আজ বৃহস্পতিবার, ২০ জুন, ২০২৪

Advertise

এএফপির প্রতিবেদনে কেন কাসেম বিন আবুবাকার?

এস এম নাদিম মাহমুদ  

কাসেম বিন আবুবাকার ঔপন্যাসিক নাকি অপন্যাসিক সেই বিষয়ে রায় দেয়ার আমার কোন ক্ষমতা নেই। এমনকি, তার লেখা চটি না পূজনীয় সে বিষয়েও কিছু বলার ইচ্ছে বা যোগ্যতা নেই। তবে যারা কাসেম বিন আবুবাকারকে আলোক-দ্রুতি দেয়ার চেষ্টা করলেন, তাদের বিষয়ে আমার কিছু কথা রয়েছে।

এএফপির যে রিপোর্টের জন্য কাসেম বিন আবুবাকারের যে নাম আমরা জানছি, সেই প্রতিবেদনকে আমি কখনো স্বাভাবিক প্রতিবেদন হিসেবে মানছি না। কেন মানছি না তার যথাযথ কারণ আমি পেয়েছি, এই প্রতিবেদনকে আপাতত ‘সেলেকটিভ মোটেভেশনাল বায়াস’ বলে মনে করছি।

প্রথমে এএফপির কাছে জানতে চাই, বাংলাদেশে এর আগে তারা কোন সাহিত্যিকের সমতুল্য সাক্ষাতকার তুলেছিল কি না? যদি না উঠায়, তাহলে মনে করায় শ্রেয় প্রতিবেদনটি বিশেষ দিকের বিবেচনায় মূল্যায়িত হয়েছে। তবে বিশেষ দিক কোনটি তা বুঝার জন্য ‘প্রতিবেদনের শুরুর লাইনটি যথেষ্ট। প্রতিবেদক বাকারের উদ্ধৃতি দিয়ে শুরু করেছেন এইভাবে ‘nobody would buy his chaste romance novels about devout young Muslims finding love within the strict moral confines of Bangladeshi society’

প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি রক্ষণশীল? এই রায় কি রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত? ধর্মীয়ভাবে ৮৯ শতাংশ মুসলিম, সেই হিসেবে রক্ষণশীল মুসলমান যে থাকবে না তা নয়। যদি এই ৮৯ ভাগের ৪০ ভাগ রক্ষণশীলতাকে ধারণ না করে তাহলে সেই দেশকে কখনো রক্ষণশীল দেশ বলে রায় দেয়া যুক্তিযুক্ত বলে মনে করি না। আমাদের সমাজ রক্ষণশীল কি না তা আপনি নিজেই হিসেব কষতে পারেন। আজ মেয়েরা ঘরের বাহিরে পুরুষের সাথে লিঙ্গ বিভেদ ভুলে গিয়ে রাষ্ট্রের অর্থনীতির চাকাকে সচল করে তুলছে। আগে যেখানে মেয়েদের ঘর থেকে বের হওয়া নিষেধ ছিল, আজ সেখানে মেয়েরা পুরুষদের চেয়ে শিক্ষায় এগিয়ে গেছে, সেটা মানের ও গুণগত দিক দিয়ে। তাই আপনি কখনো বাংলাদেশকে রক্ষণশীল দেশ (পাকিস্তান, ইরান, আফগানিস্তানের) পাল্লায় ওজন দিতে পারেন না। আপনি আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশকে।

দ্বিতীয়ত, পুরো প্রতিবেদনটিতে আবুবাকারের মন্তব্যকে ‘বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা হয়েছে’। যা প্রতিবেদনে ‘স্প্রিন বায়াসের’ রূপটি স্পষ্ট ধরা পড়েছে। আপনি যখন আত্মকেন্দ্রিক মন্তব্যকে সংবাদের যোগ্যতা বিচার করবেন, তখন সেই সংবাদের সাথে উপমেয় দিক থাকা বাঞ্ছনীয়। তারও আগে প্রতিবেদকের জানা উচিত, সাহিত্যে সমাজ-রাষ্ট্র কিংবা ব্যক্তি সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত। সাহিত্যের মূল্যচয়িত বাক্যে সমাজের গঠনগত কিংবা গুণগত পরিবর্তন না সেই লেখা হয় অসার। যে লেখায় সমাজের সক্ষমতার চেয়ে অক্ষমতার সুর জোরালো হয় সে লেখা মূলত ‘তপ্ত বালুতে এক পশলা বৃষ্টি সমতুল্য। আবুবাকারের সাহিত্যকর্ম নিয়ে আমি পড়াশুনা করিনি, তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে বাক্যগুলো দেখতে পেয়েছি, তাতে আমি ধাক্কা খেয়েছি। ধর্মকে ব্যবহার করে তিনি বিকৃত করার চেষ্টা করেছেন। ব্যক্তিগত মতে তো ধর্ম চলতে পারে না, কিন্তু তিনি এক শ্রেণির পাঠককে সুবিধা দেয়ার জন্য অনেকটা ফতোয়াবাজি বাক্য দিয়ে ‘হালাল’ করার চেষ্টা করেছেন। যা কখনো সমর্থনযোগ্য নয়।

যৌনতা পৃথিবীর শুরু থেকে ছিল, থাকবে। এ নিয়ে সাহিত্যিকদের যেমন রস আছে, তেমনি শাসকগোষ্টিদেরও আগ্রহ আছে। তবে অশ্লীলতাকে পুঁজি করে ‘যৌনতাকে’ হালালের অভিপ্রায় শুধুমাত্র গোষ্ঠিকেন্দ্রিক সুবিধার ছোবল বলেই প্রতীয়মান হয়েছে।

তৃতীয়ত, যুগে যুগে বাংলা সাহিত্যে অনেক কালপুরুষ এসেছে। তারা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। সমাজ কিংবা রাষ্ট্র গঠনে এইসব কবি-সাহিত্যিকদের অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কি অতীত কিংবা বর্তমান, এএফপি কি এর আগে বাংলাদেশের কোন সাহিত্যিকের সাক্ষাতকার লিখেছেন? যদি না হয়ে থাকে আবুবাকারকে প্রাধান্য দেয়ার হেতু কি?

এইবার হয়তো তিনি বলবেন, সর্বাধিক বিক্রিত লেখক হিসেবে আবুবাকারকে নেয়া যায়। এইবার আসুন, প্রতিবেদনে আপনি যে সর্বাধিক বিক্রিত লেখক হিসেবে আবুবাকারকে জাহির করেছেন, তা কোন প্যারামিটারের আলোকে? ‘ফুটন্ত গোলাপ’ যদি সুবাতাস ছড়িয়ে দেয়, তাহলে এই দেশে তো মৌলবাদি সমর্থক গোষ্ঠির পত্র-পত্রিকা তো দেদারছে খবর প্রকাশ করে যাচ্ছে, তাহলে তারা কেন তাকে তুলে ধরেননি? বলি কি, সাম্প্রদায়িক পরিচয়ে পরিচিত পত্রিকাগুলোকে অসাম্প্রদায়িক কবি-লেখক-সাহিত্যিকদের ভয় পায়? যদি না পায়, তাহলে এই কাজটি তাদেরই ছিল, হঠাৎ এএফপি কেন আগ্রহ দেখালো?

উত্তরটা সহজ। দেশে এখন সাম্প্রদায়িক ক্ষমতায়নের উৎসব চলছে। সাম্প্রদায়িক শক্তিকে দেশে গ্রাউন্ড করে দেয়ার জন্য সরকারের কিছু অংশ যখন প্রকাশ্যে-রূপ দিয়েছে, ঠিক তখনি পিনাকি ভট্টাচার্য কিংবা ফরহাদ মজহাররা ধর্মীয় উগ্রতা ছড়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। আমি যতদূর জানি, প্রতিবেদকের যে সাংবাদিক (কদরুদ্দিন শিশির) বক্তব্যকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, তিনি নিজেই কয়েক সপ্তাহ আগে আবুবাকারকে নিয়ে ছবিসহ পোস্ট দিয়েছেন। তার ফেইসবুক পোস্টে সাম্প্রদায়িকতার উস্কানিতে পরিপূর্ণ।

ধারণা করছি, এএফপি তার এবং পিনাকি ভট্টাচার্যের পোষ্টের সূত্রকে সংবাদের উৎস হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সে বিষয়ে আমি কিছু বলতে যাচ্ছি না, তবে প্রতিবেদনে যে কয়েকজন লেখককে পরিচয় করে দেয়া হয়েছে, একই সাথে জনপ্রিয় লেখক হিসেবে দাবি করা হয়েছে, তা কোন হিসেব কষে?

আপনি যখন একজন সাহিত্যিককে বিশ্বের কাছে পরিচয় করে দিবেন, তখন সাহিত্যে জ্ঞান রয়েছে এমন কাউকে রেফারেন্স নিতে পারতেন। প্রবীণ লেখক আল-মাহমুদকে তো অনেকেই চেনে, তার উদ্ধৃতি নিতে পারতেন। আর তা না করে আলীম-মিতুলের বক্তব্য দিয়ে আপনি মূলত সাম্প্রদায়িকতাকে পুঁজি করেছেন।

আবুবাকারের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, মোল্লাদের বই বিক্রি হয় না। এটা যদি সত্য হয়, তাহলে বাংলাদেশে অনেক মাওলানা কিংবা লেখক দেদারছে প্রতি বছর বই বের করছেন। মীর মশাররফ হোসেন, শওকত ওসমানরা তো  অতীতেও বাংলা সাহিত্য দাপিয়ে বই লিখেছেন, তাহলে তার বই কেন বিক্রি হবে না?

