়, বাঁশ কেটে নতুন মণ্ড প্রস্তুত করে নিউজপ্রিন্ট কাগজ বানাও। তবুও মক্কা প্যাক্টের দশটি ছিদ্র বিষয়ক উপসম্পাদকীয় ছাপতে হবে।

আর যামুনা টিভি টকশোতে সিনিয়র সাংবাদিক এসে আলাপ জুড়ে দেয়, বাংলাদেশকে সবসময় ভাত কাপড়ের কথা ভাবতে হবে আর নিরানন্দবাজার থেকে পেয়াজ কিনে এনে আলু ভর্তা করে খেতে হবে। আমাদের কেবল ভাতার প্যাক্ট করে ভাতের কথা ভাবতে হবে; ওসব মক্কা প্যাক্টে গিয়ে কাজ নেই।

সহ-আলোচক প্রশ্ন তোলে, ভাতার প্যাক্ট তো আওয়ামী লীগের। বিএনপিকে কেন আওয়ামী লীগের ভাতার প্যাক্ট করতে হবে!

— সৌদি আরব আপনার না হলেও চলে; কিন্তু প্রতিবেশী তো আপনি বদলাতে পারবেন না।

— বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স উপার্জিত হয় সৌদি আরব থেকে; আর আওয়ামী লীগের সময় প্রতিবেশী উলটো রেমিট্যান্স উপার্জন করে গেছে বাংলাদেশ থেকে; তার তো পাঁচ পয়সা দিয়ে উপকার করার মুরোদ নাই।

— পেয়াজ, ডিজেল কি দেয় না!

— পাড়ার দোকান থেকে পেয়াজ কেনেন বলে; তার গুরুত্ব কি আপনার চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বেশি। ঐ চাকরি না থাকলে পেয়াজ কিনবেন কি দিয়ে!

সিনিয়র সাংবাদিক এবার প্যাঁচ দিয়ে বলে, মক্কা প্যাক্ট প্রো এমেরিকান ও প্রো ইজরায়েল প্যাক্ট।

— এমন কথা বলবেন না; যাতে ঘোড়াও হাসে। ইজরায়েল-এমেরিকা ইরানে হামলার পর যুদ্ধ থামাতে সৌদি আরব-তুরস্ক-মিশর-পাকিস্তানের মধ্যস্থতার সময়েই মক্কা প্যাক্টের আইডিয়াটা তৈরি হয়।

সিনিয়র সাংবাদিক সঞ্চালকের দিকে তাকিয়ে বলে, একটা বিজ্ঞাপন বিরতি নেন, টুথ ব্রাশ দিয়ে দাঁত মেজে আসি।

বিজ্ঞাপন বিরতির পর সহ-আলোচক বলে, ঢাকা টু কলকাতা সিটিং সার্ভিসের বাইরের দুনিয়ার সব খবর গদি মিডিয়া থেকে নেয়ায়; আপনারা এমন অনায়াসে জুজু তৈরি করেন। সৌদি আরব-সংযুক্ত আরব আমিরাতের পরিবর্তনের হাওয়া তো টের পাননি। এমন সব অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে সেখানে যে পশ্চিমা পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণে পরিণত হয়েছে আরব বিশ্ব। সেইখানে ইজরায়েল ইরানে হামলা করার পর ঐ এলাকার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়েছে। এ কারণে নিরাপত্তার জন্য এমেরিকার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ফেলতে চেষ্টা করছে আরব বিশ্ব। কারণ ইরান যখন আরব বিশ্বের নানা দেশে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা করেছে; এমেরিকা তখন সেই হামলা ঠেকাতে পারেনি। যেখানে তার সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরবকে নিরাপত্তা দেবার কথা; সেখানে সে শুধুই ইজরায়েলকে নিরাপত্তা দিতে ব্যস্ত ছিলো। তাই মক্কা প্যাক্টের মাধ্যমে আরব বিশ্বের নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে। প্যালেস্টাইনে গণহত্যাকারী নেতানিয়াহুর নীল নদ থেকে ইউফ্রেতিস নদী পর্যন্ত বিস্তৃত গ্রেটার ইজরায়েলের মহাকল্পনার এন্টিডোট এই মক্কা প্যাক্ট। আর আপনি গল্প দিচ্ছেন মক্কা প্যাক্ট এমেরিকা-ইজরায়েলপন্থী! কোন দুনিয়ায় থাকেন আর কি যে বলেন!

