Advertise

ডা. নাজিম অপু

২১ মে, ২০২০ ০০:০৬

করোনা চিকিৎসায় নতুন মাত্রা ❛প্লাজমা থেরাপি❜

করোনা চিকিৎসায় ❛প্লাজমা থেরাপি❜ বর্তমানে বহুল আলোচিত বিষয়। এটি আদৌ কার্যকর হবে কি না সেটি বলার সময় এখনো আসেনি। এখনো এটি ট্রায়াল ফেজে আছে। অধিকতর গবেষণা ও ট্রায়ালের মাধ্যমে এর কার্যকারিতা প্রমাণিত হতে হবে। সে আলোচনার ক্ষেত্র আলাদা। তবে সাধারণ কিছু কথা সবার সাথে শেয়ার করার উদ্দেশ্যেই এই লেখা।

বিজ্ঞাপন

কী এই প্লাজমা থেরাপি?
রক্তের দুইটি অংশ -
১. কোষ
২. জলীয় (সাদা) অংশ।
মূলত এই জলীয় অংশকেই আমরা প্লাজমা বলি। কোন ব্যক্তি আক্রান্ত হয়ে পূর্ণ সুস্থ হওয়ার পর তার প্লাজমা সংগ্রহ করে নতুন আক্রান্ত রোগীকে দেওয়ার মাধ্যমে যে চিকিৎসা পদ্ধতি সেটাই প্লাজমা থেরাপি।

কেন এই প্লাজমা থেরাপি?
আক্রান্ত ব্যক্তির ইমিউনিটি বৃদ্ধির জন্য এটি ব্যবহৃত হয়।

কীভাবে কাজ করে?
বাইরের কোন জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হলে আপনার শরীর এদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। যুদ্ধের জন্য প্রয়োজন হয় সৈন্যের। আর এই সৈন্যগুলিকে আমরা বলি এন্টিবডি। এন্টিবডিগুলো জীবাণুর সাথে ফাইট করে আপনাকে জয়ী করবে। যত বেশি এন্টিবডি আপনার জয়ী হওয়ার চান্স তত বেশি। এন্টিবডি বেশি মানে আপনার ইমিউনিটি ভালো। এই এন্টিবডি রোগীর নিজের শরীরে তৈরি হতে পারে, আবার অন্য কোথাও তৈরি হওয়া এন্টিবডি রোগীর শরীরে ঢোকানো যেতে পারে। যখন এন্টিবডি রোগীর শরীর নিজে থেকেই তৈরি করতে পারে তখন সেটাকে বলে একটিভ ইমিউনাইজেশন। আর বাইরে থেকে এন্টিবডি দিয়ে যে প্রতিরোধ তৈরি করা হয় তাকে বলে প্যাসিভ ইমিউনাইজেশন (passive immunization). প্লাজমা থেরাপির মাধ্যমে আমরা প্যাসিভ ইমিউনাইজেশন তৈরি করি আর টীকার মাধ্যমে তৈরি হয় একটিভ ইমিউনাইজেশন।

প্যাসিভ ইমিউনাইজেশন কি আগে ব্যবহৃত হয়েছে?
অবশ্যই হয়েছে। অনেক আগেই হয়েছিল।
১. এমনকি স্প্যানিশ ফ্লু'র সময়েও হয়েছিল। যদিও সে সময় ইমিউনিটি নিয়ে এতটা ধারণা ছিল না।
২. ইবোলা ভাইরাসের চিকিৎসায় ১৯৯৫ সালে কঙ্গো এবং পরবর্তীতে গিনিতে ব্যবহার হয়েছিল। সেখানে কোন সিরিয়াস সাইড ইফেক্ট হয়নি এবং মৃত্যুহারও কমে গিয়েছিল।
৩. H1N1-এর চিকিৎসায় এটি ব্যবহার হয়েছিল।
তবে আমারা এটাও জানি এই অসুখগুলো আর করোনা সম্পূর্ণ আলাদা।

তাহলে প্রশ্ন হলো করোনার ক্ষেত্রে প্লাজমা থেরাপির ভূমিকা কী?
বর্তমানের করোনা অর্থাৎ কোভিড-১৯ আসার আগে আরও ২টি করোনার সংক্রমণ ছড়িয়েছিল, SARS- করোনা ও MARS- করোনা। এর মাঝে SARS-করোনার চিকিৎসায় প্লাজমা থেরাপি ব্যবহৃত হয়েছিল হংকং ও তাইওয়ানে। ফলাফলে দেখা যায়, প্লাজমা থেরাপি পাওয়া রোগীদের মধ্যে মৃত্যুহার কম, তারা দ্রুত ভালো হয়ে উঠেছে এমনকি হাসপাতাল থেকে দ্রুত ছাড়া পেয়ে বাড়ি যেতে পেরেছে। তাইওয়ানে এমন কিছু হেলথ কেয়ার ওয়ার্কারদের এই প্লাজমা থেরাপি দেওয়া হয় যাদের ক্ষেত্রে অন্য কোন চিকিৎসাই কাজ করছিল না। পরবর্তীতে এই হেলথকেয়ার ওয়ার্কাররা সবাই সুস্থ হয়ে ওঠেন।

তাহলে কোভিড-১৯ এর ক্ষেত্রে কার্যকারিতা কেমন?
চীনের উহানে একটি স্টাডি হয়েছে। সেখানে ১০ জন কোভিড আক্রান্ত রোগী নেওয়া হয়। এই রোগীগুলো সকলেই বিভিন্ন ধরনের এন্টি ভাইরাল, এন্টিবায়োটিক, এন্টিফাংগাল, অক্সিজেনসহ অন্যান্য প্রথাগত চিকিৎসা পেয়ে আসছিল। এদের প্রত্যেককে ২০০ মি.লি. করে প্লাজমা দেওয়া হয়। কারো সিরিয়াস সাইডইফেক্ট হয়নি। ফলাফলে দেখা যায় ১-৩ দিনের মাঝে সব উপসর্গগুলোর উন্নতি হচ্ছে, অক্সিজেন কম দেওয়া লাগছে, অক্সিজেন স্যাচুরেশন বাড়ছে, রক্তের সব খারাপ মার্কারগুলোর উন্নতি হচ্ছে। নিউমোনিয়ার উন্নতি পাওয়া গেছে ৭ দিনে। এমনকি ৭ দিনের মাথায় রক্তে আর ভাইরাস পাওয়া যাচ্ছে না।

বিজ্ঞাপন

কোন ধরনের রোগীর জন্য প্রয়োজন?
১. করোনা টেস্ট পজিটিভ এবং
২. গুরুতর রোগী বা জীবন-শঙ্কায় থাকা রোগী

নিচের যে কোন ১টি থাকলেই সে গুরুতর রোগী
• Shortness of breath (dyspnea),
• Respiratory frequency ≥ 30/min,
• Blood oxygen saturation ≤ 93%,
• Partial pressure of arterial oxygen to fraction of inspired oxygen ratio < 300,
• Lung infiltrates > 50% within 24 to 48 hours

নিচের যে কোন ১টি থাকলেই সে জীবন-শঙ্কায় থাকা রোগী
• Respiratory failure,
• Septic shock,
• Multiple organ dysfunction or failure

কে প্লাজমা দিতে পারবে?
করোনা থেকে সেরে ওঠা রোগী-
১. যার রোগ পরীক্ষা করে কনফার্ম করা হয়েছিল।
২. উপসর্গ সম্পূর্ণ রূপে চলে যাওয়ার দিন থেকে প্লাজমা দানের দিন পর্যন্ত কমপক্ষে ১৪ দিনের বিরতি আছে (নেগেটিভ টেস্টের সাথে সম্পর্ক নাই)।
৩. যেকোন পুরুষ বা গর্ভবতী নয় এমন মহিলা।
৪. যদি সম্ভব হয় তো এন্টিবডি পরিমাপ করে দেখতে হবে। (১:৬০ ভালো, তবে ১:৮০ নেয়া যেতে পারে)
৫.এন্টিবডি পরিমাপ সম্ভব না হলেও নেওয়া যাবে। তবে এক্ষেত্রে কিছুটা স্যাম্পল পরবর্তীতে পরীক্ষা করার জন্য আলাদা করে রেখে দিতে হবে।

রক্তের গ্রুপের মিল সহ রক্তদানে সক্ষমতার অন্যান্য গুণাবলি থাকতে হবে।

সবশেষে এটা বোধহয় বলাই যায়- যেহেতু টীকা আবিস্কার এখনও হয়নাই তাই দ্রুত ইমিউনিটি বৃদ্ধিতে প্যাসিভ ইমিউনাইজেশনই অন্যতম ভরসা।

তথ্যসূত্র:
১. Effectiveness of convalescent plasma therapy in severe COVID-19 patients
২. Coronavirus drugs: Using plasma from recovered patients as a treatment for COVID-19
৩. FDA guideline for convalescent plasma

ডা. নাজিম অপু: রেজিস্ট্রার, হেমাটোলজি বিভাগ, নর্থ ইস্ট মেডিকেল কলেজ।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত