সিলেটটুডে ডেস্ক

২৯ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০৬

আইএমএফের ছক অনুযায়ী চলছেন গভর্নর আহসান: অভিযোগ উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিনের

পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বর্তমান গভর্নর নীতি সুদহার বাড়িয়ে ১০ শতাংশে তুলে রেখেছেন এবং তিনি গোঁ ধরে আছেন যে এই সুদের হার ১০ শতাংশেই ধরে রাখবেন, যতদিন না মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে নামছে। গভর্নর আগে আইএমএফ কাজ করেছেন বলে সংস্থাটির ছক অনুযায়ী চলছেন বলে অভিযোগ করেন উপদেষ্টা।

তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি এই ধরনের ৭ শতাংশ মূল্যস্ফীতিরও কোনো তাৎপর্য নাই, আর ১০ শতাংশ নীতি সুদহারেরও কোনো তাৎপর্য নাই। যদিও বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এ ধরনের কিছু বেঞ্চমার্ক করে রাখে। কিন্তু কেন করে রাখে এবং সেটাই যে একেবারে অবধারিত সত্য– তা নয়। এর কোনো অর্থ নেই।

বুধবার (২৮ জানুয়ারি) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত ‘অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও পরবর্তী সরকারের চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক সেমিনার ও ইআরএফ শিক্ষাবৃত্তি- ২০২৬ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, ‘উচ্চ সুদের হার ও কঠোর মুদ্রানীতির চাপে বেসরকারি উদ্যোক্তারা ক্রমেই ঋণ জটিলতার মুখে পড়ছেন।’

বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় শিল্প ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে দীর্ঘ সময় উচ্চ সুদের হার বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা নতুন করে পর্যালোচনার আহ্বান জানিয়েছেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ।

তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য সুদের হার কড়াকড়ি করে রাখাই একমাত্র পথ নয়।

পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, ‘বর্তমানে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। উচ্চ সুদের কারণে নতুন বিনিয়োগে অনীহা বাড়ছে এবং বিদ্যমান উদ্যোক্তারা কার্যক্রম সম্প্রসারণে পিছিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন। এই অবস্থায় দীর্ঘদিন উচ্চ সুদের হার বহাল থাকলে উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।’

ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘সুদ বাড়িয়ে রেখে মূল্যস্ফীতি দ্রুত কমানোর যে ধারণা ছিল, তা বর্তমান বাস্তবতায় আর অতটা কার্যকর নয়। মূল্যস্ফীতি যতটা কমার কথা ছিল, ততটা কমেনি; তবে এর প্রবণতা নিম্নমুখী। অর্থাৎ এটা কমছে, তবে খুব ধীরগতিতে। যদিও গভর্নর মনে করেছিলেন, এটা খুব দ্রুতগতিতে কমবে।’

বছরের ব্যবধানে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি ১১ শতাংশ থেকে ৮ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। তিনি বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে নামাতেই হবে বা নীতি সুদের হার ১০ শতাংশে ধরে রাখতে হবে- এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।’

তিনি বলেন, ‘বর্তমান গভর্নর আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ব্যাচের ছাত্র এবং তিনি দীর্ঘসময় আইএমএফে কাজ করেছেন। যার ফলে আইএমএফের ছক অনুযায়ীই তিনি চলছেন। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে তিনি নীতি সুদহার বাড়িয়ে ১০ শতাংশে তুলে রেখেছেন।’

তিনি গোঁ ধরে আছেন, এই সুদের হার ১০ শতাংশেই ধরে রাখবেন, যতদিন না মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে নামছে। আমি মনে করি এই ধরনের ৭ শতাংশ মূল্যস্ফীতিরও কোনো তাৎপর্য নাই, আর ১০ শতাংশ নীতি সুদহারেরও কোনো তাৎপর্য নাই। যদিও বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এ ধরনের কিছু বেঞ্চ মার্ক করে রাখে। কিন্তু কেন করে রাখে এবং সেটাই যে একেবারে অবধারিত সত্য- তা নয়। এর কোনো অর্থ নেই। আমার নিজের মতে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ অনেক কমে গেছে। গত বছরের অক্টোবরে যা ছিল ৯ শতাংশ। এটা এখন আরও কমে ৬ শতাংশে নেমে গেছে। কিন্তু সেই হারে মূল্যস্ফীতি কমছে না। কাজেই সুদহার বাড়িয়ে ঋণ প্রবাহ কমিয়ে রাখলেই যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসবে এমন বাস্তবতা এখন আর নেই। মূল্যস্ফীতি একদিকে আর সুদের হার অন্যদিকে। এখানে একটু সমন্বয়ের সময় এসেছে।

অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরে পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, ‘আগের সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। শিল্পের কাঁচামাল আমদানি বেড়েছে, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে এবং বৈদেশিক লেনদেন পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধীরে ধীরে বাড়ছে। এসব সূচকের ভিত্তিতে চলতি বছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের কাছাকাছি হতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।’

তিনি বলেন, আগের সময়ে আপাতদৃষ্টিতে অর্থনীতি ভালো মনে হলেও বাস্তবে ব্যাংক খাতের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছিল, যা তখন স্পষ্ট ছিল না। ফলে বর্তমান সরকারকে ভঙ্গুর অর্থনীতির ভার বহন করতে হচ্ছে।

ব্যাংক খাত নিয়ে কঠোর সমালোচনা করে ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘বিগত সরকারের আমলে আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল। ব্যাপক অর্থপাচার ও অব্যবস্থাপনার কারণে ব্যাংক খাত ছিল অত্যন্ত নাজুক অবস্থায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং ব্যাংকগুলোর ধস ঠেকাতে বড় অঙ্কের টাকা পুনর্ভরণ করতে হয়েছে। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে হাজার হাজার কোটি টাকা ছাপাতে হয়েছে। এর কারণেই ঋণের সুদের হার বাড়াতে হয়েছে, ঋণ প্রবাহ কমিয়ে রাখতে হয়েছে। মূল্যস্ফীতি না কমার এটাও একটা পরোক্ষ কারণ। পাশাপাশি প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি আমদানির বকেয়া পরিশোধ করতে হয়েছে। বন্ধ কারখানার শ্রমিকদের মাসের পর মাস মজুরি পরিশোধসহ নানা কারণে সরকারকে বড় ধরনের অদৃশ্য ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে।’

বাজেট পরিস্থিতি নিয়ে পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, ‘বর্তমানে যে পরিমাণ রাজস্ব আদায় হচ্ছে, তা মূলত সরকারের পরিচালন ব্যয় মেটাতেই ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও উন্নয়ন খাতে ব্যয় করতে হচ্ছে দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর করে। বিদেশি ঋণের একটি বড় অংশ বিদেশি পরামর্শকদের পেছনেই চলে যাওয়ায় এই ধারা দীর্ঘ মেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন তিনি। সে কারণেই অহেতুক বিদেশি পরামর্শকনির্ভর প্রকল্প বাতিল করা হচ্ছে বলে জানান।’

দুর্নীতি প্রসঙ্গে ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, বড় বড় দুর্নীতি আগের তুলনায় কমলেও মামলাবাণিজ্য ও বদলিবাণিজ্যের মতো অনিয়ম এখনো বিদ্যমান। শিক্ষা উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনকালে তার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে শত শত তদবির আসত। আগে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিলেই কাজ হতো, মন্ত্রণালয়ে আসতে হতো না। এখন সবাই বলে, একটা সুযোগ এসেছে, তাই মন্ত্রণালয়ে চলে আসেন। আমার রুমের সামনে অনেক লোক আসত। আমি তাদের ডিঙিয়ে রুমে যেতাম। তিনি আরও বলেন, ‘কলেজে একটি বদলির জন্য ৮ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ তিনি গোয়েন্দা সংস্থাকে জানালেও তা উদঘাটন করা সম্ভব হয়নি।’

ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, বর্তমান সরকার একটি গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী প্রত্যাশা পূরণের সরকার হিসেবে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে কাজ করছে। তবে কেবল ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে না। ভৌত অবকাঠামো দিয়ে কঙ্কাল তৈরি করা যায়, কিন্তু মানবসম্পদ ছাড়া প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার মান নিম্নমুখী থাকায় প্রশাসনিক দক্ষতা কমেছে। যুব সমাজের হতাশা দূর করতে এবং ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড কাজে লাগাতে কারিগরি ও মানসম্মত শিক্ষার বিকল্প নেই।’

অনুষ্ঠানে ইআরএফ সদস্যদের সন্তানদের মধ্যে মেধা ও সাধারণ বৃত্তি প্রদান করা হয়। এতে বক্তব্য দেন ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী এবং ব্র্যাক ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও এসএমই ব্যাংকিং প্রধান সৈয়দ আবদুল মোমেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতার এবং সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত