০৬ ডিসেম্বর, ২০২৫ ১৮:৫২
বাংলাদেশ প্রাকৃতিকভাবেই একটি দুর্যোগপ্রবণ দেশ। ঝড়, জলোচ্ছ্বাস বা বন্যার সঙ্গে লড়াই করে এদেশের মানুষ টিকে থাকতে শিখলেও, ভূমিকম্পের মতো আকস্মিক ও বিধ্বংসী দুর্যোগ মোকাবেলায় আমাদের প্রস্তুতি একেবারেই অপর্যাপ্ত। গত কয়েক দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে অনুভূত হওয়া ভূমিকম্পগুলো আমাদের আবারও সেই রূঢ় বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে।
ভূমিকম্পের কোনো পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু এর আঘাত পরবর্তী উদ্ধার কার্যক্রমে আমাদের যে সক্ষমতার অভাব, তা রীতিমতো ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত স্কুল ও কলেজগুলোর হাজার হাজার শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা নিয়ে এখনই না ভাবলে ভবিষ্যতে আমাদের বড় মূল্য দিতে হতে পারে।
ভূমিকম্পের ইতিহাস ও বাংলাদেশের ভৌগোলিক ঝুঁকি
ভৌগোলিক ও ভূতাত্ত্বিকভাবে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত। বাংলাদেশ মূলত 'ইন্ডিয়ান প্লেট', 'ইউরেশিয়ান প্লেট' এবং 'বার্মা প্লেট', এই তিনটি গতিশীল টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে আছে। ভূতাত্ত্বিকদের মতে, ইন্ডিয়ান প্লেটটি প্রতি বছর উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে ইউরেশিয়ান প্লেটের নিচে তলিয়ে যাচ্ছে, যার ফলে বিপুল পরিমাণ শক্তি বা 'এনার্জি' ভূগর্ভে জমা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় ভূমিকম্পের সাধারণত একটি 'রিটার্ন পিরিয়ড' বা ফিরে আসার নির্দিষ্ট সময়কাল থাকে। সেই হিসেবে ১৮৯৭ সালের পর ১০০ বছরেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে, অর্থাৎ ভূগর্ভে প্রচুর শক্তি জমা হয়েছে যা যেকোনো সময় বড় মাত্রার কম্পন হিসেবে বেরিয়ে আসতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে ঘন ঘন মৃদু ও মাঝারি ভূমিকম্পগুলো সেই বড় বিপদেরই 'অশনিসংকেত' বা প্রি-শক হতে পারে।
অপ্রস্তুত নগর এবং স্কুল শিক্ষার্থীদের ঝুঁকি
১৮৯৭ সালে যখন বড় ভূমিকম্প হয়েছিল, তখন বাংলাদেশ ছিল গ্রামীণ জনপদ। পাকা দালানকোঠা ছিল হাতেগোনা। কিন্তু বর্তমান চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। অপরিকল্পিত নগরায়ন, বিল্ডিং কোড না মেনে আকাশচুম্বী ভবন নির্মাণ এবং জলাশয় ভরাট করে গড়ে ওঠা স্থাপনাগুলো ভূমিকম্পের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
এই ঝুঁকির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। দেশের অধিকাংশ স্কুল-কলেজের ভবনগুলো পুরনো অথবা সঠিক নকশা মেনে তৈরি নয়। তার ওপর সরু সিঁড়ি এবং অপ্রশস্ত করিডোর বিপদের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়।
স্কুল চলাকালীন সময়ে যখন হাজার হাজার শিক্ষার্থী ক্লাসরুমে থাকে, তখন বড় ভূমিকম্প হলে ভবন ধসে পড়ার ঝুঁকির চেয়েও বড় বিপদ হতে পারে 'প্যানিক' বা আতঙ্ক। হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে পদদলিত হয়ে হতাহতের ঘটনা ঘটার আশঙ্কা প্রবল।
রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি বা বিভিন্ন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আমরা দেখেছি, উদ্ধারকাজে আমাদের আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব এবং সরু রাস্তার কারণে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি পৌঁছাতে কতটা বেগ পেতে হয়। এমতাবস্থায় ধ্বংসস্তূপের নিচে কোমলমতি শিশুরা আটকা পড়লে তাদের উদ্ধার করা এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
করণীয়: উদ্ধার মহড়া ও প্রস্তুতি
ভূমিকম্প ঠেকানোর সাধ্য মানুষের নেই, কিন্তু প্রস্তুতি ও সচেতনতার মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি কমিয়ে আনা সম্ভব। জাপানের মতো দেশে শিশুকাল থেকেই ভূমিকম্পের সঙ্গে বসবাস করার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। আমাদের দেশেও এখন সেই সংস্কৃতি চালু করা সময়ের দাবি। কেবল সেমিনার বা গোলটেবিল বৈঠক নয়, প্রয়োজন মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি।
১. ফায়ার সার্ভিস ও ভলান্টিয়ারদের সমন্বিত উদ্যোগ: সরকারের উচিত অবিলম্বে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের নেতৃত্বে প্রতিটি স্কুল-কলেজে বাধ্যতামূলক 'মক ড্রিল' বা মহড়ার ব্যবস্থা করা। যেহেতু ফায়ার সার্ভিসের একার পক্ষে সব স্কুলে পৌঁছানো কঠিন, তাই স্কাউট, গার্ল গাইড, বিএনসিসি এবং রেড ক্রিসেন্টের প্রশিক্ষিত সদস্যদের নিয়ে একটি শক্তিশালী ভলান্টিয়ার নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে।
২. হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ: মহড়ার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শেখাতে হবে -
তাৎক্ষণিক করণীয়: কম্পন শুরু হলে দৌড়াদৌড়ি না করে কীভাবে বেঞ্চ বা শক্ত টেবিলের নিচে আশ্রয় নিতে হবে (Drop, Cover, and Hold On)।
নিরাপদ নির্গমন: কম্পন থামার পর মাথায় শক্ত কিছু (বই বা ব্যাগ) দিয়ে কীভাবে ধীরস্থিরভাবে ও সুশৃঙ্খলভাবে খোলা জায়গায় বেরিয়ে আসতে হবে।
মানসিক প্রস্তুতি: আতঙ্কিত না হয়ে একে অপরকে সাহায্য করার মানসিকতা তৈরি করা।
৩. শিক্ষক ও অভিভাবকদের সম্পৃক্ততা: শিক্ষকদের দুর্যোগকালীন 'ক্রাইসিস ম্যানেজার' হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি অভিভাবকদেরও সচেতন করতে হবে যাতে তাঁরা সন্তানদের অযথা আতঙ্কিত না করেন।
গত কয়েকদিনের ভূমিকম্প আমাদের জন্য প্রকৃতির পাঠানো সতর্কবার্তা। আমরা যদি এই বার্তাকে উপেক্ষা করি এবং 'আল্লাহ ভরসা' বলে হাত গুটিয়ে বসে থাকি, তবে তার পরিণাম হবে ভয়াবহ। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদেরই।
তাই কালক্ষেপণ না করে, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভূমিকম্প পরবর্তী উদ্ধার কার্যক্রমের মহড়া বাধ্যতামূলক করা হোক। একটি সুরক্ষিত ও সচেতন প্রজন্মই কেবল দুর্যোগের ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশকে আবার নতুন করে গড়ে তোলার শক্তি রাখে।
আপনার মন্তব্য