COVID-19
CORONAVIRUS
OUTBREAK

Bangladesh

Worldwide

48

Confirmed Cases,
Bangladesh

05

Deaths in
Bangladesh

15

Total
Recovered

658,205

Worldwide
Cases

30,442

Deaths
Worldwide

141,419

Total
Recovered

Source : IEDCR

Source : worldometers.info

বহ্নি চক্রবর্তী

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০১:৩০

শ্রীহট্টের বনেদি বাড়ির দুর্গা পূজো

সাধারণত আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষের ষষ্ঠ থেকে দশম দিন পর্যন্ত শারদীয়া দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। এই পাঁচটি দিন যথাক্রমে "দুর্গাষষ্ঠী", "মহাসপ্তমী", "মহাষ্টমী", "মহানবমী" ও "বিজয়াদশমী" নামে পরিচিত। আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষটিকে বলা হয় "দেবীপক্ষ"।

দেবীপক্ষের সূচনার অমাবস্যাটির নাম মহালয়া; এই দিন হিন্দুরা তর্পণ করে তাঁদের পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধানিবেদন করে।

দেবীপক্ষের শেষ দিনটি হল কোজাগরী পূর্ণিমা। এই দিন হিন্দু দেবী লক্ষ্মীর পূজা করা হয়। কোথাও কোথাও পনেরো দিন ধরে দুর্গাপূজা পালিত হয়।

সেক্ষেত্রে মহালয়ার আগের নবমী তিথিতে পূজা শুরু হয়। পশ্চিমবঙ্গের বিষ্ণুপুর শহরের মৃন্ময়ী মন্দির এবং অনেক পরিবারে এই রীতি প্রচলিত আছে।

পারিবারিক স্তরে দুর্গাপূজা প্রধানত ধনী পরিবারগুলিতেই আয়োজিত হয়। পুরোনো ধনী পরিবারগুলির দুর্গাপূজা "বনেদি বাড়ির পূজা" নামে পরিচিত। দুর্গাপূজো বাঙালি হিন্দুদের সর্ববৃহৎ উৎসব। এটি আনন্দের উৎসব, আত্মীয় পরিজন, বন্ধুবান্ধবের সাথে মিলিত হওয়ার উৎসব।

দেবী দুর্গা তাঁর সন্তানসন্ততি সমেত ৫ দিনের জন্য স্বর্গ থেকে মর্তে আসেন। এই কদিন সকলেই সবকিছু ভুলে শুধু আনন্দে মেতে ওঠেন। নতুন জামাকাপড়, পূজো প্যান্ডেলে নতুন নতুন প্রেম, ভালোভালো খাওয়া দাওয়া ,নানারকমের অনুষ্ঠান, আলোর রোশনাই সবমিলিয়ে ৫ দিন একেবারে জমজমাট।

সর্বজনীন পূজোর সাথে সাথে কতগুলি বিখ্যাত বনেদি বাড়ির পূজো পূজোর আকর্ষণকে আরও বাড়িয়ে তোলে। এরকমই ২ টি বিখ্যাত বনেদি বাড়ির পূজোর গল্প আজ আমার আলোচ্য।

সিলেট শহরের পরিচয় ছিলো এরকম আলী আমজাদের ঘড়ি, বঙ্কু বাবুর দাড়ি, জিতু মিয়ার বাড়ি আর চাঁদনিঘাটের সিঁড়ি!

লাল ব্রাদার্স- প্রসিদ্ধ জমিদার প্রয়াত বঙ্কু বাবুর বাড়ি, পরবর্তীতে তা সাধু বাবুর বাড়ি হিসেবে বিখ্যাত। সিলেটের শেখঘাটে অবস্থিত লাল ব্রাদার্স বাড়ি বনেদী পরিবার হিসেবে আজও বিখ্যাত। সিলেটে লাল ব্রাদার্স বাড়ির পূজো ১৮১০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে শুরু! লাল ব্রাদার্স এ বছর ২০৯ তম দুর্গা উৎসব উদযাপন করতে চলছে।

জন্মাষ্টমীর পর থেকেই প্রতি বছর দেবী প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু হয়ে যায়। একচালা ও ডাকের সাজের প্রতিমার পূজো করা হয়ে থাকে। তৎকালীন সময় পূজোর পুরোহিত আসতেন ৮-১০ জন ভারতের উড়িষ্যা থেকে। মহালয়ার পরের দিন থেকেই পূজা শুরু হতো। পারিবারিক দুর্গা পূজাগুলিতে শাস্ত্রাচার পালনের উপরেই বেশি জোর দেওয়া হয়। পূজা উপলক্ষে বাড়িতে এখনো আত্মীয়-সমাগম হয়ে থাকে।

পারিবারিক কাঠামো
লালব্রাদার্স বাড়ির বংশধরেরা আসেন কাশ্মীর থেকে। কাশ্মীরের বণিক সম্প্রদায়। বলরাম দাস বাবু আসেন কাশ্মীর থেকে মুর্শিদাবাদে। মুর্শিদাবাদ থেকে উনার ছেলে বুনচাঁদ বাবু নবাব সিরাজদৌল্লার আমলে সিলেটের ছাতকে আসেন চুনাপাথরের ব্যবসায় করতে। তখন সেখানেই মায়ের পূজা প্রথম শুরু করেন বুনচাঁদ বাবু।

যা পরবর্তীতে চালিয়ে যান বানছারাম বাবু। বানছারাম বাবুর ছেলে ব্রজগোবিন্দবাবু সিলেটে আসেন অষ্টাদশ শতাব্দীতে।

সিলেট এসে জমিদারি কিনেন, শেখঘাটের বাড়ি থেকে শুরু করে লালাদিঘীর পাড়, মির্জাজাঙ্গাল, বন্দরবাজার, মাছুদিঘীর পাড়, লালবাজার, তালতলা থেকে শুরু করে মহাজনপট্টি, চালিবন্দর দিকেও বিস্তৃত ছিলো জমিদারী। এছাড়াও বিশ্বনাথ, ব্রম্মময়ী বাজার এলাকায়ও জমিদারীর অংশ ছিলো।

ব্রজগোবিন্দ বাবুর ছেলে বঙ্কুবাবু ছিলেন প্রসিদ্ধ জমিদার। পরবর্তী সময় বঙ্কুবাবু জমিদারি বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে দেন। আর সেই পরম্পরা বঙ্কবাবুর বংশধরেরা বর্তমানে পালন করে যাচ্ছেন।

বঙ্কুবাবুর নাতি হলেন প্রয়াত সাধুবাবু, কানুবাবু ও পটলবাবু। সাধু বাবু সিলেট শহরের প্রখ্যাত ব্যবসায়ী। ছিলেন শ্রীহট্টের সম্মানিত ব্যক্তিত্ব।

সাধু বাবুর জ্যৈষ্ঠ কন্যা শ্রীমতি সাহা। বাংলাদেশের প্রখ্যাত শিল্পপতি আর পি সাহার পুত্রবধূ। শ্রীমতী সাহা মির্জাপুর কুমুদিনী ট্রাস্টের চেয়ারম্যান।

প্রয়াত সাধু বাবুর কনিষ্ঠভ্রাতা পটলবাবু ওরফে বিদিত লাল দাস জমিদারি ছাড়াও বাংলাদেশের লোক সংগীতের প্রবাদ পুরুষ ছিলেন! সংগীতের পরিমণ্ডল তাঁদের পরিবারে প্রথম থেকেই ছিলো। প্রয়াত বিদিত লাল দাসের পিতা প্রয়াত বিনোদ লাল দাস ছিলেন বিশিষ্ট পাকোয়াজ বাদক।

২.
সিলেটে বনেদি বাড়ির পূজোর মধ্যে যেটা বাদ দেওয়াই যায় না সেটা হল সিলেটের প্রাণকেন্দ্রে চৌহাট্টায় অবস্থিত, সেন্ট্রাল ফার্মেসি বাড়ির পূজো। পরিবারের পরিচিতি প্রয়াত আইনজীবী বিনয়েন্দ্র কুমার দে'র সময়ে। ব্রিটিশ আমল ১৯৪৩ সাল প্রথম চৌহাট্টা বাড়িতে দুর্গাপূজো শুরু করেন তিনি। এই বার ৭৭তম দুর্গা-পূজো উদযাপন করতে চলেছে সেন্ট্রাল ফার্মেসি পরিবার।

১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষ ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি দেশে পরিণত হয়। ব্রিটিশ ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের নিয়ে গঠিত হয় পাকিস্তান, সেই বছর প্রয়াত বিনয়েন্দ্র কুমার দে মাকে আহবান করেন! দেশ বিভাজনে পর ১৯৭০ সাল পর্যন্ত প্রতিমা গড়ে পূজা করা হয়।

১৯৭১ সাল মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় সেন্ট্রাল ফার্মেসির সবাই ভারতের শিলচর শহরে চলে যান, সেখানে আবার মায়ের পূজো করা হয়। তবে পরিবারের সবাই দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আবার দেশে ফিরে আসেন।

এরপর থেকে, একচালা ও ডাকের সাজের প্রতিমার পূজো করা হয়ে থাকে এ বাড়ির পুরোহিতরা ছিলেন প্রয়াত পণ্ডিত সিতাংশু ভট্টাচার্য, প্রয়াত পণ্ডিত সুরেশ চক্রবর্তী। বিভিন্ন সময় সিলেটের বড় বড় পণ্ডিত পুরোহিতরা পূজার কাজ সম্পাদন করেছেন।

সেন্ট্রাল ফার্মেসির পরিবার শাক্ত- বৈষ্ণবমতে দীক্ষিত! কিন্তু প্রাণী বলি কোনও দিনই এই পূজোর অংশ হয়নি। পূজোর কদিন এই কারণেই সমস্ত সদস্যরাই নিরামিষ আহার করেন। দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের পরই আমিষ খাবার খাওয়া হয়। এখানে দেবীর উপাচারেও রয়েছে বিশেষ বৈশিষ্ট্য। লুচি-মিষ্টি-মণ্ডা ভোগের সঙ্গে থাকে চিনির মঠ।

এই পরিবারের মহিলারাই পূজোর সমস্ত কাজ করেন এবং সবাইকে খাবার বা ভোগ পরিবেশন করে থাকেন। প্রতি বছরই পরিবারের সমস্ত সদস্যরাই এই পুজোয় মিলিত হন। বাংলাদেশের বহু বিখ্যাত মানুষ এবং বিদেশ থেকেও অনেকে এই পূজো দেখতে আসেন। দশমীতে সিঁদুর খেলা এবং বিজয়া দশমীতে অষ্টদূর্বা দিয়ে আশীর্বাদ এই পরিবারের অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। এই বাড়িতে পুজোয় এসেছেন ডঃ মহানামব্রত ব্রক্ষ্মচারী এবং প্রেসিডেন্সী কলেজ কলকাতার অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক বীরেন্দ্র চক্রবর্তী। এছাড়াও বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদ ও মন্ত্রীরা প্রতিবছর দর্শন করতে আসেন।

পারিবারিক কাঠামো
সেন্ট্রাল ফার্মেসি পরিবার সেই ব্রিটিশ আমল থেকে আদি নিবাসী চৌহাট্টায়। সেন্ট্রাল ফার্মেসি ১৯৪৫ সালে দেশ বিভক্ত হওয়ার আগেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল প্রয়াত বিজেন্দ্র কুমার দে'র হাত ধরে। সেন্ট্রাল ফার্মেসি তৎকালীন আমলে বিশ্বস্ত নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে ওঠে সিলেটে। প্রয়াত বিজেন্দ্র কুমার দে পেশায় কেমিস্ট ছিলেন।

‘সেন্ট্রাল ফার্মেসি’ পরিবারের সারাবিশ্বে প্রায় ২০০ জন সদস্য রয়েছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, হংকং ইত্যাদি শহরে এই পরিবারটি প্রায় আট দশক ধরে দুর্গাপূজা উদযাপন করে আসছে। এই যৌথ পরিবারেরও প্রাথমিক ব্যবসাটি বাংলাদেশের সিলেটের প্রাণকেন্দ্র চৌহাট্টায় অবস্থিত সেন্ট্রাল ফার্মেসী প্রাইভেট লিমিটেড।

বিশেষ কৃতজ্ঞতা: অধ্যাপক বিজিত কুমার দে, অমিতাভ দে, বিশ্বদ্বীপ লাল দাস বাসু।

বহ্নি চক্রবর্তী: প্রবাসী লেখক।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত