টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
Advertise
কবির য়াহমদ | ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
গত জুলাইয়ে নিজের ফেসবুক আইডিতে একটা রিল ভিডিও পোস্ট করে দেশব্যাপী ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছিলেন সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের পিঠাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রানি পাল। এক সহকর্মীর ধারণ করা সেই ভিডিওতে ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছিল ‘ডিফারেন্ট টাচ’ ব্যান্ডের কালজয়ী গান, ‘শ্রাবণের মেঘগুলি জড়ো হলো আকাশে/ অঝরে নামবে বুঝি শ্রাবণেই ঝরায়ে/ আজ কেন মন উদাসী হয়ে/ দূর অজানায় চায় হারাতে...’ পরিপাটি শাড়ি পরে স্কুল প্রাঙ্গণে হাঁটার এই সাধারণ দৃশ্য সোশ্যাল মিডিয়ায় আসতেই শুরু হলো অনলাইন ট্রায়াল।
ঘটনার পর পরই শিক্ষিকার শালীনতা, নীতি ও শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাকে সামাজিকভাবে কোণঠাসা করার প্রতিযোগিতায় মেতে উঠল একটা শ্রেণির ফেসবুক ব্যবহারকারী। হেনস্তার শিকার শিক্ষিকাকে নিরাপত্তা চেয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি করতে হলো। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রভাবিত হয়ে স্থানীয় শিক্ষা প্রশাসন শুরুতে ‘আচরণবিধি লঙ্ঘনের’ অজুহাতে তদন্ত কমিটি গঠনের তোড়জোড়ও শুরু করে দিল। শেষমেশ সেটা আর হয়নি, মূলত প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের সংস্কৃতিবান্ধব একটা মন্তব্যের পর। প্রতিমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘একজন শিক্ষিকা গান গেয়ে একটা ভিডিও আপলোড করেছেন, এতে কোনো অশ্লীলতা নেই, গান গাওয়াকে তিনি অন্যায় মনে করেন না।’ এ একটা মন্তব্যেই মূলত থেমে যায় প্রশাসনের তদন্তের পথচলা। সামাজিকভাবে কোণঠাসা অবস্থা থেকে শুরু করে চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তারও ইতি ঘটে তার।
এই সেপ্টেম্বরে বসে সেই জুলাইয়ে ফিরে যাওয়ার কারণ মূলত সিলেট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস যখন ২০২৬ সালের জন্য জেলার ‘গুণী শিক্ষক’হিসেবে চারজনের নাম ঘোষণা করল, তার শীর্ষেই উঠে এলো বিউটি রানি পালের নাম। আর এ স্বীকৃতির সঙ্গে ফিরে এলো সেই ‘ভাইরাল’ প্রসঙ্গ। প্রশ্নটা তাই স্বাভাবিকভাবেই এসে দাঁড়ায়, স্কুলশিক্ষিকা বিউটি রানি পালকে আমরা আসলে কীভাবে মূল্যায়ন করব? তিনি কি ভাইরাল হয়েছিলেন বলে ‘গুণী শিক্ষক সম্মাননা’র জন্য নির্বাচিত হলেন, নাকি তার পাঠদানের দক্ষতার কারণে? আর যদি জুলাইয়ের সেই ভাইরাল-প্রসঙ্গকেই মুখ্য করে দেখি এই অর্জনকে, তাহলে কি তার মেধার অবমূল্যায়ন আর শিক্ষকতা পেশার অপমান হয়ে যায় না?
বাস্তবতা বলছে, অনলাইনের সেই ‘বিউটি-মুভমেন্ট’ বা সোশ্যাল মিডিয়ার ভাইরালিটির প্রভাবে শিক্ষা বিভাগ তাকে ‘গুণী শিক্ষক’ ঘোষণা করেনি। এই স্বীকৃতি কোনো করুণা নয়, ক্ষতিপূরণ নয়, ভাইরালিটির কোনো পুরস্কারও নয়। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাখাওয়াত এরশেদ জানিয়েছেন, কোনো সোশ্যাল মিডিয়া ট্রল বা জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে এই নির্বাচন হয়নি। বিউটি পালের দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন, শ্রেণিকক্ষে উদ্ভাবনী ও আনন্দময় পাঠদান পদ্ধতি, শিশুদের সৃজনশীল উপায়ে গণিত-বিজ্ঞান শেখানো, বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা আর সহপাঠ্যক্রমিক কার্যক্রমে অবদান, এসব নির্দিষ্ট মানদণ্ড ধরেই এসেছে এই স্বীকৃতি। শিক্ষা-কর্মকর্তার এই বক্তব্যে এখানে একটা পরিহাসও লুকিয়ে আছে, যে কর্মকর্তা মাস-দুয়েক আগে তার বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠনের কথা বলছিলেন, সেই একই কর্মকর্তা এখন তার যোগ্যতার কথা বলছেন প্রাতিষ্ঠানিক ভাষায়।
বিউটি রানি পাল সম্পর্কে যারা খবর রাখেন, তারা জানেন, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের এই প্রাক্তন শিক্ষার্থী আগেও জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদকের অধীনে সিলেট জেলার সেরা প্রধান শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছিলেন। অর্থাৎ ভাইরাল হওয়ার অনেক আগে থেকেই তিনি ছিলেন প্রমাণিত, সফল একজন শিক্ষক। তার পেশাগত দক্ষতাই শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি, সোশ্যাল মিডিয়ার অযাচিত বিতর্ক যার ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারেনি কখনো।
‘গুণী শিক্ষক’ স্বীকৃতির সরকারি ঘোষণা আসার পর পরই আবার সেই সামাজিক মাধ্যমে মাতম উঠেছে-- ভাইরাল হওয়ার কারণে পুরস্কার। তার অর্জনকে স্রেফ একটা ‘ভাইরাল কাণ্ড’ এবং তৎপরবর্তী আলোচনা অথবা সোশ্যাল মিডিয়ায় তার পক্ষে ব্যাপক জাগরণের ফসল বলে অনেকে ট্যাগ দিয়ে সংকুচিত করে ফেলছেন। অনেককে যখন বলতে দেখছি ‘ভাইরাল হয়ে বিউটি পাল গুণী শিক্ষক সম্মাননার জন্য নির্বাচিত হলেন’ কিংবা ‘প্রতিবাদের মুখে তাকে পুরস্কার দেওয়া হলো’, তখন আদতে তার দুই দশকের শিক্ষকতাজীবন, মেধা, যোগ্যতা আর ক্লাসরুমে শিক্ষার্থীদের মনস্তত্ত্ব বুঝে পাঠদান কার্যক্রমকে একপাশে ঠেলে দিচ্ছি আমরা। একজন পেশাদার শিক্ষককে ফেলা হচ্ছে স্রেফ একটা ‘সোশ্যাল মিডিয়া ফেনোমেনন’-এ। এটা আসলে বিউটি রানি পালের পেশাগত মেধা ও ব্যক্তিত্বের একধরনের প্রচ্ছন্ন অবমূল্যায়ন, যতটা না ইচ্ছাকৃত, তার চেয়ে বেশি আমাদের শব্দ ও ভাষা ব্যবহারের অভ্যাসগত সীমাবদ্ধতা কিংবা দুর্বলতা।
সোশ্যাল মিডিয়া সম্পাদনাহীন এক প্ল্যাটফর্ম হওয়ার কারণে এখানে সবকিছুকে এক পাল্লায় মাপার একটা প্রবণতা রয়েছে। কিন্তু বিউটি রানি পালের গল্পটা এমন ভাইরালিটির নয়, এটা একজন যোগ্য শিক্ষকের নিজের কর্মক্ষেত্রে স্বাতন্ত্র্যের এক গল্প। একজন শিক্ষকের মূল পরিচয় থাকে সোশ্যাল মিডিয়ার রিলে নয়, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের চোখে। বিউটি রানি পাল প্রমাণ করেছেন, অনলাইনের কোলাহল যত তীব্রই হোক না কেন, কর্মক্ষেত্রের নিষ্ঠা আর পেশাগত যোগ্যতার আলো তার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।
আমাদের উচিত বিউটি পালকে স্রেফ একটা ‘ভাইরাল চরিত্র’ বা ‘অনলাইন প্রতিবাদের প্রতীক’ বানিয়ে না রেখে, একজন দক্ষ ও মেধাবী শিক্ষক হিসেবে তার প্রাপ্য সম্মান দেওয়া। তিনি গুণী শিক্ষক সম্মাননার জন্য নির্বাচিত হয়েছেন নিজের মেধা, যোগ্যতা আর পাঠদান স্বাতন্ত্র্যে; সোশ্যাল মিডিয়ার পরিচিতি কিংবা দয়ায় নয়। শিক্ষাপ্রশাসন তাকে পুরস্কৃত করছে ড্যামেজ কন্ট্রোল করতে নয়, সত্যিকার অর্থে পেশাদারত্বের নিক্তিতে।
বিউটি রানি পালকে অভিনন্দন। শিক্ষাপ্রশাসনকে ধন্যবাদ তাকে স্বীকৃতির এ সিদ্ধান্তের জন্য। বিউটি রানি দেখিয়েছেন শিশুর মনস্তত্ত্ব বুঝে, যাকে আমরা ‘আনন্দময় পাঠদান’ বলছি তার প্রয়োগে। এখানে কর্তৃপক্ষের উচিত হবে ‘আনন্দময় পাঠদান’-কে কেবল স্লোগানের মধ্যে না রেখে, এবং বাস্তবে এর অনুশীলন যারা করছে কেবল তাদেরকে স্বীকৃতি দিয়ে থেমে না থেকে, এই পদ্ধতিকে প্রাতিষ্ঠানিক করার উদ্যোগ নেওয়া।
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪
মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।
আপনার মন্তব্য