নিজস্ব প্রতিবেদক

২৮ ফেব্রুয়ারি , ২০১৫ ১৩:৩০

অভিজিৎ রায় হত্যা: গ্রেফতার নাই, বক্তব্যও নাই স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর

অভিজিৎ রায়ের হত্যাকাণ্ডের ৪৮ ঘন্টার বেশি সময় পার হয়ে যাওয়ার পরও পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি। উলটা বিতর্কিত বক্তব্য দিয়েছে তারা। সরকারের পক্ষ থেকেও কোন বক্তব্য আসেনি। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর পক্ষ থেকেও কোন বক্তব্য আসেনি।

বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) একুশে বইমেলা থেকে বাসা ফেরার পথে বইমেলার পাশেই টিএসসিতে জঙ্গি মৌলবাদী কর্তৃক আক্রান্ত হন বিজ্ঞান লেখক ও মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ রায়। মারাত্মকভাবে আহত হন তাঁর স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা।

গুরুত্বর আহত অবস্থায় অভিজিৎ রায়কে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত ডাক্তারেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত বন্যাকে ঢামেক থেকে স্কয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে উন্নত চিকিৎসার জন্যে।

ডিএমপি কমিশনার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জঙ্গিগোষ্ঠীর আখড়া বলে মন্তব্য করেছেন কিন্তু অদ্যাবধি তাদের পক্ষ থেকে কোন ধরণের পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় নি।

ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া শুক্রবার সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন- “জঙ্গিরা কতোটা ডেসপারেট হতে পারে তার প্রমাণ দিয়েছে। পাশেই থানা, বইমেলার প্রবেশমুখে পুলিশ, সবগুলো প্রবেশপথে পুলিশ... এরপরও এখানে একটা ঘটনা ঘটিয়ে গেছে তারা।”

এদিকে, রমনা অঞ্চলের জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার (এসি) এস এম শিবলী নোমান বলেন, ‘একজন পুলিশ ঘটনা দেখে মনে করেছিল, মারামারি হচ্ছে। এ রকম যে ঘটবে, সেটা আগে বুঝতে পারেনি।’

মারামারি হবে দেখে পুলিশ এগোয়নি এমন বক্তব্যে ক্ষোভে ফুঁসছেন অনেকেই। এ প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ফাহিম বলেন- পুলিশের এমন বক্তব্যে আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন- মারামারি কিংবা খুন হলেও যদি পুলিশ না এগিয়ে আসে তাহলে পুলিশের কাজ কী?

অভিজিতের বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক অজয় রায় ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘পুলিশ হয়তো আমার ছেলের খুন ঠেকাতে পারত না। কিন্তু পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে না থেকে তারা তো খুনিদের ধরতে পারত।’

গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা আসার পর প্রতিদিনই বইমেলায় যাওয়া আসা করছিলেন অভিজিৎ রায়। বৃহস্পতিবার রাতে যে জায়গায় তার ওপর হামলা হয়, ওই পথ দিয়েই প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ বইমেলায় যায়, চলাফেরা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সাংস্কৃতিক কর্মীরা। ঘটনাস্থল থেকে টিএসসি মোড় আর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের প্রবেশ পথের দূরত্ব ২৫/৩০ গজ।

টিএসসি মোড়ে মেলার জন্য ব্যারিকেড দিয়ে পুরো ফেব্রুয়ারি মাসই পাহারায় রয়েছে পুলিশ। এছাড়া দুই/আড়াইশ' গজ দূরে শাহবাগ থানা। শাহবাগ মোড়, বইমেলা পেরিয়ে দোয়েল চত্বর, ফুলার রোডের মোড়, নীলক্ষেতসহ ক্যাম্পাসের প্রতিটি প্রবেশমুখে রয়েছে সার্বক্ষণিক পুলিশি নিরাপত্তা। তারপরও কীভাবে এরকম একটি হত্যাকাণ্ড ঘটল, হামলাকারীরা কীভাবে কাজ শেষে নির্বিঘ্নে পালিয়ে গেল, হত্যাকাণ্ডের পর একদিন পার হলেও পুলিশ কেন কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারল না- এসব প্রশ্নের জবাব নেই কারও কাছে।

২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি লেখক হুমায়ুন আজাদকেও কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয় এই টিএসসি এলাকায়। টিএসসি থেকে মাত্র শ’ খানেক গজ দূরে ফুটপাতের ওপর ফেলে কোপানো হয় তাকে, যে ঘটনায় জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ। বইমেলার মাসে সেই তারিখের একদিন আগে ২৬ ফেব্রুয়ারি খুন হলেন অভিজিৎ, যিনি সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্ম ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে যুক্তিনির্ভর লেখালেখি করে আসছিলেন নিয়মিত। এ জন্য তাকে হুমকিও পেতে হয়েছে। একই স্থানে আবারও একজন লেখক হামলার শিকার হওয়ায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বইমেলার প্রকাশক, লেখক, পাঠক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের মধ্যেও।

এদিকে পুলিশের নিরাপত্তায় দুর্বলতার কথা মানতে চাননি পুলিশ কামিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া। তবে পুলিশের নাকের ডগায় আবারও একই ধরনের হামলায় তারাও যে স্তম্ভিত, তা তার কথাতেও স্পষ্ট। হুমায়ুন আজাদ, ব্লগার রাজিব আর অভিজিত হত্যার ঘটনা ‘একই সূত্রে গাঁথা’ বলে জানান তিনি।

পুলিশের দায়িত্বশীলেরা যখন বিতর্কিত বক্তব্য দিচ্ছিলেন তখন হত্যাকারীদের গ্রেফতারে তাদের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল দেশ-বিদেশে আলোচিত এই হত্যা নিয়ে কোন মন্তব্য করেননি। ফলে সরকারের কাছে এই হত্যাকাণ্ডের গুরুত্ব নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।

এদিকে অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ডের তদন্তে আগ্রহ প্রকাশ করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই)। তারা বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) এফবিআইর পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সঙ্গে অনানুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ করা হয়েছে। ডিবির দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের ওয়েব সাইটে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তি থেকে জানা যায় মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র জেন সাকি নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে অভিজিৎ রায়ের হত্যাকাণ্ডে নিন্দা জানিয়েছেন এবং তদন্ত কাজে মার্কিন সরকার সহযোগিতা করতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন। এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা ও খুনিদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন বৃটিশ হাইকমিশনার গিবসন। 

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে অভিজিৎ রায়ের হত্যাকাণ্ডের খবর গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হয়েছে। দি গার্ডিয়ান, সিডনি মরনিং হেরাল্ড, বিবিসি, এনডিটিভি সহ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমগুলোতে হত্যাকাণ্ডের খবরে ইসলামপন্থী জঙ্গি মৌলবাদী গোষ্ঠীদের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। সেখানে জঙ্গি মৌলবাদীদের দেওয়া হুমকিগুলো আলোচিত হয়।

দেশে-বিদেশে তোলপাড় সৃষ্টি এই হত্যাকাণ্ডে সবাই কথা বললেও ‘চুপ’ করে বসে আছেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কামাল। তবে সরকারদলীয় ১৪ দলীয় জোটের মূখপাত্র এবং প্রভাবশালী মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এই হত্যাকাণ্ডকে রাজনৈতিক মেরুকরণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মান্না-খোকা’র ষড়যন্ত্রমূলক ফোনালাপের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন।

উল্লেখ্য, কয়েকদিন আগে ফাঁস হওয়া এক অডিওতে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না ও বিএনপি নেতা সাদেক হোসেন খোকার মধ্যকার আলাপে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় লাশ ফেলে আন্দোলন চাঙ্গা করার ইঙ্গিত ছিল।

মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের রাজনৈতিক বক্তব্য ইতোমধ্যেই প্রবল সমালোচনার মুখে পড়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বিপ্লব পাল এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন- একজন সিনিয়র মন্ত্রী হয়েও নাসিম সাহেব কীভাবে এই দুঃখজনক ঘটনার সঙ্গে রাজনীতিকে জড়িত করে ফেলেন সেটা দেখে অবাক হলাম। এটা খুনি মোলবাদী জঙ্গিদের বাঁচাবার একটা মিশন বলে যোগ করেন তিনি।

এদিকে দুঃখজনক এই ঘটনা নিয়ে রাজনীতিকরণ করার চক্রান্তে মেতেছেন বামপন্থী আরেক রাজনীতিবিদ জুনায়েদ সাকি। তিনি বলেছেন-দেশে হত্যার রাজনীতির মধ্য দিয়ে কেউ ক্ষমতায় থাকতে চায় আর কেউ ক্ষমতায় যেতে চায়। কিন্তু হত্যাকারীর বিচার কেউ করে না। রাজনীতির এ হত্যার খেলার বিরুদ্ধে জনগণকে সংগঠিত হতে হবে।

 

 

 

 

আপনার মন্তব্য

আলোচিত