প্রতিবেদনে, আবুবাকারের পাঠক হিসেবে নারীদেরকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে, তিনি এতোটাই জনপ্রিয় যে নারীরা তাদের রক্ত দিয়ে প্রেমপত্র লিখতো। এমনকি নারী পাঠকের টেলিগ্রাম আর প্রতিদিন শত শত চিঠি পাওয়ার কথা বলা হয়েছে।

প্রশ্নটা হচ্ছে, এতো জনপ্রিয় একজন লেখকের কাছে কি নারী পাঠকরা চিঠি লিখে, না পুরুষরা? লিঙ্গার্কাষণে হয়তো নারীকে এগিয়ে রাখা হয়েছে, কিন্তু প্রতিবেদক কোন চিঠি নিজে দেখছেন? নাকি আবুবাকারের বক্তব্যকে পীরের বাক্য বলে মনে করেছেন। কিসের উপর ভিত্তি করে?

অবশ্য প্রত্যেক প্রতিবেদকের তথ্যে বিশ্বাসের বিষয়বস্তু হাইড থাকে। তবে প্রতিবেদনের তথ্য এইটুকু মনে হয়েছে, তথ্য গোপন। যা সাংবাদিকদের কখনো উচিত নয়। এতো বড় জনপ্রিয় লেখক, যার বাড়িতে শত শত চিঠি আসে, ইচ্ছে করলে প্রতিবেদক কিছু চিঠির স্তূপের ছবি দিয়ে পাঠকদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে দিতে পারতেন।

কিন্তু না তা করা হয়নি। বরং পর্দার আড়াল করার চেষ্টা চলছে। বাংলা সাহিত্যে কে শক্তিমান লেখক আর কে অক্ষমান তা যুগ যুগ ধরে বাঙালিরা সাহিত্য চর্চার মাধ্যমে কোনটি সাহিত্যকর্ম আর কোনটি সাহিত্যকর্ম নয়, সেটা সচেতন পাঠক আর সাহিত্যবোদ্ধারা হিসেব কষবেন। তবে একজন সাংবাদিক হিসেবে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এই ধরনের সংবাদ প্রচার মূলত সাম্প্রদায়িক উস্কানি হিসেবে মনে করি।

বাংলাদেশ এখনো সাম্প্রদায়িক দেশে পরিণত হয়নি। এখনো আমরা স্বাধীনভাবে লিখতে, বলতে, চলতে পারি। আমরা অসাম্প্রদায়িকতার চর্চা করি। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বঙ্কিম, শরৎ, হুমায়ূন আহমেদকে সমাজ কিংবা রাষ্ট্রে সংস্কারক হিসেবে মনে করি। সেখানে সাম্প্রদায়িক আর অশ্লীলতায় ভরপুর লেখককে টেনে তোলা মূলত ভবিষ্যৎ সাম্প্রদায়িক শক্তিকে বেগবানের প্রয়াস মাত্র। সরকারের সাম্প্রদায়িক প্রীতির ডামাঢোলে পানি ঘোলা করার মতো প্রতিবেদন সবাইকে ভুগতে হবে। গণমাধ্যমের শক্তিশালী ভূমিকায় ধর্মীয় কুসংস্কার দূর হয়ে আলোর পথে যখন বাংলাদেশ, তখন গোষ্ঠিভিত্তিক সাম্প্রদায়িক শক্তিকে স্থান দেয়া সার্বভৌমত্বে সরাসরি আঘাত বলে মনে করি।

 

এস এম নাদিম মাহমুদ, গবেষক, ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অধ্যাপক ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী ৪৮ অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১১ আজমিনা আফরিন তোড়া ১০ আনোয়ারুল হক হেলাল আফসানা বেগম আবদুল গাফফার চৌধুরী আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ৩২ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল ১০ আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১৮ আরিফ রহমান ১৬ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৫৪ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইনাম আহমদ চৌধুরী ইমতিয়াজ মাহমুদ ৭১ ইয়ামেন এম হক এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন একুশ তাপাদার এখলাসুর রহমান ৩৭ এনামুল হক এনাম ৪৪ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ এস এম নাদিম মাহমুদ ৩৩ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৬৩ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান কেশব কুমার অধিকারী খুরশীদ শাম্মী ১৭ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ৪৪ জহিরুল হক মজুমদার জাকিয়া সুলতানা মুক্তা জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুনাইদ আহমেদ পলক জুয়েল রাজ ১০৭ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ১২ ড. কাবেরী গায়েন ২৩ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ড. শামীম আহমেদ ৪১ ডা. আতিকুজ্জামান ফিলিপ ২০ ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার তোফায়েল আহমেদ ৩১ দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৭ নাজমুল হাসান ২৪ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক প্রফেসর ড. মো. আতী উল্লাহ ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬২ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৪২ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার জাকির হোসেন ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৮ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১৯১ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১৫৩ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক ১৪ রণেশ মৈত্র ১৮৩ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ৫৫ রাজু আহমেদ ১৯ রাজেশ পাল ২৮ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩৮ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর শাওন মাহমুদ