পদ্মশ্রী দে

০২ এপ্রিল, ২০২৬ ১৪:৩৫

ইয়োগা থেরাপি ও সৃজনশীল পরিবেশ: অটিস্টিক শিশুদের জন্য নতুন সম্ভাবনা

আজ বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস । গোটা বিশ্বব্যাপী অটিজম আজ একটি জটিল সমস্যা।বহু মানুষ এই সমস্যায় পড়ে রাতদিন দীর্ঘশ্বাস ছাড়ছেন। তারা মানসিক ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন। আমি দীর্ঘদিন অটিস্টিক ও এডিএইচডি শিশুদের নিয়ে কাজ করার ফলে বিচিত্র অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছি।অথচ, অজ্ঞতা, ভয়-ভীতি, কুসংস্কার এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে অনেকেই এই জটিল পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসতে পারছেন না।

কিছুদিন আগে, আমার অফিসে একটি ছেলে সন্তানকে নিয়ে দুইজন মা-বাবা এসেছিলেন। শিশুটির অটিজমের কথা বলতে গিয়ে, বারবারই অটিজমকে রোগ হিসেবে আখ্যায়িত করছিলেন এবং তাদের ভাষ্য মতে, অনেক চিকিৎসকের কাছে শিশুকে দেখিয়েছেন কিন্তু কোনো ওষুধেই তারা সন্তুষ্ট হতে পারছেন না। অটিজমকে রোগ হিসেবে ভাবা এবং বারবার নতুন নতুন ডাক্তার দেখানোর আগে, অটিজম কী, অটিজম কেন হয়, একটি শিশুর অটিজম থাকলে তাকে কীভাবে পরিচর্যা করতে হবে, তা প্রত্যেক মা-বাবার আগে জানা দরকার, বোঝা দরকার। আমার কাজের সুবাদে, কিছু মা-বাবার অভিজ্ঞতা শোনার ও বোঝার সুযোগ হয়েছে। তারা অটিজম আক্রান্ত শিশুকে নিয়ে অসহায় বোধ করেন, অনেকের লোকলজ্জা কাজ করে। আবার অনেক সময় অনেক অভিভাবক নিজেও অ্যানজাইটি বা ডিপ্রেশনে ভোগেন। শারীরিক স্বাস্থ্য ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আজও ঘরে ঘরে মানুষের শিক্ষা ও সচেতনতা নেই। মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক কোনো সমস্যা দেখা দিলে, প্রথমে সাইকোলজিস্টের কাছে যেতে হবে না সাইক্যাট্রিস্টের কাছে যেতে হবে, কার কাজ কী ! এই বিষয় নিয়েও আজও অনেকের পরিষ্কার ধারণা নেই ।

আমি মনে করি, প্রতিটি স্কুলে শিশুর পাশাপাশি যদি অভিভাবকদের জন্যও বিশেষ কিছু ট্রেনিং এবং শারীরিক-মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক কিছু প্রোগ্রাম করা হতো তাহলে মনে হয়,যে মা বাবাদের ঘরে অটিজম আক্রান্ত শিশু আছে, তারা হয়তো এসব বিষয় নিয়ে এত অসহায় বোধ করতেন না, তাদের এত লজ্জা থাকতো না। তাদের মনে এতো প্রশ্ন ও দুঃখ বোধ এতটাও থাকতো না। কারণ তারা বুঝতেন এই শিশুগুলোও অনেক মেধার অধিকারী। তাদের দ্বারা ও কতো কিছু সম্ভব।

দীর্ঘ সময় একটা বিভ্রান্তিতে থাকতে থাকতে উপযুক্ত পরিচর্যা আর প্রশিক্ষণের সময় অনেকটা নষ্ট হয়ে যায়। সঠিক সময়ে, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও উপদেশ নিয়ে, শিশুর বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী পরিচর্যা, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, এবং প্রয়োজনীয় কিছু সমস্যার জন্য বিশেষ ওষুধ প্রয়োগ করা খুবই প্রয়োজনীয়। অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের আচরণগত সমস্যা, অস্হিরতা, নিজেকে আঘাত করার প্রবণতা, খিটখিটে মেজাজ ইত্যাদির জন্য পৃথিবীর সকল উন্নত দেশেই সীমিত আকারে বিশেষ ওষুধ প্রয়োগ করা হয়।

আমাদের দেশে অটিজম আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় পরিচালিত এক জরিপ অনুযায়ী দেখা গেছে বাংলাদেশে দুই লাখ সাতচল্লিশ হাজার ছত্রিশজন প্রতিবন্ধীর মধ্যে ছেচল্লিশ হাজার পাঁচশো অনুশোত্তর জন অটিজমে আক্রান্ত। তবে বর্তমানে এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে। আমাদের দেশে মা বাবারা যখন খেয়াল করেন তাদের শিশুটি একটু ভিন্ন , ঠিক মতো চোখে চোখ মেলাচ্ছে না, সঠিক ভাবে রেসপন্স করছে না তখন তারা নিজেরাও বুঝতে পারেন না কী করবেন ! কোথায় যাবেন ! অনেক সময় চিকিৎসককে দেখানোর পরেও তাদের মনে কৌতূহল থাকে যে আদৌ তাদের বাচ্চাটির অটিজম আছে কিনা। আবার অনেকেই অটিজমকে রোগ হিসেবে ভাবেন । আর এই সবকিছু হচ্ছে অটিজম নিয়ে স্পষ্ট ধারণা এখনো ঘরে ঘরে পৌঁছায়নি বলে।

অটিজম সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ২০০৮ সালে প্রতি বছর দুই এপ্রিল আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস পালিত হয়। স্বাস্থ্য সংক্রান্ত জাতিসংঘের সাতটি দিবসের মধ্যে বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস একটি গুরুত্বপূর্ণ দিবস হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। তাহলে আমার প্রশ্ন হলো এখনও এই অটিজমে আক্রান্ত শিশুকে সমাজের আরও দশটা বাচ্চা থেকে আলাদা হয়ে থাকতে হয় । এখনও মা বাবাদের চোখে কেনো এই অসহায়ত্ব !! সেই অসহায় মা বাবাদের জন্য কিছু বিখ্যাত উক্তি আমি এখানে শেয়ার করছি- আমেরিকান বিজ্ঞানী টেম্পল গ্র্যান্ডিন যার নিজের অটিজম ছিলো তিনি বলেছেন- আমি ভিন্ন কিন্তু আমি কম নই। স্টুয়ার্ট ডাঙ্কন বলেছিলেন, অটিজম একটি অক্ষমতা নয়,এটি একটি ভিন্ন ক্ষমতা। জনি সেইট্জ বলেছিলেন, সাধারণ হওয়া নিয়ে ভাবা বন্ধ করুন...আপনার শিশুটি কী হতে পারে, সেটির জন্য আপনার কল্পনা ও যথেষ্ট বড় নয়।

এখন চলুন বুঝি যে অটিজম কী এবং ইয়োগা থেরাপি ও লাফটার ইয়োগা কীভাবে অটিস্টিক শিশুদের জন্য এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে। অটিজম হল এক ধরনের স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার। স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার হল এক ধরনের মানসিক জটিলতা যেখানে অনেক ধরনের মানসিক সমস্যা একসাথে যুক্ত থাকতে পারে। এটা এক ধরনের নিউরো ডেভেলপমেন্ট ডিসঅর্ডার যে একটি শিশুর আচরণ, সামাজিক যোগাযোগ ও শেখার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। কারণ এটি শেখার গতিকে ধীর করে দেয় এবং শিশুর অভ্যন্তরীণ বোঝাপড়া ও সামাজিক দক্ষতা বিকাশের পথে বাধা সৃষ্টি করে। অটিজমের বৈশিষ্ট্যগুলো সাধারণত শিশুর প্রারম্ভিক শৈশবকালে দেখা যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিশুর আঠারো মাস থেকে আঠাশ মাস বয়সের মধ্যেই অটিজম প্রকাশ পায়। কোনো কোনো সময় শিশু দেড় থেকে দুই বছর বয়স পর্যন্ত স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠে।

অস্ট্রিয়ান মেডিকেল থিওরিস্ট হ্যান্স অ্যাসপারগার ও আমেরিকান শিশু মনোবিজ্ঞানী লিও ক্যানার ১৯৪৩ সালে ১১ জন শিশুকে নিয়ে গবেষণা করে অটিজমের যে লক্ষণগুলো দেখতে পান সেগুলোকে একসাথে বোঝাতে অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার শব্দটি ব্যবহার করেন যাকে সংক্ষেপে বলা হয় এএসডি। আমাদের সমাজে অনেকেই মনে করেন, অটিজম থাকা ব্যক্তিরা অক্ষম বা ডিসেবল। কিন্তু তারা অক্ষম নয়, বরং তারা ভিন্নভাবে সক্ষম। সঠিক সময়ে সঠিক পরিচর্যা, সঠিক পরিবেশ, এবং যথার্থ সহায়তা পেলে, তারাও সাধারণ মানুষের মতো অনেক কিছু অর্জন করতে পারেন এবং অসাধারণ কিছু করে দেখাতে পারেন।

