Advertise

হোসনে আরা কামালী

০৪ এপ্রিল, ২০২০ ২১:২২

নাই নাই ভয়, হবে হবে জয়, খুলে যাবে এই দ্বার

আজকের বিশ্বের সব চেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ করোনা ভাইরাস। করোনার করাল গ্রাস উন্নত বিশ্বকে আজ তছনছ করে দিয়েছে। মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ থেকে হচ্ছে দীর্ঘতর। তৃতীয় বিশ্বও করোনা আক্রান্ত। বাংলাদেশে করোনা এখনও মহামারী আকারে না ছড়ালেও আশঙ্কা তো থেকেই যায়। মানুষের ইতিহাস সাক্ষ্যবহন করে সে অতীতের যত সব মহামারী, দুর্যোগ এসেছে, মানুষ চরমমূল্য দিয়েও কিন্তু মানুষ আবার উঠেও দাঁড়িয়েছে। মানুষের সাহস, সংগ্রাম করার স্পৃহা, ত্যাগ এবং মানবতা তাকে জিতিয়ে দিয়েছে বারংবার। এই বিপদের দিনে মানুষই জেগে ওঠেছে মানুষের জন্য। ক্রন্দন নয়, বেদনার গান গাইবার জন্য নয়, জাগরণের গান গাইবার জন্য। বাঁচারগান গাইবার জন্য।

প্রস্তরযুগের মানুষের জানা এবং না জানার ইতিহাস, যুগের পালকে নতুন মাত্রা যোগ করা যুদ্ধবিগ্রহ এবং বিজয়, সাধারণ মানুষের সংগ্রাম মানুষের সভ্যতাকেই নিরন্তর নবায়ন করে গেছে। জন্ম দিয়েছে মানবের লড়াকুসংস্কৃতির। আজকে ভুলে যেতে চাই পরাশক্তির দাপট, স্নায়ুযুদ্ধের কূটচাল, বিভেদের রাজনীতি, সাম্প্রদায়িক নষ্টামি। জানি, আবার যদি জেগে উঠতে পারি পুরাতন পোশাকই হয়ত নতুন করে পরবে এই পৃথিবী। আজকের দিনে সেই শঙ্কার অভিধান খুলে বসতে চাই না। না চাওয়ার কারণও বিস্তর। শুধু অমঙ্গলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য মানুষের যূথবদ্ধ ভালোবাসার বাগান চাই। পরিচর্চায় মানুষ নামীয় ফুল ফোটাতে চাই। কিন্তু কীভাবে? সহজ উত্তর –ভালোবাসা দিয়ে। অধিকন্তু ভালোবাসার কথা মুখে বলা সহজ। কথাগুলো বেশ তাত্ত্বিকই হয়ে যাচ্ছে… আসুন মাঠের খবরের দিকে দৃষ্টি ফেরাই।

প্রসঙ্গ ও প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ। আজ পর্যন্ত বাংলাদেশে করোনায় মৃত্যু নয় জন, আক্রান্ত মোট সত্তর জন। বাংলাদেশ একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। এখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১২৬৩ জন লোক বাস করেন। খেটে খাওয়া মানুষের সংখ্যা অনেক। ছিন্নমূল বাস্তুহারা মানুষ ছোটবড় সব শহরেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন। অদ্যাবধি বড়োজোর তারা করোনা ভাইরাসের নামটি জেনেছেন। ওদের কে সচেতনতার আওতায় আনা একটি কঠিন কাজ। ‘বাড়িতে থাকুন’, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখুন, বার বার হাত ধুন’, কথাগুলো তাদেরকে স্পর্শ করছে না। এইসব আমজনতার কথা যদি বাদও দেই সামাজিকভাবে আমাদের সচেতনতার অবস্থা কী রকম তাই বা ভাবছি কী! আমরা ধর্মীয় জামায়েতগুলোকে বাদ দিতে পারছি না, গরীবদের সাহায্যের নামে পাঁচ কেজি চাল দান করতে পঁচিশজন দাঁড়িয়ে ছবি তুলছি। ফেইসবুকে আপলোড করার প্রতিযোগিতায় মত্ত হয়ে আছি। ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছি দুর্যোগের দিনে। মানবিকমানুষের চেহারা আমরা ভুলতে বসেছি নয় কি? ঘটনার উল্টোপিঠও আছে। মানুষের জন্য মানুষ কথাটিকে মাথায় নিয়ে ডাক্তার, নার্স, টেকনিশিয়ান, ছাত্র-তরুণ, সাংস্কৃতিক কর্মী সবাই কাজ করার জন্য বেরিরে এসেছে যে যার মত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিক চেষ্টায় সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসন কাজ করছে। জনগণের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে তার মিল অমিলের আনুপাতিক হিসেব কষা অন্যসময়ের বিষয় বিবেচনা। সবাইকে মিলতে এবং মেলাতে প্লাটফর্ম তৈরি করা জরুরি। সেটা ব্যক্তিপর্যায়ে হোক বা গোষ্ঠি পর্যায়েই হোক।

বলাকা কাব্যের ২নং কবিতার ব্যাখ্যায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন— ‘দুঃখকালেই অন্তরের ও সমাজের প্রচ্ছন্ন সম্পদ দেখা দেয়। দুঃখের দিন ছাড়া অন্তর সম্পদ আপনাকে প্রকাশ করে না।' ক্রান্তিকালে মানবতা ইতিহাসের জন্ম দেয়। এখন এমন নজিরের অপেক্ষা না করে যে যার মত সাহসিকতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে মনযোগী হতে হবে। কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজে নানা গুজব রটিয়ে আনন্দ পান হয়ত কেউ কেউ, আর যদি তাতে ধর্মীয় ফ্লেভার দেয়া যায়, যাচাই না করা সাধারণ মানুষ তা বিশ্বাস করে। করোনা আক্রান্ত দেশেও গুজবের ছড়াছড়ি। কেউ কেউ করনা ভাইরাস সাক্ষাৎকার নিয়ে বসে আছেন এবং জানতে পেরেছেন ভাইরাসটি বাংলাদেশের প্রতি সমমর্মী, বাংলাদেশের জনগণকে আক্রান্ত থাকবে না, গো-মূত্র পান করলে করোনা আরোগ্য হবে। আমপাতার মধ্যে মধু, তাতেই মিলবে করোনার দাওয়াই। একটি শিশুর জন্ম হয়েই সে কথা বলতে শুরু করে দেয় এবং বলে চিনি ছাড়া লাল চা-ই করোনার দাওয়াই। এভাবেই নানাদিকে রচিত গুজব ছড়িয়ে যাচ্ছে মোবাইলের মাধ্যমে সর্বত্র। করোনার মতো এইসব গুজবও মানুষের মগজকে বিকল করে দিতে দ্রুত ছড়াচ্ছে। বিজ্ঞানচর্চায় আমরা যতটা না পিছিয়ে বিজ্ঞানমনস্কতায় তার চাইতেও বেশি। গুজবে কান দেয়া যাবে না, গুজবের বিরুদ্ধে প্রচারণাও দরকার।

মেডিকেল সাইন্স যে স্বাস্থ্যবিধির কথা বলছে তা আক্ষরিক মেনে চলা দরকার। স্রষ্টা সর্বত্র বিরাজমান, জমায়েত এড়িয়ে স্রষ্টাকে ডাকুন ঘরে বসে। নিশ্চিত তিনি শুনতে পাবেন। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখুন অন্তত এপ্রিল মাস টি। আতঙ্ক সমাধান দেবে না, সচেতনতাই সুস্থ রাখবে বস্তুবাদী সমাজে ভোগের উপকরণের অভাব নেই, ব্যক্তিচিন্তার উগ্র প্রকাশ অনেক সময় খাটো হয়ে যায় পরিপার্শ্ব। তাই যার কাছে টাকা পয়সা আছে, খেয়াল খুশিমতো সদাই এনে ঘরভর্তি করে ফেলতে পারব। কিন্তু আমাদের আশে পাশের অনেকেই তা পারবেন না। কথাটি যেন আমরা ভুলে না যাই। আমি আর আমাদের পার্থক্য ঘুচানোর সময় কিন্তু আজ বয়ে যায়।

যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম আবারও তাই বলি -মানুষ জানে না তাঁর শক্তিমত্তা কতটুকু। সে অগোচরে সঞ্চিত করে জীবনের ধন তার প্রাণশক্তি। বিপদ ও দৈন্যের কালে সে শক্তিরই বিকাশ ঘটায়, রূপান্তর ও বিবর্তন সাধন করে সময়ের প্রয়োজনে। তাই মানুষ জিতে যায়। মানবতার হয় জয়। পৃথিবী টিকে আছে অসীম মানবিক ক্ষমতার মানুষ আছে বলেই। জানিনা এবেলা বেঁচে থাকব কিনা, যদি নাও থাকি ঠিক জানি ওবেলা আলো আসবেই। পৃথিবীর জরা ঘুচবেই। বিজিত মানুষ মাথা তুলে দাঁড়াবেই। তবে প্রত্যাশা হবে আগামীর প্রকৃতিরসন্তান মানুষ হবে প্রকৃতিবান্ধব। সে যেন আত্মঘাতী মানুষ হয়ে না ওঠে।

  • হোসনে আরা কামালী: কবি-প্রাবন্ধিক, বিভাগীয় প্রধান, বাংলা বিভাগ, মদনমোহন কলেজ, সিলেট।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত