আজ শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬

Advertise

নিষেধাজ্ঞার দেয়ালে সম্প্রীতি ঢোকে না

ড. মো. আবু নাসের  

আমাদের রাজনীতিতে একটা পুরনো রোগ আছে। যারা ক্ষমতায় আসে তারা ভাবে, ইতিহাসের শেষ অধ্যায়টা তারাই লিখবে। প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিষিদ্ধ করলে ক্ষমতায় থাকা নিরাপদ হবে, এই বিশ্বাসও নতুন নয়। অর্ধশতক ধরে আমরা পরীক্ষাটা চালাচ্ছি এবং ফল প্রতিবার একই। নিষিদ্ধ দল শেষ হয়ে যায় না। আড়ালে চলে যায়, গোপনে সক্রিয় থাকে। আর আড়ালের রাজনীতি কখনো শোভন হয় না।

২০২৫ সালের মে মাসে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনের সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধনও বাতিল করে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। সেই নির্বাচনে নৌকা ছিল না। এপ্রিলে নতুন সংসদ আইন করে সেই নিষেধাজ্ঞাকেই অনুমোদন দেয়। ওদিকে দিল্লি থেকে শেখ হাসিনা বলছেন, নিষেধাজ্ঞা তুলে নিন। তিনি ডিসেম্বরে দেশে ফিরতে চান। অর্থাৎ ঘরের ভেতরে দরজা বন্ধ, কিন্তু বাইরে থেকে একজন বলছেন তিনি ঢুকবেন। এই অবস্থায় প্রশ্ন একটাই। আমরা কি আরেকটা দেয়াল তুলব, নাকি দরজাটা খুলে দেবো।

দেশের ইতিহাসে যে কয়টি ভালো নির্বাচন হয়েছে তার সবকটিতেই আওয়ামী লীগ কোটি কোটি মানুষের ভোট পেয়েছে। ২০০১ সালে হেরে গিয়েও দলটি প্রায় ৪০ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। এই ভোটাররা কোনো অপরাধ করেননি। তারা কেউ চা-দোকানদার, কেউ স্কুলশিক্ষক, কেউ ইউনিয়ন পর্যায়ের কর্মী। একটি দল নিষিদ্ধ হলে তাদের রাজনৈতিক ঠিকানাটাই কেড়ে নেওয়া হয়। গণতন্ত্রে ঠিকানাহীন নাগরিক বিপজ্জনক। জোর করে তাদের চুপ করে রাখার চেষ্টা করা হলেও তারা অন্য পথ খুঁজে নেয়।

অপরাধ করে মানুষ, দল নয়। ২০২৪ এর জুলাই-আগস্টে যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের পরিবারের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার প্রশ্নাতীত। কিন্তু দল নিষিদ্ধ করলে কেউই ন্যায়বিচার পায় না। ন্যায়বিচার আসে তদন্ত, সাক্ষ্য, আসামিপক্ষের আইনজীবী আর খোলা আদালতের পথে। যে অভিযুক্ত, আদালত তার বিচার করুক। যে নির্দোষ, সে কেন দলীয় পরিচয়ের দায়ে শাস্তি ভোগ করবে? সম্মিলিত দায়ের নীতি আইনের শাসনের বিপরীত। আজ যারা সেটা সমর্থন করছেন, কাল অন্য কেউ সেটা তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করতে পারে।

নিষেধাজ্ঞার এই গল্প নতুন নয়। জামায়াতে ইসলামী ১৯৭২ সালে নিষিদ্ধ হয়েছিল, পরে জিয়াউর রহমানের আমলে দলটি আবার রাজনীতিতে ফেরে। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার সরকার দলটিকে নিষিদ্ধ করেছিল। কয়েক সপ্তাহ পরেই অন্তর্বর্তী সরকার সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। নিষেধাজ্ঞা আমাদের দেশে টেকে না, কারণ ক্ষমতার হাত বদলায়।আজকের বিজয়ী যে নিষেধাজ্ঞা চাপায়, কালকের পরাজিত সেটার বিরুদ্ধেই অভিযোগ তোলে। এই চক্র থেকে বেরোতে হলে কাউকে একবার থামতে হবে। আরও পেছনে গেলে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের কথা মনে পড়ে। বিচারের পথ বন্ধ করে দিলে ক্ষত শুকোয় না। তখন যেমন বিচার আটকানো ভুল ছিল, এখন রাজনীতি আটকানোও একই ধরনের ভুল।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গত নভেম্বরে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। সরকার বলছে তারা তাঁকে ফেরত চায়। তথ্য উপদেষ্টা বলেছেন, তিনি ফিরতে চাইলে সরকার সেই প্রক্রিয়া সহজ করবে। তাহলে আপত্তি কোথায়? অনুপস্থিতিতে হওয়া রায়ের নৈতিক ওজন সব সময় কম থাকে। আসামি আদালতে দাঁড়ালে, আত্মপক্ষ সমর্থন করলে, আপিলের সুযোগ পেলে রায়টা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়। শেখ হাসিনা যদি দেশে ফেরেন, আদালতের মুখোমুখি হন, তাহলে সবাই এমন একটা বিচার দেখবে যা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারবে না। তিনি দিল্লিতে বসে থাকলে দুই দেশের সম্পর্কে একটা কাঁটা থেকে যায়। ফেরার পথটা তাই খুলে দেওয়া উচিত। নিরাপত্তা ও আইনি প্রক্রিয়ার নিশ্চয়তাসহ তাঁকে আদালতের সামনে দাঁড়াতে দেওয়া উচিত।

এখানে একটা সতর্কতা জরুরি। তাঁর ফেরার দিনে যেন রাস্তায় বিচার না বসে। সম্প্রতি দিল্লিতে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের দিন ঢাকায় তাঁর কুশপুত্তলিকা পোড়ানো হয়েছে। ক্রিকেট তারকা সাকিব আল হাসানের বাড়িতেও হামলা হয়েছে। এই উত্তেজনা বলে দেয়, আমাদের সমাজে ঘৃণা এখনো টগবগ করছে। কিন্তু ঘৃণাকে সরকারি নীতি বানালে ঘৃণা আরও বাড়ে। রাষ্ট্রের কাজ ঘৃণার সঙ্গে তাল মেলানো নয়, আইনের শাসনে ঘৃণাকে বেঁধে রাখা।

নিষেধাজ্ঞা তোলা মানে বিনা শর্তে সবকিছু ছাড় দেওয়া নয়। আওয়ামী লীগের কাছে স্পষ্ট প্রত্যাশা থাকতে পারে যে, তারা জুলাইয়ের ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচারপ্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করবে। আওয়ামী লীগ ফিরলে রাজনীতি প্রকাশ্যে ও নিয়মের মধ্যে চলবে, ফিরতে না দিলে চলবে আড়ালে ও নিয়মের বাইরে।

সম্প্রতি আমরা রিকনসিলিয়েশন শব্দটা অনেক শুনছি। রিকনসিলিয়েশন জরুরি, তবে তার থেকে বেশি প্রয়োজন সম্প্রীতি আর সুশাসনের রাজনীতি। সম্প্রীতি আসে তখন, যখন প্রতিপক্ষকে রাজনীতির মাঠে দাঁড়াতে দেওয়া হয়। যারা মনে করেন একটি দলকে আইন করে অদৃশ্য করে দিলে গণতন্ত্র শক্ত হবে, তারা আসলে ভোটারের ওপর আস্থা রাখেন না। ভোটার জানে কাকে কখন শাস্তি দিতে হয়। ১৯৯৬ সালে দিয়েছে, ২০০১ সালে দিয়েছে, ২০০৮ সালেও দিয়েছে। ভোটারদের সেই সুযোগটা আবার দিন।

সুশাসন কোনো ঘোষণা নয়, এটা প্রতিদিনের চর্চা। থানায় কার মামলা নেওয়া হচ্ছে, কার নেওয়া হচ্ছে না। আদালতে কার জামিন হচ্ছে। সরকারি চাকরি কীসের ভিত্তিতে মিলছে। রাস্তায় কার ঘরবাড়ি নিরাপদ। যে সরকার এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সবার জন্য এক রাখতে পারে, নিষেধাজ্ঞার আইনের ঢাল সেই সরকারের প্রয়োজন হয় না।

নিষিদ্ধ করা সহজ, কারণ তাতে শুধু একটা কলম লাগে। ঠিকঠাক বিচার করা কঠিন, কারণ তাতে লাগে ধৈর্য, প্রমাণ আর সাহস। দেশ চালাতে সহজ পথটা বেছে নিলে কঠিন কাজটা আরও ভারী হয়ে ওঠে। এই ভার আমরা পঞ্চাশ বছর ধরে বহন করে আসছি। আর কত?

ড. মো. আবু নাসের, চেয়ারপারসন, কমিউনিকেশনস বিভাগ, ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি, বেকার্সফিল্ড।

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য ২ অধ্যাপক ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী ৪৮ অধ্যাপক ডা. শেখ মো. নাজমুল হাসান ২৯ অসীম চক্রবর্তী ৯ আজম খান ১১ আজমিনা আফরিন তোড়া ১০ আনোয়ারুল হক হেলাল ১ আফসানা বেগম ১ আবদুল গাফফার চৌধুরী ৯ আবু এম ইউসুফ ৩ আবু সাঈদ আহমেদ ৮ আব্দুল করিম কিম ৩২ আব্দুল্লাহ আল নোমান ২ আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল ১০ আমিনা আইরিন ৩ আরশাদ খান ৩ আরিফ জেবতিক ১৮ আরিফ রহমান ১৬ আরিফুর রহমান ২ আলমগীর নিষাদ ১ আলমগীর শাহরিয়ার ৫৪ আশরাফ মাহমুদ ৯ আশিক শাওন ৫ ইনাম আহমদ চৌধুরী ৯ ইমতিয়াজ মাহমুদ ৭৩ ইয়ামেন এম হক ১ এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন ১ একুশ তাপাদার ১ এখলাসুর রহমান ৩৭ এনামুল হক এনাম ৫৫ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ ওমর ফারুক লুক্স ৩ কবির য়াহমদ ৮৯ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান ১ কেশব কুমার অধিকারী ১ খুরশীদ শাম্মী ১৮ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু ৭ জহিরুল হক বাপি ৪৪ জহিরুল হক মজুমদার ৩ জাকিয়া সুলতানা মুক্তা ৯ জান্নাতুল মাওয়া ২ জাহিদ নেওয়াজ খান ৫ জুনাইদ আহমেদ পলক ২ জুয়েল রাজ ১২৩ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ১২ ড. কাবেরী গায়েন ২৩ ড. নাদিম মাহমুদ ৩৮ ড. মাহরুফ চৌধুরী ১৫ ড. মো. আবু নাসের ১ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ৮ ড. শামীম আহমেদ ৪৫ ডা. আতিকুজ্জামান ফিলিপ ২০ ডা. সাঈদ এনাম ৪ ডোরা প্রেন্টিস ২ তপু সৌমেন ৩ তসলিমা নাসরিন ১০ তানবীরা তালুকদার ৩ তোফায়েল আহমেদ ৩২ দিব্যেন্দু দ্বীপ ৭ দেব দুলাল গুহ ৮ দেব প্রসাদ দেবু ১ দেবজ্যোতি দেবু ২৭ নিখিল নীল ৫ পাপলু বাঙ্গালী ৪ পুলক ঘটক ৫ প্রফেসর ড. মো. আতী উল্লাহ ৫ ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬২ ফড়িং ক্যামেলিয়া ২ ফরিদ আহমেদ ৪৪ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা ১ বদরুল আলম ৯ বন্যা আহমেদ ৪ বিজন সরকার ৪ বিপ্লব কর্মকার ৭ ব্যারিস্টার জাকির হোসেন ২ ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৮ ভায়লেট হালদার ৩ মারজিয়া প্রভা ৭ মাসকাওয়াথ আহসান ১৯৬ মাসুদ পারভেজ ২ মাহমুদুল হক মুন্সী ৩ মিলন ফারাবী ১ মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ৩ মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১৫৩ মো. মাহমুদুর রহমান ৬ মো. সাখাওয়াত হোসেন ৩ মোছাদ্দিক উজ্জ্বল ৩ মোনাজ হক ১৪ রণেশ মৈত্র ১৮৩ রতন কুমার সমাদ্দার ১ রহিম আব্দুর রহিম ৫৫ রাজু আহমেদ ৪৪ রুমী আহমেদ ১ রেজা ঘটক ৩৮ লীনা পারভীন ৬