সিলেটটুডে ডেস্ক

০৭ ডিসেম্বর, ২০২৫ ১৩:৪০

অ্যালার্জির কণা: আমাদের চারপাশে লুকিয়ে থাকা ক্ষুদ্র বিপদ

ছবি: সংগৃহীত

আমরা প্রতিদিন এমন এক অদৃশ্য জগতে চলাফেরা করি, যেখানে অসংখ্য ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণার উপস্থিতি আমাদের টেরই পাই না। এই কণাগুলো এতই ছোট যে খালি চোখে ধরা পড়ে না— তবু এরা ছড়িয়ে আছে আমাদের চারপাশে। দৈনন্দিন ব্যবহারের সাবান, কসমেটিক, আসবাবপত্র থেকে শুরু করে খাদ্যদ্রব্য, এমনকি বাতাসেও তারা ভেসে বেড়ায়। যে কণাগুলো এমন অতি-প্রতিক্রিয়া ঘটায়, সেগুলোই অ্যালার্জি কণা্ও রয়েছে। অ্যালার্জি কণার উৎস নানাভাবে হতে পারে— পুরোনো জিনিসপত্রে থাকা ফাঙ্গাসের স্পোর, ফুলের পরাগ বা পলেন, বিভিন্ন গাছ-ঘাসের নিঃসরিত কণা, কিংবা ডিটারজেন্ট ও ক্লিনজারের মতো দৈনন্দিন ব্যবহার্য সামগ্রী।

এই কণাগুলো মূলত চারটি পথে আমাদের শরীরে প্রবেশ করতে পারে : ত্বক, নাক ও শ্বাসনালি; চোখ, এবং মুখগহ্বর–খাদ্যনালি। তাই অ্যালার্জির উপসর্গগুলোও সাধারণত এই অঙ্গগুলোকেই ঘিরে প্রকাশ পায়।

এই কণাগুলো যখন শরীরের সংস্পর্শে আসে, তখন আমাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থা (ইমিউন সিস্টেম) সাধারণত দুটি প্রতিক্রিয়া দেখায়—
১) কোনো সমস্যা না মনে করে শরীর এগুলোকে গ্রহণ করে নেয়।
২) অথবা অতিরিক্ত সাড়া দিয়ে অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

দ্বিতীয় ধরনের প্রতিক্রিয়াকেই আমরা ‘অ্যালার্জি’ বলি। 

আমাদের চারপাশে থাকা নানা কণা বা উপাদানের প্রতি শরীরের অতিসংবেদনশীল প্রতিক্রিয়াই মূলত এলার্জি। এই প্রতিক্রিয়া শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে দ্রুত প্রকাশ পায়। লক্ষণগুলো কখনো খুব হালকা হয়, আবার কখনো প্রাণঘাতী আকারও নিতে পারে। অ্যালার্জির সাধারণ ও গুরুতর কিছু লক্ষণ।

১. সর্দি ও নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া।

শ্বাসের সঙ্গে আসা এলার্জিকণা নাকের ভেতরের আস্তরণকে উত্তেজিত করে ফুলিয়ে তুলতে পারে। এর ফলেই সর্দি, নাক বন্ধ থাকা বা নাক দিয়ে পানি পড়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। কোনো ওষুধ গ্রহণের পর যদি এক ঘণ্টার মধ্যেই নাক বন্ধ হয়ে আসে, তবে সেটি ওষুধের প্রতিক্রিয়াও হতে পারে।

২. হাঁচি

হাঁচিকে অনেকেই গুরুত্ব দেন না, কিন্তু এটি অ্যালার্জির অন্যতম প্রাথমিক সংকেত। বারবার লাগাতার হাঁচি শুরু হলে তা পরবর্তীতে আরও জটিল লক্ষণ তৈরি করতে পারে।

৩. চোখে চুলকানি এবং অশ্রুপাত।

বসন্তসহ বিভিন্ন মৌসুমে বাতাসে পরাগরেণুর পরিমাণ বাড়লে চোখের বাইরের আবরণ উত্তেজিত হয়ে চুলকাতে থাকে বা পানি ঝরতে পারে। চোখের এই অস্বস্তি প্রায়ই গুরুতর অ্যালার্জির আগমনি বার্তা হয়।

