হাসান নাঈম, শাবিপ্রবি

২১ মে, ২০২৪ ১৩:৩৫

বাংলাদেশের চা শিল্পের সংকট-সম্ভাবনা

আন্তর্জাতিক চা দিবস

আজ আন্তর্জাতিক চা দিবস। সূচনালগ্ন থেকেই চা সর্বত্র পানীয়, বিশ্বব্যাপী তাৎপর্যপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব বহন করে আসছে। চা উৎপাদনের সমৃদ্ধ ইতিহাস বাংলাদেশসহ বিশ্ব চা-য়ের বাজারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। চা-এর বহুমুখী ও অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে। এছাড়াও আর্থ-সামাজিক ও শ্রম সমস্যা নিরসন, ভবিষ্যতের অপার সম্ভাবনা চোখে পড়ার মতো।

আন্তর্জাতিক চা দিবসে বাংলাদেশের চা শিল্পের অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ, সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টি টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ও চা গবেষক ড. ইফতেখার আহমেদের সাথে কথা বলে সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোর। 

আন্তর্জাতিক চা দিবসের তাৎপর্য নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ২০০৫ সালে চা উৎপাদনকারী দেশগুলো এক হয়ে আন্তর্জাতিক চা দিবস পালন করে। এই দেশগুলো হলো- শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ইন্দোনেশিয়া, কেনিয়া, মালয়েশিয়া ও উগান্ডা। পরে ২০১৯ সালে ২১ মে আন্তর্জাতিক চা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ২০১৯ সালের ২১ ডিসেম্বর জাতিসংঘ চা দিবসকে হ্যাঁ বলে। ২০২০ সালের ২১ মে জাতিসংঘ প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক চা দিবস পালন করে।বর্তমানে চা উৎপাদনে বিশ্বে নবম বাংলাদেশ। বাংলাদেশ থেকে চা রপ্তানি হচ্ছে পাকিস্তান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিশ্বের ২৫টি দেশে।

এছাড়াও চা উৎপাদনে মাঠ থেকে শুরু করে কাপে চুমুক দেওয়া পর্যন্ত বিশেষ করে নারীদের পরিশ্রম ও ত্যাগ রয়েছে। তাদের প্রতিটি অবদানকে সম্মান প্রদর্শন এবারের চা দিবসে অনন্য মাত্রা যোগ করে। স্বাধীনতার ৫০ বছরে চা-শিল্প অনেক এগিয়ে গেছে। এ পর্যন্ত ২১টি উচ্চফলনশীল জাতের ক্লোন অবমুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া খরাসহিষ্ণু ও উন্নত ফলনের আরও দুটি ক্লোনও অবমুক্ত করা হয়েছে। চা-শিল্পের বর্তমান বয়স ১৭৮ বছর। সুদীর্ঘ পথচলায় এ শিল্পের রয়েছে অনেক চড়াই-উৎরাইয়ের ইতিহাস।

বাংলাদেশের চা এর পথচলা নিয়ে ড. ইফতেখার বলেন, বাংলাদেশে প্রথম চা বাগান করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় ১৮২৮ সালে। ১৮৪০ সালে চট্টগ্রাম ক্লাব প্রথম চা-গাছ রোপণ করা হয়। এরপর ১৮৫৪ সাল থেকে সিলেটে বাণিজ্যিকভাবে চা চাষ শুরু হয়। সে বছর সিলেট শহরের উপকণ্ঠে মালনীছড়া চা বাগান প্রতিষ্ঠিত হয়। মূলত তখন থেকেই চা এ দেশে একটি কৃষি-শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

চা শিল্পের সংকট-সম্ভাবনা নিয়ে এ চা গবেষক বলেন, চা শিল্প একটা সম্ভাবনার নাম কিন্তু আজকের দিনেও বেশ কিছু জটিল চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন যা এর চিরস্থায়ী এবং লাভের সম্ভাবনাকে হুমকির মুখে ফেলে। বর্তমানে বিশ্ববাজারে চা এর দাম কমছে। উৎপাদন খরচ মেটাতেও ব্যর্থ হচ্ছে চা উৎপাদনকারীরা। এই অর্থনৈতিক চাপ অনেক চা উৎপাদনকারীর জন্য উল্লেখযোগ্য আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়াও বাংলাদেশে চা শ্রমিকদের শোচনীয় অবস্থা সম্পর্কে সকলের অজানা নই।

এতে দেখা যায়, দেশে চা-শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ। বাংলাদেশের ৯৫ ভাগের বেশি নারী চা-শ্রমিকের কোনো নিয়োগপত্র নেই। এর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি নারী। চা-শ্রমিকদের মাসিক বর্তমান গড় আয় ৪ হাজার ৯৮২ টাকা (প্রায়)। অধিকাংশ শ্রমিকের ক্ষেত্রে মজুরি প্রদানের আগে কোনো বেতন রশিদ দেওয়া হয় না। পাশাপাশি নারী কর্মীদের যৌন হয়রানির মতো ঘটনা তো রয়েছে।

বাংলাদেশের চা এর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানাতে গিয়ে অধ্যাপক ইফতেখার আহমেদ বলেন, নিলামের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৩-২৪ মৌসুমে চট্টগ্রামে ৫০টি নিলামে চা বিক্রি হয়েছে ৯ কোটি ৪৮ লাখ কেজি। প্রতি কেজিতে দাম মিলেছে ১৭১ টাকা ৯১ পয়সা। চা উৎপাদনের উচ্চ মান বজায় রাখা যেখানে বিশ্ব বাজারে প্রতিযোগিতার জন্য অপরিহার্য, তবুও জলবায়ু পরিবর্তন, কীটপতঙ্গের উপদ্রব এবং সেকেলে কৃষি অনুশীলনের মতো কারণগুলি চা এর গুণগতমান এবং ফলন উভয়কেই নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে আসছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চায়ের প্রভাব রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, চা বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে উল্লেখ করা যায়। পাটের পর দ্বিতীয় সর্বাধিক রপ্তানিকৃত অর্থকরী ফসল হিসেবে এর অবদান আমরা ভোগ করে আসছি। চা শিল্পের কারণে আজ জাতীয় জিডিপিতে উল্লেখযোগ্যভাবে অবদান রাখে এবং প্রায় ৪ মিলিয়ন লোকের কর্মসংস্থান ও সরাসরি তাদের জীবিকাকে প্রভাবিত করে আসছে। তবে চা শিল্পের রপ্তানি বাড়াতে হলে উৎপাদিত চায়ের গুণগত মান উন্নত করার বিকল্প নেই।