আমেরিকান বিজ্ঞানী টেম্পল গ্র্যান্ডিন অটিস্টিক হয়ে ও তার কাজ দিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের মন জয় করেছেন। বিশ্বব্যাপী অটিজম ও নিউরোডাইভার্সিটি নিয়ে বক্তৃতা দিয়ে, বই লিখে মানুষকে সচেতন করেছেন। ব্রিটিশ পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন উইলিয়াম হকিংও অ্যামিওট্রফিক ল্যাটারাল স্ক্লেরোসিস (অখঝ) অর্থাৎ এক ধরনের মোটর নিউরন রোগে আক্রান্ত ছিলেন।পৃথিবীর ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, পৃথিবীর অনেক মহাপ্রতিভাবান মানুষ ছিলেন অটিস্টিক, অথবা নিউরোডাইভারজেন্ট, কিন্তু তারা যে ভিন্নভাবে সক্ষম, সেটা তারা বারবার প্রমাণ করে দেখিয়েছেন তাদের কর্ম ও অসাধারণ চিন্তা দিয়ে। ইয়োগা থেরাপি, লাফটার ইয়োগা, ক্ল্যাপিং থেরাপি এবং একটি ইতিবাচক পরিবেশ, একটি অটিস্টিক শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে গভীরভাবে সাহায্য করতে পারে। যোগব্যায়াম শুধু শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য নয়, এটি আত্মনিয়ন্ত্রণ বাড়াতে, মন শান্ত করতে ও মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। ইয়োগা থেরাপি আমাদের নার্ভাস সিস্টেমকে সক্রিয় করে এবং প্রভাবিত করে। বিভিন্ন ধরণের প্রাণায়াম ও ইয়োগা আমাদের ভেগাস নার্ভকে নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে।

নিউরোইমেজিং করে গবেষণায় দেখা গেছে, ইয়োগা থেরাপির পর প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়, যা শিশুর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, বিচার-বিশ্লেষণ ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে। বিভিন্ন ধরণের আসন, যেমন চাইল্ড পোজ, বাটারফ্লাই, ট্রি পোজ, ক্যাট অ্যান্ড কাউ, এসব আসন এবং কিছু বিশেষ ইয়োগা থেরাপি আছে, যেগুলো একটি অটিস্টিক শিশুর ক্ষেত্রে খুবই প্রয়োজনীয়। অটিস্টিক শিশুর মধ্যে সংবেদনশীলতা থাকে অনেক বেশি, ক্ল্যাপিং থেরাপি শিশুর উদ্বেগ কমাতে, সংবেদনশীলতা নিয়ন্ত্রণে, মোটর কর্ডিনেশনে, স্ট্রেস হরমোন করটিসল কমিয়ে, এন্ডোফিন হরমোন রিলিজ করে শিশুর মনকে ভালো করে রাখে। লাফটার ইয়োগার জন্য শিশুর গ্রুপ অ্যাক্টিভিটি ও সামাজিক যোগাযোগের দক্ষতা বাড়ে, স্ট্রেস, অ্যাংজাইটি কমে। বিভিন্ন ধরণের কগনেটিভ ডেভেলপমেন্ট গেমস, গ্রুপ অ্যাক্টিভিটিজ, একটি অটিস্টিক শিশুর ক্ষেত্রে খুব সাহায্যকারী ভূমিকা পালন করতে পারে। গত কয়েক বছর ধরে, আমার প্রতিষ্ঠানের ইমেজ ডেভেলপমেন্ট ফর চিল্ড্রেন কোর্সে, শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়া ও তাদের সার্বিক উন্নয়ন দেখে, আমি স্বপ্ন দেখি যে, একদিন আমাদের দেশে এই শিশুরা তাদের মতো করে সঠিকভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ, সুবিধা ও সম্ভাবনা আরও পাবে। মা-বাবারা অসহায় বোধ না করে সাহস ও বিশ্বাসের সাথে তাদের শিশুদের নিয়ে সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবেন, কারণ এই শিশুরা অক্ষম নন, তারা ভিন্নভাবে সক্ষম। পৃথিবীতে সবার সম্ভাবনা থাকে, সঠিক সময়ে সঠিক যত্ন এবং পরিবেশ পেলে সে সম্ভাবনা বিকশিত হয় ও বেড়ে ওঠে।

যদি টেম্পল গ্র্যান্ডিন, স্টিফেন উইলিয়াম হকিং, টেলিফোনের আবিষ্কারক আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল, এবং বিজ্ঞানী থমাস আলফা এডিসন পারেন, তাহলে আমাদের দেশের এই শিশুগুলো কেনো পারবে না?

"আজ যে শিশু পৃথিবীর আলোয় এসেছে, আমরা তার তরে একটি সাজানো বাগান চাই।"

পদ্মশ্রী দে: ইয়োগা টিচার ও হলিস্টিক ওয়েলনেস কোচ, ফাউন্ডার- ট্রিপল এ

আপনার মন্তব্য

আলোচিত