আজ সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

Advertise

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ওসমান হাদি কতটা প্রাসঙ্গিক, এবং কেন?

জুয়েল রাজ  

গত ২৫ আগস্টের একটি সংবাদ আমাকে ভাবিয়েছে। শহিদ শরীফ ওসমান হাদির ৪৪টি বক্তব্য নিয়ে বারুদমাখা কথামালা নামে একটি বই প্রকাশিত হয়েছে। বইটির সম্পাদক ও প্রকাশক ডাকসুর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ। প্রকাশনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং ইউনূস সরকারের সাবেক প্রেস সচিব শফিকুল আলম। একজন রাজনৈতিককর্মীর বক্তব্য সংরক্ষণ করা অপরাধ নয়। বরং সময়ের গুরুত্বপূর্ণ মানুষের বক্তব্য সংরক্ষণ ইতিহাসেরই অংশ। কিন্তু এখানে প্রশ্নটি অন্য জায়গায়। কেন ওসমান হাদি? কেন ডাকসু? এবং কেন এই মানুষগুলোই সমবেত হলেন এক জায়গায়?

ওসমান হাদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষার্থী ছিলেন না, ডাকসুর নির্বাচিত প্রতিনিধিও ছিলেন না। জুলাই আন্দোলনের সময়ও প্রকাশ্যে তিনি খুব বেশি আলোচনায় ছিলেন বলে অন্তত আমার চোখে পড়েনি। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে ইনকিলাব মঞ্চের মাধ্যমে নিজের একটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থান তৈরি করেন, অথবা করানো হয়। তার যতগুলো বক্তব্য, টকশো আমি অন্তত দেখেছি শুনেছি সেখানে দুইটি বিষয় ছিল। এক হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধকে নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করা। এবং কোট আনকোট করে বলেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপক্ষেই নাকি ৫ আগস্ট হয়েছিল। এরপর আর তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দ্বিতীয়বার আর ভাবতে হয়নি। দ্বিতীয় বিষয় ছিল ভারতের আগ্রাসন, ভারত ছাড়া বাংলাদেশের কোন শত্রু নাই; পৃথিবীতে একমাত্র রাষ্ট্র যারা বাংলাদেশের সাহিত্য সংস্কৃতি ও ইসলামকে ভূলুণ্ঠিত করছে। এই বয়ানটা প্রতিষ্ঠা করতেই আগ্রহী ছিল ওসমান হাদি। কারণ মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করতে হলে ভারত বিরোধিতা ছাড়া সম্ভব হয় না। বাই ওয়ান গেট ওয়ান ফ্রি'র মত অবস্থা। তাই ডাকসুর মতো ঐতিহাসিক একটি ছাত্র প্রতিষ্ঠান যখন তার বক্তব্যকে বই আকারে প্রকাশ করে, তখন ঘটনাটিকে শুধু একটি প্রকাশনা কার্যক্রম হিসেবে দেখলে বিষয়টির রাজনৈতিক তাৎপর্যটি আড়াল হয়ে যায়। আমার কাছে এই ঘটনার গুরুত্ব আরও বড় একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং আলোচিত অধ্যায়। আন্দোলনে প্রাণহানি ঘটেছে। বহু মানুষ আহত হয়েছেন। এসব ঘটনার সত্য উদঘাটন এবং দায়ীদের বিচার হওয়া জরুরি। শুধুমাত্র গণহারে কিছু হত্যা মামলা ছাড়া আর কোন তৎপরতা দেখা যায়নি। কিন্তু একটি ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ হলেই সেটিকে মহিমান্বিত করতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। বরং ইতিহাসের ক্ষেত্রে উল্টো নিয়ম প্রযোজ্য। যত বড় ঘটনা, তত বেশি নিরপেক্ষ অনুসন্ধান প্রয়োজন। ২০২৪-এর হত্যাকাণ্ড, নিহতের সংখ্যা, বিভিন্ন ঘটনার প্রকৃতি ও দায় নিয়ে শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক রয়েছে। এসব প্রশ্নের নিষ্পত্তি হওয়ার আগেই যদি জুলাইকে একটি পবিত্র, প্রশ্নাতীত এবং গৌরবময় জাতীয় আখ্যান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়, তাহলে সেটি ইতিহাসচর্চা নয়, রাজনৈতিক বয়ান নির্মাণ। আর সেই বয়ানই এখন তৈরি হচ্ছে কি না, সেটি প্রশ্ন করার সময় এসেছে। কারণ জুলাইকে শুধু একটি আন্দোলন হিসেবে স্মরণ করা হচ্ছে না। তাকে ক্রমশ একটি নতুন জাতীয় সূচনাবিন্দু হিসেবে সামনে আনা হচ্ছে।

১৯৪৭-এর ভারতবর্ষের স্বাধীনতা পরবর্তীতে দেশভাগ উপমহাদেশের মানচিত্রের সাথে সাথে মানুষের চিন্তায়, মননেও একধরনের বিভাজন নিয়ে আসে। এর মাঝ থেকেই ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬-এর ছয় দফা, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের ধারাবাহিকতা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৭১ সেই ধারার পরিণতি। এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম। একটি নতুন আত্মপরিচয় ।বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাই ১৯৭১ কেবল একটি অতীত ঘটনা নয়। এটি রাষ্ট্রের বৈধতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি।

কিন্তু ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধুকে সপরিবার হত্যার পর, আওয়ামী লীগও এর নেতাকর্মীদের হত্যা জেল এর মধ্য দিয়ে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেক পরিবর্তন এসেছে। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী ব্যক্তি ও রাজনৈতিক শক্তিও ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় রাজনীতিতে ফিরে এসেছে। ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার বেড়েছে। রাষ্ট্রের সাংবিধানিক চরিত্রেও পরিবর্তন এসেছে। তারপরও ১৯৭১-কে পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়া যায়নি। বা সম্ভব হয়নি। কারণ বাংলাদেশকে বাংলাদেশ হিসেবে ব্যাখ্যা করতে গেলে শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের কাছে ফিরে আসতেই হয়। আর এখানেই নতুন রাজনৈতিক বয়ানের প্রয়োজন দেখা দেয়। যদি ১৯৭১ একটি রাজনৈতিক শক্তির জন্য অস্বস্তিকর ইতিহাস হয়, তাহলে তার বিকল্প কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি প্রয়োজন।

এখানেই আমার আপত্তি সবচেয়ে বেশি। যেভাবেই ঘটুক বা পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হউক ২০২৪-এর ঘটনাকে বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি অধ্যায় হিসেবে রাখতে হবে। এবং থাকবে, এ নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। বরং সত্য উদঘাটনের জন্য তা সংরক্ষণ করা উচিত। কিন্তু ২০২৪-কে ১৯৭১-এর সমান্তরাল বা বিকল্প জাতীয় মুক্তির ইতিহাস হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হলে সেটি মেনে নেওয়ার কারণ নেই।

১৯৭১-এর সঙ্গে ২০২৪-এর মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। ১৯৭১ ছিল একটি জাতির স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ। এর পেছনে ছিল দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, জনগণের ম্যান্ডেট, সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক লক্ষ্য। কিন্তু ২০২৪-এর আন্দোলনের লক্ষ্য, চরিত্র ও রাজনৈতিক পরিণতি ছিল ভিন্ন। শুধু একটি আন্দোলনে মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলেই সেটি ১৯৭১-এর সমতুল্য হয়ে যায় না। শুধু ‘গণঅভ্যুত্থান’ শব্দটি ব্যবহার করলেই দুটি ঘটনা একই ঐতিহাসিক মর্যাদা পায় না। ইতিহাস আবেগ দিয়ে লেখা যায়, কিন্তু রাষ্ট্রের ইতিহাস আবেগ দিয়ে পুনর্নির্ধারণ করা যায় না।

২০২৪-এর জুলাইকে যদি নতুন বাংলাদেশের সূচনা বলা হয়, তাহলে সেই নতুন বাংলাদেশের বাস্তব চেহারা কী?

আন্দোলনের পর বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। হত্যা, খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, দখল ও রাজনৈতিক সহিংসতার নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এবং বাংলাদেশের ৫৫ বছরের অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দিয়ে একটি ব্যর্থরাষ্ট্রে পরিণত করার প্রয়াসই আমরা দেখতে পাচ্ছি। ইতোমধ্যেই বিশ্বের ঋণখেলাপি দেশের তালিকায় ১ নম্বরে এসে পৌঁছেছে বাংলাদেশ। যে পরিবর্তনকে নতুন বাংলাদেশের সূচনা হিসেবে মহিমান্বিত করা হচ্ছে, তার পরবর্তী বাস্তবতার দায় কে নেবে? একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের মূল্যায়ন শুধু তার সূচনালগ্নের আবেগ দিয়ে হয় না। তার পরিণতি দিয়েও হয়। যদি কোনো আন্দোলনের পর রাষ্ট্র আরও অনিরাপদ হয়, সামাজিক সহিংসতা বাড়ে, আইন ও প্রতিষ্ঠানের ওপর মানুষের আস্থা কমে এবং অপরাধীরা শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তাহলে সেই বাস্তবতাকেও ইতিহাসের অংশ হিসেবেই দেখতে হবে। জুলাইয়ের গল্প শুধু মিছিল, স্লোগান ও মৃত্যুর গল্প হতে পারে না। জুলাইয়ের পর কী হয়েছে, সেটিও সেই গল্পের অংশ।

হাদি জুলাই আগস্টের আবু সাঈদ বা মুগ্ধের মত নিহত ব্যক্তি নন। জুলাই আন্দোলন পরবর্তী বাংলাদেশে হত্যা খুনের এক খোলা মাঠ হয়ে উঠেছে। এই দুই বছরে ঠিক কত লোক খুন হয়েছেন তার কোন সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে পুলিশের পরিসংখ্যানই বলছে এর পরিমাণ প্রায় ৬ হাজার। সেই ছয় হাজারের একজন হাদি। বাকি ৬ হাজার খুন বা হত্যাকাণ্ড থেকে হাদিকে আলাদা করে শহিদ স্বীকৃতি দেয়ার প্রয়োজনীয়তা পড়ল কেন?

তিনি আন্দোলনের পর একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চিন্তা সামনে এনেছিলেন। ইনকিলাব, সাংস্কৃতিক পরিবর্তন, বাঙালি মুসলমানের পরিচয় এবং নতুন বাংলাদেশের ধারণা তার বক্তব্যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই চিন্তার সঙ্গে একমত হওয়া বা না হওয়া আলাদা বিষয়। কিন্তু তার বক্তব্য সংরক্ষণ যখন একটি ঐতিহাসিক ছাত্র প্রতিষ্ঠান থেকে হয়, তখন তার রাজনৈতিক চিন্তাকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগও তৈরি হয়। তাই প্রশ্নটি আবারও ফিরে আসে: এটি কি শুধু একজন মানুষের বক্তব্য সংরক্ষণ, নাকি একটি রাজনৈতিক চিন্তার উত্তরাধিকার তৈরি? এই প্রশ্নের উত্তর গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ রাজনীতিতে শহিদের স্মৃতি কখনো নিরপেক্ষ থাকে না। মৃত্যুর পর একজন মানুষকে কীভাবে স্মরণ করা হবে, কোন বক্তব্য সামনে আনা হবে, কোন পরিচয়ে তাকে নতুন প্রজন্মের কাছে উপস্থাপন করা হবে, এসবের মধ্য দিয়েই রাজনৈতিক উত্তরাধিকার তৈরি হয়। এই আলোচনায় জামায়াতের প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে জামায়াতে ইসলামীর ঐতিহাসিক অবস্থান ছিল স্বাধীনতার বিরোধী। জামায়াত ইসলাম সেটি স্বীকার করে। কিন্তু এড়িয়ে যায় তাদের হত্যা, খুন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ লুটপাটের দায়। যুদ্ধের সময় দলটির বিভিন্ন নেতাকর্মীর ভূমিকা নিয়েও বাংলাদেশের ইতিহাসে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে দলটির কয়েকজন শীর্ষ নেতার যুদ্ধাপরাধের বিচার এবং দণ্ডও হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসে ১৯৭১ জামায়াতের জন্য একটি কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতা। কিন্তু রাজনীতি অতীতের অস্বস্তিকর অধ্যায় এড়িয়ে যাওয়ার নতুন পথও খোঁজে। নিজস্ব শহিদ, নিজস্ব স্মৃতি, নিজস্ব রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করা সেই পথের একটি অংশ।

আবদুল মালেককে ঘিরে জামায়াতপন্থী রাজনীতির স্মৃতিচর্চা তার একটি উদাহরণ। একজন ব্যক্তিকে শহিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা, তার জীবন ও বক্তব্যকে রাজনৈতিক আদর্শের অংশ করা, এবং সেই স্মৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া কোনো নতুন রাজনৈতিক কৌশল নয়। এই বাস্তবতায় ওসমান হাদিকে ঘিরে নতুন স্মৃতি নির্মাণও তাই রাজনৈতিকভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। কারণ এখানে শুধু একজন মৃত ব্যক্তিকে স্মরণ করা হচ্ছে না। তার সঙ্গে একটি রাজনৈতিক চিন্তা, একটি সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং একটি ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর ধারণাও সামনে আসছে।

ইতিহাসের লড়াই আসলে ভবিষ্যতের লড়াই। ইতিহাস নিয়ে লড়াই কখনো শুধু অতীত নিয়ে হয় না। কে শহিদ, কে বীর, কোন আন্দোলন জাতীয় মুক্তির প্রতীক, কোন ঘটনাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্মরণ করা হবে, কোন ইতিহাস পাঠ্যবইয়ে গুরুত্ব পাবে, এসব প্রশ্নের সঙ্গে ভবিষ্যতের ক্ষমতার সম্পর্ক আছে। এই কারণেই ২০২৪-এর জুলাইকে নিয়ে আলোচনা জরুরি। ২০২৪-এর হত্যাকাণ্ডের বিচার চাইতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে ফেলার আয়োজন ও উন্মত্ততাই দেখছি আমরা। বঙ্গবন্ধুকে অপমান করে এক ধরনের নগ্ন উল্লাস দেখতে পাচ্ছি।

একটি ইতিহাসকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য আরেকটি ইতিহাসকে ধ্বংস করতে হয় না। ১৯৭১-এর জায়গায় ২০২৪-কে বসানো, তাহলে সেটি আর ইতিহাস সংরক্ষণ থাকে না। সেটি হয়ে যায় রাজনৈতিক পুনর্গঠন। বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০২৪ থাকবে। কিন্তু কোন জায়গায় থাকবে, সেটিই প্রশ্ন। এটি কি হবে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক আন্দোলনের বছর, যার ভালো-মন্দ, সাফল্য-ব্যর্থতা, সহিংসতা ও পরিণতি ইতিহাসবিদরা নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করবেন? নাকি এটিকে এমনভাবে নির্মাণ করা হবে, যেন ২০২৪-এর আগে বাংলাদেশ ছিল একটি ভুল ইতিহাস এবং জুলাইয়ের পরেই শুরু হয়েছে ‘নতুন বাংলাদেশ’?

দ্বিতীয় পথটি বিপজ্জনক।কারণ একটি জাতির ইতিহাস মুছে নতুন ইতিহাস বসানো যায় না। ইতিহাসকে অস্বীকার করে নতুন রাষ্ট্রীয় চেতনা তৈরি করা যায় না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অগ্রযাত্রা বহু সংগ্রামের ফল। ১৯৫২, ১৯৬৯, ১৯৭১, ১৯৯০ এবং পরবর্তী গণতান্ত্রিক আন্দোলনগুলোকে পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু ২০২৪-কে ১৯৭১-এর বিকল্প হিসেবে দাঁড় করানো হলে প্রশ্ন উঠবেই। ২০২৪ কি ১৯৭১-এর ধারাবাহিকতা, নাকি ১৯৭১ থেকে সরে যাওয়ার রাজনৈতিক প্রকল্প? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে, আগামী দিনের বাংলাদেশ কোন ইতিহাসের ওপর দাঁড়িয়ে নিজেকে চিনবে।

আমার কাছে বিপদের জায়গাটি এখানেই। জুলাইকে ইতিহাস হিসেবে সংরক্ষণ করা হোক। নিহতদের মৃত্যুর সত্য উদঘাটন করা হোক। হত্যার বিচার হোক। বিতর্কিত সংখ্যা ও ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হোক। কিন্তু ২০২৪-এর রাজনৈতিক ঘটনাকে মহিমান্বিত করে ১৯৭১-এর বিকল্প জাতীয় ইতিহাস বানানো চলবে না। কারণ ইতিহাসের ভিত্তি দুর্বল হলে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎও দুর্বল হয়ে যায়। আবু সাঈদ কিংবা মুগ্ধের নাম নিয়ে কথা হয় না খুব একটা, এখন বরং ওসমান হাদি হয়ে উঠেছে সেই ২৪-এর রাজনীতির তুরুপের তাস।

জুয়েল রাজ, সম্পাদক, ব্রিকলেন; যুক্তরাজ্য প্রতিনিধি, দৈনিক কালেরকন্ঠ

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অধ্যাপক ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী ৪৮ অধ্যাপক ডা. শেখ মো. নাজমুল হাসান ২৮ অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১১ আজমিনা আফরিন তোড়া ১০ আনোয়ারুল হক হেলাল আফসানা বেগম আবদুল গাফফার চৌধুরী আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ৩২ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল ১০ আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১৮ আরিফ রহমান ১৬ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৫৪ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইনাম আহমদ চৌধুরী ইমতিয়াজ মাহমুদ ৭৩ ইয়ামেন এম হক এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন একুশ তাপাদার এখলাসুর রহমান ৩৭ এনামুল হক এনাম ৫৪ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৮১ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান কেশব কুমার অধিকারী খুরশীদ শাম্মী ১৮ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ৪৪ জহিরুল হক মজুমদার জাকিয়া সুলতানা মুক্তা জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুনাইদ আহমেদ পলক জুয়েল রাজ ১২২ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ১২ ড. কাবেরী গায়েন ২৩ ড. নাদিম মাহমুদ ৩৮ ড. মাহরুফ চৌধুরী ১৩ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ড. শামীম আহমেদ ৪৫ ডা. আতিকুজ্জামান ফিলিপ ২০ ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন ১০ তানবীরা তালুকদার তোফায়েল আহমেদ ৩২ দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৭ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক প্রফেসর ড. মো. আতী উল্লাহ ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬২ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৪৪ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার জাকির হোসেন ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৮ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১৯৫ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১৫৩ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক ১৪ রণেশ মৈত্র ১৮৩ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ৫৫ রাজু আহমেদ ৪৩ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩৮ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর