টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
Advertise
এনামুল হক এনাম | ১৮ অক্টোবর, ২০২৬
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে কেবল কবি বা সাহিত্যিক হিসেবে দেখলে তাঁর প্রতি যথাযথ মূল্যায়ন করা হয় না। কারণ, তিনি শুধু বাংলা ভাষায় অসামান্য সাহিত্য রচনা করেননি, বাংলা ভাষা কীভাবে নিজেকে প্রকাশ করবে, কীভাবে জটিল চিন্তা ধারণ করবে এবং আধুনিক জ্ঞান ও বিজ্ঞানের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করবে, সেই বিকাশপ্রক্রিয়াতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। বাংলা ভাষার ইতিহাসে তিনি শুধু একজন স্রষ্টা নন, ভাষার আধুনিক রূপ নির্মাণের অন্যতম প্রধান কারিগর।
বাংলা ভাষা রবীন্দ্রনাথের একক সৃষ্টি নয়। কোনো ভাষাই একজন মানুষের হাতে জন্ম নেয় না। হাজার বছরের সামাজিক বিবর্তন, মানুষের মুখের ভাষা, আঞ্চলিক বৈচিত্র্য, সাহিত্যিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বহু প্রজন্মের অবদানে ভাষা গড়ে ওঠে। চর্যাপদের কবিরা বাংলা ভাষার প্রাচীন লিখিত নিদর্শনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ; মধ্যযুগের বৈষ্ণব পদাবলি ও মঙ্গলকাব্য তাকে সমৃদ্ধ করেছে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যে শৃঙ্খলা ও কাঠামো নির্মাণ করেছেন, মাইকেল মধুসূদন দত্ত কবিতা ও নাটকে নতুন আঙ্গিক এনেছেন, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় উপন্যাস ও গদ্যকে শক্তিশালী করেছেন। এই ধারাবাহিকতার মধ্যেই রবীন্দ্রনাথের আবির্ভাব। তাঁর বিশেষত্ব হলো, তিনি বাংলা ভাষার প্রকাশক্ষমতাকে বহুমাত্রিকভাবে প্রসারিত করেছেন।
তাঁর অন্যতম বড় অবদান বাংলা গদ্যের প্রকৃতি পরিবর্তনে। একসময় সাধুভাষা ছিল লিখিত গদ্যের প্রধান রীতি। এই ভাষার ঐতিহাসিক গুরুত্ব থাকলেও এর আড়ষ্টতা ও সংস্কৃতঘেঁষা বাক্যবিন্যাস অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক কথোপকথন থেকে দূরত্ব তৈরি করত। চলিত ভাষাকে সাহিত্যিক মর্যাদা দেওয়ার আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। প্রমথ চৌধুরীর সম্পাদনায় সবুজপত্র এই পরিবর্তনের উল্লেখযোগ্য ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। বাংলা গদ্য ক্রমে আরও স্বাভাবিক, গতিশীল ও বহুমুখী প্রকাশের উপযোগী হয়ে ওঠে। এই পরিবর্তন অবশ্য কোনো একজনের একক কীর্তি ছিল না; এর পেছনে ছিল বহু লেখকের সম্মিলিত প্রচেষ্টা।
ভাষার আধুনিকায়নে তাঁর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান বাংলা ভাষার নিজস্ব প্রকৃতি অনুসন্ধান। বাংলাশব্দতত্ত্ব ও বাংলাভাষা-পরিচয় গ্রন্থে তিনি বাংলা ভাষার ধ্বনি, শব্দ, উচ্চারণ ও গঠন নিয়ে আলোচনা করেছেন। বাংলা ভাষাকে সংস্কৃত ব্যাকরণের ছাঁচে বিচার না করে তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও বিবর্তনের আলোকে বোঝার চেষ্টা করেছেন। ভাষা কোনো প্রাচীন ব্যাকরণের বন্দি নয়; মানুষের ব্যবহার, সামাজিক পরিবর্তন এবং উচ্চারণের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে তার নিয়ম গড়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথের ভাষাবিষয়ক চিন্তায় এই উপলব্ধির পরিচয় পাওয়া যায়।
বাংলা গদ্যের বাক্যগঠনেও তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য। দার্শনিক প্রবন্ধে তাঁর গদ্য এক রকম, গল্পে অন্য রকম, চিঠিতে আরও স্বতঃস্ফূর্ত, আবার রম্যরচনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভাষাকে তিনি একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে আবদ্ধ না রেখে বিষয়, অনুভূতি ও চিন্তার প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করেছেন। তাঁর ছোটগল্প, প্রবন্ধ ও চিঠিপত্র বাংলা ভাষার প্রকাশভঙ্গিকে সমৃদ্ধ করেছে।
শিক্ষার ক্ষেত্রেও তাঁর ভাষাচিন্তা গুরুত্বপূর্ণ। ঔপনিবেশিক সমাজে ইংরেজি শিক্ষার প্রভাবের মধ্যে তিনি মাতৃভাষায় শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন। শান্তিনিকেতনের শিক্ষাব্যবস্থা এবং শিশুদের জন্য সহজ পাঠ রচনার মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষায় শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তুলতে অবদান রেখেছেন। তাঁর কাছে ভাষা শুধু সাহিত্য উপভোগের মাধ্যম ছিল না; এটি ছিল জ্ঞান অর্জন, চিন্তা প্রকাশ এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগের মাধ্যম।
এই ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, প্রমথ চৌধুরী, জীবনানন্দ দাশ, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবদানও স্মরণীয়। নজরুল বাংলা শব্দভাণ্ডার, ছন্দ ও সংগীতে নতুন শক্তি এনেছেন। আরবি-ফারসি শব্দের সৃজনশীল ব্যবহার বাংলা ভাষার প্রকাশভঙ্গিকে বিস্তৃত করেছে। শরৎচন্দ্র সাধারণ মানুষের জীবন ও কথ্য ভাষাকে জনপ্রিয় গদ্যে প্রতিষ্ঠা করেছেন। জীবনানন্দ বাংলা কবিতায় নতুন চিত্রকল্প ও অনুভবের জগৎ তৈরি করেছেন। বাংলা ভাষার বিকাশ তাই কোনো একক ব্যক্তির কীর্তি নয়; এটি বহু স্রষ্টার সম্মিলিত ইতিহাস।
কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে আমাদের সময়ের একটি অদ্ভুত প্রবণতা লক্ষ করা যায়। কেউ কেউ তাঁকে ভিনদেশি বলে প্রত্যাখ্যান করেন, কেউ তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে এনে তাঁর সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক অবদানকে খাটো করতে চান। তাঁদের স্মরণ রাখা দরকার, রবীন্দ্রনাথের জন্ম ১৮৬১ সালে কলকাতায়, ব্রিটিশ শাসিত ভারতের বাংলায়। সে সময় আজকের ভারত ও বাংলাদেশের মতো পৃথক রাষ্ট্রের সীমানা ছিল না। বাংলা ছিল ব্রিটিশ ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। আজকের রাষ্ট্রীয় সীমান্তকে উনিশ শতকের মানুষের পরিচয়ের ওপর বসিয়ে দিয়ে তাঁকে ভিনদেশি বলা ইতিহাসকে বর্তমানের সংকীর্ণতায় বন্দি করা।
রবীন্দ্রনাথের ধর্মীয় পরিচয়ও সরলীকরণের বিষয় নয়। তিনি ব্রাহ্মধর্মের অনুসারী ছিলেন। তাঁর পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন আদিব্রাহ্মসমাজের অন্যতম প্রধান নেতা। ব্রাহ্মধর্ম একেশ্বরবাদ, ধর্মীয় সংস্কার ও উপনিষদীয় চিন্তার সঙ্গে যুক্ত একটি স্বতন্ত্র ধর্মীয় আন্দোলন। তবে আদিব্রাহ্মসমাজের অনুসারীদের পরিচয় নিয়ে ঐতিহাসিকভাবে হিন্দুধর্মের সঙ্গে সম্পর্ক ও আত্মপরিচয়ের বিভিন্ন ব্যাখ্যা ছিল। তাই রবীন্দ্রনাথকে কেবল প্রচলিত হিন্দুধর্মের অনুসারী বলে চিহ্নিত করা যেমন অসম্পূর্ণ, তেমনি তাঁকে হিন্দু ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কহীন বলে দাবি করাও ইতিহাসের সরলীকরণ। তাঁর সাহিত্য ও চিন্তার পরিসর কোনো একক ধর্মীয় পরিচয়ে সীমাবদ্ধ ছিল না।
রবীন্দ্রনাথের আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক গুরুত্বের একটি অসাধারণ উদাহরণ তাঁর রচিত দুটি জাতীয় সংগীত। বাংলাদেশের আমার সোনার বাংলা এবং ভারতের জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে তাঁরই সৃষ্টি। ভারতের জাতীয় সংগীতটি মূলত বাংলায় রচিত হয়েছিল। অর্থাৎ, একটি ভাষায় রচিত গান পরবর্তীকালে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জাতীয় পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে। শ্রীলঙ্কার জাতীয় সংগীতের ক্ষেত্রেও তাঁর প্রভাব রয়েছে। সংগীতশিল্পী আনন্দ সমরকুন রবীন্দ্রনাথের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন; তবে শ্রীলঙ্কার জাতীয় সংগীতকে রবীন্দ্রনাথের রচনা বলা সঠিক নয়।
এখানেই রবীন্দ্রনাথের তাৎপর্য। বাংলা ভাষায় জন্ম নিয়েও তাঁর সৃষ্টি ভৌগোলিক সীমানা অতিক্রম করেছে। তিনি বাংলা ভাষাকে বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে সংযুক্ত করেছেন, আবার বাংলা ভাষার ভেতরেই এমন প্রকাশক্ষমতা দেখিয়েছেন, যা প্রেম থেকে দর্শন, ব্যক্তিমানুষের সংকট থেকে সমাজের প্রশ্ন, প্রকৃতি থেকে বিশ্বমানবতার ধারণা পর্যন্ত বিস্তৃত।
রবীন্দ্রনাথকে দেবতা বানানোর প্রয়োজন নেই। তাঁর সব বক্তব্য চূড়ান্ত সত্য নয়, তাঁর সব রচনাও সমান মানের নয়। তাঁকে প্রশ্ন করা যায়, সমালোচনা করা যায়, তাঁর সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করা যায়। কিন্তু তাঁকে কেবল কবির পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করলে ভাষা ও সংস্কৃতির ইতিহাসে তাঁর বিস্তৃত ভূমিকা আড়াল হয়ে যায়।
রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষা সৃষ্টি করেননি, কিন্তু বাংলা ভাষা নিজেকে যে আধুনিক, বহুমাত্রিক ও বিশ্বমুখী রূপে প্রকাশ করতে শিখেছে, সেই যাত্রায় তিনি ছিলেন অন্যতম প্রধান পথপ্রদর্শক। তাঁকে ছোট করার জন্য তাঁর ধর্মীয় পরিচয় বা জন্মভূমিকে অস্ত্র বানানোর প্রয়োজন নেই। বরং তাঁর অবদান বুঝতে হলে ইতিহাস জানতে হবে, ভাষার বিবর্তন বুঝতে হবে এবং সাহিত্যকে সংকীর্ণ পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে পড়তে হবে।
কারণ, ভাষা কোনো ধর্মের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, কোনো রাষ্ট্রের সীমানায় তার সৃষ্টিশীলতার শেষ রেখা টানা যায় না। রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি এমন এক ভাষার নির্মাতা, যে ভাষায় আজও মানুষ ভালোবাসে, প্রতিবাদ করে, প্রশ্ন তোলে, নিজের পরিচয় খোঁজে এবং পৃথিবীকে নতুন করে বুঝতে শেখে।
সুইজারল্যান্ড, জার্মানি, স্পেন, চেক প্রজাতন্ত্র, সার্বিয়া, স্কটল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম ও উজবেকিস্তানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রবীন্দ্রনাথের আবক্ষ মূর্তি স্থাপিত হয়েছে। এমনকি শেক্সপিয়রের জন্মভূমি স্ট্র্যাটফোর্ড-আপন-এভনেও রয়েছে তাঁর ভাস্কর্য। তাঁর বিশ্বকবিত্বের পরিচয় শুধু একটি উপাধিতে নয়, ভাষা ও ভূগোলের সীমানা পেরিয়ে মানুষের শ্রদ্ধা ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারে।
যাঁর সৃষ্টি পৃথিবীর নানা প্রান্তে সম্মানিত, তাঁকে ধর্মের সংকীর্ণ পরিচয়ে বন্দি করতে চাওয়া রবীন্দ্রনাথের মহত্ত্বকে নয়, বরং সেই সংকীর্ণতার দৈন্যকেই প্রকাশ করে, কারণ বিশ্বকবিকে ছোট করতে গেলে শেষ পর্যন্ত নিজের পৃথিবীটাকেই ছোট করে ফেলতে হয়।
মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।
আপনার মন্তব্য