১৮ মে, ২০২৫ ১২:০৩
আমাদের জীবনে কিছু মানুষ থাকেন, যাঁদের কাজ, চিন্তা ও মনন আমাদের অনুপ্রাণিত করে, পথ দেখায়। সাংবাদিকতা, সাহিত্য ও সমাজসেবার ক্ষেত্রে এমনই এক উজ্জ্বল নাম শামসাদ হুসাম চৌধুরী। একজন নিঃস্বার্থ সত্য-সন্ধানী হিসেবে তিনি শুধু কলম ধরেননি, বরং সমাজের নানা স্তরের সমস্যা, বৈষম্য ও মানবিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর জীবন ও কর্মের প্রতিটি পর্বই আমাদের শেখায়—একজন সাংবাদিক কীভাবে সমাজের প্রহরী হয়ে উঠতে পারেন। বলছিলাম শামসাদ জাহা চৌধুরীর কথা যিনি বৈবাহিক সূত্রে শামসাদ হুসাম চৌধুরী হিসেবেও পরিচিত।
শামসাদ হুসাম চৌধুরী বিশিষ্ট এক পরিবার ও বংশের গর্বিত উত্তরাধিকার। তাঁদের পূর্বপুরুষরা ছিলেন মহী পাল রাজবংশের উত্তরসূরি। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে সিলেট জেলার বিয়ানীবাজার উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন মরহুম আবদুর রব চৌধুরী এবং মাতা মরহুমা বেগম দিল আফরোজ চৌধুরী। তাঁর শ্বশুর সলমান চৌধুরী ছিলেন এমসি কলেজ, সিলেট-এর ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী অধ্যক্ষ। তাঁর বড়ো ভাসুর জনাব জিয়া উস সামস চৌধুরী এমসি কলেজেই শিক্ষকতা করতেন। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ ফরেন সার্ভিসে যোগ দিয়ে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেন। ছোটো ভাসুর জনাব আহমদ শামীম চৌধুরী ঢাকা কলেজে শিক্ষকতার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করে পরবর্তীকালে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান এবং নিউ অরলিন্সের টুলেন ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা করেন। তাঁর স্বামী জনাব হুসাম মোহাম্মদ চৌধুরী চা বাগানে উচ্চপদে কর্মরত ছিলেন। শামসাদ খালার পিতার দাদা মরহুম আবদুল আহাদ চৌধুরী ১৯৪০-এর দশকে আসামের করিমগঞ্জ পৌরসভা (লোকাল বোর্ড)-এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আবদুল আহাদ চৌধুরীর ছোটভাই মরহুম শফিকুল হক চৌধুরী বৃটিশ শাসনামলে সিলেট আলিয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল ছিলেন। তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন, ছিলেন একজন সাহিত্যিকও। তাঁর লেখা পাঁচটি গ্রন্থ সে সময় মাদ্রাসার পাঠ্যতালিকাভুক্ত ছিল। বোঝাই যায়, আগের দিনের বৈষয়িক লাঠির সাথে কলমেরও বেশ ভারী জোর ছিল।
সাংবাদিকতা: দায়িত্ববোধের সাহসী ভাষ্য
শামসাদ হুসাম চৌধুরীর সাংবাদিকতা নিছক পেশাগত পরিধির মধ্যে কখনোই আবদ্ধ ছিল না; বরং এটি ছিল এক অন্তরঙ্গ সামাজিক ও নৈতিক দায়বোধের সাহসী প্রকাশ। তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় যেমন আত্মীয়তার সূত্রে, তেমনি নিবিড়ভাবে ঘটেছে তাঁর লেখা কলাম ও প্রতিবেদনের মধ্য দিয়ে। তাঁর লেখাগুলো কেবল তথ্য পরিবেশনে সীমাবদ্ধ থাকত না; সমাজের গভীরে প্রোথিত বৈষম্য, অনিয়ম ও অসংগতির শিকড় অনুসন্ধান করত গভীর বিশ্লেষণধর্মী দৃষ্টিভঙ্গিতে। নারী অধিকার, প্রান্তিক মানুষের জীবনযাপন কিংবা রাজনৈতিক দুরবস্থা—যে বিষয়ই হোক, তিনি কখনো দ্বিধা করেননি লেখার সময়। তাঁর সাহস ছিল সুসংযত ও পরিপক্ব—কখনো অহংকারে রূপ নেয়নি। বরং তাঁর বিনয়, মৃদুভাষিতা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে করে তুলে আরও গ্রহণযোগ্য ও প্রভাবশালী।