৪. কান বা মুখে চুলকানি।

বিশেষ করে নতুন কোনো খাবার খাওয়ার পর মুখগহ্বর, ঠোঁট বা কানে চুলকানি শুরু হলে তা খাদ্যজনিত অ্যালার্জির সূচনা হতে পারে। সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে এটি আরও জটিল অবস্থায় পৌঁছাতে পারে।

৫. শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া।

হঠাৎ শ্বাস আটকে আসা, বুকে চাপ অনুভব করা বা স্বাভাবিক শ্বাস নিতে না পারা— এসবই গুরুতর অ্যালার্জির তীব্র লক্ষণ। অবহেলা করলে এটি বিপজ্জনক অবস্থায় যেতে পারে।

৬. আমবাত বা আরটিকারিয়া

ত্বকে হঠাৎ সাদা বা লালচে উঁচু চাকা, সঙ্গে প্রচণ্ড চুলকানি— এটিই আমবাত। এটি ওষুধ, খাবার বা রাসায়নিকের প্রতিক্রিয়ার কারণে দেখা দিতে পারে। তবে একই সঙ্গে ঠোঁট ফুলে যাওয়া বা শ্বাসকষ্ট হলে বিষয়টি জরুরি চিকিৎসার দাবি রাখে।

৭. চামড়ায় ফুসকুড়ি

ত্বকে হঠাৎ চুলকানিযুক্ত ফুসকুড়ি বা ফোসকা দেখা দিতে পারে। এগুলো সাধারণত প্রাণীর খুশকি, রাসায়নিক, খাবার বা মেকআপের অ্যালার্জিতে দেখা দেয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সহজ চিকিৎসায় সেরে গেলেও কখনো এটি অ্যানাফিল্যাক্সিসের শুরু হতে পারে।

৮. বমি বমি ভাব, বমি বা ডায়রিয়া।

খাবার গ্রহণের অল্প পরেই এসব উপসর্গ দেখা দিলে খাদ্যজনিত অ্যালার্জির সম্ভাবনা থাকে। লক্ষণগুলো দ্রুত খারাপের দিকে যাওয়ায় এগুলোকে সাধারণ পেটের অসুখ হিসেবে নেওয়া বিপজ্জনক।

৯. বুক টানটান হওয়া।

হঠাৎ বুক শক্ত হয়ে যাওয়া বা শ্বাসের সময় ব্যথা অনুভব করা গুরুতর খাদ্য-অ্যালার্জির একটি পরিচিত সংকেত। দেখা মাত্রই চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।

১০. জিহ্বা বা ঠোঁট ফুলে যাওয়া।

কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়া মুখের ভেতর, ঠোঁট বা জিহ্বা ফুলে উঠলে সেটি অ্যাঞ্জিওইডিমার লক্ষণ হতে পারে। শ্বাসকষ্ট থাকলে তা প্রাণঘাতী পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। প্রায়ই ফুলে গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ অবশ্যই প্রয়োজন।

১১. ত্বকে হঠাৎ লালচে হয়ে যাওয়া (ফ্লাশিং)

অ্যালার্জি উদ্দীপক খাদ্য বা কণার সংস্পর্শে এসে ত্বক হঠাৎ লাল হয়ে গেলে তা গুরুতর প্রতিক্রিয়ার নির্দেশ হতে পারে। সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা নেওয়া উচিত।

১২. হঠাৎ বিভ্রান্তি বা উদ্বেগ অনুভব

রক্তচাপ দ্রুত কমে যাওয়ার ফলে ব্যক্তি বিভ্রান্ত, অস্থির বা মৃত্যুভয় অনুভব করতে পারেন। এটি অ্যানাফিল্যাক্সিসের একটি মারাত্মক লক্ষণ এবং অবিলম্বে জরুরি সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন।

গুরুতর অ্যালার্জি— একটি মেডিক্যাল ইমার্জেন্সি।

উন্নত দেশগুলোতে অ্যালার্জি ব্যবস্থাপনায় উন্নত চিকিৎসাসুবিধা থাকলেও আমাদের দেশে এখনও এ বিষয়ে সচেতনতা ও প্রস্তুতি কম। গুরুতর এলার্জিকে কখনোই হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। সময় নষ্ট না করে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া, সঠিক পরীক্ষা–নিরীক্ষার মাধ্যমে কারণ নির্ণয় এবং বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী প্রতিরোধ-ব্যবস্থা গ্রহণ করাই নিরাপদ পথ।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত