০৫ আগস্ট, ২০২৬ ২১:০৫
সুনামগঞ্জে গত কয়েক দিন ধরে বিদ্যুতের চরম লোডশেডিং চলছে। দিনের অর্ধেক সময়ই বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না শহর ও গ্রামের মানুষ। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সব শ্রেণির গ্রাহক।
দিরাই পৌর শহরের মাদানী মহল্লার বাসিন্দা পাবেল হাসান বলেন, দিনের অধিকাংশ সময় বিদ্যুৎ থাকে না বললেই চলে। দিনে তিন ঘণ্টা পর পর এবং রাতে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা পর পর বিদ্যুৎ আসে-যায়। গ্রামের মানুষের কষ্ট আরও বেশি। লোডশেডিংয়ের কারণে গ্রাম থেকে শহর—সবাইকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা লোডশেডিংয়ের কথা স্বীকার করে জানান, চাহিদা অনুযায়ী অর্ধেকের বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বাধ্য হয়েই একসংগে প্রায় অর্ধেক ফিডার বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
জানা গেছে, সুনামগঞ্জ জেলায় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির গ্রাহকসংখ্যা ৪ লাখ ৫৩ হাজারের বেশি। এর মধ্যে পিডিবির সুনামগঞ্জ শহর এলাকায় ৩৫ হাজার ও দিরাই জোনের আওতায় ১৮ হাজার এবং পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির গ্রাহক প্রায় ৪ লাখ।
সিলেট থেকে ছাতক হয়ে সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কের ইকবালনগর গ্রিডের মাধ্যমে জেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। সেখান থেকে পিডিবির ২টি ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ১১টি উপকেন্দ্রের মাধ্যমে বিভিন্ন ফিডারে বিদ্যুৎ পৌঁছায়। বর্তমানে পিডিবি সুনামগঞ্জে ৫টি ও দিরাইয়ে ৪টিসহ মোট ৯টি এবং পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ৬৫টি ফিডারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে।
সুনামগঞ্জ পিডিবি কর্তৃপক্ষের দাবি, শহরের ৩৫ হাজার গ্রাহকের জন্য প্রতিদিন গড়ে ১৩ থেকে ১৪ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। কিন্তু গত কয়েক দিন ধরে মিলছে মাত্র ৬ থেকে সাড়ে ৭ মেগাওয়াট, যা চাহিদার অর্ধেকেরও কম। ফলে দিনের অর্ধেক সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না।
একই অবস্থা দিরাই জোনেও। সেখানে ১৯ হাজার গ্রাহকের জন্য প্রতিদিন ৬ থেকে সাড়ে ৬ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ২ থেকে আড়াই মেগাওয়াট।
অন্যদিকে, সুনামগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ৪ লাখ গ্রাহকের (যার ৩ লাখ ৯৩ হাজারই আবাসিক) দৈনিক চাহিদা ৬০ থেকে ৭০ মেগাওয়াট। কিন্তু গ্রিড থেকে মিলছে মাত্র ৩০ মেগাওয়াট। রাতে চাহিদা বেড়ে ৬৫ থেকে ৭০ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ মিলছে অর্ধেকেরও কম।
কাঙ্ক্ষিত বিদ্যুৎ না পাওয়ায় উৎপাদন ও সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠানগুলো চরম সংকটে পড়েছে। জামালগঞ্জ উপজেলার সাচনাবাজারের ব্যবসায়ী সুদীপ্ত রায় বলেন, বিদ্যুতের অভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। সারাদিনে ৪-৫ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না। সামর্থ্যবানরা আইপিএস, জেনারেটর বা সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করলেও সাধারণ মানুষ দিশেহারা।
সুনামগঞ্জ শহরের ষোলঘরের বাসিন্দা কাউছার আহমদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কারেন্টের যন্ত্রণায় আমরা অতিষ্ঠ। সামান্য মেঘ ডাকলেই বিদ্যুৎ বন্ধ হয়ে যায়। একবার গেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা খবর থাকে না। গরমে রাতে ঘুমানো যায় না, দিনে কাজ করা যায় না। অফিসে ফোন করলে একটাই জবাব—লোডশেডিং চলছে।
পৌর মার্কেটের ব্যবসায়ী সুজন দাস জানান, তীব্র গরমের মধ্যে টানা লোডশেডিংয়ে বেচাকেনা একপ্রকার বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
সুনামগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) মিলন কুমার কুন্ডু বলেন, আমাদের দিনে ৫৫ থেকে ৬০ মেগাওয়াট এবং রাতে ৬৫ থেকে ৭৫ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা থাকে। কিন্তু পাচ্ছি মাত্র ৩০ থেকে ৩২ মেগাওয়াট। বাধ্য হয়ে ৬৫টি ফিডারের মধ্যে অন্তত ৩০টি বন্ধ রাখতে হচ্ছে। বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় এ সংকট তৈরি হয়েছে বলে ধারণা করেন তিনি।
সুনামগঞ্জ পিডিবির বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাসেল আহমদ বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতি, গ্যাস ও জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সমস্যা হচ্ছে। গত ৪-৫ দিন ধরে সরবরাহ অনেক কমে গেছে। চাহিদার অর্ধেক বিদ্যুৎ পাওয়ায় ৯টির মধ্যে ৪-৫টি ফিডার নিয়মিত বন্ধ রাখতে হচ্ছে, ফলে সব গ্রাহককে নিরবচ্ছিন্ন সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
আপনার মন্তব্য