তাঁর পেশাগত পথচলা দীর্ঘ, ধারাবাহিক ও নিষ্ঠাপূর্ণ। ১৯৮৩ সালে সাপ্তাহিক ‘যুগভেরী’-তে স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে ১৯৯৩ সালে পত্রিকাটি দৈনিকে রূপান্তরিত হলে তিনি সহকারী সম্পাদক হন। পরবর্তীতে ১৯৯৫ সালে ‘দৈনিক বাংলা’-র সিলেট অফিসে কাজ করেন। নিউইয়র্ক প্রবাসকালেও তিনি ‘সাপ্তাহিক বাংলা’-র সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দেশে ফিরে তিনি আবার ‘যুগভেরী'-তে যোগ দেন এবং প্রায় ২৩ বছর ধরে টেবিল সাংবাদিকতায় রেখেছেন অগ্রণী ভূমিকা। দেশে থাকাকালীন সিলেট প্রেসক্লাবের নির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন। তাঁর লেখনী হচ্ছে সমাজ-মনস্তত্ত্ব ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সূক্ষ্ম পাঠ। পেশাজীবনে তিনি যে নিষ্ঠা, দায়িত্ববোধ ও সাহসিকতা প্রদর্শন করেছেন, তা এক অনন্য সংমিশ্রণ।
শামসাদ হুসাম চৌধুরী শুধু একজন সাংবাদিক নন—তিনি ছিলেন সমাজের অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন এক সচেতন প্রহরী। তাঁর কলমে ছিল সত্যনিষ্ঠতা, চিন্তায় ছিল মানবিকতা, এবং দায়িত্ববোধে ছিল নিষ্ঠা ও সাহস। দৃশ্যমান ঘটনাপ্রবাহের বাইরে তিনি অন্বেষণ করতেন অন্তর্জগতের বাস্তবতা, আর সেই উপলব্ধিকে রূপ দিতেন বিশ্লেষণমূলক, সংবেদনশীল লেখায়। তাঁর জীবন ও কর্ম আমাদের শিখিয়ে দেয়, একজন সাংবাদিক কেবল তথ্য পরিবেশক নন, তিনি হতে পারেন এক সক্রিয় সমাজসেবী, বিবেকবান পথপ্রদর্শক।
তিনি স্পর্শকাতর বিষয়েও লিখেছেন নির্ভীকভাবে, যেখানে ভয়ের স্থানে থাকত প্রজ্ঞা, এবং অভিমতের পরিবর্তে যুক্তির দৃঢ়তা। সময়, প্রযুক্তি ও পাঠকের রুচির পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে সৃজনশীলভাবে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা তাঁর বরাবরই স্বাভাবিক ও সাবলীল। তবে এই অভিযোজন কখনোই তাঁর মানবিক মূল্যবোধ কিংবা বিশ্লেষণী দৃষ্টিকে ক্ষুণ্ণ করেনি। সংবাদ পরিবেশনে প্রান্তিক মানুষের গল্পকেই তিনি তুলে ধরেছেন হৃদয়ের অনুভব দিয়ে- এটি শুধু সাংবাদিকতার নয়, বরং এক সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতার প্রকাশ।
তাঁর ভাষা সহজ, প্রাঞ্জল ও হৃদয়গ্রাহী—পাঠকের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তৈরি করত। পেশাগত পরিসরেও তিনি সহযোগিতামূলক সম্পাদনার প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং দলগত কর্মের এক আন্তরিক প্রবক্তা। সহকর্মীদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক এবং সকলের মতামতকে মূল্য দেওয়ার প্রবণতা তাঁকে একজন সাংবাদিকের বাইরেও এক অনুপ্রেরণাদায়ী কর্মনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
এক সুস্থ সামাজিক বন্ধনের প্রতীক
শামসাদ হুসাম চৌধুরীর সঙ্গে আমার ও আমাদের পরিবারের সম্পর্ক পেশাগত পরিমণ্ডল ছাড়িয়ে এক অন্তরঙ্গ পারিবারিক বন্ধনে রূপ নিয়েছিল। আমাদের পরিবারগুলো পরস্পরের খুব কাছাকাছি ছিল। তাঁর বাবার বাড়ি বিয়ানীবাজার উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামে, আমাদের বাড়ি বড়লেখা উপজেলার শাহবাজপুর এলাকার শ্রীধরপুর গ্রামে। শাহবাজপুর এলাকার ভূগা, ভট্টশ্রী, শ্রীধরপুর ও বিয়ানীবাজারের বাহাদুরপুরের পরিবারগুলোর মধ্যে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সুসম্পর্ক ছিল, বিয়েসাদি থেকে শুরু করে নানা অনুষ্ঠান, উপলক্ষে আসাযাওয়া ছিল, ছিল সাধারণ সামাজিক যোগাযোগ ও সম্পর্কের আলোকে নিত্য আসাযাওয়া। আমাদের শ্রীধরপুরে আরও একটি সম্ভ্রান্ত পরিবার ছিল বিচারপতি বদরুল ইসলাম চৌধুরীর। এই পরিবারের সাথে ও আমাদের সুসম্পর্ক ছিল। বিচারপতি চৌধুরী শামসাদ খালার বড়ো মামা, আমাদের বড়ো ভাই। শামসাদ খালার খালা সুরাইয়া রাজা চৌধুরী ছিলেন এই সিলেটের বিশিষ্ট একজন সংস্কৃতিজন ও সংগঠক। সুতরাং বিভিন্ন পারিবারিক বা সামাজিক অনুষ্ঠানে একত্র হওয়ার সুযোগ হয়েছে বহুবার, এবং প্রতিবারই তাঁর ও তাঁর পরিবারের সরলতা, আন্তরিকতা ও সৌহার্দ্য আমাদের মুগ্ধ করেছে। তাঁর স্বামী জনাব হুসাম মোহাম্মদ চৌধুরী একজন পরিপূর্ণ ভদ্রলোক, যিনি অতিথিদের স্বাগত জানাতে ওতপ্রোতভাবে সবসময়ই আন্তরিক। শামসাদ হুসাম চৌধুরী আমার খালা। মূলত তিনি আমার ভাগ্নি। আমার সিনিয়র হওয়ায় বাঙালি সমাজের চিরন্তন ধারায় তিনিই আমার খালা, জনাব হুসাম মোহাম্মদ চৌধুরী আমার খালু। তাঁদের সন্তান আজরা ও নাদভী আমার ছাত্র ছিল। তারা তাদের মা-বাবার যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবেই বড়ো হয়েছে। তাদের সঙ্গে আমার যত কথোপকথন হয়েছে, ততই বুঝেছি—এই পরিবারটি এক শিক্ষিত, সচেতন এবং সহানুভূতিশীল মূল্যবোধে বেড়ে ওঠা সমাজের প্রতিচ্ছবি। ২০০৩ সালে আমার পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে আয়োজিত গুণীজন সংবর্ধনায় অন্যতম গুণী ব্যক্তিত্ব অপরাজেয় বাংলা খ্যাত বিশ্বনন্দিত ভাস্কর প্রফেসর সৈয়দ আব্দুল্লাহ খালিদ-কে নিয়ে এই উপলক্ষে প্রকাশিত স্মারকগ্রন্থে মূল্যায়নধর্মী প্রবন্ধ লেখেন ও অনুষ্ঠানে তাঁর অবদানের ওপর সারগর্ভ বক্তব্য প্রদান করেন। অনুষ্ঠান আয়োজনে ছিল তাঁর ব্যতিক্রমধর্মী সহযোগিতা।
সাহিত্যসাধনায় শামসাদ হুসাম চৌধুরী
শামসাদ হুসাম চৌধুরীর সাহিত্যচর্চা বহুমাত্রিক ও বর্ণাঢ্য। তাঁর মৌলিক ও সম্পাদিত সতেরোটি গ্রন্থের তালিকা বিশ্লেষণ করলে যে সাহিত্যিক পরিসর ও মনোভঙ্গির পরিচয় মেলে, তা অত্যন্ত বিস্তৃত ও চিন্তনসমৃদ্ধ। তিনি একাধারে প্রাবন্ধিক, গবেষক, অনুবাদক, কবি, ভ্রমণ লেখক, শিশুসাহিত্যিক এবং ঐতিহাসিক মননের ধারক। ইসলামী জীবনাদর্শ থেকে শুরু করে আঞ্চলিক ইতিহাস, ভাষাবিজ্ঞান, শিক্ষাব্যবস্থা, স্মৃতিচারণ ও আন্তর্জাতিক সাহিত্য অনুবাদ—সবখানেই তাঁর নিবিড় মনোনিবেশ লক্ষ্য করা যায়। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থগুলো হচ্ছে : ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা’ (ইসলামিক জীবনী গ্রন্থ), ‘দুঃসময়ের অস্তিত্ব’ (কবিতা), ‘কালের ক্যানভাসে যারা’ (জীবনী গ্রন্থ, ‘যৌথ সম্পাদনা), ‘সলমান চৌধুরী : প্রজন্মের অহংকার’ (সম্পাদনা), ‘দেশ বিদেশের বিচিত্র ঐতিহাসিক কাহিনী’ (শিশুতোষ), ‘কালজয়ীদের জীবন কথা’ (শিশুতোষ), ‘নিধুয়া পাথার কান্দে’ (ছোটোগল্প), ‘প্রচ্ছায়া পথে পথে’ (ভ্রমণ), ‘পথ থেকে প্রান্তর’ (ভ্রমণ), ‘অন্তবিহীন পথ’ (ভ্রমণ), ‘সুরমা থেকে বরাক, উত্তর কাছাড়ের পথ ধরে’ (ভ্রমণ), ‘ইতিহীন ইতিকথা’ (প্রবন্ধ), ‘নির্বাচিত কলাম (প্রবন্ধ), ‘সিলেট : নিবাস বাংলাদেশ’ (সিলেট বিষয়ক), ‘পাল রাজবংশের উত্তরাধিকার’ (ইতিহাস), ‘বিশ্বায়নের খোলা জানালা’ (কলাম-নিবন্ধ সংকলন)। প্রকাশিতব্য গ্রন্থসমূহের মধ্যে রয়েছে ‘তবুও তার হ্রদয় জুড়ে পুরোটাই ছিল বাংলাদেশ’ (কলাম-নিবন্ধ সংকলন), একটি গল্পগ্রন্থ ও একটি কবিতার বই। ‘পাল রাজবংশের উত্তরাধিকার’ গ্রন্থটি পঞ্চখণ্ডের পাল রাজবংশের উত্তরসূরি হিসেবে তিনি নিজ শিকড়ের অনুসন্ধানে অতীত ও বর্তমানের মাঝে এক আত্মিক সেতুবন্ধন গড়ে তুলেছেন, যা তাঁর লেখার একটি অন্তর্নিহিত সুর। তাঁর সাহিত্যকর্মে ভাষার রসবোধ, ঐতিহ্যের প্রতি ভালোবাসা ও সমাজ-মনস্তত্ত্বের গভীর অনুধাবন মিলেমিশে এক অনন্য মাত্রা সৃষ্টি করেছে, যা তাঁকে শুধু একজন সংবাদ ভাষ্যকার নয়, বরং একজন প্রজ্ঞাবান ইতিহাস-অনুরাগী সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ধারক হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে।
সামাজিক ও সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা
দেশে অবস্থানকালে তিনি সিলেট লেখিকা সংঘের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ‘সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)’-এর সিলেট চ্যাপ্টারের সেক্রেটারি ছিলেন। সিলেট সুরমা লায়নেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ও পরে সভাপতি এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) সিলেট শাখার সেক্রেটারি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। জাতীয় যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রশিক্ষণে প্রশিক্ষক হিসেবে অংশ নিয়েছেন। সিলেট বেতারে নিয়মিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতেন তিনি। ২০০৬ সালে আসামের শিলচর থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘সাময়িক প্রসঙ্গ’ পত্রিকায় প্রায় এক বছর কলাম লেখক হিসেবে কাজ করেছেন। একই বছর নিউইয়র্কে ফিরে এসে ‘সাপ্তাহিক কথা’ এবং ‘সাপ্তাহিক নিউইয়র্ক ’পত্রিকায় সিনিয়র সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেন। বর্তমানে তিনি ‘সাপ্তাহিক ঠিকানা পত্রিকার নিয়মিত কলাম লেখক। একসময় নিউইয়র্কের টাইম টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন। কলাম লেখক হিসেবে তিনি ‘সাপ্তাহিক আজকাল ’ ও ‘সাপ্তাহিক প্রথম আল ‘-র সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ (যুক্তরাষ্ট্র শাখা)-এর সভাপতি এবং প্রগ্রেসিভ ফোরাম (যুক্তরাষ্ট্র শাখা)-এর সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
পুরস্কার ও সম্মাননা
বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পাবলিক লাইব্রেরি কর্তৃক আয়োজিত রচনা প্রতিযোগিতায় ১৯৮৮, ১৯৯০ ও ১৯৯১ সালে পরপর তিনবার জেলা পর্যায়ে ছোটোগল্পে শীর্ষস্থান অধিকার করে ‘একুশে পুরস্কার’ লাভ করেন। ২০০৬ সালে সাংবাদিকতায় বিভাগীয় (নারী) পর্যায়ে ‘দুর্বার নেটওয়ার্ক সম্মাননা’ পান। ২০০০ সালে সাহিত্যে ‘বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ সম্মাননা’ লাভ করেন। সাহিত্যিক অবদানের জন্য আরও ১৪টি সম্মাননা ছাড়াও তিনি ‘ঠিকানা অ্যাওয়ার্ড (নিউইয়র্ক)’ এবং ভারতের ‘ভাষা-সংস্কৃতি আকাদেমী, আসাম’-এর ২০০৬ সালের সম্মাননায় ভূষিত হন।
উত্তরাধিকার ও অনুপ্রেরণা
শামসাদ হুসাম চৌধুরীর জীবন আমাদের শেখায়, সাংবাদিকতা কেবল পেশা নয়, এটি একটি সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব। আজ যখন সংবাদমাধ্যম নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তখন তাঁর মতো সাংবাদিকের অভাব তীব্রভাবে অনুভূত হয়। তিনি প্রমাণ করে গেছেন, একজন নারীও কণ্ঠস্বর হতে পারেন সমাজের, ইতিহাসের, ও ভবিষ্যতের। তাঁর জীবনধারা, কাজের প্রতি নিষ্ঠা এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা আমাদের কাছে এক অমূল্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
আমরা যারা তাঁকে কাছ থেকে দেখেছি, তাঁর সঙ্গে কথা বলেছি, তাঁকে অনুভব করেছি, তারা জানি—তিনি যেমন সাহসী, তেমনি সহানুভূতিশীল। যেমন তীক্ষ্ণ, তেমনি বিনয়ী। তাঁর কর্ম ও ব্যক্তিত্ব আজকের এবং আগামী দিনের সাংবাদিকদের জন্য এক দীপ্ত আলোকবর্তিকা। বর্তমানে তিনি নিউইয়র্ক শহরে বাস করেন। তাঁর একটি ছেলে ও একটি মেয়ে রয়েছে। নাতি-নাতনি পাঁচজন। দাদি-নানি হিসেবে দায়িত্বের নতুন এক যুগ্ম সংস্করণ! তাঁর ও তাঁর পরিবারের সকল সদস্যের প্রতি আমাদের শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা জানাই।
উপসংহার
শামসাদ হুসাম চৌধুরী এক অনন্য প্রতিভার নাম, যিনি সাংবাদিকতা, সাহিত্য এবং মানবিক বোধের এক সেতুবন্ধনে নিজেকে পরিপূর্ণভাবে উজাড় করে দিচ্ছেন। তিনি সাহস ও সততার এক প্রতিমূর্তি। তাঁর কলম প্রান্তিকের, প্রান্তজনের কণ্ঠ, তাঁর বক্তব্য সমাজের দর্পণ, তাঁর চিন্তা ভবিষ্যতের আলোকবর্তিকা।
তাঁর কাজ ও চিন্তা আমাদের হৃদয়ে চিরস্থায়ী হয়ে আছে, থাকবে। ভবিষ্যতের সাংবাদিক, লেখক ও চিন্তাবিদরা তাঁকে অনুসরণ করবে এক আদর্শ হিসেবে—যিনি প্রমাণ করেছেন, সত্য ও মানবতা কখনো পরাজিত হয় না।
আপনার মন্তব্য