টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
Advertise
কবির য়াহমদ | ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কখনো কখনো শ’পাতার দ্বিপাক্ষিক চুক্তি কিংবা প্রটোকলভিত্তিক দীর্ঘ বৈঠকের চেয়েও একটি সাধারণ শুভেচ্ছাবার্তা অনেক বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের যে জট বছরের পর বছর ধরে খোলা যায় না, সামান্য এক সৌজন্য প্রকাশ সেই বরফ গলিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে পারে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ছিয়াত্তরতম জন্মদিনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পাঠানো শুভেচ্ছা এবং তার জবাবে মোদির প্রতিক্রিয়া তেমনই এক ইঙ্গিত দিচ্ছে। গত দুই বছর ধরে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে চলতে থাকা দূরত্ব, ভুল বোঝাবুঝি ও কূটনৈতিক লড়াইয়ের পর দুই শীর্ষ নেতার এই যোগাযোগকে ইতিবাচক এক রূপান্তর হিসেবেই দেখা যেতে পারে।
১৭ সেপ্টেম্বর রাতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের (পিএমও) ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ ও এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডল থেকে এ শুভেচ্ছা বার্তা পোস্ট করা হয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ছবি সম্বলিত বর্ণিল শুভেচ্ছা কার্ড পোস্ট করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান লেখেন, ‘প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে জন্মদিনের উষ্ণ শুভেচ্ছা। আপনার এই বিশেষ দিনে অনেক অনেক শুভকামনা। ভারতের জনগণের জন্য আপনার নিবেদিত সেবা সবসময় সুস্বাস্থ্য ও উদ্যমের সঙ্গে অব্যাহত থাকুক।’ এর কিছুক্ষণের মধ্যেই সাড়া দেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। তারেক রহমানের বার্তাটি নিজের এক্স হ্যান্ডলে শেয়ার করে নরেন্দ্র মোদি লেখেন, ‘আপনার আন্তরিক শুভকামনার জন্য ধন্যবাদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আপনার সদয় কথাগুলো আমি গভীরভাবে মূল্যায়ন করছি।’
সোশ্যাল মিডিয়ায়, বিশেষ করে ফেসবুকে এই শুভেচ্ছাবার্তা প্রকাশিত হওয়ার পর তা ভাইরাল হয়ে যায়। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যেখানে জনমত গঠনে এবং সরকারের সিদ্ধান্তের গতিপথ নির্ধারণে সোশ্যাল মিডিয়া বড় ভূমিকা রাখে, সেখানে একটা শ্রেণির তীব্র ভারতবিরোধী অবস্থানের বিপরীতে এই পোস্ট করা ছিল এক সাহসী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। হাজার হাজার মানুষ এই পোস্টে মন্তব্য করেছেন, যাদের প্রতিক্রিয়া ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই রূপেই বিভক্ত। তবে সকল সমালোচনা সামলে রাষ্ট্র পরিচালনায় এ ধরনের শুভেচ্ছাবার্তা সরকারের বলিষ্ঠ এক রাজনৈতিক নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক পেশাদারত্বের পরিচয়।
দুই প্রতিবেশী দেশের শুভেচ্ছাবার্তার এই আদান-প্রদানকে কোনো ব্যক্তিগত বা দাপ্তরিক শিষ্টাচার হিসেবে সীমিত পরিসরে দেখার সুযোগ নেই। একে বৃহত্তর পরিসরে দেখা যেতে পারে। কারণ, এই বার্তার পেছনের প্রেক্ষাপট একেবারে মসৃণ নয়। সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে মোদি সরকারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়টি সর্বজনবিদিত। কিন্তু চব্বিশের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে দুই দেশের সম্পর্কে ব্যাপক টানাপড়েন দেখা দেয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে সরকারের উপদেষ্টা থেকে শুরু করে অনেক নেতা ভারতের সেভেন সিস্টার্স দখলেরও হুমকি দিয়েছিলেন। ভারত সরকার ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশে ক্ষমতাসীনদের চক্ষুশূলে পরিণত হয়েছিল। এগুলো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে চরম অবিশ্বাসের জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরেও সেই অবিশ্বাসের দেয়াল ভাঙেনি, বরং দিন দিন তা আরও পোক্ত হচ্ছিল।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়া এবং শরীফ ওসমান হাদির হত্যাকারীদের হস্তান্তরের দাবি করা হলেও দিল্লি তাতে সাড়া দেয়নি। উপরন্তু, গত মাসে দিল্লিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে শেখ হাসিনার এক মতবিনিময় সভাকে কেন্দ্র করে ঢাকা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। বাংলাদেশের অভিযোগ ছিল, ভারতের মাটিকে ব্যবহার করে ‘বাংলাদেশবিরোধী’ রাজনৈতিক প্রচারণা চালানো হচ্ছে এবং দিল্লি তা নিয়ন্ত্রণে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এই টানাটানির রেশ ছড়িয়ে পড়েছিল কূটনৈতিক অঙ্গনেও। ভারতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের সাইডলাইনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তা ‘প্রধানমন্ত্রী’ প্রটোকলে না হয়ে হয়েছিল কেবল ‘বিমসটেক চেয়ার’ হিসেবে। এই পদবি ও আমন্ত্রণের ধরণ নিয়ে অসন্তোষ থেকে সরকার সেটাকে গ্রহণ করেনি। পরবর্তীতে ভারতের পক্ষ থেকে দ্বিপাক্ষিক সফরের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হলেও ঢাকা শর্ত দেয়— আগে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট অগ্রগতি দেখাতে হবে। সব মিলিয়ে এমন এক জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যে, আদৌ ভারতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কোনো সফর হবে কি না, তা নিয়েই সংশয় দেখা দেয়।
সম্প্রতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবিরের বক্তব্যেও সেই টানাপড়েনের চিত্র ফুটে উঠেছিল। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ‘রিসেট’ চায় সরকার এবং গত ১৫ বছরের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। ভারত নিয়ে অতিরিক্ত মোহের প্রকাশ হচ্ছে এমন ইঙ্গিত দিয়ে তিনি মন্তব্য করেছিলেন, “ভারত কেবল আরেকটি প্রতিবেশী দেশ... সকালের নাশতা, দুপুরের খাবার, রাতের খাবার—সব সময় খালি ভারতের কথাই ভাবলে চলবে না। নিজের দেশের কথা ভাবুন।” যদিও হুমায়ুন কবির তীব্র ভারতবিরোধী কোনো রাজনৈতিক নেতা নন। তাদের দল যখন ক্ষমতার বাইরে ছিল, ২০১৮ সালে তিনি বিএনপির উচ্চপর্যায়ের এক প্রতিনিধি দলের সদস্য হয়ে ভারত সফর করে এসেছিলেন। এই বিবিধ প্রতিকূলতা ও অস্থির কূটনৈতিক আবহেই এলো এই জন্মদিনের শুভেচ্ছা বার্তা। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বিমসটেক কিংবা প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল নিয়ে যখন ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে জট লেগেছিল, ঠিক তখন তারেক রহমানের শুভেচ্ছাবার্তার জবাবে নরেন্দ্র মোদি নিজের পোস্টে সরাসরি ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান’ লিখে সেই বিতর্কের রেশ অনেকটাই হালকা করে দিলেন।
বিমসটেকের চেয়ার নাকি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী— এই দ্বন্দ্ব যখন চলছে, তখন ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান’ শব্দগুলোর গুরুত্ব অনেক। সাময়িক উত্তেজনা কিংবা রাজনৈতিক দূরত্ব যতই থাক না কেন, ঢাকা বা দিল্লি কোনো পক্ষই এই দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থাকে আর টেনে নিয়ে যেতে চায় না। এবং বাস্তবতার নিরিখে ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক কারণে বাংলাদেশ ও ভারত একে অপরের অনিবার্য প্রতিবেশী। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য টেবিলে মুখোমুখি বসার কোনো বিকল্প নেই। প্রতিবেশীদের মধ্যে সম্পর্কের টানাপড়েন থাকে, থাকবেই; কিন্তু একে অন্যকে অগ্রাহ্য করে চলা অসম্ভব।
জন্মদিনের এই শুভেচ্ছাবার্তা এবং এর জবাব - দুই দেশের সমস্ত ঝুলে থাকা অমীমাংসিত সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে না। রাজনৈতিক আশ্রয়, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ কিংবা ট্রাইব্যুনালের রায়ের মতো বড় বড় ইস্যুগুলো কূটনৈতিক টেবিলে ঠিকই চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে। কিন্তু একে অন্যকে এড়িয়ে চলার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছিল, এবং দিন দিন যা আরও পোক্ত হচ্ছিল; দুই প্রধানমন্ত্রীর এই সংক্ষিপ্ত অথচ আন্তরিক বার্তা বিনিময়ে সেই বরফ অন্তত গলতে শুরু করেছে। এই আশাবাদের জায়গাটি হয়তো খুব বড় নয়, তবে কূটনীতির প্রায়-বন্ধ দুয়ার খোলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।
১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।
আপনার মন্তব্য