সিনিয়র সাংবাদিক এবার চোখগুলো গোল গোল করে বলে, কিন্তু মক্কা প্যাক্টে যোগ দিলে; ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ বাধলে তখন পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধ করতে হবে। হা ভগবান, সে তো হবে পেয়াজপাপ।

— ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে এমেরিকা পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেয়, বিনিয়োগ থাকার কারণে চীন তাকে যুদ্ধ বিমান দেয়, তুরস্ক তাকে ড্রোন দেয়, সৌদি আরব অর্থ সাহায্য দেয়। আর দেশটির পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। সেখানে বাংলাদেশের কাছে সামরিক সাহায্য চাওয়ার আশংকা আপনার অতিকল্পনা। আপনি কি জানেন ন্যাটো প্যাক্টে কোন সদস্য রাষ্ট্র যুদ্ধ আক্রান্ত হলে তাকে সাহায্য করা অন্য সদস্য দেশগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক নয়। ইরানের বিরুদ্ধে হামলায় ট্রাম্প বার বার সাহায্য চেয়েছে। কিন্তু ন্যাটো দেশগুলো সেই ডাকে সাড়া দেয়নি। মক্কা প্যাক্টও ঠিক তেমনি। আসলে আপনারা চান বাংলাদেশ শুধু ভাতার প্যাক্টে ছায়া উপনিবেশ হয়ে থাকবে। তার আন্তর্জাতিক আর কোন প্যাক্টে যাবার দরকার নাই।

— চীন কি মক্কা প্যাক্টকে ভালোভাবে নেবে! ইরানের কি এতে সম্মতি আছে।

— ও বাবা এখন বড্ড চীনের প্রতি দরদ দেখাচ্ছেন যে; ঈশ্বরহীন চীন আর ঈশ্বরমুখী সৌদি আরবের সম্পর্ক অত্যন্ত ভালো। আরব বিশ্বের নিরাপত্তা চীনের বিনিয়োগ রক্ষার জন্যই বেশি প্রয়োজন। আরব বিশ্বের আত্মনির্ভর নিরাপত্তাকৌশল গড়ে তুলতে এই মক্কা প্যাক্ট। এতে যে ইরানের স্ট্র্যাটেজিক লাভ; তা তেহেরানও বোঝে। যা কিছু ইজরায়েলের হুমকি ঠেকায়; ইরানের তার প্রতি সমর্থন থাকবেই।

— তবু মন সায় দেয় না যে।

— এর কারণ আপনার ডিএনএ-তে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জমিদারের প্রজা হিসেবে বেঁচে থাকার অনুশীলন। আপনার পৃথিবী সেই জমিদারের প্রতিভূ ভারতস্বামীকে ঘিরে। এই কালচারাল লক্ষ্মণরেখার বাইরে যেতে আপনার রাবণের ভয়। বড্ড পৌরাণিক কল্পনার জীবন আপনাদের।

মাসকাওয়াথ আহসান, সাংবাদিক, সাংবাদিকতা শিক্ষক

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অধ্যাপক ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী ৪৮ অধ্যাপক ডা. শেখ মো. নাজমুল হাসান ২৮ অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১১ আজমিনা আফরিন তোড়া ১০ আনোয়ারুল হক হেলাল আফসানা বেগম আবদুল গাফফার চৌধুরী আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ৩২ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল ১০ আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১৮ আরিফ রহমান ১৬ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৫৪ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইনাম আহমদ চৌধুরী ইমতিয়াজ মাহমুদ ৭৩ ইয়ামেন এম হক এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন একুশ তাপাদার এখলাসুর রহমান ৩৭ এনামুল হক এনাম ৫৪ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৭৮ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান কেশব কুমার অধিকারী খুরশীদ শাম্মী ১৮ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ৪৪ জহিরুল হক মজুমদার জাকিয়া সুলতানা মুক্তা জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুনাইদ আহমেদ পলক জুয়েল রাজ ১২১ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ১২ ড. কাবেরী গায়েন ২৩ ড. নাদিম মাহমুদ ৩৮ ড. মাহরুফ চৌধুরী ১২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ড. শামীম আহমেদ ৪৫ ডা. আতিকুজ্জামান ফিলিপ ২০ ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন ১০ তানবীরা তালুকদার তোফায়েল আহমেদ ৩২ দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৭ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক প্রফেসর ড. মো. আতী উল্লাহ ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬২ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৪৪ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার জাকির হোসেন ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৮ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১৯৫ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১৫৩ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক ১৪ রণেশ মৈত্র ১৮৩ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ৫৫ রাজু আহমেদ ৪৩ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩৮ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর